X
রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
৮ বৈশাখ ১৪৩১

যে তার রুমাল নাড়ে

মোস্তফা তারিকুল আহসান
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৪:৪৭আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৪:৪৭

সৈয়দ শামসুল হক প্রয়াত হওয়ার আগে ও পরে তাঁকে নিয়ে যেসব কথাবার্তা হতো বা হচ্ছে তা  আমাদের একটু বিচলিত করে, মনে হয় একটা ভুল হচ্ছে তাঁকে নিয়ে, বিশেষত তাঁকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। প্রথমত, তিনি চলে যাবার পরেও তিনি মহান লেখকদের মতো সক্রিয় আছেন সংশ্লিষ্ট মহলে এবং তাঁকে নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আর তাঁর রচনা বা তাঁকে নিয়ে যারা বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন তারা হয় নিজেরা আলোকিত হওয়ার জন্য করেছিলেন অথবা এটা তারা করেছিলেন শ্রেফ অসুয়াবশত যা তাদের স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। সৈয়দ হকের বিপুল ও বিচিত্র রচনার দিকে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয় যে তিনি লেখাকে নিজের ব্রত মনে করেছিলেন, সার্বক্ষণিক লেখা নিয়ে থাকতেন এবং লেখক সত্তাকে সক্রিয় রাখার জন্য যা যা প্রয়োজন সব তিনি করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের কথায় তিনি সৃজনশীলভাবে বেঁচে ছিলেন। মৃত্যুর কিছু সময় আগেও তিনি লেখক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো। আমাদের ভাবতে অবাক লাগে আসন্ন মৃত্যুর ভয়াবহ বেদনা ও পরিণতির ভাবনা বা পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার সময় যে তাড়নায় সবাই ছটফট করে তখন তিনি নতুন কবিতার পঙক্তির কথা ভাবছেন, নতুন গল্পের প্লটের কথা ভাবছেন, অসমাপ্ত রচনার কথা ভাবছেন। নিজের পরিণতির কথা, পরজন্মের কথা কমই ভাবছেন তিনি। এই শক্তি নিশ্চয় সৃজনশীলতার শক্তি, তবে এই শক্তি কত জন লেখকের থাকে শেষ পর্যন্ত তা আমরা জানি না। কেউ কেউ একে বাড়াবাড়ি বলতে পারেন, ছলনা বলতে পারেন, তবে কার্যত ঐ সময় কারো পক্ষে তা করা সম্ভব নয়।

বিচিত্র পথে বিচিত্রভাবে সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় প্রায় ষাট বছর তিনি রচনা করে গেছেন। তাঁর রচনার পরিমাণও যে কোনো লেখকের জন্য ঈর্ষা করা বিষয় হতে পারে।  মেনে নিচ্ছি তাঁর সব রচনা এক মানের নয়, সেটি তিনি নিজেও অনেক সময় স্বীকার করেছেন। তবু এর মধ্যে প্রতিনিধিত্য-স্থানীয় রচনাগুলো বিবেচনায় নিলেও তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা ও ধ্রুপদী লেখক এবং তাতে কোনো সন্দেহ করা চলে না। বিশ্বসাহিত্যের পঠন-পাঠনজাত অভীক্ষা তাঁকে বৈচিত্র্যপূর্ণ লেখার ও প্রকরণের দিকে ধাবিত করেছিল আর এর সাথে যোগ হয়েছিলো তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মারক।  বাঙালি লেখকের অভিজ্ঞতাহীন ক্লিশে রচনার বিপুল সমাবেশ সম্পর্কে আমরা জানি, যাকে শুধু রচনাই বলা যায় যা শিল্প হয়ে ওঠে না কখনো। শুধু অভ্যেসবশত লেখকেরা রচনা করেন। সৈয়দ হক বাংলা (দ্রষ্টব্য : বাংলার মুখ) ও বিশ্বের নানা প্রান্তে ভ্রমণের ফলে জনপদ-জীবনের নানা পর্যবেক্ষণের নির্যাস নিয়েছিলেন নিজের মতো করে; মানব মানবীর সম্পর্কজাত অভিজ্ঞতা ও মানব স্বভাবের নানাবিধ হদিশ নেবার যে সুযোগ তাঁর হয়েছিলো তা তিনি তাঁর লেখায় ব্যবহার করতে পেরেছিলেন গভীরভাবে।

নানা বিষয়ে বিচিত্র মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার ফলে তাঁর লেখার শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে কথা বলা যে কারো পক্ষে কঠিন। তিনি যে আঁকিবুকি করতেন অবসরে তাঁর কথায় মস্তিষ্ককে খানিকটা সচল রাখার জন্য সেটা বাদ দিলে তাঁর সব পদের রচনাই উল্লেখযোগ্য। এমনকি সৃজনশীল রচনার বাইরেও তাঁর বিপুল সৃষ্টি রয়েছে যা অনেক পাঠকের বা সমালোকের চোখে পড়েনি। সেখানেও সৃজনশীলতার লক্ষণ আছে খুব গভীরভাবে; সৃজনশীল ব্যক্তির মননশীল কাজও সৃজনশীলতার জলে স্নাত হয়। সে কারণে সে রচনাও হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র এবং নতুন ধরনের সৃজনশীল রচনা। অনুবাদের ক্ষেত্রে তিনি যখন কাজ করেছেন তখন বোঝা যায় তিনি নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন, কখনো নতুন পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করেছেন, কাহিনি প্লট ভাষাভঙ্গি বদলে নিয়েছেন। এমনকি শেক্সপীয়রের (জুলিয়াস সিজার, ম্যাকবেথ, টেম্পেস্ট) নাটক অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি এই স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। ‘শ্রাবণ রাজা’ (সল বেলোর উপন্যাস, ১৯৫৯, Henderson the Rainking) অনুবাদে তাঁর সফলতা আমাদের মনে বাংলা ভাষায় স্যাটায়ারিক নভেল অনুবাদের ধারণাকে পাল্টে দেয়। তাঁর সফলতা ইংরেজি উর্দু বা অন্য ভাষা থেকে অনুবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইংরেজি ভাষা ও অন্য ভাষা থেকে অনূদিত তাঁর গ্রন্থগুলো সেই সাক্ষ্য দেয়।

সৈয়দ হকের সৃজনশীল রচনার বাইরে রয়েছে আরো অনেক কাজ। আগেই উল্লেখ করেছি সেগুলোর ভেতরে রয়েছে সৃজনশীলতা প্রগাঢ় চিহ্ন। হৃৎকলমের টানে (দুই খণ্ড), কথা সামান্যই, গল্পের কলকবজা, প্রণীত জীবন, তিন পয়সার জোছনা, আমার স্কুল- এই সব রচনায় সৈয়দ হকের গদ্যের শক্তির নমুনা পাওয়া যায়। আত্মজীবনী জাতীয় বা অন্যান্য গদ্যে তিনি বাংলা গদ্যের নতুন একটা রীতি তৈরি করেছেন; এই গদ্য পড়লে বোঝা যায় এভাবে আগে কেউ বাংলা গদ্য লিখতেন না। বাক্য কাঠামো, যতিচিহ্নের ব্যবহার, সূক্ষ্মভাবনারাজিকে গদ্যের শরীরে যুক্ত করার যে কৌশল তিনি তৈরি করেছিলেন তা থেকে সৈয়দ হকের স্বতন্ত্র গদ্যরীতির নমুনা পাওয়া যায়। এ নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি কেউ করেননি। নিরীক্ষাপ্রিয় এই লেখকের নিরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল লেখাকে গতানুগতিকতার নির্বেদ থেকে মুক্ত করে নতুন করে কিছু তৈরি করা। সেটা তিনি পেরেছিলেন এবং তাঁর নিরীক্ষা শুধু নিরীক্ষা অনুশীলন হয়ে থাকেনি। বরং লেখার মৌলিক ধারা হিসেবে সেটা মানানসই হয়েছে এবং স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্য থেকে তিনি নানা উপকরণ নিয়েছেন সহজভাবে, উপযুক্ত প্রেক্ষিতে তা ব্যবহার করেছেন। ‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার যে রীতি চালু করেছিলেন, তাতে সফল হয়েছিলেন এবং বাংলাদেশে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কবিরা তাঁর এই রীতি অনুসরণ করেছেন, সফলও হয়েছেন কেউ কেউ। তিনি নিজেও প্রথমে খুব সংশয়হীন ছিলেন না সেজন্য নবী মুনশী ছদ্মনামে সনেটগুলো লিখেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি যখন টি এস এলিয়টের কাব্যনাট্যের তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে নাটক লেখা শুরু করেন তখন এই সনেট তাকে সহায়তা করেছিলো। তিনি অবশ্য বলেছেন, কাব্যনাট্য লিখতে গিয়ে এলিয়টের নাট্যভাবনা তাকে ক্রয় করে ফেলে। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন যে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’কে তিনি নাটকের আদিপাঠ মনে করেন। আমাদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য যে আমাদের নতুন সাহিত্য রচনার প্রেরণা হতে পার সেই যুক্তির স্বপক্ষে তিনি বেশ কিছু রচনা তৈরি করেছেন। কাব্যনাট্যের বাইরে আছে তাঁর উপন্যাস ‘আয়না বিবির পালা’ ও ‘বারো দিনের শিশু’ যা ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র গল্প নিয়ে নতুনভাবে নতুন প্রেক্ষিতে লিখিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ল্যাটিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজমের সূত্র আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে আছে বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর যুক্তি বেশ শক্ত বলে আমাদের ধারণা।

তাঁর সৃজন প্রক্রিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বতন্ত্র এবং তিনি যে অনুপ্রেরণা ও যুক্তি নিয়ে এগিয়েছেন তা সক্রিয় রেখেছেন, তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অবিরাম কাজ করে গেছেন। তিনি অনেকবার বলেছেন, তিনি পরিশ্রমী লেখক, জন্মসূত্রে পাওয়া প্রতিভা নিয়ে তিনি লিখতে চাননি। বা সেই প্রতিভাকে তিনি অস্বীকার করেছেন। আমরা দেখেছি বিরামহীন তাঁর লেখকজীবন, চঞ্চলতা তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই কর্মযজ্ঞে তিনি বেশ সফল, পুরোপুরি সফল হওয়ার কোনো সুযোগ এখানে থাকার কথা নয়। আমাদের ধারণা তিনি মূলত কবি। কবিতা তাঁর করোটির মূল শক্তি। এবং সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন কাব্য প্রতিভা সব সৃজনশীল মানুষের মধ্যে থাকে। কথাসাহিত্যিকেরা কবিতা না লিখলেও তার লেখায় কাব্যের উপাদান ও তার শক্তির নমুনা পাওয়া যায়। তিনি সচেতনভাবে কাব্যকে ব্যবহার করেছেন চরিত্র ও পরিবেশকে উন্মোচিত করতে। তবে যারা মূলত কবি তাদের কথাসাহিত্যের বেলায় সচেতন থাকতে হয় যাতে তার এই জাতীয় লেখা কাব্যাক্রান্ত হয়ে না পড়ে।  সৈয়দ হক কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, মুক্তগদ্য, গান, ছড়া, সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার সময় খুব সচেতন ছিলেন সেটা তাঁর  লেখা পড়লে বোঝা যায়। ‘জলেশ্বরী’ নামে যে উপনিবেশ বা জনপদ তিনি তৈরি করেছেন তার ভাষা ও ভূগোল তৈরি করার জন্য তিনি পরিশ্রম করেছেন, অনুশীলন করেছেন, তাঁর চরিত্ররা বিকশিত হয়েছে পরিপূর্ণ শক্তি নিয়ে, বাস্তবতাকে অনুসরণ করে।

তিনি শুরু করেছিলেন, ‘হৃদয় যেন, রংগপুরের কণকরঙা মেয়ে’ এরকম পঙ্‌ক্তি দিয়ে। ‘বুনোবৃষ্টির গান’ কাব্যের এসব লেখা থেকে তাঁর শক্তি বোঝা যায়। এরপর তিনি অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন, বাংলা ভাষার শক্তি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছেন নিপুণ কারিগরের মতো, আজব বাজিকরের মতো। একজন পরিপূর্ণ মাত্রার লেখক সৈয়দ শামসুল হককে আমরা পাই ষাট বছরের অবিরাম সৃজনশীল পথচলায়। কত কথায়, কত অভিব্যক্তিতে, কতভাবে প্রগাঢ় উচ্চারণে, সাহিত্যের প্রতিটি স্তরে তাঁর রচনা আমাদের হাতছানি দেয়; আমরা নিমজ্জিত হই তাঁর লেখার অতলে। সে তার বুকের রুমাল উড়িয়ে দেয় আমাদের পরানের গহীন ভিতর।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
চট্টগ্রামে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্যাটারি কমপ্লেক্স’ উদ্বোধন
চট্টগ্রামে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্যাটারি কমপ্লেক্স’ উদ্বোধন
যুক্তরাজ্যের টিভি চ্যানেলে ফারুকী-তিশার ‘অটোবায়োগ্রাফি’
যুক্তরাজ্যের টিভি চ্যানেলে ফারুকী-তিশার ‘অটোবায়োগ্রাফি’
যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসে বন্দুকধারীর হামলায় ২ জন নিহত
যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসে বন্দুকধারীর হামলায় ২ জন নিহত
সারা দেশে হাসপাতালের শয্যা খালি রাখার নির্দেশ
সারা দেশে হাসপাতালের শয্যা খালি রাখার নির্দেশ
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
প্রবাসীদের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে কোটিপতি, দুই ভাই গ্রেফতার
প্রবাসীদের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে কোটিপতি, দুই ভাই গ্রেফতার
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?