পাহাড়-সমুদ্র, নানা স্বাদের খাবার, রঙিন উৎসব আর মানুষের আন্তরিকতা। ভারতের জীবনযাত্রায় এমন অনেক কিছু রয়েছে, যা বিদেশি পর্যটকদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। ফিনল্যান্ড থেকে দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে মুম্বাইয়ে থাকতে শুরু করা এক পরিবারের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে সেই পরিচিত ভারতের নানা দিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দ্য ফিন্ডিয়ান ফ্যামিলি’ নামে পরিচিত পরিবারটি সম্প্রতি একটি ভিডিওতে ফিনল্যান্ড ও ভারতের জীবনযাত্রার ১০টি পার্থক্য তুলে ধরেছে। দুই দেশের আবহাওয়া, খাবার, সামাজিক সম্পর্ক, খেলাধুলা ও উৎসব নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ এখন নেটিজেনদের আলোচনার বিষয়।
ফিনল্যান্ডের শীত, মুম্বাইয়ের গরম
পরিবারটির ভিডিওতে প্রথমেই উঠে এসেছে দুই দেশের আবহাওয়ার পার্থক্য। ফিনল্যান্ডের কনকনে শীতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মুম্বাইয়ের অক্টোবর মাসের গরমের তুলনা করেছে তারা। ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখার অভ্যাসেও দুই দেশের মধ্যে ফারাক দেখেছে পরিবারটি। তাদের মতে, ফিনল্যান্ডে মানুষ ব্যক্তিগত পরিসরকে বেশি গুরুত্ব দিলেও ভারতে অপরিচিতদের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার প্রবণতা চোখে পড়ে।
খাবারের ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। ফিনল্যান্ডের তুলনামূলক হালকা স্বাদের খাবারের অভ্যাস থেকে ভারতে এসে ঝাল ও মশলাদার নানা পদ চেখে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের। পরিবারটির চোখে, এই ছোট ছোট পার্থক্যই দুই দেশের দৈনন্দিন জীবনকে আলাদা করে তুলেছে।
ভারতের ‘সুন্দর বিশৃঙ্খলা’
ফিনল্যান্ডের শান্ত পরিবেশের সঙ্গে ভারতের ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ জীবনযাত্রার তুলনা করতে গিয়ে পরিবারটি ব্যবহার করেছে ‘সুন্দর বিশৃঙ্খলা’ কথাটি। যানবাহনের ব্যস্ততা, মানুষের আনাগোনা, নানা রকমের শব্দ আর চারপাশের প্রাণচাঞ্চল্যের মধ্যেও তারা খুঁজে পেয়েছে নিজস্ব এক সৌন্দর্য।
উৎসব ও খেলাধুলার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে মিল-অমিল রয়েছে। পরিবারটির মতে, ফিনল্যান্ডে আইস হকির জনপ্রিয়তা অনেকটা ধর্মীয় আবেগের মতো। ভারতে ক্রিকেটের অবস্থানও তেমনই। দুই দেশের মানুষের খেলাধুলার প্রতি গভীর ভালোবাসার বিষয়টি তাদের নজর কেড়েছে।
সন্তানদের ঘিরে ‘লক্ষ লক্ষ আন্টি’
ভারতে এসে পরিবারটি যে আন্তরিকতা পেয়েছে, তার একটি মজার বর্ণনাও রয়েছে ভিডিওতে। তাদের কথায়, সন্তানদের জন্য ভারতে যেন ‘লক্ষ লক্ষ আন্টি’ রয়েছেন। অর্থাৎ, আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলেও অনেকেই শিশুদের আপনজনের মতো স্নেহ করেন। নতুন পরিবেশে সন্তানদের ঘিরে মানুষের এমন আন্তরিকতা পরিবারটির কাছে বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।
ভিডিওর শেষে দুই দেশের প্রতিই ভালোবাসার কথা জানিয়েছে পরিবারটি। ফিনল্যান্ডকে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে তারা বলেছে, ভারত তাদের সুখ খুঁজে পাওয়ার নতুন পথ শেখাচ্ছে। ক্যাপশনে তাদের বক্তব্য, “ফিনল্যান্ড বনাম ভারত! দুটি সম্পূর্ণ আলাদা দেশ, অথচ দুটিকেই আমরা ভালোবাসি। আমরা এক ফিনিশ পরিবার, ভারতে সন্তানদের বড় করছি এবং দুই দেশের সেরা অভিজ্ঞতাগুলি উপভোগ করছি!”
নেটিজেনদের প্রশংসা, উঠল ভ্রমণের আমন্ত্রণও
ভিডিওটি প্রকাশের পর অনেকেই পরিবারটির দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছেন। দুই দেশের তুলনা করতে গিয়ে কোনও একটিকে ছোট না করে উভয়ের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার বিষয়টি ভালো লেগেছে দর্শকদের। একজন মন্তব্য করেছেন, দুই দেশকে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের জন্য সম্মান করার এই মনোভাব থেকে অনেক ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সারের শেখার আছে। অন্য একজনের মতে, পরিবারটি কোনও কিছু নিয়ে আগেভাগে বিচার না করে বাস্তব পরিস্থিতিকে গ্রহণ করতে পেরেছে।
বিদেশে থাকা কয়েকজন ভারতীয়ের কাছেও ভিডিওটি দেশের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন বলে জানিয়েছেন এমন এক ব্যক্তি লিখেছেন, ভারতের কোলাহল, রং আর উৎসবের কথা তাঁর খুব মনে পড়ে।
মুম্বাইয়ের আবহাওয়া নিয়ে পরিবারের মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে। এক দর্শকের মতে, মুম্বাইয়ের বাসিন্দাদের কাছে শীতকাল ঠান্ডা মনে হতে পারে, যদিও উত্তর ও মধ্য ভারতের অনেকের কাছে বিষয়টি তেমন মনে নাও হতে পারে। আবহাওয়ার অনুভূতি যে অঞ্চলভেদে বদলে যায়, সেই বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে।
পরিবারটিকে ভারতের আরও নানা জায়গায় ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নেটিজেনরা। কেউ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য ঘুরে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন, আবার কেউ গুয়াহাটিতে আতিথেয়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। দিল্লি ভ্রমণ এবং বারাণসীতে দীপাবলি উদ্যাপনের অভিজ্ঞতা নেওয়ার কথাও বলেছেন অনেকে।
তবে কয়েকজন মনে করেন, জীবনযাত্রার তুলনা করতে গেলে আবহাওয়া ও সংস্কৃতির পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় দেখা প্রয়োজন। তাঁদের পরামর্শ, সুখের আন্তর্জাতিক সূচকে অবস্থান, বায়ুর গুণমান, আয় ও জীবনযাত্রার মানের মতো বিষয়ও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
দুই দেশের জীবনযাত্রা নিয়ে এই পরিবারের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নতুন কোনও দেশে বসবাসের অর্থ সেখানকার পার্থক্যগুলির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, আবার অচেনা পরিবেশের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেওয়া। ফিনল্যান্ডের শান্ত জীবন আর ভারতের প্রাণচঞ্চল দৈনন্দিনতার মধ্যে তারা নিজেদের মতো করে খুঁজে নিচ্ছে সুখের নতুন সংজ্ঞা।