X
রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২
৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
রবীন্দ্রসংগীত

সুরের বিকৃতি এবং মৌলবাদ

আহসান হাবিব
০৬ আগস্ট ২০২২, ১৩:৫২আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২২, ১৩:৫২

রবীন্দ্রনাথ তার গান বিকৃতি থেকে সুরক্ষার জন্য প্রতিটি গানের স্বরলিপি বেঁধে গেছেন। কেউ যদি তার গান গাইতে চায়, তার দেওয়া সুরেই গাইতে হবে, কোনো মানদণ্ডেই এর বিকল্প থাকতে পারে না। তার সঠিক সুর পেতে স্বরলিপির দ্বারস্থ হতেই হবে। যদি কেউ কোনো শিল্পীর গাওয়া গান থেকে শিখে গায়, তাহলেও স্বরলিপি দেখে মিলিয়ে নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কিন্তু কেন?

কারণ অন্যের সৃষ্টি বিকৃত করার অধিকার আমরা রাখি না। যেমন রাখি না তার কোনো লেখার একটি শব্দ পাল্টে ফেলার। সুর বিকৃতি মানেই তার সৃষ্টিকে নষ্ট করে ফেলা। রবীন্দ্রভারতী থেকে কপিরাইট উঠে যাবার পর অনেক শিল্পীকে নিজেদের ইচ্ছেমতো গাইতে দেখা গেছে। যারা এই প্রচেষ্টা করেছেন, শ্রোতারা তাদের গ্রহণ করেনি। করেনি কারণ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে এরা ঊন। তিনি তার গান সম্পর্কে নিজেই বলে গেছেন ‘আমি তো আমার গানে কোন ফাঁক রাখিনি যে কেউ তা ভরে দেবে’। এই কাজ করে কিছু শিল্পী। শিল্পী যত বড়ই হোক—এই কাজ করার কোনো অধিকার তার নেই।

অনেককেই বলতে শুনি স্বরলিপিতে গান থাকে না। কথা সত্য। স্বরলিপি একটি কাঠামো, তাকে অনুসরণ করে গান করে তোলার কাজটি করবেন শিল্পী নিজে। এই কাজে তাকে সহায়তা করবে সংগীতের ভাষা। এই ভাষা জানতে হলে গুরুর কাছে তালিম নিতে হয়। তালিম হলেই কেবল স্বরলিপিতে দেওয়া কাঠামোকে গানে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা জন্মায়। তার মানে এই নয়, তিনি স্বরলিপির বাইরে কিছু করছেন। কিছুই করছেন না, শুধু ভাষার প্রয়োগ করছেন। মীড়, মুড়কি, মূর্চ্ছনা, গমক ইত্যাদি কখন কোথায় প্রয়োগ করতে হবে এসব শিখতে হয়। একদিন নয়, বছরের পর বছর। মনে রাখতে হবে সংগীত গুরুমুখি বিদ্যা। এটা সাহিত্যের মতো নিজে নিজে অর্জন করা যায় না। 

রবীন্দ্রনাথের গান অন্যান্য গান থেকে আলাদা। তার সাংগীতিক দর্শন নিজস্ব। তিনি ভারতীয় মার্গসংগীত থেকে কাঠামো নিয়ে তাতে ব্যবহৃত অলংকারের বাহুল্য বর্জন করেছেন। এখানে যা প্রযোজ্য বলে মনে করেছেন তা রেখেছেন। যেমন তার গান মীড়ের অধিক ব্যবহার আছে কিন্তু তান নেই, বিস্তার নেই। ভারতীয় মার্গসংগীতে কথা নয়, সুরই প্রধান কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানে কথা এবং সুর দুই-ই সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। সুতরাং, তার গান গাইতে হলে তার নির্মাণকৌশল জানতে এবং বুঝতে হয়। এখন কেউ যদি তার গানে অনাবশ্যক একটি তান যুক্ত করে ফেলে, গানটি ভেঙে পড়বে। সেটি আর রবীন্দ্রসংগীত থাকবে না।

কিন্তু নজরুলের গানের গঠন কাঠামো আলাদা। তিনি ভারতীয় মার্গসংগীতের কাঠামোর সবকিছু ব্যবহার করেছেন। ফলে রাগ সংগীত জানা একজন শিল্পী তার গানে ততটুকু অধিকার রাখবেন যতটুকু ঐ নির্দিষ্ট গানের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু তিনি সুরের কাঠামোর বাইরে যেতে পারবেন না। এরপরেও কথা থাকে। নজরুল নিজে তার গানের স্বরলিপি করে যাননি, ফলে দেখা গেছে তার গানে সবচেয়ে বেশি সুরের বিকৃতি ঘটেছে। সুরের বিকৃতি মানেই একটি অরাজকতা। তার দেওয়া সুরের বিকৃতি ঘটাবার কারো অধিকার নেই। দেরিতে হলেও নজরুল ইনস্টিটিউট নজরুলের তত্ত্বাবধানে যেসব গান রেকর্ড হয়েছিল, সেইসব আদি গান থেকে স্বরলিপিকরণের কাজ হয়েছে এবং এটা চলমান আছে। যতদূর জেনেছি এখন পর্যন্ত ১৮০০-২০০০ গানের স্বরলিপি করা সমাপ্ত হয়েছে। এর ফলে নজরুলের গানে অরাজকতা কমবে এবং কমে এসেছেও।
আমার কথা এই, অন্যের দেওয়া সুর কেউ বিকৃত করার অধিকার রাখে না এবং স্পর্ধা দেখানোও সমীচীন নয়। নিজের সৃষ্টি নিয়ে যা ইচ্ছা করা যায়, অন্যেরটা নিয়ে নয়।

গান গাওয়ার স্বাধীনতা আর গান বিকৃত করার অধিকার এক নয়। সব মানুষই গান গায়, হাটে মাঠে ঘাটে, কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু এটি যখন গীত হয়ে শ্রোতার কাছে আসে, সেটি পণ্য হয়, তখন অথেনটিসিটি মানতে হবে। মনে রাখতে হবে শিল্প কোনো নৈরাজ্যের জায়গা নয়।

২.
বাংলাদেশ এক আশ্চর্য দেশ! এখানে যেন যাচ্ছেতাই করতে পারা যায়! একদল লোক বাকস্বাধীনতার ধুয়া তুলে জীবন দিতেও প্রস্তুত! এমনকি হত্যাকারীর পক্ষে গেলেও! কেননা তাদের পেছনে আছে সেই দার্শনিক—ভলতেয়ার—যিনি অন্যের মত প্রকাশে জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন যদি তার বিপক্ষে যায় তবুও! 
এখানে যার যে যোগ্যতা বা পারদর্শিতা নেই, সে সেটাও করতে পারে। যিনি চিকিৎসক নন, তিনি নির্বিঘ্নে চিকিৎসা করতে পারবেন। যিনি ইঞ্জিনিয়ার নন, তিনি যেকোনো স্থাপনা বা প্রযুক্তি বানাতে পারবেন। যিনি পেইন্টার নন, ছবি আঁকতে তার কোনো সমস্যা নাই। লেখক নন, অথচ বইয়ের পর বইয়ের স্বত্বাধিকারী তিনি হতে পারবেন। আর কেউ যদি উপর মহলের খাস লোক হন, সরকারি পুরস্কার জোটানো তার সময়ের ব্যাপারমাত্র। 

যিনি কোনো দিন গান শেখেননি, কোনো সমস্যা নাই, গান গেয়ে মঞ্চ কাঁপিয়ে দিতে পারবেন। কারণ, এটা যেন তার ব্যক্তিস্বাধীনতা! যদি অগাধ টাকার মালিক হন, নিজস্ব চ্যানেল থাকে, তাহলে তো কথাই নেই, গানবন্যায় দেশকে ভাসিয়ে দিতে পারেন। সেই গান শুনে আবার এদেশের বিপুল মানুষ অনির্বচনীয় আনন্দ পায় এবং বাহবায় ভাসিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না! এদের বিরুদ্ধে রীতিসুদ্ধ কথা বললে একগ্রুপ তথাকথিত বাকস্বাধীনতার সেবক সমালোচকদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়। যে যত স্থূল এবং কদাকার, এখানে তত তার কদর। 

সংস্কৃতিচর্চার নামে এখানে যে যত ডাস্টবিন পূর্ণ করবে, সে তত বড় শিল্পী! এখানে যে যত বিকৃতি উৎপাদনে ওস্তাদ, সে তত সম্মাননীয় এবং সেলিব্রিটি। প্রমিত উচ্চারণে কেউ কথা বললে তাকে নিয়ে হাসাহাসি হয়। যে যত পশ্চাদপদ, তার তত মূল্য, সে যেন তত উপনিবেশবিরোধী এক জাতীয়তাবাদী সোলজার!

এরা মনে করে যে কেউ যা ইচ্ছা তাই-ই করতে পারে। যে কারো সৃষ্টিকে ইচ্ছামতো বিকৃত করতে পারে, এটা তাদের অধিকার। বিকৃতিই যেন এদের কাছে শ্রেষ্ঠ শিল্প।

৩.
আমাদের দেশে কতিপয় ব্যক্তি আছেন যারা রবীন্দ্রসৃষ্টিকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার কথা কেউ বললে তাদের রবীন্দ্র-মৌলবাদী বলে গালি দেয়। যেমন কেউ যদি রবীন্দ্রসৃষ্ট সংগীতকে নিজের মতো বানিয়ে পরিবেশন করে এবং এর প্রতিবাদ করে, সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক এদের রবীন্দ্র মৌলবাদী বলে বিদ্রূপ করে। অথচ, এখানে মৌলবাদের সঙ্গে এই প্রসঙ্গের আদৌ কোনো সম্পর্ক নাই।
বরং রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মৌলবাদবিরোধী একজন আধুনিক প্রগতিশীল মানুষ। মৌলবাদের পশ্চাৎপদতা সম্পর্কে তিনি অসংখ্য বক্তব্য রেখেছেন। তিনি রাশিয়া ভ্রমণ শেষে প্রভূত প্রশংসা করছেন। বিশেষত শিক্ষা, উৎপাদন ব্যবস্থা ও সামাজিক সংঘবাদীতার, সঙ্গে তিনি যুক্ত করছেন তার প্রাজ্ঞ সংশয়, বলেছেন—কিন্তু যদি কোনো ব্যবস্থা বাইরে থেকে অনড় থাকে তাহলে তা ভেতর থেকে একদিন ফেটে যাবে অর্থাৎ তিনি সমাজতন্ত্রের একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আঙুল তুলেছিলেন।

আমরা যদি রবীন্দ্রনাথের সংগীতের কথাই ধরি তাহলে দেখতে পাব তিনিই প্রথম সেই সংগীতবিপ্লবী যিনি মার্গসংগীতের অনড়তা ভেঙে নতুন রূপের সংগীত রচনা করেন। এবং তার দেখানো পথ ধরেই আজকের বাংলা সংগীতের বহু বিচিত্র বিকাশ। তিনি সংগীতের যে রূপ সৃষ্টি করেছেন, তা চির আধুনিকতার দাবি রাখে। এই দাবি একদিকে সাংগীতিক, অন্যদিকে সাহিত্যিক। তার গীতিকবিতা একদিকে ধ্রুপদী অন্যদিকে রোম্যান্টিক। এই দুইয়ের মিশেলে তার সংগীত হয়ে উঠেছে চির আধুনিক।

তিনি যে সংগীত রচনা করেছেন, তাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তার সমস্ত গানকে—আগেই বলেছি—স্বরলিপিতে গ্রথিত করেছেন এবং তার সৃষ্টি যাতে কেউ তাদের ইচ্ছামতো বিকৃত করতে না পারে। এটা তার বিচক্ষণতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। তিনি তার গানকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় বেঁধেছিলেন বলেই আজো তার সৃষ্টি অবিকৃত পাচ্ছি। এটা বাঙালি সংস্কৃতির একটি শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে মহাকালের আর্কাইভে জমা পড়েছে। এই যে তার সৃষ্টিকে রক্ষা করার কৌশল এবং তা অবিকৃত রাখার প্রচেষ্টা করতে যারা ভূমিকা পালন করছে পরবর্তীতে, কতিপয় অসংস্কৃত ব্যক্তি এটাকেই রবীন্দ্রমৌলবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করছে। কী হাস্যকর!

তার মানে কি এই, তিনি যে গান রচনা করেছেন, পরবর্তীতে অন্য কেউ তার গানে ছুরি চালালে তা খুব আধুনিক কর্ম হয়ে পড়ে? এই চিন্তা অর্বাচীন। কারণ কারো সৃষ্টিকে অন্য কেউ বদলাতে পারে না। বরং তারচেয়ে আরো আধুনিক যুগোপযোগী সংগীত রচনা করা যেতে পারে। এবং সেটা হয়েছেও। রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সংগীতের যে অভাবনীয় বিকাশ, রবীন্দ্রসংগীত কি তার বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? একদম নয়, বরং আধুনিক যাবতীয় সংগীত সৃষ্টিতে রবীন্দ্রসংগীত সাহায্যের অকৃপণ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত সৃষ্টি না হলে পরবর্তী সংগীতের বিকাশ ঘটত কি না সন্দেহ। ঘটলেও তার রূপ কেমন হতো কেউ জানে না। রবীন্দ্রনাথ তার সংগীত রচনার মধ্যদিয়ে সংগীতচিন্তার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার মানে কি এই যে তার সৃষ্ট গানকে বদলাতে হবে, বিকৃত করতে হবে? আর এর বিরুদ্ধে কথা বললেই শুনতে হবে মৌলবাদী বলে গালি? বেঠোফেনের যেকোনো সিম্ফনির একটি নোটস কি বদলাবার কথা ভাবা যায়? কিংবা শেক্সপিয়ারের সনেটের একটি শব্দ। এখন কেউ যদি সেগুলোকে নিজের মাধুরী মিশিয়ে বদলায়, তা কি অনুমোদনযোগ্য নাকি এটা সঠিক কোনো পদক্ষেপ? 

রবীন্দ্রসংগীত কি সংগীতের বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো? সে কি ধর্মের মতো বলেছে যে রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া আর কোনো সংগীত হতে পারবে না? বলেনি, তাহলে তার সৃষ্টিকে রক্ষার কথা বললে কেন এই নিন্দা শুনতে হয়? কারণ এই সকল লোক মৌলবাদ শুধু নয়, শিল্প সম্পর্কেও কোনো ধারণা রাখে না। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংগীতিক শিল্পরূপ হচ্ছে রবীন্দ্রসংগীত। একে রক্ষা করা সভ্যতার লক্ষণ। কারণ সভ্যতা হচ্ছে পুরনোকে অবিকৃতরূপে সংরক্ষণ করা।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ওয়েবম্যাট্রিক্স এর র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে ঢাবি
ওয়েবম্যাট্রিক্স এর র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে ঢাবি
পাকিস্তানপন্থার রাজনীতি এখনও বহন করছে বিএনপি: ইনু
পাকিস্তানপন্থার রাজনীতি এখনও বহন করছে বিএনপি: ইনু
স্ট্রিমিং-এর অনলাইন স্টোর নিয়ে ভাবছে ইউটিউব
স্ট্রিমিং-এর অনলাইন স্টোর নিয়ে ভাবছে ইউটিউব
ঘাতক ট্যাংকের পথে আলোর মিছিল
ঘাতক ট্যাংকের পথে আলোর মিছিল
এ বিভাগের সর্বশেষ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পুনর্পাঠ
জন্মশতবর্ষেসৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পুনর্পাঠ
স্বপ্ন ছিল তারেকের নামে জাদুঘর হবে
স্বপ্ন ছিল তারেকের নামে জাদুঘর হবে
বিদ্যুতের মতো উজ্জ্বল
হুমায়ুন আজাদবিদ্যুতের মতো উজ্জ্বল
‘আংশিক-বাঙালি’ ভার্জিনিয়া উলফ
‘আংশিক-বাঙালি’ ভার্জিনিয়া উলফ
এস এম সুলতানের জীবনবোধ
এস এম সুলতানের জীবনবোধ