নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা তুলোর মতো মেঘ দেখতে যতটা সুন্দর, তার পেছনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিও ততটাই চমকপ্রদ। কখনও আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকে সাদা মেঘ, কখনও আবার ঘন কালো মেঘ জমে নামে বৃষ্টি। কিন্তু আকাশে মেঘ তৈরি হয় কীভাবে? কোথা থেকেই বা আসে এই মেঘ?
মেঘ তৈরির মূল উপাদান হলো জলীয় বাষ্প। সূর্যের তাপে সমুদ্র, নদী, হ্রদ, পুকুর ও মাটির উপরিভাগের পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে যায়। গাছপালাও প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাতাসে জলীয় বাষ্প ছাড়ে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বাষ্পীভবন ও প্রস্বেদন।
জলীয় বাষ্প থেকেই মেঘের জন্ম
বাতাসে মিশে থাকা উষ্ণ জলীয় বাষ্প সাধারণত ওপরের দিকে উঠতে থাকে। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের তাপমাত্রা কমে যায়। ফলে জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। তাপমাত্রা যথেষ্ট কম হলে জলীয় বাষ্প থেকে বরফের ক্ষুদ্র কণাও তৈরি হতে পারে।
বাতাসে থাকা ধুলো, লবণের অতি ক্ষুদ্র কণা কিংবা অন্যান্য কণার গায়ে এই জলকণা বা বরফকণা জমতে শুরু করে। অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণা একত্রিত হয়ে তৈরি করে মেঘ। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ঘনীভবন।
মেঘ সাদা দেখায় কেন?
মেঘের ভেতরে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণা সূর্যের আলোকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেয়। দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন রং প্রায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মেঘকে সাধারণত সাদা দেখায়।
তবে মেঘ যখন অনেক ঘন হয়ে যায়, তখন তার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো সহজে নিচে পৌঁছাতে পারে না। ফলে মেঘের নিচের অংশ ধূসর বা কালচে দেখায়। এ ধরনের ঘন মেঘের সঙ্গে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকতে পারে, যদিও শুধু মেঘের রং দেখেই বৃষ্টি হবে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সব মেঘ থেকে কি বৃষ্টি হয়?
সব মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় না। মেঘের ভেতরের ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণা বড় ও ভারী হতে হতে যখন বাতাসে ভেসে থাকার ক্ষমতা হারায়, তখন সেগুলো বৃষ্টি, তুষার বা শিলার আকারে মাটিতে পড়তে পারে। মেঘের ধরন, তাপমাত্রা, বাতাসের গতি এবং বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে বৃষ্টিপাত হবে কি না।
কিছু মেঘ আকাশে পাতলা সাদা স্তরের মতো ছড়িয়ে থাকে। কিছু মেঘ তুলোর স্তূপের মতো দেখায়। আবার কিছু মেঘ উল্লম্বভাবে অনেক উঁচুতে উঠে বজ্রঝড় ও ভারী বৃষ্টি তৈরি করতে পারে।
মেঘের আকার বদলে যায় কেন?
আকাশে মেঘকে কখনও লম্বা, কখনও গোলাকার, আবার কখনও ছড়িয়ে থাকা চাদরের মতো দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হলো বাতাসের গতি, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের প্রবাহ। মেঘের জলকণা বাষ্পীভূত হওয়া বা নতুন জলকণা তৈরি হওয়ার কারণেও মেঘের আকার ও ঘনত্ব বদলে যায়।
প্রকৃতির জলচক্রে মেঘের ভূমিকা
মেঘ শুধু আকাশের সৌন্দর্য বাড়ায় না, পৃথিবীর জলচক্রেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি বাতাসে ওঠে, মেঘে ঘনীভূত হয় এবং বৃষ্টির মাধ্যমে আবার পৃথিবীর মাটি, নদী ও জলাশয়ে ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়া কৃষিকাজ, পানির জোগান এবং জীবজগতের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, আকাশের মেঘ আসলে বাতাসে ভেসে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণার সমষ্টি। সূর্যের তাপ, বাতাসের চলাচল এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তৈরি হয় মেঘ। আর সেই মেঘ থেকেই কখনও নামে স্বস্তির বৃষ্টি, কখনও আবার শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টির আবহ।