দেশ বিদেশে, আক্ষরিক অর্থেই তীর্থভূমি—এমন চির-আরাধ্য কিছু জায়গায় অসামান্য কিছু সময় আমার কেটেছে কবি ও সব্যসাচী লেখক শামীম রেজার সাহচর্যে—পরম বন্ধু বলে যাকে মানি—তাঁর সঙ্গে ভ্রমণে, গালগল্পে, তর্কে, আবার একই সঙ্গে চুপচাপ রাস্তায় হেঁটে—এসব আনন্দস্মৃতি খুব দুঃখের দিনেও সীমাহীন আনন্দ জোগায়। আমার বন্ধু লিডস বেকেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের বিভাগীয় প্রধান, ডাকসাইটে কবি অধ্যাপক ওজ হার্ডউইক শামীম রেজার ইংরেজি ভাষায় অনূদিত কিছু কবিতা পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন, তাতে, তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘ভারতবর্ষ’-এর অনুরাগী পাঠক আমিও নতুন করে তাঁর কবিতা পাঠ করতে শুরু করি (এসব নিয়ে অন্য পরিসরে আরো বিশদ লেখার ইচ্ছে থাকলো)। ফলে আমাদের সম্পর্ক যতটা বন্ধুত্বের তার চেয়েও বেশি তাঁর সৃজনবিশ্ব নিয়ে আমার পক্ষ থেকে এক অদম্য কৌতূহলের এবং তাঁর পক্ষ থেকে বোধকরি—আমার ভেতরের জেদ জাগিয়ে তোলার জন্য প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে তাগাদা, অনুযোগ, এমনকি খানিকটা ধমকেরও। ফলে যতবারই আমাদের দেখা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে আমি বাড়ি ফিরেছি নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে, আবার নতুন করে নিজের লেখালেখি, সিনেমা ইত্যাদিতে মনোযোগী হবার গভীর প্রত্যয় নিয়ে। ফলত আমার জীবন কেটেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের, এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের, এক সংস্কৃতির সঙ্গে আরেক সংস্কৃতির সংযোগ ও অভিসার রচনা করতে করতেই। নিজের জন্যে, যত সামান্যই হোক—আমার নিজের কাজের জন্যে বা আমার কাজের সঙ্গে অন্যের বা অন্যদের সংযোগ রচনা করার কথা এ যাবৎ ঐভাবে কাউকে ভাবতে দেখিনি—বোধকরি বন্ধু শামীম রেজা এজন্যে আমার জীবনে অনন্য, সবার থেকে আলাদা।
‘কে যেন ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে’ তাই শৈশব থেকেই বেজায় কুঁড়ে ও ঘরকুনো, ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া' আমার মতই এক দুঃখী নদী ওয়ার্ফও ভালো করে ঘুরে দেখতে পারিনি। কিন্তু জার্মানিতে আমাদের প্রথম সফরকালেই শামীম রেজার কৌতূহল ও অদম্য ভ্রমণ-পিপাসার কারণে মাত্র তিন চারদিনেই জার্মানি ও বেলজিয়াম প্রায় চষে বেড়িয়েছি। গ্যাটে হাউজ, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল, পিকাসো ভিলেজ, বিচিত্র সব মিউজিয়াম, কবি মরিস মেটেরেলিঙ্কের বাড়ি, বিখ্যাত সব গথিক ক্যাথিড্রাল, হ্যানরিশ হাইনের বাড়ি, অপূর্ব পূর্ণিমার ছায়ায় মধ্যরাতে ডুসেলডর্ফে রাইন নদী এবং বেলজিয়ামের আন্ত্রিপে শেল্ড নদীতীরে হাঁটতে হাঁটতে কবিতা পড়া, রবীন্দ্রনাথ ও স্তাঁদাল নিয়ে নানাবিধ তর্কে অবতীর্ণ হওয়া—এমন উজ্জ্বল অনপনেয় সব অভিযান এমনি এমনি জীবনে আসতো কিনা সন্দেহ!
এবছর জানুয়ারিতে নিউইয়র্কে যাব কিনা নিজেই খুব স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিলাম না। নিউইয়র্ক এই সময়টাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা, জনজীবন প্রায় স্থবির থাকে বলে বন্ধুরা জানাতে শুরু করেছেন। তদুপরি আরো উটকো কিন্তু একান্তই প্রাত্যহিক কিছু সমস্যাও এসে হাজির হওয়ায় নিজেও ঠিক নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। যদিও ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ ঠিকই যেতে পারব—এমন একটা প্রত্যয় ছিল মনে। কেননা এই নাগরিক জীবনের সমুদয় ক্ষয়, স্খলন ও মুখস্থ মানুষের সংস্পর্শে বিপন্ন ও অসহায়বোধ করছিলাম, হাঁপিয়ে উঠেছিলাম ভেতরে ভেতরে; কবি শামীম রেজার সঙ্গ এরকম সংকটের দিনে রীতিমতো শুশ্রূষার মতই, তাই শেষ পর্যন্ত হ্যাঁ জয়যুক্ত হলো, হ্যাঁ জয়যুক্ত হলো।
নিউইয়র্কে গেলাম। আমার আগেই তিনি পৌঁছে গেছেন পরিবার সমেত। আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে কবি এয়ারপোর্টে আসলেন। সেই একই আদি অকৃত্রিম হাসিমাখা মুখ, একইভাবে আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে ব্রাসেলেস এয়ারপোর্টে এসেছিলেন, মনে পড়ে, পাক্কা এক বছর আগে। জগতে কিছু বন্ধুরা জন্মেছে অন্যদের জীবনকে সহজ ও আনন্দময় করে তুলতে! দিকে দিকে তারা এক অভ্যর্থনার উৎসব সাজিয়ে রাখে—নিজের শশব্যস্ত সৃজনশীল জীবনের পরও—শামীম রেজা এই বিরল মানুষদের একজন! তিনি আমাকে বন্ধু হিসাবে মেনে নিয়েছেন এটা পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেওয়ার মতো গৌরবের ঘটনা বলে আমি মানি।
নিউইয়র্কের পথে পথে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি, সেন্ট্রাল পার্ক, টাইম স্কয়ার, ব্রুকলিন, ম্যানহাটন অথবা কানেক্টিকাট অঙ্গরাজ্যে কবি সিজান মাহমুদের বাড়িতে যাওয়া-আসা অথবা ইথিকাতে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে আমরা কিছুদিন ও কিছু রাত্রি একসঙ্গেই কাটিয়েছি! কত কত কথা বা কথার গভীরে, প্রসঙ্গ ও প্রসঙ্গের গভীরে ঢুকে পড়েছি নানা ছুতোয়। কিন্তু তাঁকে কখনো এক নিমিষের জন্যে শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের বাইরে বা সাহিত্য-চলচ্চিত্র নিয়ে আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া দেওয়া ছাড়া একটিবারও প্রসঙ্গচ্যুত হতে দেখিনি। প্রতিনিয়ত এমন আচ্ছন্নতা, এত নিরবচ্ছিন্ন শিল্পোন্মাদনা বহন করে বেড়ানো মানুষ আমি ইতঃপূর্বে দ্বিতীয় আরেকজন দেখিনি।
শিকাগোতে যাবো বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা করতে। ভেতর থেকে সায় পাচ্ছিলাম না। কিন্তু শামীম রেজা যা তিনি করবেন না এব্যাপারে যেমন প্রায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যা তিনি করবেন এই ব্যাপারেও আক্ষরিক অর্থেই আসক্ত ও ঘোরগ্রস্ত থাকেন বলে আমার ধারণা। শেষমেষ ভোরবেলা আমরা শিকাগো যাবার প্লেনে উঠলাম। দুপুরে অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তীর বাসায় পৌঁছালাম। কিছুক্ষণ পরেই দীপেশদা আমাদের নিয়ে বের হলেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই একটা জাপানিজ রেস্টুরেন্টে নিয়ে লাঞ্চ করালেন। লাঞ্চ সেরে আবারো তাঁর বাসায় এসেছি, ততক্ষণে দীপেশ দা'র স্ত্রী বিশিষ্ট ফিল্মতাত্ত্বিক অধ্যাপক রচনা মজুমদার বাসায় ফিরেছেন। আমার সাথে এই স্বনামধন্য তাত্ত্বিক-দম্পতির পরিচয় এই প্রথম। আড্ডা আলাপ শেষে আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম। পরেরদিন শিকাগো আর্ট সেন্টার—স্বামী বিবেকানন্দ যেখানে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচ-কানাচ ঘুরে আমরা নিউইয়র্ক ফিরলাম। কিন্তু বিস্ময় মানি—শামীম রেজা, মাঝে মাঝে যাকে মূর্তিমান আতঙ্ক বলেও মনে হয়েছে, এক মুহূর্তের জন্যেও শিল্প সাহিত্য দর্শনের বাইরে অন্য কোনো প্রসঙ্গে ঢুকতে চাইলেন না। মাঝে মাঝে আমি জোর করে নারী নিয়ে কথা তুলেছি, স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে খানিকটা প্রশ্রয় দিয়েছেন বটে কিন্তু খানাখন্দে ঘুরে ঘুরে নিজেকে যে নিঃশেষ করে ফেলছি এই সতর্কবার্তা কয়েক লক্ষবারের মতো তখনো আওড়েছেন। এসব গল্প আরো রসিয়ে বসিয়ে আরো সময় নিয়ে পাড়তে হবে অন্য আরেকদিন। আমার গল্পের বই বের করার কড়া তাগিদ শুরু হলো হোটেলে বসে বসেই। যেইনা বলা ওমনিই কাজের শুরু। তৎক্ষণাৎই আমাদের বন্ধু কবি মোস্তাক আহমাদ দীনকে ফোন করে নব্বই দশকে বিভিন্ন লিটলম্যাগে প্রকাশিত আমার গল্পগুলো সংগ্রহ করে রাখার দায়িত্ব দিলেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পার্কের মতো একটা জায়গায় বসে দুজনেই নিজেদের দুটো কবিতা পাঠ করলাম। কবিতাপাঠ বা কবিতা শোনায় তাঁকে একবারের জন্যেও ক্লান্ত হতে দেখিনি—এক আশ্চর্য প্রাণশক্তি ভেতরে বাহিরে।
এবারের নিউইয়র্ক ভ্রমণ পূর্ণতা পেলো বিশ্ববরেণ্য তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের সঙ্গে আড্ডার মধ্য দিয়ে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাফে লুক্সেমবার্গে গায়ত্রীদি আমাদের লাঞ্চ করাবেন—এতটুকু জোগাড়যন্ত্র শামীম রেজা আগেই করে রেখেছিলেন। আমরা দুজনেই উঠতি যৌবনেই গায়ত্রী চক্রবর্তীর দেরিদাপাঠ, সাবল্টার্নতত্ত্ব, জরুরি সব উত্তর-কাঠামোবাদী কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। কাফে লুক্সেমবার্গে গায়ত্রীদিও বোধকরি আমাদের সঙ্গ উপভোগ করেছিলেন। পাক্কা আড়াই ঘণ্টার মতো বসেছিলেন আর জগতের হেন বিষয় নেই যা নিয়ে আমরা কথা বলিনি। ফেরার সময় কাফে লুক্সেমবার্গের বাইরে দাঁড়িয়ে যখন গায়ত্রীদি'র ট্যাক্সির জন্যে অপেক্ষা করছিলাম, সহসাই তিনি, কবি বিনয় মজুমদারের সেই 'চাকা' শামীম রেজার হাত ধরে বললেন, কম্পারেটিভ লিটারেচার অ্যান্ড ডেমোক্রেসির সঙ্গে আমি নানাভাবে জড়িয়ে আছি, জানো তো? আজকের বিশ্বে এই বিষয়খানা খুব দামিই নয়, জরুরিও। নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করো। আমার বিশ্বাস আছে তোমার উপর। ছড়িয়ে দাও! আমার আশীর্বাদ থাকলো তোমাদের সকলের জন্যে।
ফেরার পথে মনে হলো শৈশবে, কোনো এক কুক্ষণে যে এই শিল্প-সাহিত্য প্রেমে ঘোরগ্রস্ত হয়ে উঠেছিলাম। পৃথিবীর পথে পথে কত বিচিত্র মানুষের সঙ্গে যে সংযোগ তৈরি হয়েছে শুধু এই সাহিত্য শিল্প ইত্যাদিকে উপলক্ষ্য করে—তার শেষ তো নেই। কৈশোরে পড়া এই ডাকসাইটে তাত্ত্বিকের সঙ্গে দেখা হলো ভারতবর্ষে নয়, রীতিমতো এক শশব্যস্ত নগর নিউইয়র্কের প্রায় কেন্দ্রস্থলে বসে! এমনই এক রহস্যময় পথে স্বেচ্ছায় নেমে পড়েছি, একবার পা বাড়ালে পরেই ফেরার দরজা বন্ধ হয়ে যায়! এই প্রায় নিঃসঙ্গ পথের কোনো গন্তব্য নেই, ফেরা নেই—পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর ক্লেদ বা আনন্দ-বেদনাটুকুই এর সব! বাসায় ফেরার পথে দেখি শামীম রেজা আরো আচ্ছন্ন এক শিশুতে পরিণত হয়েছেন! এই শিশুসত্ত্বাই বোধকরি সকলের অলক্ষ্যে তৈরি করে নেয় শিল্পীর নিজের অন্তর্দৃষ্টি! এই অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে বরং কথা হবে অন্য আরেকদিন অন্য কোনো কাফেতে বসে, ট্যানেরিফ বা লিসবনের কোনো বারে শিল্পী শামীম রেজার সঙ্গে বসেই।








