আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭, আহত ৫৩৬: এইচআরএসএস

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট  
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৪আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৪

চলতি বছরের আগস্টে সারাদেশে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭ জন নিহত এবং ৫৩৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

সংগঠনটির ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত হয়েছিলেন। আগস্টে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০টিতে।

আগস্টে বিএনপির অন্তর্কোন্দলের ২০টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও কমপক্ষে ১৫২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ১৮টি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৩৩ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৭টি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৬টি ঘটনায় ১৬ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১০টি ঘটনায় ৩৮ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে আরও ৯টি ঘটনায় ৭১ জন আহত হয়েছেন।

নিহত ৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের একজন এবং জামায়াতের একজন রয়েছেন।

ক্যাম্পাসে ১৩ সংঘর্ষে আহত ২১৬

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে অন্তত ১৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ২১৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে ৮টি ঘটনায় ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

এইচআরএসএসের মতে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তর্কোন্দল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং কয়েকটি জেলায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

দুষ্কৃতকারীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত চারটি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ১৯টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও সহিংসতা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক মামলায় আসামি ৩ হাজারের বেশি

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৬২টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ১২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও প্রায় ২ হাজার ২০৯ জনকে।

একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৬২টি ঘটনায় ১২ হাজার ৮২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন, এনসিপির ৯ জন এবং উগ্রপন্থি সংগঠনের ৫ জন সদস্য রয়েছেন।

মব সহিংসতায় নিহত ২৮

আগস্টে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার অন্তত ৫৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৬২ জন।

সাংবাদিক নির্যাতনের ৩২ ঘটনায় শিকার ৪৫ জন

আগস্টে অন্তত ৩২টি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৬ জন আহত, ৬ জন লাঞ্ছিত এবং ৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। এছাড়া ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।

সংবাদ প্রকাশের জেরে একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর আওতায় করা একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়ও উদ্বেগ

এইচআরএসএস বলছে, আগস্টে সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। এ মাসে ১৩টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ৬১ জন আহত ও ৮ জন আটক হয়েছেন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনায় অন্তত ৮টি ঘটনায় ১০ জনকে আটক এবং ৮টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন

আগস্টে ২৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকারদের ৪৬ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।

এ ছাড়া ১৮ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৯৩ জন, যাদের মধ্যে ৩৮ জন শিশু।

যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় ৬ জন নারী নিহত, ৭ জন আহত এবং একজন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪৯ জন নিহত, ৩১ জন আহত এবং ২৩ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন।

অপরদিকে, আগস্টে ২৮২ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ২০৫ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

সীমান্ত ও কারাগারেও হতাহত

আগস্টে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮টি ঘটনায় বিএসএফের হামলায় ২ জন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ৫ জনকে পুশইন এবং আরও ১৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন বাংলাদেশি যুবক নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। এছাড়া জলসীমা থেকে ৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

এ মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ৬ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে একজন কয়েদি ও ৫ জন হাজতি ছিলেন।

কর্মক্ষেত্রে নিহত ৬৩ শ্রমিক

আগস্টে অন্তত ৮৪টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও কমপক্ষে ৬৭ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কর্মক্ষেত্রে অন্তত ৬৩ জন শ্রমিক মারা গেছেন। পৃথক দুটি ঘটনায় ২ জন গৃহকর্মীর মৃত্যু এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

বিভিন্ন স্থানে ৮৭ লাশ উদ্ধার

আগস্টে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৮৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ৮২টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পেয়েছে এইচআরএসএস।

এর মধ্যে ১২টি লাশ বস্তাবন্দি, ১৭টি ঝুলন্ত এবং ২৬টি শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ৯টি গলা কাটা এবং ৮টি হাত-পা বাঁধা লাশ পাওয়া গেছে।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

সার্বিক বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, আগস্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিশেষ করে ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে ঘটেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান ইজাজুল ইসলাম। একই সঙ্গে নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরও সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

/এসএনকে/এম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে আজ ইসলামী আন্দোলনের বিক্ষোভ
জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে আজ ইসলামী আন্দোলনের বিক্ষোভ
রাউজানে দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবক নিহত
রাউজানে দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবক নিহত
আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭, আহত ৫৩৬: এইচআরএসএস
আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭, আহত ৫৩৬: এইচআরএসএস
ভেনেজুয়েলার ‘চুরির অভিযোগ’ নিয়ে যা বললেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী
ভেনেজুয়েলার ‘চুরির অভিযোগ’ নিয়ে যা বললেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
জেমস-রথীর সেই পুরোনো ছবি, আজ শুধুই স্মৃতি
জেমস-রথীর সেই পুরোনো ছবি, আজ শুধুই স্মৃতি
কেন ভারত ছাড়লেন আনুশকা-বিরাট? মুখ খুললেন মাধুরীর স্বামী
কেন ভারত ছাড়লেন আনুশকা-বিরাট? মুখ খুললেন মাধুরীর স্বামী
বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভাস্কর্য
বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভাস্কর্য
জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি নজরুল ইসলামকে নিয়ে স্পিকার বললেন, ‘জিএম তো নাই’
জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি নজরুল ইসলামকে নিয়ে স্পিকার বললেন, ‘জিএম তো নাই’
২৮৬ দিন সমুদ্রে থাকা মার্কিন রণতরি দেখে ‘স্তম্ভিত’ পর্যবেক্ষকরা
২৮৬ দিন সমুদ্রে থাকা মার্কিন রণতরি দেখে ‘স্তম্ভিত’ পর্যবেক্ষকরা