ব্লগার ও গণজাগরণ আন্দোলনের কর্মী নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় হত্যার ১১ বছর পার হলেও শেষ হয়নি বিচার। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে। চার্জশিটভুক্ত ১৫ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত এক বছরেও নতুন কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।
২০১৫ সালের ৭ আগস্ট। রাজধানীর পূর্ব গোড়ান টেম্পো স্ট্যান্ড সংলগ্ন ৮ নম্বর সড়কের নিজ বাসায় দুর্বৃত্তদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়।
এ হত্যাকাণ্ডের পর কেটে গেছে ১১ বছর। কিন্তু এখনো আদালতের কাঠগড়ায় শেষ হয়নি সাক্ষ্যগ্রহণ। বিচার কবে শেষ হবে, তা নিয়েও নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে মামলাটি ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আলমগীর হোসেনের আদালতে বিচারাধীন।
২০২৫ সালের ৩০ জুলাই মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ পরিদর্শক মো. আনোয়ার হোসেন আদালতে সাক্ষ্য দেন। পরে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এরপর গত এক বছরে আর কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।
সর্বশেষ গত ২১ জুন সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় আগামী ১৭ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।
বিচার শুরুর পর থেকে চার্জশিটভুক্ত ১৫ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
দীর্ঘ ১১ বছরেও স্বামীর হত্যার বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী এবং নিলয়ের স্ত্রী আশা মনি।
তিনি বলেন, প্রতি বছর নিলয় হত্যার বার্ষিকীতে সাংবাদিকরা খোঁজ নেন। কিন্তু বছরের বাকি সময় কেউ খবর রাখেন না। এখনো তিনি ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
আশা মনি বলেন, বিয়ের মাত্র দুই বছরের মাথায় স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। এরপর থেকে নিলয়ের স্মৃতি নিয়েই বেঁচে আছেন। কেন নিলয়কে হত্যা করা হলো, তার যৌক্তিক কোনো কারণ আজও খুঁজে পাননি তিনি।
স্বামীর হত্যার বিচার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চেয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে আশা মনি বলেন, তিনি জানেন না কবে এই বিচার শেষ হবে, আদৌ বিচার পাবেন কি না। তবে যতদিন বেঁচে থাকবেন, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকবেন।
বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু নিলয় হত্যা নয়, দেশে সংঘটিত সব ব্লগার হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করা উচিত। এ মামলার প্রতিও সরকার সুদৃষ্টি দেবে বলে আশা করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, কয়েকজন সাক্ষীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একজন তদন্ত কর্মকর্তা এরই মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
তবে সাক্ষীদের পাওয়া না গেলে মামলাটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তার আশা, দ্রুতই মামলাটির বিচার শেষ হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ বিল্লাহ হোসেন বলেন, মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। সাক্ষীরা আর আদালতে উপস্থিত না হলে মামলাটি রায়ের জন্য প্রস্তুত হবে। চলতি বছরের মধ্যেই রায় দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আদালত থেকে সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও তারা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না। ফলে বছরের পর বছর মামলাটি ঝুলে আছে।
সাক্ষীরা উপস্থিত না হলে আসামিপক্ষেরও কিছু করার থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারাধীন মামলা হওয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে আসামিরাও ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা করেন তিনি।
যেভাবে হত্যা করা হয় নিলয়কে
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট পূর্ব গোড়ানের বাসায় চার যুবক বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে প্রবেশ করে। এরপর নিলয়ের স্ত্রী আশা মনিকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তারা নিলয়ের গলা ও ঘাড়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
পরে এ ঘটনায় খিলগাঁও থানায় অজ্ঞাতপরিচয় চারজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন আশা মনি।
২০২০ সালের ৪ অক্টোবর রমনা জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক শাহ মো. আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস ১৩ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এরপর ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ফয়সল আতিক বিন কাদেরের আদালত ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—মো. মাসুম রানা, সাদ আল নাহিয়ান, মো. কাওসার হোসেন খাঁন, মো. কামাল হোসেন সরদার, মাওলানা মুফতী আব্দুল গাফ্ফার, মো. মর্তুজা ফয়সলে সাব্বির, মো. তারেকুল আলম ওরফে তারেক, খায়রুল ইসলাম ওরফে জামিল ওরফে রিফাত ওরফে ফাহিম ওরফে জিসান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাহাব, মোজাম্মেল হোসেন সায়মন, মো. আরাফাত রহমান এবং মো. শেখ আব্দুল্লাহ ওরফে জুবায়ের।
আসামিদের মধ্যে মেজর জিয়া ও মো. কাওসার হোসেন খাঁন পলাতক। আরেক আসামি আবু সিদ্দিক সোহেল আদালত থেকে পালিয়ে গেছেন।
হত্যার আগে হুমকি
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন নিলয়। ‘নিলয় নীল’ নামে ইস্টিশন ব্লগে লিখতেন তিনি। পাশাপাশি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কালেকটিভ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছিলেন নিলয়। নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে হত্যার প্রায় আড়াই মাস আগে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে ফেসবুকে লিখেছিলেন তিনি।
হুমকির সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়। নিজ বাসায় স্ত্রীকে সামনে রেখে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় নিলয়কে। কিন্তু হত্যার ১১ বছর পরও শেষ হয়নি সেই হত্যার বিচার।









