ঘুমের মধ্যে কখনও দেখি, বহু দিন দেখা হয়নি এমন কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। কখনও আবার এমন কোনও জায়গায় পৌঁছে যাই, যা বাস্তবে কখনও দেখিনি। কোনও স্বপ্ন আনন্দ দেয়, কোনওটি ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরেও মনে ভয় বা অস্বস্তি তৈরি করে। ঘুমের মধ্যে এমন বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা কেন হয়? স্বপ্ন কি শুধুই মস্তিষ্কের কল্পনা, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্মৃতি, আবেগ ও দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা?
বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানেন না, ঠিক কী কারণে মানুষ স্বপ্ন দেখে। তবে গবেষণায় ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়, স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণ এবং আবেগের সঙ্গে স্বপ্নের বেশ কিছু যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) তথ্য অনুযায়ী, ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কিছু কার্যকলাপ শেখা ও স্মৃতি সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। সেই প্রক্রিয়ার কিছু অংশ স্বপ্নের অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হতে পারে।
ঘুমের কোন পর্যায়ে বেশি স্বপ্ন দেখি?
ঘুম একটানা একই রকম থাকে না। সারা রাত ধরে মস্তিষ্ক নন-র্যাপিড আই মুভমেন্ট (নন-আরইএম) এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট (আরইএম) এই দুই ধরনের পর্যায়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে যায়। আরইএম পর্যায়ে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ অনেকটাই সক্রিয় থাকে, চোখের পাতা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে এবং শরীরের পেশিগুলি সাময়িকভাবে শিথিল হয়ে যায়।
এ পর্যায়ে সাধারণত স্বপ্ন বেশি জীবন্ত ও স্পষ্ট হয়। তবে শুধু আরইএম পর্যায়েই যে স্বপ্ন দেখা যায়, তা নয়। ঘুমের অন্য পর্যায়েও স্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা হতে পারে। রাত যত এগোয়, আরইএম পর্যায়ের সময় সাধারণত তত বাড়ে। তাই ভোরের দিকে দেখা স্বপ্ন অনেক সময় বেশি স্পষ্ট মনে থাকে।
স্বপ্নের সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক কী?
দিনের বেলায় আমরা অসংখ্য ঘটনা দেখি, কথা বলি, নতুন তথ্য শিখি এবং নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাই। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সেই তথ্য ও অভিজ্ঞতার কিছু অংশ নিয়ে কাজ করে। স্মৃতি গুছিয়ে রাখা, নতুন শেখা বিষয়কে আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা এবং তথ্যের সংযোগ তৈরি করার মতো প্রক্রিয়া ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই প্রক্রিয়ায় দিনের কোনও ঘটনা, পুরনো স্মৃতি কিংবা পরিচিত মানুষের ছবি স্বপ্নে ফিরে আসতে পারে। তবে স্বপ্নে দেখা ঘটনাগুলি বাস্তবের হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। বিভিন্ন স্মৃতি ও অনুভূতির টুকরো মিশে সম্পূর্ণ নতুন বা অদ্ভুত কাহিনি তৈরি হতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক আলোচনায় স্মৃতি ও চেতনার সঙ্গে স্বপ্নের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে, ঘুমের সময় স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণের কিছু অংশ সচেতন অভিজ্ঞতার রূপ নিতে পারে। তবে স্বপ্ন তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া এখনও গবেষণার বিষয়।
আনন্দের স্মৃতি যেমন আসে, দুঃস্বপ্নও কেন হয়?
স্বপ্নে শুধু সুখের অভিজ্ঞতা ফিরে আসে না। ভয়, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা অস্বস্তিকর অনুভূতিও দেখা দিতে পারে। মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, ভয় ধরানো ছবি বা সিনেমা দেখা এবং কিছু ওষুধের প্রভাব দুঃস্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা বা মানসিক আঘাতজনিত সমস্যার সঙ্গেও বারবার দুঃস্বপ্ন দেখার যোগ রয়েছে।
তবে প্রতিটি দুঃস্বপ্নের পেছনে নির্দিষ্ট কোনও ঘটনা বা মানসিক সমস্যা থাকে না। কেন একটি নির্দিষ্ট স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তার একটিমাত্র নিশ্চিত ব্যাখ্যা সব সময় পাওয়া যায় না।
স্বপ্ন এত বাস্তব মনে হয় কেন?
স্বপ্ন দেখার সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সক্রিয় থাকে। স্বপ্নে দৃশ্য, শব্দ, অনুভূতি এবং কখনও ভয় বা আনন্দের মতো তীব্র আবেগও তৈরি হতে পারে। ফলে ঘুমের মধ্যে দেখা কোনও ঘটনা বাস্তবের মতো মনে হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু ঘুম ভাঙার পরে স্বপ্নের অনেক অংশ দ্রুত ভুলে। এর একটি কারণ, ঘুম থেকে ওঠার পর স্বপ্নের স্মৃতি ধরে রাখা কঠিন হতে পড়ে। ঘুম ভাঙার ঠিক আগে বা পরেই স্বপ্নের কথা মনে থাকলেও কিছুক্ষণ পর তার বিবরণ অস্পষ্ট হয়ে যায়। তাই কেউ প্রতিদিন স্বপ্ন দেখেও মনে করতে পারেন না, আবার কেউ ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই স্বপ্নের বিস্তারিত মনে করতে পারেন।
স্বপ্নের কি বিশেষ কোনও অর্থ রয়েছে?
স্বপ্নে কোনও নির্দিষ্ট মানুষ, জায়গা বা ঘটনা দেখলেই তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ইঙ্গিত পাওয়া যায় এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। স্বপ্নে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বা অনুভূতির ছাপ থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিটি স্বপ্নের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণ করা যায় না।
কোনও স্বপ্ন বারবার মনে পড়লে নিজের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ বা আবেগের দিকে খেয়াল করা যেতে পারে। তবে শুধু স্বপ্নের ভিত্তিতে নিজের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখা বা দুঃস্বপ্ন হওয়া সাধারণ অভিজ্ঞতা। তবে দুঃস্বপ্ন যদি ঘন ঘন হয়, ঘুম ভেঙে যায়, ঘুমাতে ভয় লাগে অথবা দিনের বেলায় কাজকর্ম ও মনোযোগে প্রভাব পড়ে, তা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন অনুযায়ী হাত-পা ছোড়া, আঘাত পাওয়া বা পাশে থাকা কাউকে আঘাত করার মতো ঘটনাও অবহেলা করা ঠিক নয়।
নিয়মিত সময়ে ঘুমানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং ঘুমের আগে মানসিক চাপ কমানোর অভ্যাস ঘুমের মান ভালো রাখতে সাহায্য করে। দুঃস্বপ্নের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার কারণ খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বপ্ন কেন দেখি, তার সব উত্তর এখনও বিজ্ঞানের জানা নেই। তবে এটুকু স্পষ্ট, ঘুমের সময়ও মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় থাকে না। স্মৃতি, অনুভূতি এবং মস্তিষ্কের নানা কার্যকলাপের জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই তৈরি হতে পারে আমাদের রাতের বিচিত্র অভিজ্ঞতা।
তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (এনআইসিএইচডি), ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, স্লিপ ফাউন্ডেশন ও হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং।