শিশুদের স্ক্রিন টাইম কীভাবে কমাবেন

অরুন্ধতী মুনমুন
০৯ জুন ২০২৬, ১৩:৫৫আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ১৪:০৭

‘মোবাইলটা একটু রাখো’- কথাটা শুনলেই কি আপনার সন্তান রেগে যায়?

সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসেছেন। আপনি সন্তানের হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি নামিয়ে রাখতে বললেন। মুহূর্তের মধ্যেই সে বিরক্ত হয়ে গেলো, মুখ গোমড়া করলো কিংবা রাগ দেখাতে শুরু করলো। এমন দৃশ্য কি আপনার পরিচিত?

অনেক অভিভাবকই আজকাল লক্ষ্য করছেন, তাদের সন্তান আগের তুলনায় বেশি অস্থির, অধৈর্য কিংবা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছে। ছোটখাটো বিষয়েও রেগে যাওয়া, দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা সব সময় নতুন বিনোদনের খোঁজে থাকা—এসব আচরণের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি শিশুদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, গেমিং কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্ক্রিনের ভূমিকা রয়েছে। প্রযুক্তির এই সুবিধাগুলো শিশুদের শেখা ও বিকাশে সহায়ক হলেও, যখন স্ক্রিন তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তখন তা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে?

দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকলে শিশুদের ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, সামাজিক যোগাযোগে অনীহা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতাসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-

 মনোযোগ ও একাগ্রতা কমে যেতে পারে

বর্তমানের ডিজিটাল কনটেন্টগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে খুব দ্রুত শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। কয়েক সেকেন্ড পরপর নতুন ভিডিও, নতুন দৃশ্য কিংবা নতুন উদ্দীপনা মস্তিষ্ককে ক্রমাগত উত্তেজিত রাখে। এর ফলে অনেক শিশু বই পড়া, পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া বা ধৈর্য ধরে কোনো কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।

বিরক্তি, রাগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে নিমগ্ন থাকার পর হঠাৎ সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসা শিশুদের জন্য কঠিন হতে পারে। ফলে ডিভাইস সরিয়ে নিলে তারা রেগে যায় বা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা ধীরে ধীরে আনন্দ, শান্তি বা ব্যস্ততা কাটানোর জন্য স্ক্রিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

ঘুমের সমস্যা

শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঘুমানোর আগে মোবাইল, ট্যাব বা গেমিং ডিভাইস ব্যবহার করলে স্ক্রিনের নীল আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে শিশুদের ঘুমাতে দেরি হয়, ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যায় ও সকালে ক্লান্ত অনুভব করে।

সারাদিন মেজাজ খিটখিটে থাকা

সবসময় অনলাইনে থেকেও একাকীত্ব। অনেক শিশু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। পারিবারিক আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা কিংবা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যে সামাজিক দক্ষতা তৈরি হয়, তা ভার্চুয়াল যোগাযোগে পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব নয়।

উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি

অতিরিক্ত গেমিং, দ্রুতগতির ভিডিও কনটেন্ট এবং সামাজিক মাধ্যমের অবিরাম উদ্দীপনা শিশুদের মস্তিষ্ককে সব সময় সক্রিয় রাখে।

ফলে কিছু শিশুর মধ্যে দেখা দিতে পারে অস্থিরতা, উদ্বেগ, মন খারাপ, ধৈর্যহীনতা; সব সময় নতুন বিনোদনের চাহিদা।

তাহলে সমাধান কী? অভিভাবকরা কী করতে পারেন?

সুখবর হলো, এর সমাধান আছে। এবং সেই সমাধান স্ক্রিন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা নয়।

১। স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত সীমা নির্ধারণ করুন- স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, উদ্দেশ্য এবং নিয়ম নিয়ে পরিবারে আলোচনা করুন। যেমন- খাবারের সময় কোনো ডিভাইস নয়; ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ; পড়াশোনা শেষ হলে নির্দিষ্ট সময় বিনোদন

২। ডিভাইস-মুক্ত সময় ও স্থান তৈরি করুন- ডাইনিং টেবিল, শোবার ঘর কিংবা পারিবারিক সময়কে স্ক্রিনমুক্ত রাখার চেষ্টা করুন। এতে শুধু স্ক্রিন টাইম কমবে না, পরিবারে যোগাযোগও বাড়বে।

৩। বাইরে খেলা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিন- গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক কার্যক্রম শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খেলাধুলা শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, মনোযোগ উন্নত করে, চাপ কমায় এবং সামাজিক দক্ষতা গড়ে তোলে।

৪। নিজেরাও উদাহরণ তৈরি করুন- শিশুরা অভিভাবকদের দেখেই শেখে। যদি আমরা নিজেরাই সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকি, তবে শিশুদের কাছ থেকে ভিন্ন আচরণ আশা করা কঠিন।

৫. শুধু সময় নয়, কনটেন্টের মানও বিবেচনা করুন- সব স্ক্রিন টাইম সমান নয়। শিক্ষামূলক ভিডিও, সৃজনশীল কাজ, অনলাইন শেখার প্ল্যাটফর্ম এবং বয়স-উপযোগী কনটেন্ট শিশুদের জন্য উপকারী হতে পারে।

তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত- “আমার সন্তান স্ক্রিনে কী করছে?” শুধু- “সে কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করছে?” তা নয়।

প্রযুক্তি আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা। তাই শিশুদের জীবন থেকে স্ক্রিন পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া সম্ভবও নয়, প্রয়োজনও নয়।

প্রয়োজন হলো ভারসাম্য। শিশুদের প্রযুক্তি দরকার, কিন্তু একই সঙ্গে দরকার পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা, বই পড়া, পারিবারিক সময় এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্ক। একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার ভূমিকা প্রযুক্তি বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং সন্তানকে প্রযুক্তির সঙ্গে একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করা। আজকের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই আপনার সন্তানের আগামী দিনের মানসিক সুস্থতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

 

অরুন্ধতী মুনমুন: শিশু বিকাশ বিষয়ক গবেষক, শিশুবিকাশ ডটকম

 

/এমএএল/ 
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
জনপ্রশাসনে সংযুক্ত হলেন শিল্প সচিব
জনপ্রশাসনে সংযুক্ত হলেন শিল্প সচিব
পুশইন নিয়ে উত্তেজনা: ঢাকা বলছে দিল্লি মানছে না
পুশইন নিয়ে উত্তেজনা: ঢাকা বলছে দিল্লি মানছে না
মহাসড়কে উলটোপথে চলা থ্রি-হুইলার ধরায় পুলিশের গাড়িতে হামলা
মহাসড়কে উলটোপথে চলা থ্রি-হুইলার ধরায় পুলিশের গাড়িতে হামলা
তিন পুরস্কার জিতলো গোলাম রাব্বানীর এক মিনিটের ফিল্ম ‘সাঁতার’
তিন পুরস্কার জিতলো গোলাম রাব্বানীর এক মিনিটের ফিল্ম ‘সাঁতার’
সর্বাধিক পঠিত
হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, কীভাবে মৃত্যু হলো জানালেন সেই নারী
হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, কীভাবে মৃত্যু হলো জানালেন সেই নারী
এনআইডি’র স্মার্টকার্ড প্রকল্প শেষ হচ্ছে নভেম্বরে 
এনআইডি’র স্মার্টকার্ড প্রকল্প শেষ হচ্ছে নভেম্বরে 
কবর খুঁড়তে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২ জন
কবর খুঁড়তে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২ জন
বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম
বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম
খুলছে নতুন দিগন্ত, আসছে ইসলামী সঞ্চয়পত্র
খুলছে নতুন দিগন্ত, আসছে ইসলামী সঞ্চয়পত্র