সন্তান জন্মের পর থেকে বাবা-মাই তার সবচেয়ে কাছের মানুষ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবারেই বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে অদৃশ্য এক দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। যোগাযোগের ঘাটতি, প্রজন্মগত চিন্তার পার্থক্য, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কিংবা পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব—এসব কারণেই সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যেতে পারে।
সময়মতো এসব কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা না করলে সেই দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা সাহায্য করতে পারে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক উন্নয়নে। বিষয়টি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন মনোরোগ চিকিৎসক আতিকুল হক মজুমদার।
শুধু শাসন, ভরসার অভাব:
অনেক পরিবারে বাবা-মা সন্তানের ওপর নিয়মকানুন চাপিয়ে দিলেও তাদের মনের কথা শোনার জন্য যথেষ্ট সময় দেন না। সন্তান জিপিএ-৫ পেল কি না বা পড়াশোনায় কেমন করছে, তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তার অনুভূতি, ভয় কিংবা সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা কম হয়। ফলে সন্তান ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যায় এবং নিজের ভুল বা কষ্টগুলো গোপন রাখতে শুরু করে।
‘কী’ আর ‘কেন’-র পার্থক্য:
শুধু “এটা করো না” বা “ওটা করো না” বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোনও কাজ কেন করা উচিত নয় বা তার পরিণতি কী হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ না বুঝলে সন্তানের মধ্যে ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা ও বাস্তবজ্ঞান যথাযথভাবে গড়ে ওঠে না।
সাধারণ জীবনে ‘বোর’ হওয়া:
বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিশু-কিশোর সবসময় নতুনত্ব, উত্তেজনা ও বিনোদনের খোঁজে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল বিশ্বের প্রভাবে তারা অনেক সময় সাধারণ জীবনের একঘেয়েমি মেনে নিতে পারে না। ফলে সামান্য হতাশা বা শূন্যতার মুহূর্তে তারা ভুল সিদ্ধান্ত বা অনুপযুক্ত সঙ্গের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
সবকিছু ঠিক থাকার পরও মনে অকারণ ভয় কাজ করে কেন?
মস্তিষ্কের ‘ফলস অ্যালার্ম’:
আদিম যুগে মানুষ যখন জঙ্গলে থাকত, তখন সবসময় বাঘ-ভাল্লুকের ভয় কাজ করত। এখন জঙ্গল বা বাঘ নেই, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের সেই ভয় পাওয়ার স্বভাবটা ঠিকই রয়ে গেছে। তাই অনেক সময় সামান্য ঘটনা যেমন-অফিসে বসের মন খারাপ দেখলে বা আত্মীয়রা কী ভাববে—এই চিন্তা মস্তিষ্ককে অযথা সতর্ক সংকেত দিতে বাধ্য করে।
সবকিছু 'পারফেক্ট' করার চাপ:
ছোটবেলা থেকেই অনেককে শেখানো হয় সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে হবে এবং সবার মন জয় করতে হবে। ফলে জীবনের স্বাভাবিক সমস্যা, মতবিরোধ বা ব্যর্থতাকে অনেকেই বড় সংকট হিসেবে দেখেন। এতে অযথা ভয়, উদ্বেগ ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়।
ভয়কেই সত্যি ভেবে নেওয়া:
হঠাৎ কোনও নেতিবাচক চিন্তা মাথায় এলে আমরা অনেক সময় সেটিকে যাচাই না করেই সত্য বলে ধরে নিই। যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ না করে ভয়কে বাস্তব মনে করলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
এই ভয় ও দূরত্ব কমানোর সহজ উপায়
একটু থেমে নিজেকে প্রশ্ন করা:
অকারণ ভয় বা উদ্বেগ অনুভব করলে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—“আসলেই কি বড় কোনও সমস্যা হয়েছে, নাকি আমি শুধু আশঙ্কা করছি?” যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে অনেক সময় ভয় কমে যায়।
জীবনের ‘জট’ মেনে নেওয়া:
জীবন আসলে একটা নকশীকাঁথার মতো। ওপরের দিকটা সুন্দর হলেও পেছনের দিকে সুতোর কিছু জট থাকবেই। পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা সম্পর্কের মধ্যে ছোটখাটো সমস্যা ও মতবিরোধ থাকতেই পারে। এগুলোকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিতে পারলে মানসিক চাপ কমে।
নির্ভয়ে কথা বলার পরিবেশ:
পরিবারে এমন পরিবেশ থাকা প্রয়োজন, যেখানে সন্তান ভুল করলেও নির্ভয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে। ভরসা ও সহানুভূতিই সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
সব কিছুকে ‘রোগ’ না ভাবা:
সাময়িক ভয়, দুশ্চিন্তা বা অস্থিরতা সবসময় বড় কোনও মানসিক সমস্যার লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা, সহানুভূতি পাওয়া এবং চিন্তার ধরনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।









