দুজন স্থানীয় সাক্ষী ছাড়া তল্লাশি-জব্দ বেআইনি, আসামিকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

বাহাউদ্দিন ইমরান
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:১৬ আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:২৮

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, অন্তত দুজন স্থানীয় বাসিন্দার উপস্থিতি ছাড়া তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা বেআইনি বলে গণ্য হবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় দুজন সম্মানিত বাসিন্দার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে পরিচালিত তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম ফৌজদারি বিচারে বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে।

‘রত্না খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় দেওয়া এক রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে মাদক উদ্ধারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অধস্তন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রেখে আপিল খারিজের সিদ্ধান্ত বাতিল করে আসামি রত্না খাতুনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

গত ১৭ জুলাই বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ ফৌজদারি রিভিশনের রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন। এরপর ১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গত ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

আদালতে রিভিশন আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মঞ্জুরুল আলম সুজন।

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার কাছারিপাড়া গ্রামে রত্না খাতুনের বাড়িতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি দল। অধিদফতরের পরিদর্শক মো. ফারুক সুলতানের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে রত্না খাতুনকে আটক করা হয়।

পরে একজন নারী কনস্টেবলের মাধ্যমে তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে কাগজে মোড়ানো ২৫ পুরিয়া হেরোইন উদ্ধারের দাবি করা হয়। উদ্ধার করা হেরোইনের ওজন ছিল আনুমানিক তিন গ্রাম।

এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণি ১(ক) অনুযায়ী মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলাটি কুষ্টিয়ার দায়রা আদালতে বিচারাধীন হয়।

বিচার শেষে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার তৃতীয় আদালতের যুগ্ম দায়রা জজ রত্না খাতুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। পরে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন করেন রত্না খাতুন।

এদিকে, হাইকোর্টে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ শুনানিকালে আদালতকে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, রত্না খাতুনের কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের অভিযোগ নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মামলার বাদী নিজেই তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তা ছাড়া জব্দতালিকার সাক্ষীরাও আদালতে মাদক উদ্ধারের ঘটনা সমর্থন করেননি। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই অধস্তন আদালত সাজা দিয়েছেন এবং আপিল আদালত তা বহাল রেখেছেন।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ আখতারুল ইসলাম যুক্তি দেন, বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। আপিল আদালতও যথাযথভাবে সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন।

তবে মামলার নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, অভিযানে অংশ নেওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শক ফারুক সুলতানই মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার জবানবন্দি ছাড়া অন্য কোনও প্রসিকিউশন সাক্ষী মাদক উদ্ধারের ঘটনাকে সমর্থন করেননি। অধিদফতরের সদস্য হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া একজন কনস্টেবলও মাদক উদ্ধারের বিষয়ে কিছু বলেননি।

জব্দতালিকার দুই সাক্ষীর বক্তব্যেও অসংগতি পাওয়া যায়। তাদের একজন জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখতে পান এবং জব্দতালিকায় স্বাক্ষর করেন। তবে মাদক উদ্ধারের বিষয়ে তার প্রত্যক্ষ কোনও জ্ঞান ছিল না। অপর সাক্ষী জানান, তিনি ভেড়ামারা মোটর শ্রমিক কার্যালয়ে বসে থাকার সময় অধিদফতরের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তার স্বাক্ষর নেন।

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার ১ ও ২ উপধারায় তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতির যে বিধান রয়েছে, তা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্তত দুজন সম্মানিত বাসিন্দার উপস্থিতিতে তল্লাশি পরিচালনা করতে হবে। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেসব বস্তু জব্দ করা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য হবে।

আদালত আরও বলেন, তল্লাশি ও জব্দের পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওই দুই স্থানীয় বাসিন্দার উপস্থিতিতে সম্পন্ন করতে হবে। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম শেষ করা হলে কিংবা তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর এসব কার্যক্রম পরিচালিত হলে আইনের শর্ত পূরণ হবে না।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ না করে পরিচালিত যেকোনও তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে এবং ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে তা বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে।

তাই সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট রিভিশনের রুল যথাযথ ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজের দেওয়া আপিল খারিজের রায় বাতিল করে দেন।

ফলে রত্না খাতুনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি রায়ের অনুলিপিসহ অধস্তন আদালতের নথিপত্র অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ মতে, তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে এ রায়। তবে রায়ের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের প্রয়োগ সংশ্লিষ্ট মামলার ঘটনা, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান বিবেচনা করেই করতে হবে।

/বিআই/আইএএম/
সম্পর্কিত
বিমানবন্দরে ১৫ লাখ টাকার স্বর্ণসহ গ্রেফতার, আসামি ২ দিনের রিমান্ডে
রবীন্দ্রনাথের ছবি মুছে ফেলার চেষ্টা: সাকিব-সুজন রিমান্ড শেষে কারাগারে
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল থাকবেন কারাগারে, বিচার চলবে ভার্চুয়ালি
সর্বশেষ খবর
সরকারি এক হাসপাতালে ২৩ কোটি টাকা অপচয়, চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ে এত অনিয়ম
সরকারি এক হাসপাতালে ২৩ কোটি টাকা অপচয়, চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ে এত অনিয়ম
চুরির অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যা
চুরির অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যা
গেম খেলার সময় ফোন বিস্ফোরণে দুই যুবক আহত, চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কা 
গেম খেলার সময় ফোন বিস্ফোরণে দুই যুবক আহত, চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কা 
ধর্ষণ-চাঁদাবাজি-হত্যাযজ্ঞ থামছেই না, ঘাটতি কোথায়?
ধর্ষণ-চাঁদাবাজি-হত্যাযজ্ঞ থামছেই না, ঘাটতি কোথায়?
সর্বাধিক পঠিত
আলাদা থাকছেন সাবিলা নূর, বিচ্ছেদের গুঞ্জন
আলাদা থাকছেন সাবিলা নূর, বিচ্ছেদের গুঞ্জন
আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে নিশ্চিত নয়: ফায়ার সার্ভিস
আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে নিশ্চিত নয়: ফায়ার সার্ভিস
সৌদি আরবের সব বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনায় নতুন নির্দেশনা
সৌদি আরবের সব বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনায় নতুন নির্দেশনা
সাভারে মদ তৈরির কারখানা থেকে চীনা নাগরিকসহ নারী গ্রেফতার
সাভারে মদ তৈরির কারখানা থেকে চীনা নাগরিকসহ নারী গ্রেফতার
‘হামজাদের ছাড়া ভুটানকে হারাতে না পারলে বাংলাদেশে ফুটবল বন্ধ করে দেওয়া উচিত’
‘হামজাদের ছাড়া ভুটানকে হারাতে না পারলে বাংলাদেশে ফুটবল বন্ধ করে দেওয়া উচিত’