সকালে এক কাপ কফি না খেলে দিন শুরু করতেই কষ্ট হয়? কিংবা দুপুরের পর কাজ করতে বসলে চোখে ঘুম চলে আসে? ঘুমভাব কাটাতে অনেকেই তখন কফির ওপর ভরসা করেন। কফিতে থাকা ক্যাফেইন শরীর ও মস্তিষ্ককে সজাগ রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু শুধু কফি পান করাই নয়, এর সঙ্গে যদি অল্প সময়ের একটি ঘুম যোগ করা যায়, তাহলে ঘুমভাব কাটানোর ক্ষেত্রে আরও ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এই কৌশলটিকেই বলা হয় ‘কফি ন্যাপ’।
কফি ন্যাপের ধারণাটি প্রথমে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। ঘুম পেলে কফি পান করার বদলে কফি খেয়ে আবার ঘুমানো বিষয়টি যেন পরস্পরবিরোধী। কিন্তু এই কৌশলের কার্যকারিতার পেছনে রয়েছে কফির ক্যাফেইন এবং অল্প সময়ের ঘুমের সমন্বিত প্রভাব।
ক্যাফেইন হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করা একটি উপাদান। এটি মস্তিষ্কে ঘুমভাব তৈরি করতে ভূমিকা রাখা অ্যাডেনোসিন নামের রাসায়নিকের কার্যক্রমে বাধা দেয়। এর ফলে সজাগতা বাড়ায়, মনোযোগ তীক্ষ্ণ করে এবং ক্লান্তি কিছুটা কম অনুভূত হয়। ক্যাফেইন ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিনের মতো কিছু রাসায়নিকের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে, যা মেজাজ ও কর্মশক্তির ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে কফি পান করার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাফেইন মস্তিষ্কে গিয়ে কাজ শুরু করে না। কফি পান করার পর ক্যাফেইন প্রথমে পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে শোষিত হয়ে রক্তে মিশে যায়। এরপর রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। সাধারণত প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে ক্যাফেইনের প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করে।
এই সময়টিই কফি ন্যাপের মূল রহস্য। কফি পান করার পরপরই যদি প্রায় ২০ মিনিটের জন্য ঘুমিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে ক্যাফেইনের প্রভাব শুরু হওয়ার আগেই শরীর ও মস্তিষ্ক কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায়। ফলে ঘুম থেকে ওঠার সময় ক্যাফেইনও ধীরে ধীরে কাজ শুরু করতে পারে।
অল্প সময়ের এই ঘুম ক্লান্তি কমিয়ে মস্তিষ্ককে কিছুটা সতেজ হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ঘুম থেকে ওঠার সময় ক্যাফেইনের উদ্দীপক প্রভাব শুরু হলে সজাগতা ও মনোযোগ আরও বাড়ে। অর্থাৎ, ঘুমের বিশ্রাম এবং ক্যাফেইনের উদ্দীপক প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে ঘুমভাব কাটাতে সাহায্য করে।
কফি ন্যাপ নিতে হলে কফি পান করার পর খুব বেশি সময় অপেক্ষা না করে বিশ্রামে যেতে হবে। এক কাপ কফি দ্রুত পান করে সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়া যেতে পারে। ব্ল্যাক কফি, আইসড কফি কিংবা এসপ্রেসো ক্যাফেইনযুক্ত যেকোনো কফি দিয়েই এই কৌশল চেষ্টা করা যায়।
তবে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়া ঠিক নয়। সাধারণত ২০ মিনিটের মতো স্বল্প সময়ের ঘুমই এ ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী। ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমিয়ে গভীর ঘুমের পর্যায়ে চলে গেলে ঘুম ভাঙার পর শরীর ভারী লাগতে পারে, মাথা ঝিমঝিম করতে পারে বা কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এতে কফি ন্যাপের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা বরং কমে যেতে পারে।
আবার কফি পান করার পর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়তে না পারলেও চিন্তার কারণ নেই। চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে শুয়ে থাকলেও শরীর ও মন কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায়। ফলে অল্প সময়ের এই বিশ্রামও ক্লান্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
কফি ন্যাপ মূলত ক্যাফেইনের উদ্দীপক প্রভাব এবং অল্প সময়ের ঘুমের বিশ্রামদায়ক প্রভাবকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর একটি কৌশল। দিনের মাঝামাঝি সময়ে কাজের চাপের মধ্যে হঠাৎ ঘুমভাব চলে এলে এটি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সতর্কতা, মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে কফি ন্যাপ নিয়মিত ও পর্যাপ্ত রাতের ঘুমের বিকল্প নয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখাই সুস্থ থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের অভ্যাসও এড়িয়ে চলা উচিত। যাদের ক্যাফেইন গ্রহণে কোনও শারীরিক সমস্যা হয় বা চিকিৎসক কফি কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই কৌশল অনুসরণ করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।









