ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া চৌধুরীর করা প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির মামলায় অভিনেত্রী তানজিন তিশার বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘সত্যতা পায়নি’ বলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) যে প্রতিবেদন দিয়েছে তার বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছে বাদীপক্ষ।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে বৃহস্পতিবার সানায়া চৌধুরীর পক্ষে শুভ্র সিনহা রায় রনি এ নারাজি জমা দেন।
পরে শুভ্র সিনহা রায় বলেন, ‘মামলার বাদী ও তিন জন সাক্ষীকে আগামী ২০ অক্টোবর আদালতে উপস্থিত হতে বলেছেন আদালত। ওইদিন এ বিষয়ে অধিকতর শুনানি হবে।’
যে অভিযোগে মামলা
ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া চৌধুরী ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তানজিন তিশার বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে মামলাটি করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গুলশানে সানায়া চৌধুরীর একটি ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে। তানজিন তিশা ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তার কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা দামের একটি শাড়ি নেন।
অনুষ্ঠান শেষে পরদিন শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সানায়া।
মামলায় বলা হয়, শাড়িটি ফেরত চেয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তানজিন তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান সানায়া। এরপর শাড়ি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তানজিন তিশা তাকে ‘গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি’ দেন।
পরে ২০২৫ সালের ১৩ ও ১৮ মার্চ দুটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তানজিন তিশার সঙ্গে দেখা হলে শাড়িটি ফেরত চান সানায়া। তখনও শাড়িটি ফেরত দেওয়া হয়নি বলে মামলায় বলা হয়।
এরপর ১০ নভেম্বর ফেসবুক মেসেঞ্জারে ফোন করে তানজিন তিশা মামলা করার এবং ‘সামাজিকভাবে হেয় করার’ হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন সানায়া। ওই অভিযোগে ১২ নভেম্বর গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন তিনি।
তবে গত ২৫ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘সত্যতা পায়নি’ বলে প্রতিবেদন জমা দেন পিবিআইয়ের এসআই মো. জাহাঙ্গীর আলম।
তদন্তে যা বলেছে পিবিআই
তদন্ত প্রতিবেদনে পিবিআই বলেছে, সানায়া চৌধুরী ফ্যাশন ডিজাইনার এবং তানজিন তিশা মডেল ও অভিনেত্রী। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নেওয়া এবং ভ্রমণের সূত্রে তাদের মধ্যে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ তৈরি হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানের জন্য তানজিন তিশা তার সাবেক চালকের মাধ্যমে সানায়ার কাছ থেকে শাড়িটি নেন।
তদন্তে দুই পক্ষের ফেসবুক মেসেঞ্জারের কথোপকথনের স্ক্রিনশটও পর্যালোচনা করা হয়। পিবিআই বলেছে, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর শাড়ি ফেরত চেয়ে সানায়া বার্তা পাঠালেও তানজিন তিশা তা দেখেননি। পরবর্তী সময়ের কথোপকথনেও শাড়িটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি উঠে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর সানায়া মেসেঞ্জারে শাড়িটি ফেরত দিতে বলেন। জবাবে তানজিন তিশা প্রথমে কোনও শাড়ির কথা বলা হচ্ছে জানতে চান। পরে শাড়িটির ছবি পাঠানো হলে তিশা জানান, বিষয়টি তার মনে নেই এবং খুঁজে দেখে জানাবেন।
এছাড়া বাদী বিবাদীকে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছাও পাঠান আবার পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ১৮ মে তার সঙ্গে অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রামে দেখা হলে সেখানে তাদের কুশল বিনিময় হয়। এর কিছুদিন পরে বাদীর ফ্যাশন হাউজের শো-রুমের ট্রায়াল রুম নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য শোনায় এবং উভয়ের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়।
এরপর দুই পক্ষের মধ্যে এ নিয়ে কথাবার্তা ও মনোমালিন্য হয় বলে তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য।
তানজিন তিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে লিখেছেন, সানায়ার সঙ্গে তার আগে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ওই শাড়ির আগেও তিনি সানায়ার কাছ থেকে আরও কয়েকটি শাড়ি নিয়েছেন এবং পরে সেগুলো ফেরত দিয়েছেন। এর জন্য কোনও টাকা নেননি বলেও তিশা তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান।
তদন্ত প্রতিবেদনে তানজিন তিশার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, শাড়িটি নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলেন। তার সাবেক চালক শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে সানায়ার কাছ থেকে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা জানার চেষ্টা করেন।
পরে মামলার বিষয়টি জানার পর ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান বলে তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান তিশা।
পিবিআই বলেছে, গত ৩১ মার্চ তানজিন তিশা ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠানোয় প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হুমকির অভিযোগের ক্ষেত্রে পিবিআই বলেছে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তানজিন তিশার পাঠানো মেসেজের শেষ অংশে শাড়িটি ফেরত পাঠানোর ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়েছিল এবং সানায়ার সুন্দর জীবন কামনা করা হয়েছিল। এসব বিবেচনায় হুমকির অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিশার বিরুদ্ধে আরেক শাড়ির মামলা
তানজিন তিশার বিরুদ্ধে শাড়ি নিয়ে এটি দ্বিতীয় মামলা। এর আগে অনলাইন ফ্যাশন পেজ ‘অ্যাপোনিয়া’র কাছ থেকে প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ টাকা দামের একটি শাড়ি নেওয়া এবং সেটির প্রচার ও মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতি না রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।
ওই মামলায় আদালত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) তদন্তের নির্দেশ দেয়। ডিবির প্রতিবেদনে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়।
ওই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আদালত সমন জারি করে। এরপর গত ১৩ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে হাজির হয়ে জামিন পান তানজিন তিশা।









