কুয়াশার মতো নীরবতা, পানির বুক চিরে উঠে আসা শিকড়, কাদার ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রাণ আর ঘন সবুজের আড়ালে ওত পেতে থাকা শিকারি, ম্যানগ্রোভ বন যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক রহস্যময় জগৎ। এখানে একই সঙ্গে চলে জীবন ও মৃত্যুর খেলা। কোথাও বাঘ নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়, কোথাও কাদার ঘূর্ণি তুলে শিকার ধরে ডলফিন, আবার কোথাও শিকড়ের জালে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেয় ছোট্ট কচ্ছপ।
স্থল আর সমুদ্রের মাঝামাঝি এই বিস্ময়কর জগৎ শুধু বন্যপ্রাণীর আবাস নয়, উপকূল রক্ষারও এক প্রাকৃতিক দুর্গ। কিন্তু দূষণ, বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে সেই জগৎ আজ ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে উঠছে।
এই রহস্য, সৌন্দর্য, বেঁচে থাকার লড়াই এবং অদৃশ্য সংকটই ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী হয়েছে ২০২৬ সালের ম্যানগ্রোভ ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস-এ। ভারতের সুন্দরবন থেকে ফ্লোরিডা, বাহামাস থেকে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের নানা প্রান্তের ম্যানগ্রোভ বনের এমনই ১৩টি দৃষ্টিনন্দন ছবিতে চোখ রাখা যাক।
অদৃশ্য সংকট
প্রতিযোগিতার সামগ্রিক বিজয়ী হয়েছে অতিবেগুনি রশ্মির আলোয় জ্বলজ্বল করা একটি লুকানো ‘ঘোস্ট নেট’-এর নজরকাড়া ছবি। গৌরব পাটিলের তোলা ছবিতে ভারতের মুম্বাইয়ের দক্ষিণে জোয়ার-ভাটায় প্রভাবিত একটি উপকূলে ম্যানগ্রোভ গাছের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ওই জালটি দেখা যায়।
ফেলে দেওয়া মাছ ধরার জাল ম্যানগ্রোভ বনে আটকে গেলে তা বন্যপ্রাণীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এসব জালে আটকে প্রাণী আহত হতে পারে, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
বিস্ময় জাগানো দৃশ্য
ভারতের সুন্দরবনের আরও একটি ছবিতে দেখা গেছে এই দুই রঙিন মাডস্কিপারকে। এরা পানির বাইরে হাঁটতে, লাফাতে এবং শ্বাস নিতে পারে। ম্যানগ্রোভ বনের মতোই স্থল ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী পরিবর্তনশীল অঞ্চলে বিচরণ করে এই মাছ।
লালচে বিরলতা
ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ১০০টিরও বেশি দেশের উপকূল ও মোহনায় ম্যানগ্রোভ গাছ দেখা যায়। বাহামাসে সবুজ ম্যানগ্রোভের মাঝে বিরল লালচে রঙের এই রেডিশ এগ্রেট পাখিটি সহজেই নজর কাড়ে।
কাদা ঘিরে শিকার
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বে অঞ্চলের বোতলনাক ডলফিনগুলো বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ও কৌশলী প্রাণী। ম্যানগ্রোভে ঘেরা এই উপকূল তাদের নানা ধরনের শিকারের জোগান দেয়, যার মধ্যে রয়েছে মুলেট মাছ।
মাছ শিকারের সময় ডলফিনগুলো পানির নিচ থেকে কাদা তুলে চারপাশে একটি বৃত্ত তৈরি করে। ঘোলাটে কাদামিশ্রিত পানিকে অনেকটা জালের মতো ব্যবহার করে সেই বৃত্তের মধ্যে মাছ আটকে ফেলে তারা। ফ্লোরিডা বে অঞ্চলের ডলফিনদের মধ্যে প্রায় অনন্য এই শিকারের কৌশল। ক্যামেরায় এমন দৃশ্যও খুব কমই ধরা পড়ে।
আশ্রয়ের খোঁজে
ম্যানগ্রোভ বন পানির নিচে জটিল ও বৈচিত্র্যময় আবাসস্থল তৈরি করে। শিকড়ের জালের মধ্যে সাঁতার কাটতে থাকা একটি সবুজ কচ্ছপের শাবকের এই ছবিতে সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে। জোয়ারের সময় পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে এই এলাকা সমৃদ্ধ এক বাস্তুতন্ত্রে পরিণত হয়। পাশাপাশি বাঘ হাঙরসহ বিভিন্ন শিকারির হাত থেকেও প্রাণীদের আশ্রয় দেয় ম্যানগ্রোভের শিকড়ের জটিল এই জাল।
ফ্লেমিঙ্গোদের পদযাত্রা
ফ্লোরিডা বে থেকে তোলা আরেকটি ছবি পাখি বিভাগে প্রথম পুরস্কার জিতেছে। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, একদল আমেরিকান ফ্লেমিঙ্গো খুব কাছ থেকে একটি লেমন শার্ককে পর্যবেক্ষণ করছে।
মায়াবী দ্বীপপুঞ্জ
গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের অদূরে অগভীর একটি ম্যানগ্রোভ উপসাগরের পাশ দিয়ে ভেসে যেতে দেখা গেছে একদল গোল্ডেন রে মাছকে। ম্যানগ্রোভ বন শুধু নিজেরাই জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে না, আশপাশের অন্যান্য বাস্তুতন্ত্রকেও টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে রয়েছে কাছাকাছি থাকা সিগ্রাসের তৃণভূমি ও প্রবালপ্রাচীর।
স্নুকের হামলা
ম্যানগ্রোভ বন ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি প্রজাতির প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক মাছের জন্য নার্সারি বা বেড়ে ওঠার নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে।
ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, বোনায়ারের ল্যাক বে-তে একঝাঁক ছোট মাছ আশ্রয় নিয়েছে। ঠিক সেই সময় তাদের দিকে দ্রুত ছুটে আসছে একটি স্নুক মাছ।
ডালে বসতে আসছে
ম্যানগ্রোভ বন স্থলভিত্তিক বনের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি কার্বন সঞ্চয় করতে পারে। ম্যানগ্রোভের শিকড় ঢেউয়ের গতি কমিয়ে দেয় এবং ঝড়ের জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এর ডালপালা পাখিদেরও আশ্রয় দেয়। ছবিতে ইরানের একটি ম্যানগ্রোভ গাছে বসতে আসা মনোমুগ্ধকর ভারতীয় সাদা-চোখ পাখিটিকে দেখা যাচ্ছে।
যেখানে ম্যানগ্রোভের শুরু
কল্লোল মুখার্জির তোলা এই ছবিটি স্তন্যপায়ী প্রাণী বিভাগে বিজয়ী হয়েছে। ঘন ম্যানগ্রোভের গাছপালার আড়ালে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে জঙ্গল ক্যাটের শাবকগুলো।
একটি হিসাব অনুযায়ী, উপকূলীয় ভূমিকে স্থিতিশীল রাখা এবং ভাঙন কমানোর মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ বন ১৫ কোটিরও বেশি মানুষকে উপকূলীয় ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ম্যানগ্রোভ বন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও সঞ্চয় করে।
প্রাচীন আলোর প্রতিফলন
প্রতিযোগিতার ‘অন দ্য গ্রাউন্ড’ বিভাগে বিজয়ী রিউহেই সুগুরির তোলা এই ছবিতে ইন্দোনেশিয়ার একটি নির্জন ম্যানগ্রোভ গাছকে দেখা যাচ্ছে। মাথার ওপর বিস্তৃত মিল্কিওয়ের আলোয় গাছটি যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্যে আলোকিত হয়ে উঠেছে।
বর্জ্যের সাগর
মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে ম্যানগ্রোভ বন ক্রমেই নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দূষণ, যার ভয়াবহ চিত্রই ফুটে উঠেছে এই ছবিতে।
ম্যানগ্রোভের জন্য আরেকটি বড় হুমকি হলো নির্বিচারে বন উজাড়। মাছের চাষ, কৃষিকাজ ও উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অনেক ম্যানগ্রোভ বন পরিষ্কার করে ফেলা হচ্ছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।









