রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে হয়রত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল থেকে বের হচ্ছিলেন বাংলাদেশি যাত্রী শাজাহান আলম। তিনি কানাডার টরন্টো থেকে এসেছেন। মুখে ক্লান্তির ছাপ। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
সাংবাদিকদের শাজাহান আলম বললেন, ‘৪০ ঘণ্টা যাযাবরের মতো ছিলাম। ৮ ঘণ্টা ফ্লাইটের ভেতর কেটেছে। এরপর বিমানবন্দরের লাউঞ্জে নেওয়া হলো। সেখান থেকে বলা হলো হোটেলে নেবে। কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের লাউঞ্জে রেখে আমেরিকা-কানাডার পাসপোর্টধারীদের হোটেলে নিলো। আমরা বাংলাদেশি পাসপোর্টধীরা পড়ে রইলাম লাউঞ্জে। এরপর সেখানেই কেটে গেলো ৪০ ঘণ্টা। আমরা মানুষ না অন্যকিছু তারা কিছুই মনে করলো না।’
শাহজাহান আলম বলেন, ‘আমাদের পাসপোর্টের তারা কোনও দামই দিল না। আর খাবার যা দেওয়া হলো, তাতো আমরা খেতে পারি না। সব মিলিয়ে দুই দিনের মতো আমরা একটা যাযাবর দিন পার করলাম।’
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আনিকা নামের আরেক যাত্রী। তিনি বলেন, ‘বিমানের ভেতর থাকা অবস্থায় প্রায় ৩ ঘণ্টা পর আমরা জানতে পারি ত্রুটির কথা। এরপর আরও প্রায় ৫ ঘণ্টা পর আমাদের নামানো হলো। এরপর এলেন বিমানের এক কর্মকর্তা। তিনি স্যরি বললেন। আমরা যারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট হোল্ডার তাদের লাউঞ্জে রেখে কানাডা, আমেরিকার পাসপোর্ট হোল্ডারদের হোটেলে নেওয়া হলো। আর আমরা পড়ে রইলাম।’
তিনি বলেন, ‘চেয়ারেই কেটে গেলো ৪০ ঘণ্টা। বিমান ও আমাদের অ্যাম্বাসি চেষ্টা করলে আমাদেরও নিতে পারতো। তারা অনঅ্যরাইভাল ভিসাও দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে আমাদের এত দুর্ভোগ পোহাতে হলো।’
শাফায়াত হোসেন নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারকে বলবো, পাসপোর্টকে শক্তিশালী করতে। আর যেহেতু নতুন সরকার, সবকিছু নতুন। বিমান ও অ্যাম্বাসির পুরাতন কাউকে দেখতে চাচ্ছি না। তারপরও সরকারকে ধন্যবাদ যে, আমাদের নিয়ে এসেছেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা। তিনিও আটকে পড়েন। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিমান নিয়ে নিউজ করে কী করবেন? তারা কী কোঅর্ডিনেশন দেখালো? একটা চেয়ারে কীভাবে আমরা এত সময় কাটালাম। এত দুর্ভোগ কেউ কোনও কথা বলে না।’
মাহমুদা তালুকদার নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘আমার কানাডার পাসপোর্ট থাকায় হোটেলে ছিলাম। আমার ছোট মেয়ে নিয়ে আমার কস্ট করতে হয়নি। কিন্তু যারা এয়ারপোর্টে ছিল, তাদের অনেক দুর্ভোগ হয়েছে।’
যাত্রীরা বলেন, বৃদ্ধ, শিশু নিয়ে এই সময়টা তাদের যে দুর্ভোগ সেটা বলার মতো নয়। একটা চেয়ারে, ফ্লোরে শুয়ে বসে থাকা অনেক কষ্টের। তবে বিমানের উদ্দেশে তারা বলেন, সার্ভিস ভালো না করলে খুব দ্রুত সময়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসটি ডুবে যাবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার কানাডার টরন্টো থেকে বিমানের বিজি ৩০৬ ফ্লাইটটি ২৫৯ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। শুক্রবার রোম এয়ারপোর্টে জ্বালানি নিতে যাত্রাবিরতি করলে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার চেষ্টায় সেই ত্রুটির সমাধান করতে না পারায় ফ্লাইটটি বাতিল করে যাত্রীদের প্লেন থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাদের হোটেল ও এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে অবস্থানের ব্যবস্থা করে বিমান কর্তৃপক্ষ।
এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম নিয়ে প্রকৌশল টিম শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া ১১টার দিকে একটি ফ্লাইটে রোমে পৌঁছায়। এরপরই উড়োজাহাজটি মেরামত করে উড্ডয়ন উপযোগী করেন তারা।
এদিকে দীর্ঘসময় ফ্লাইটটি গ্রাউন্ডেড ও অনেক যাত্রীকে ইতালি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ভিসাজনিত কারণে বিমানবন্দরের বাইরে হোটেলে যেতে না দিলে যাত্রীদের বিমানবন্দরেই থাকতে হয়। দীর্ঘসময় তারা বিমানবন্দরে থাকার ফলে নানা দুর্ভোগের শিকার হন।
যাত্রীদের অভিযোগ, রোমে অবতরণের পর ত্রুটির কথা জানিয়ে প্রায় ৮ ঘণ্টা তাদের উড়োজাহাজের ভেতরেই অপেক্ষা করানো হয়। এতে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
আরও পড়ুন...
ঢাকায় পৌঁছালো রোমে আটকে থাকা বিমানের সেই ফ্লাইট
ইতালির বিমানবন্দরে বাংলাদেশিদের নির্ঘুম ৩০ ঘণ্টা পার
‘আটকে পড়া যাত্রীরা ঘুমিয়েছেন চেয়ারে-মেঝেতে, বিমানের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না’

সৌদি আরবে ফ্লাইট বাড়াতে চুক্তি, হজযাত্রায় টিকিট সংকট কাটবে? 







