ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি খুন হতে পারে বলে সন্দেহ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে শনিবার (৩১ অক্টোবর) রিমান্ড শুনানিতে এ সন্দেহের কথা জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে তদন্তে সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ মামলার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।
আসামি জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হয়ে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে মন্তব্য করে আবেদনে বলা হয়, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মূল রহস্য উদঘাটনসহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেফতার করাসহ পাঁচ কারণ দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ডের আর্জি জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
দুপুর সোয়া ২টার দিকে আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। শুনানিকালে বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটের দিকে তাকে এজলাসে তোলা হয়। হাতকড়া, মাথায় হেলমেট, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিহিত ছিল দীপের। কাঠগড়ায় নেওয়ার পর হেলমেট, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট খুলে ফেলা হয়।
৩টা ২৬ মিনিটের দিকে বিচারক এজলাসে উঠলে শুনানি শুরু হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রপক্ষে কৌঁসুলি আজিজুল হক দিদার রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন।
শুনানিতে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও করেছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হয়। এ কারণে ভুক্তভোগীকে খুন করা হতে পারে। সে তথ্য উদঘাটনের জন্য, এ ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত তা জানান জন্য আসামির রিমান্ড প্রয়োজন।
দীপের পক্ষে মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে শুনানি করেন।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীর সঙ্গে আসামির ছয় বছরের সম্পর্ক, পারিবারিকভাবে এ সম্পর্ক। ভুক্তভোগীর বাবা কিন্তু একটি বারও বলেননি আসামি ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আর ভুক্তভোগী বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। রাত ২ টার দিকে তিনি কেন মাদক আস্তানায় যাবেন, তা বোধদয় নয়।
তিনি বলেন, আসামি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। আমরাও চায় সত্য উদঘাটন হোক। আসামি কিন্তু প্রথম থেকে সহযোগিতা করে আসছে। এটা হত্যা না আত্মহত্যা সন্দেহ হয়। আর ভিকটিমের শরীরে কিন্তু কোনও আঘাতের চিহ্ন নাই। তার পরিবার কিন্তু মামলা করতে চায়নি। আমরাও সত্য উদঘাটনের পক্ষে। এ কারণে জামিন আবেদন করিনি।
মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, আসামি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তিনি জড়িত থাকলে কিন্তু বাসায় থাকতেন না। প্রথম থেকে কিন্তু তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আমরাও চায় প্রকৃত রহস্য উঠে আসুক।
দুই পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত তার চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।
আমি ফুললি স্ট্রং
রিমান্ডের আদেশ হওয়ার পর আদালত থেকে বের করা হয় দীপকে। এসময় এক স্বজনকে উদ্দেশ্য করে দীপ বলেন, ‘আমি ফুললি স্ট্রং’। টেনশন করতে না করেন। পরে তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে উঠানোর সময় ও নামানোর সময় কয়েকবার তাকে হাসতে দেখা যায়। শুনানিকালেও স্বাভাবিক দেখা যায় তাকে।
এর আগে দীপকে বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছিল পিবিআই। তিন দিনেও মামলা না হওয়ায় তাকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, সেই আলোচনার মধ্যে শুক্রবার রাতে তাকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা মামলা করার পর দীপকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণকারী’ হিসেবে আলোচনায় থাকা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ বুধবার বিকালে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌপুলিশ।
তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নামেন এবং নিজের বাইক নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।
দীপ বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান।
রাতেই মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তার দেওয়া তথ্যেই শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের বাইকটি উদ্ধার করা হয়।
‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা স্বীকারও করে দীপ। একপর্যায়ে তাকে নিয়ে শুক্রবার টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন পিবিআই কর্মকর্তারা।