‘একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি বা ক্ষমতার প্রতি নয়’, অবসরোত্তর সংবর্ধনায় বিচারপতি আশফাকুল

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:০২আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:০২

একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; তার আনুগত্য সংবিধান, আইন ও নিজের বিবেকের প্রতি—অবসরে যাওয়ার সময় এমন মন্তব্য করেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম।

সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) অবসরে যান তিনি। প্রথা অনুযায়ী এদিন তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষে সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন তাকে সংবর্ধনা জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী, আপিল বিভাগের বিচারপতি ও আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

বিদায়ী বক্তব্যে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর তিনি অবসর নিচ্ছেন। তবে এটিকে তিনি শুধু বিচারিক জীবনের সমাপ্তি নয়, আইনাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখেন।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ ও রাষ্ট্রের সেবায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। একজন বিচারক হিসেবে প্রজাতন্ত্রের সেবা করতে পারাকে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেন।

বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত সংগ্রামীদের স্মরণ করে তাদের অবদান জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি তার মরহুম পিতা, সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম এবং সদ্যপ্রয়াত মাতা, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজুকে স্মরণ করেন। ওয়ারীর ১১ র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের ‘কবিতাঙ্গন’ শুধু তাদের পরিবারের নয়, দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সমৃদ্ধ করতেও ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সহধর্মিণীর ধৈর্য, ত্যাগ ও ভালোবাসা এবং সন্তানদের সমর্থন ছাড়া এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা সম্ভব হতো না।

আইনজীবী জীবন ও বিচারক হিসেবে কর্মজীবনে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, সেই প্রবীণ আইনজীবী, জ্যেষ্ঠ বিচারপতি, সহকর্মী বিচারপতি এবং কনিষ্ঠ সহকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একই বেঞ্চে বিচারকার্য পরিচালনার সুযোগকে তিনি আনন্দময় অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগ শুধু বিচারক বা আইনজীবীদের নয়; বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী—সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই এ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে। ভবিষ্যতেও বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে বিচার বিভাগের কল্যাণে কাজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অবসরকে নতুন অধ্যায়ের সূচনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয়। সামর্থ্য থাকা পর্যন্ত বিচার বিভাগের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

নবীন আইনজ্ঞদের উদ্দেশে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ সততা, এরপর চরিত্র এবং তারপর অধ্যয়ন। সংবিধান, আইন, দেশি-বিদেশি রায় ও বিচারতত্ত্ব নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইনে পড়াশোনারও আহ্বান জানান তিনি।

বিচার বিভাগের সামনে মামলার জট কমানো, বিচার দ্রুত ও কার্যকর করা এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব মোকাবিলায় বিচার বিভাগকে আরও দক্ষ, আধুনিক ও সেবামুখী হতে হবে।

তিনি বলেন, বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই যথেষ্ট নয়; মানুষকেও বিশ্বাস করতে হবে যে বিচার হয়েছে। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা, আর সেই আস্থা রক্ষা করাই সর্বোচ্চ দায়িত্ব।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিচক্ষণ ব্যবহার বিচার বিভাগের দক্ষতা বাড়াবে, মানুষের ভোগান্তি কমাবে এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করবে বলেও মত দেন তিনি।

জেলা পর্যায়ের বিচারকদের উদ্দেশে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, সব সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা জয় করে ধৈর্যের সঙ্গে নির্ভয়ে ন্যায়ের পক্ষে থাকতে হবে। এতে জনগণের আস্থা অটুট থাকবে এবং নতুন প্রজন্মের বিচারকদের প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উৎকর্ষ অর্জিত হবে।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আরও আধুনিক, দক্ষ, মানবিক ও জনমুখী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; বিচারবোধ, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থায় নিহিত।

বক্তব্যের শেষাংশে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়; এটি স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। বিচার বিভাগের দায়িত্ব সেই অঙ্গীকার সমুন্নত রাখা। একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; তার আনুগত্য সংবিধান, আইন ও নিজের বিবেকের প্রতি।

/বিআই/ইউএস/
সম্পর্কিত
গুম করে গুলশানের বাড়ি দখলের অভিযোগ: মূল মালিকের পক্ষে আপিল বিভাগের রায়
‘ড. ইউনূসের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মওকুফের তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা’ 
দীর্ঘ ২০ বছরের আইনি লড়াই, নিহতের স্ত্রী-শ্বশুর-শাশুড়ির যাবজ্জীবন
সর্বশেষ খবর
‘আমি আগুনে ঘি ঢালতে আসিনি, খেলোয়াড়রা জানে এটা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল’
‘আমি আগুনে ঘি ঢালতে আসিনি, খেলোয়াড়রা জানে এটা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল’
আজও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির আভাস, কোথাও হতে পারে ভারী বর্ষণ
আজও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির আভাস, কোথাও হতে পারে ভারী বর্ষণ
ম্যারাডোনার মতো স্মরণীয় হতে পারবেন মেসি?
ম্যারাডোনার মতো স্মরণীয় হতে পারবেন মেসি?
অর্থবহ পর্যটনকে টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার করার আহ্বান
অর্থবহ পর্যটনকে টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার করার আহ্বান
সর্বাধিক পঠিত
‘স্বামীর প্রাক্তন বা বর্তমান স্ত্রী মানেই শত্রু নয়, এটি সমাজের শিখিয়ে দেওয়া’
‘স্বামীর প্রাক্তন বা বর্তমান স্ত্রী মানেই শত্রু নয়, এটি সমাজের শিখিয়ে দেওয়া’
সরকারের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে, শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাই: জি এম কাদের
সরকারের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে, শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাই: জি এম কাদের
‘যারা বিএনপি মনা তারা ভাগ করে খালে মাছ চাষ করুন, আমি টাকা দেবো’
‘যারা বিএনপি মনা তারা ভাগ করে খালে মাছ চাষ করুন, আমি টাকা দেবো’
গুনে গুনে ঘুষ নিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করেন তিনি, বলেন ‘আমার কাছে কারও বেইল নাই’
গুনে গুনে ঘুষ নিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করেন তিনি, বলেন ‘আমার কাছে কারও বেইল নাই’
পুষ্টিকর ও সুস্বাদু একটি খাবার পঞ্চপদী খিচুড়ি
পুষ্টিকর ও সুস্বাদু একটি খাবার পঞ্চপদী খিচুড়ি