ভুয়া ঠিকানার প্রতিষ্ঠানের নামে ফলের চালান, আড়ালে স্বর্ণ পাচার

ইমরান আলী
১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫২আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫২

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ফলের ক্যারেটের গোপন প্রকোষ্ঠ থেকে সম্প্রতি ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় চোরাচালানের একটি বড় নেটওয়ার্কের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তে উঠে এসেছে, ‘ফুড লিংক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গত এক বছরে হংকং থেকে অন্তত ১০টি ফলের চালান দেশে এসেছে। এসব চালানের কয়েকটিতে একই কৌশলে স্বর্ণ আনা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, সর্বশেষ গত ১৯ জুলাই যে চালান থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে, সেটি এই চক্রের বড় একটি নেটওয়ার্কের মাত্র একটি অংশ। আগের চালানগুলোও এখন নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।

পুরো চক্রকে শনাক্ত ও গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন।

তদন্তে জানা গেছে, কাগজপত্রে ফল আমদানির কথা উল্লেখ থাকলেও ক্যারেটের ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি গোপন প্রকোষ্ঠে স্বর্ণবার লুকিয়ে আনা হতো। এভাবে আন্তর্জাতিক কার্গো ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর পার করে চালানগুলো খালাসের পর্যায়ে পৌঁছাত।

এক প্রতিষ্ঠানের নামে ১০ চালান

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হংকং থেকে ‘ফুড লিংক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গত এক বছরে অন্তত ১০টি ফলের চালান দেশে এসেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৭৭৫ ও ৭৪২ কেজি ওজনের দুটি চালান, ফেব্রুয়ারিতে ৬৯৬ কেজির একটি এবং মার্চে ৬৮৩ ও ৬৮৮ কেজি ওজনের আরও দুটি চালান আসে।

এরপর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে একই প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৫৮ ও ৬৩৬ কেজি ওজনের আরও দুটি চালান আসে। এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকটি চালান দেশে এসেছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

এসব চালানের প্রতিটিই এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, ফলের চালানকে দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের পর সন্দেহ

গত ১৯ জুলাই একটি চালান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সেটি খুলে পরীক্ষা করা হয়। এ সময় ফলের ক্যারেটের ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি গোপন প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণবার পাওয়া যায়। উদ্ধার করা হয় প্রায় ১৬ কেজি স্বর্ণ।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, ক্যারেটের কাঠামোর ভেতরে এমনভাবে প্রকোষ্ঠ তৈরি করা হয়েছিল, বাইরে থেকে দেখে যাতে সহজে বোঝার উপায় না থাকে। সন্দেহজনক চালানটি শনাক্ত হওয়ার পর আগের একই প্রতিষ্ঠানের নামে আসা চালানগুলোর তথ্যও খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।

ঢাকা কাস্টমস হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম জানান, তারা পাঁচটি চালানের সন্ধান পেয়েছেন। হংকং-শাহজালাল রুটকে স্বর্ণ চোরাচালানের নতুন রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে বড় স্ক্যানার না থাকায় সব চালান যান্ত্রিকভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহের ভিত্তিতে চালান পরীক্ষা করতে হয়। উদ্ধার হওয়া ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

কাগজে ফল, ক্যারেটে স্বর্ণ

শুল্ক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সূত্র জানায়, হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন কার্গো ফ্লাইটে এসব চালান ঢাকায় এসেছে। নথিতে পণ্য হিসেবে ফলের উল্লেখ থাকায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সেগুলো কার্গো ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেছে।

উদ্ধার হওয়া চালানের নথি অনুযায়ী, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল ফুড লিংক। চালান খালাসের জন্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে ট্যাগ করা ছিল এ. রাজ্জাক ট্রেডিং নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। মাস্টার কার্গো এজেন্ট হিসেবে ছিল ফাস্টট্র্যাক কার্গো সলিউশনস লিমিটেড।

তদন্তে সংশ্লিষ্টদের নাম ও প্রতিষ্ঠানের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ভুয়া ঠিকানায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান

শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফুড লিংকের নিবন্ধিত ঠিকানা প্লট-৫৬০, মণ্ডা, উত্তরখান, ঢাকা-১২৩০। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হিসেবে মো. গোলাম মোস্তফার নাম রয়েছে।

তবে তদন্তকারীরা ওই ঠিকানায় গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অফিস, গুদাম বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সন্ধান পাননি। প্রাথমিক তদন্তে ঠিকানাটি ভুয়া বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, অস্তিত্বহীন বা ভুয়া ঠিকানার একটি প্রতিষ্ঠানের নামে কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে একের পর এক পণ্যবাহী চালান দেশে এসেছে এবং সেগুলো নিয়মিত খালাস হয়েছে।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সন্দেহজনক চালান জব্দের পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিরাপত্তা প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সেটির কায়িক পরীক্ষা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি বডি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে এবং কাস্টম হাউসে সেই ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে।

কাস্টমসের নথিতে চালান পরীক্ষা ও খালাস প্রক্রিয়ায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধির উপস্থিতির তথ্যও রয়েছে। তবে মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীকে আসামি করা হলেও অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে চালানটির জন্য ট্যাগ করা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এ. রাজ্জাক ট্রেডিং বা এর স্বত্বাধিকারীকে আসামি করা হয়নি।

এ নিয়ে তদন্তের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।

‘পুরো চক্রকে গ্রেফতারে কাজ চলছে’

বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম বলেন, তদন্ত অনেকটা গুছিয়ে আনা হয়েছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। কাগজপত্র অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানের অফিসেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের নামে হংকং থেকে যত চালান এসেছে, সেগুলোর কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। আমরা পুরো চক্রকে গ্রেফতারে কাজ করছি।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি অভিযান চালানো হয়েছে। তবে এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ফল আমদানির বৈধ ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক কাজ করে থাকতে পারে। সর্বশেষ ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের পর আগের চালানগুলোর তথ্যও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত এগোলে এই চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত এবং কীভাবে চালানগুলো খালাস হয়েছে, সে বিষয়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

/এম/
সম্পর্কিত
‘রোম বিমানবন্দরের লাউঞ্জে যাযাবরের মতো পড়ে রইলাম ৪০ ঘণ্টা’
নায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা ডন গ্রেফতার
ঢাকায় পৌঁছালো রোমে আটকে থাকা বিমানের সেই ফ্লাইট 
সর্বশেষ খবর
এসএসসির চেয়ে দাখিলে পাসের হার কম
এসএসসির চেয়ে দাখিলে পাসের হার কম
সৃজনশীল কাজে এআই ব্যবহারের সন্দেহে বাতিল হচ্ছে চুক্তি
সৃজনশীল কাজে এআই ব্যবহারের সন্দেহে বাতিল হচ্ছে চুক্তি
কেউ পাস করেনি- এমন প্রতিষ্ঠান বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
কেউ পাস করেনি- এমন প্রতিষ্ঠান বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
২.২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস
২.২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস
সর্বাধিক পঠিত
ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
আগারগাঁওয়ের ভাতের হোটেলের ‘ভাইরাল মিজান’ গ্রেফতার
আগারগাঁওয়ের ভাতের হোটেলের ‘ভাইরাল মিজান’ গ্রেফতার
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা
দুই নেতা আলোচনায় বসলে সব সমস্যার সমাধান হবে: ভারতের হাইকমিশনার
দুই নেতা আলোচনায় বসলে সব সমস্যার সমাধান হবে: ভারতের হাইকমিশনার
কেরালার নাম বদলে দিচ্ছে মোদি সরকার
কেরালার নাম বদলে দিচ্ছে মোদি সরকার