সংগীতের জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন আদনান সামি। তবে সংগীতের বাইরেও তাঁর রয়েছে দুর্লভ ও ব্যতিক্রমী জিনিস সংগ্রহের নেশা। মুম্বাইয়ের লোখান্ডওয়ালায় তাঁর বিলাসবহুল পেন্টহাউস যেন সেই রুচি ও সংগ্রহেরই প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি চলচ্চিত্র নির্মাতা ফারাহ খান তাঁর ভ্লগে দর্শকদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন গায়ক-সুরকারের এই নান্দনিক আবাস।
অফ-হোয়াইট রঙের প্রাধান্যে সাজানো পেন্টহাউসটিতে রয়েছে ব্যক্তিগত মিউজিক স্টুডিও, হোম থিয়েটার, অফিস, প্রার্থনার কক্ষসহ একাধিক আলাদা স্পেস। বাড়ির বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের সংগীতের রেকর্ড, রুপার সামগ্রী, ভিনটেজ নিদর্শন, দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও নানা স্মারক।
প্রবেশমুখেই অতিথিদের চোখে পড়ে আদনান সামি ও তাঁর স্ত্রী রয়্যা ফারিয়াবির ছবি দিয়ে তৈরি একটি আকর্ষণীয় ফটো কোলাজ।
লিভিং রুমে সুর ও আড্ডার আলাদা পরিসর
বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে প্রশস্ত লিভিং রুম। বড় একটি ঘরকে একটিমাত্র বসার জায়গা হিসেবে ব্যবহার না করে পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। কোথাও অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, কোথাও ডাইনিং স্পেস, আবার কোনো অংশে রয়েছে সংগীতের আবহ।
এর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া সংগীতের কর্নার। ঘরের মাঝখানে রাখা পিয়ানোটি স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠেছে এই অংশের কেন্দ্রবিন্দু। পিয়ানোর বিপরীতে রয়েছে ডাইনিং এরিয়া, যেখানে রাখা হয়েছে মার্জিত অফ-হোয়াইট টেবিল।
নিরপেক্ষ রঙের এই ইন্টেরিয়রে প্রাণ এনে দিয়েছে ডাইনিং স্পেসের পাশের দেয়াল। সেখানে ফ্রেমবন্দী অরিজিনাল মিউজিক রেকর্ড, ভিনটেজ সামগ্রী এবং রুপার বিভিন্ন সংগ্রহযোগ্য জিনিস সাজানো হয়েছে। ফলে ঘরটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা ও বসবাসের আরামদায়ক পরিসরের আবহ তৈরি করেছে।
দেয়ালজুড়ে সংগীতের ইতিহাস
আদনানের বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ তাঁর সংগীতের স্মারক সংগ্রহ। এসব নিদর্শনের অনেকটাই তাঁর শৈশবের সংগীত-রুচি ও পরবর্তী ক্যারিয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাড়ির একটি অংশে সাজানো রয়েছে হিন্দি সিনেমার বেশ কিছু জনপ্রিয় ও কালজয়ী ছবির অরিজিনাল রেকর্ড। এর মধ্যে রয়েছে ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’, ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’, ‘আরাধনা’, ‘পাকিজা’, ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণ’, ‘শোলে’ এবং ‘বৈজু বাওরা’র মতো চলচ্চিত্রের রেকর্ড।
শুধু ভারতীয় সিনেমাতেই থেমে নেই তাঁর সংগ্রহ। আন্তর্জাতিক সংগীতের কিংবদন্তিদের স্মারকও রয়েছে সেখানে। ‘দ্য বিটলস ও এলভিস প্রিসলি’র রেকর্ডও যত্ন করে সংরক্ষণ করেছেন আদনান।
নিজের সংগ্রহ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি এগুলো নিলাম থেকে সংগ্রহ করেছি। এগুলো ছিল তাঁদের পাওয়া গোল্ড রেকর্ড, যা নিলামের জন্য দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেই আমি এগুলো কিনেছি।”
বিথোভেনের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি
আদনান সামির সংগ্রহের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অংশগুলোর একটি হলো অরিজিনাল মিউজিক্যাল পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে রয়েছে কিংবদন্তি জার্মান সুরকার, পিয়ানোবাদক ও কন্ডাক্টর লুডভিগ ভ্যান বিথোভেনের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্লভ কিছু পাণ্ডুলিপি।
১৭৭০ থেকে ১৮২৭ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকা বিথোভেন পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর স্বহস্তলিখিত সংগীতের পাণ্ডুলিপি যে কতটা দুর্লভ ও মূল্যবান, তারও ইঙ্গিত মেলে বিভিন্ন নিলামের দামে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, বিথোভেনের অরিজিনাল মিউজিক্যাল পাণ্ডুলিপির একটি পাতা বা নির্দিষ্ট মুভমেন্টের স্বহস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি নিলামে ২০ লাখ থেকে প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় এর মূল্য আনুমানিক ২০ কোটি থেকে ৪০ কোটি রুপি।
স্মৃতির দেয়ালে ক্যারিয়ারের গল্প
বাড়ির আরেকটি আকর্ষণ ‘মেমোরি ওয়াল’। আদনানের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে এই দেয়াল।
অভিনেতা ও বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের মুহূর্ত, মঞ্চে পারফরম্যান্স এবং জীবনের নানা স্মরণীয় সময়ের ছবি সেখানে স্থান পেয়েছে। বিশেষভাবে রয়েছে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হওয়ার মুহূর্তের ছবিও। ফলে এই দেয়ালটি শুধু সাজসজ্জার অংশ নয়, বরং আদনানের দীর্ঘ সংগীতজীবনের এক ধরনের ব্যক্তিগত আর্কাইভ।
ভিনটেজ আবহে ব্যক্তিগত হোম থিয়েটার
বাড়িতে রয়েছে শব্দনিরোধক ব্যক্তিগত হোম থিয়েটার। ঘরটির সাজে আধুনিক আরামের সঙ্গে মিশেছে ভিনটেজ নান্দনিকতা।
গাঢ় বাদামি রঙের ইন্টেরিয়র, আরামদায়ক কুশন এবং দেয়ালে সাজানো পুরোনো সিনেমার পোস্টার ঘরটিকে দিয়েছে উষ্ণ ও সিনেমাটিক আবহ। ‘দেওয়ার’ এবং ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’র মতো কালজয়ী সিনেমার পোস্টার এই স্পেসের ভিনটেজ চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ইউরোপীয় আবহে ব্যক্তিগত অফিস
আদনানের ব্যক্তিগত অফিসের সাজে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় কর্মক্ষেত্রের ছোঁয়া। সবুজ রঙের গদি দেওয়া চেয়ার ও একই রঙের সোফা কাঠের আসবাবের সঙ্গে তৈরি করেছে চমৎকার বৈপরীত্য।
কাঠের টেবিল, জার্নাল এবং ব্যক্তিগত স্মারকে সাজানো এই ঘরটিতে রয়েছে পুরোনো দিনের স্টাডি বা লাইব্রেরির মতো এক ধরনের ক্লাসিক আবহ। ব্যক্তিগত সংগ্রহের নানা জিনিসও ঘরের বিভিন্ন অংশে রাখা হয়েছে।
ইট-লাল রঙে আলাদা মিউজিক স্টুডিও
আদনানের মিউজিক স্টুডিওটি বাড়ির অন্যান্য অংশের তুলনায় একেবারেই আলাদা। গাঢ় ইট-লাল রঙ এখানে তৈরি করেছে নাটকীয় ও সৃজনশীল পরিবেশ। সোফা, টেবিল, চেয়ার থেকে শুরু করে মেঝেতেও ছড়িয়ে আছে এই রঙের ব্যবহার।
তবে পুরো ঘরটিকে ভারী করে না তুলে বেইজ রঙের বিভিন্ন উপকরণ গাঢ় টোনের মধ্যে ভারসাম্য এনেছে। স্টুডিওতে রয়েছে ছোট একটি সিঙ্গিং বুথও। সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায় একটি বারান্দায়, যেখান থেকে দেখা যায় সবুজে ঘেরা মনোরম একটি অংশ।
প্রার্থনার কক্ষে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া
বাড়ির শেষ প্রান্তে রয়েছে আধ্যাত্মিকতা ও প্রার্থনার জন্য আলাদা একটি কক্ষ। ঘরটিতে সাজানো রয়েছে সুন্দরভাবে ফ্রেমবন্দী একটি উর্দু মোটিফ, যেটিকে আদনান ‘কাবা থেকে পাওয়া’ বলে পরিচয় করিয়ে দেন।
এই কক্ষের পরিবেশ ফারাহ খানকেও স্পর্শ করে। ট্যুরের মাঝেই তিনি কিছুক্ষণ থেমে মাথা নত করে প্রার্থনা করেন।
সংগীতের স্মারক, ভিনটেজ আসবাব, দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, ব্যক্তিগত স্মৃতি আর আধ্যাত্মিকতার জন্য আলাদা পরিসর আদনান সামির পেন্টহাউস যেন তাঁর রুচি, সংগীতপ্রেম ও জীবনের নানা অধ্যায়ের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা।









