ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হয়েছে, রিপোর্টেও স্বস্তির খবর। তবু কি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়া যায়? সব ক্ষেত্রে নয়। চিকিৎসার পরও কখনও কখনও শরীরে আবার ক্যানসারের কোষ সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কখনও আগের জায়গাতেই রোগটি দেখা দেয়, আবার কখনও শরীরের অন্য কোনও অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি হতে পারে নতুন ধরনের ক্যানসারও।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্যানসার ফিরে আসার শুরুতে অনেক সময় স্পষ্ট কোনও উপসর্গ থাকে না। ফলে চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর নিয়মিত নজরদারি ও ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগটি আবার ফিরে আসে কীভাবে?
ক্যানসারের চিকিৎসার পরও শরীরে অতি ক্ষুদ্র কিছু ক্যানসার কোষ থেকে যেতে পারে। পরীক্ষায় সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও পরবর্তী সময়ে কোষগুলো আবার বাড়তে শুরু করতে পারে। তখন নতুন করে টিউমার তৈরি হয় বা শরীরের অন্য অংশে ক্যানসারের উপস্থিতি দেখা দেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্যানসার ফিরে আসাকে সাধারণত কয়েকভাবে দেখা হয়। আগের টিউমারের জায়গায় আবার রোগ দেখা দিলে সেটিকে স্থানীয় প্রত্যাবর্তন বলা হয়। কাছাকাছি টিস্যু বা লসিকাগ্রন্থিতে ফিরে এলে তা আঞ্চলিক প্রত্যাবর্তন হিসাবে বিবেচিত হয়। আর শরীরের দূরের কোনও অঙ্গে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে তাকে দূরবর্তী প্রত্যাবর্তন বা মেটাস্ট্যাসিস বলা হয়।
শরীরে লুকিয়ে থাকা ক্যানসার কোষ
প্রাথমিক চিকিৎসার সময় ক্যানসারের দৃশ্যমান অংশ অপসারণ বা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও কিছু অতি ক্ষুদ্র কোষ শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে। এগুলো দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকার পর আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
রক্তপ্রবাহ বা লসিকাতন্ত্রের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ শরীরের অন্য অঙ্গে পৌঁছাতে পারে। পরে সেখানে নতুন টিউমার তৈরি হলে সেটিকে মেটাস্ট্যাটিক ক্যানসার বলা হয়। কোন অঙ্গে ক্যানসার ছড়াবে, তা মূল ক্যানসারের ধরন ও অন্যান্য জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।
চিকিৎসার পরও কিছু কোষ কেন টিকে যায়?
ক্যানসারের কোষ সবসময় একই ধরনের আচরণ করে না। কিছু কোষ চিকিৎসায় ধ্বংস হলেও অন্য কিছু কোষ তুলনামূলকভাবে প্রতিরোধী হতে পারে। এসব কোষ পরে আবার বিভাজিত হয়ে নতুন ক্যানসার কোষ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া ক্যানসার কোষের জিনগত পরিবর্তনও চিকিৎসার প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। সময়ের সঙ্গে ক্যানসার কোষের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এলে আগের চিকিৎসা সব কোষের ওপর একইভাবে কাজ নাও করতে পারে।
কী কী পরিবর্তন হলে সতর্ক হবেন?
ক্যানসার ফিরে আসার উপসর্গ রোগের ধরন ও কোথায় তা ফিরে এসেছে তার ওপর নির্ভর করে। তাই একটি নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখে ক্যানসার ফিরে এসেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে শরীরে নতুন কোনো গাঁট বা মাংসপিণ্ড দেখা দিলে, দীর্ঘদিনের ক্ষত না শুকালে কিংবা অস্বাভাবিক ব্যথা বা শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিও কখনো কখনো সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে। ফুসফুসে রোগ ফিরে এলে দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। আবার পরিপাকতন্ত্রের কোনো অংশ আক্রান্ত হলে হজমের সমস্যা, বমিভাব, পেটব্যথা বা মলের সঙ্গে রক্তের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ফ্যাকাশে ভাব কিংবা অস্বাভাবিক রক্তপাতও অবহেলা করা উচিত নয়। তবে এসব লক্ষণ কেবল ক্যানসারের কারণেই হয় এমন নয়; অন্য অনেক রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসা শেষ মানেই ফলোআপ শেষ নয়
ক্যানসারের চিকিৎসা সফলভাবে শেষ হওয়ার পরও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ করা গুরুত্বপূর্ণ। রোগের ধরন, চিকিৎসার পদ্ধতি ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারেন।
শরীরে নতুন বা অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে পরবর্তী নির্ধারিত সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো। নিজের ইচ্ছায় কোনো পরীক্ষা বা চিকিৎসা শুরু না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ক্যানসারের চিকিৎসার পর স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান এড়িয়ে চলা, অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা, সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং চিকিৎসকের দেওয়া পরামর্শ মেনে চলা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্যানসার একবার ফিরে এলেই চিকিৎসার সুযোগ শেষ হয়ে যায় এমন ধারণা ঠিক নয়। রোগটি কেন ফিরে এসেছে, কোথায় ছড়িয়েছে এবং আগের চিকিৎসায় কী ফল পাওয়া গেছে, এসব বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করেন। তাই চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত যোগাযোগ ও নজরদারি চালিয়ে যাওয়া জরুরি।