কষা মাংস হোক কিংবা পোলাও দারুচিনির হালকা মিষ্টি সুবাস খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ দুটিই বদলে দেয়। রান্নাঘরের পরিচিত এই মসলাটি শুধু স্বাদের জন্যই নয়, নানা স্বাস্থ্যগুণের কারণেও জনপ্রিয়। কিন্তু বাজার থেকে যেটি কিনে আনছেন, সেটি কি সত্যিই দারুচিনি?
দারুচিনির মতো দেখতে আরেক ধরনের মসলা ক্যাসিয়া। দেখতে অনেকটা একই রকম হওয়ায় অনেকেই দুটিকে আলাদা করতে পারেন না। অথচ গঠন, স্বাদ, গন্ধ এবং কিছু রাসায়নিক উপাদানের দিক থেকে আসল দারুচিনি ও ক্যাসিয়ার মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
তাই বাজার থেকে দারুচিনি কেনার সময় শুধু রং বা গন্ধ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে এর গঠন ও উৎস সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
বাজারে প্রধানত সিলন দারুচিনি ও ক্যাসিয়া এই দুই ধরনের মসলা বেশি দেখা যায়। সিলন দারুচিনির উৎপত্তি শ্রীলঙ্কায় এবং এর ছাল তুলনামূলক পাতলা। অন্যদিকে ক্যাসিয়ার ছাল মোটা ও শক্ত।
সিলন দারুচিনির গন্ধ সাধারণত কোমল ও মিষ্টি ধরনের। স্বাদও তুলনামূলকভাবে মৃদু। ক্যাসিয়ার ঘ্রাণ বেশি তীব্র এবং স্বাদও বেশ ঝাঁঝালো হতে পারে।
দারুচিনির সুবাসের জন্য দায়ী গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সিনামালডিহাইড। অন্যদিকে ক্যাসিয়ায় কুমারিন নামের একটি যৌগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। নিয়মিত অতিরিক্ত কুমারিন গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ক্যাসিয়াকে খাঁটি দারচিনির বিকল্প ভেবে অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া ঠিক নয়।
তবে ক্যাসিয়াকে ‘নকল’ বা ‘ভেজাল’ বলা ঠিক নয়। এটি নিজেই একটি স্বতন্ত্র মসলা। মূল বিষয় হলো ক্যাসিয়াকে দারুচিনি ভেবে কিনছেন কি না।
সিলন দারুচিনির ছাল সাধারণত পাতলা এবং একাধিক স্তরে মোড়ানো থাকে। একটি দারুচিনির কাঠির ভেতরে অনেকগুলো পাতলা স্তর দেখা যায়। এ কারণে এটি দেখতে অনেকটা কাগজের রোলের মতো লাগে।
হাতে নিলে এর ছাল তুলনামূলকভাবে ভঙ্গুর মনে হতে পারে এবং সহজেই ভেঙে গুঁড়ো করা যায়।
অন্যদিকে ক্যাসিয়ার ছাল মোটা, শক্ত ও অপেক্ষাকৃত পুরু। সাধারণত একটি বা কয়েকটি মোটা স্তর একসঙ্গে দেখা যায়। তাই কাঠি অবস্থায় দুটিকে পাশাপাশি রাখলে পার্থক্য কিছুটা সহজেই বোঝা যায়।
দারুচিনি চেনার ক্ষেত্রে গন্ধ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সিলন দারুচিনির সুবাস সাধারণত মৃদু, কোমল ও সামান্য মিষ্টি ধরনের।
অন্যদিকে ক্যাসিয়ার গন্ধ অনেক বেশি তীব্র ও ঝাঁঝালো। তাই খুব শক্তিশালী গন্ধ পেলেই সেটিকে ‘খাঁটি দারুচিনি’ ভাবার কারণ নেই। বরং তীব্র সুবাস ক্যাসিয়ার বৈশিষ্ট্যও হতে পারে।
সিলন দারুচিনির স্বাদ তুলনামূলকভাবে মৃদু ও হালকা মিষ্টি। ক্যাসিয়ার স্বাদ বেশি ঝাঁঝালো এবং কখনও তেতো বা কষাটে মনে হতে পারে।
তবে শুধু স্বাদ পরীক্ষা করে মসলা শনাক্ত করা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষ করে গুঁড়ো দারুচিনি হলে পার্থক্য বোঝা আরও কঠিন। তাই কাঠি অবস্থায় দারুচিনি কেনা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক।
অনেক জায়গায় গরম পানিতে দারুচিনির গুঁড়ো মিশিয়ে আসল-নকল বোঝার একটি ঘরোয়া পদ্ধতির কথা বলা হয়। কিন্তু এই পরীক্ষাকে নির্ভরযোগ্যভাবে আসল দারচিনি শনাক্ত করার বৈজ্ঞানিক উপায় হিসেবে ধরা যায় না।
গুঁড়ো মসলার ক্ষেত্রে রং, কণার আকার, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মসলার ধরন অনুযায়ী পানিতে আচরণ ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু পানিতে ভাসা বা মিশে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে দারচিনি আসল না নকল এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
বাজার থেকে গুঁড়ো কিনলে সেটি দারুচিনি নাকি ক্যাসিয়া, তা বোঝা কঠিন। কারণ গুঁড়ো অবস্থায় দুটির চেহারার পার্থক্য প্রায় থাকেই না।
তাই সম্ভব হলে কাঠি অবস্থায় দারুচিনি কিনুন। ছালের স্তর, পুরুত্ব ও গন্ধ দেখে তুলনামূলক সহজে ধারণা পাওয়া যায়। প্যাকেটজাত মসলা কিনলে প্যাকেটের গায়ে মসলার ধরন ও উপাদানের তালিকাও দেখে নেওয়া ভালো।
দারুচিনিতে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং এর সম্ভাব্য নানা স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে কোনও মসলাকেই রোগের চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশেষ করে ক্যাসিয়ায় কুমারিনের পরিমাণ বেশি থাকায় নিয়মিত ও অতিরিক্ত গ্রহণ এড়িয়ে চলা ভালো। যাদের লিভারের সমস্যা রয়েছে কিংবা দীর্ঘদিন কোনও ওষুধ সেবন করতে হয়, তারা নিয়মিত বেশি পরিমাণ দারুচিনি বা ক্যাসিয়া খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে পারেন।
রান্নায় এক চিমটি দারুচিনি খাবারে এনে দিতে পারে অনন্য সুবাস। কিন্তু বাজারে একই রকম দেখতে মসলার কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই দারুচিনির কাঠির গঠন, স্তর, গন্ধ ও প্যাকেটের তথ্য সম্পর্কে একটু সচেতন হলেই কেনার সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।









