ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে...

Send
ফাতেমা আবেদীন
প্রকাশিত : ০৯:২০, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৪, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০

ভালোবাসা দিবস‘ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম’

-বলেছিলেন বিনয় মজুমদার। ভালোবাসা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন এই শক্তিমান কবি। কবিতার স্তরে স্তরে ছিল ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ভালোবেসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা সাহিত্য গবেষক ও নারীবাদ বিষয়ক বিশ্লেষক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে। তবে বিনয় ভালোবেসে বিলিন হয়ে গেলেও গায়ত্রীর বিনয়কে ভালোবাসার ফুরসত হয়নি। গায়ত্রী পড়তে আমেরিকা গেলেন সেখানে ট্যালবট স্পিভাককে বিয়ে করে থিতু হলেন। পরে অবশ্য ভারতে ফিরে আসেন তিনি।

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, বিনয় মজুমদার ‘ফিরে এসো চাকা’ কবিতাগ্রন্থটি লিখেছেন গায়ত্রীকে নিয়ে। এখানে চাকা মানে চক্রবর্তী। তবে গায়ত্রী এসবই হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, বিনয়ের সঙ্গে তেমন একটা কথাও হয়নি। -একবার ভাবুন যার সঙ্গে কথাই হয়নি তাকে ভালোবেসে একদম নিঃসঙ্গ থেকে গেলেন একজন। এটাই হয়তো প্রেম বা ভালোবাসার অদম্য শক্তি। যে শক্তি আমরা সবাই খুঁজে বেড়াচ্ছি।

সবাইকে ভালোবাসা দিবস অর্থাৎ ভ্যালেন্টাইন ডে’র শুভেচ্ছা। কবে কী করে এই দিবস এলো, তাতে কত তীব্র ভালোবাসা বা আত্মত্যাগ আছে সেই ইতিহাস আমরা গত ২০/২৫ বছরে বেশ জেনে গিয়েছি। সেন্ট ভ্যালেন্টিনোর আত্মাহুতির গল্প এই দেশেও আছে। এই দেশেও চণ্ডিদাস-রজকিনী, গাজী কালু চম্পাবতীদের প্রেমের অমর কাব্যগাঁথা লিপিবদ্ধ আছে।ভালোবাসা দিবস

এমন প্রেম এ যুগেও আছে। হয়তো সময়ের কারণে কেউ তাদের নাম নেবে না। মাত্র দু’দিন আগে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে প্রেমিকার মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে তার কবরের পাশে গিয়ে বিষপান করে প্রেমিকের আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। মরিয়ম শিকদারের (১৫) মৃত্যুর ১১ দিন পর সোহাগ মল্লিকের (১৮) মৃত্যু হয়। এদের দু’জনের কেউই কৈশোর পাড়ি দেয়নি। পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, কলিগ্রামের সোহাগ মল্লিকের সঙ্গে একই এলাকার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী শান্ত শিকদারের মেয়ে মরিয়ম শিকদারের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু প্রেমে বাধ সাধে পরিবারের লোকজন। এ ঘটনার জের ধরে গত ১ ফেব্রুয়ারি মরিয়ম বিষপানে আত্মহত্যা করে। এই শোক সহ্য করতে পারেনি সোহাগ। ১০ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাতে সে মরিয়মের কবরের পাশে গিয়ে বিষপান করে। এমন  প্রেমের গল্প আমরা আগে বইতেই দেখেছি। বাস্তব ঘটনা এই প্রথম। কিংবা ঘটেছে আমরাই জানি না।

তবে এসব পড়ে মোটেও ভেবে বসবেন না ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য একতরফা শব্দ। সংসারে সবার জন্যই ভালোবাসার আলাদা আলাদা খাত তৈরি হয়ে যায় অজান্তেই। জসীম উদ্দিনের কবর কবিতার কথা মনে আছে?

এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মত মুখ,

পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।

এই ভালোবাসার কোনো পরিমাপ নেই। সংসারে পাশাপাশি থাকতে থাকতে এমন ভালোবাসা গড়ে ওঠে দু’জন মানুষের মধ্যে। তেমন ভালোবাসা সন্তান-নাতি-নাতনী সবার জন্যই মানুষের থাকে।

চারপাশে এত ভালোবাসার গল্প তবু কী মনে হয় না আমরা এই সময়ে ভালোবাসার অভাবে আছি। তীব্র অভাবে আমরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। নইলে চারপাশে যত খুন-রাহাজানি-হানাহানির ঘটনা নিত্য ঘটছে। বন্ধু মেরে ফেলছে বন্ধুকে। প্রেমিকার জন্য যেমন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে তেমনি প্রেমিক-প্রেমিকাকে এসিড দিয়ে ঝলসানোর বা কুপিয়ে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। ন্যাক্কারজনকহারে বেড়েছে ধর্ষণের ঘটনা। অনিরাপদ জীবন যাপন করছে- আমাদের শিশু সন্তানরা পর্যন্ত।

মানুষের কথা ছেড়েই দিলাম প্রতিদিন যে পরিমাণ কুকুর হত্যা করার ঘটনা বেড়েছে এ সহ্য করবার মতো নয়। আমরা কাউকেই ভালোবাসছি না, না মানুষ না পশু-পাখিকে। শীত বলে ইচ্ছামতো অতিথি পাখি ঝলসিয়ে খাচ্ছি, গরম বলে পথে ঘেউ ঘেউ করা কুকুরকে গরম পানি বা বিষযুক্ত খাবার দিয়ে মারছি।

তীব্র ভালোবাসার অভাববোধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই বোধহয় একটা সুসময় আসবে। আসুন সবাই স্থির হই। ভালোবাসি। ভালোবেসে নয়নের জলে কবর ভিজিয়ে রাখি, নতুবা ভালোবেসে নিভৃত যতনে নামটি লিখে রাখি একে-অপরের। ভালোবাসাই পারবে আমাদের নতুন পথ দেখাতে... 

আপ-এফএস

লাইভ

টপ
X