প্রিমো লেভির মৃত্যু নিয়ে রহস্য

ফজল হাসান
ফজল হাসান
২০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০১আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০১

ইতালির অন্যতম লেখক প্রিমো লেভি ছিলেন ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক এবং কবি। তবে কর্মজীবনে তিনি ছিলেন রসায়নবিদ। আউশভিৎস বন্দি শিবির (হলোকাস্ট কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প) থেকে বেঁচে ফিরে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন, যা ইতালিয়ান ভাষায় ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি ১৯৫৯ সালে ইংরেজিতে অনূদিত (ইফ দিস ইজ অ্যা ম্যান) হয়ে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের সাহিত্যাঙ্গনে এবং তিনি আউশভিৎস বন্দি শিবিরের মুখ্য বিবরণ দাতা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি বন্দি শিবিরের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং ভয়ঙ্কর সময়কে তুলে ধরেছেন। এছাড়া তিনি হলোকাস্ট সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। উল্লেখ্য, তাঁকে ‘হলোকাস্ট লেখক’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়, যা তিনি পছন্দ করতেন না।

জানা যায়, আউশভিৎস বন্দি শিবির থেকে মুক্তির অনেক বছর পরও প্রিমো লেভি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ও বিপর্যস্ত ছিলেন। তিনি ১১ এপ্রিল ১৯৮৭ সালে তুরিন শহরে নিজের তিন তলা অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যান। সরকারি মতে তাঁর আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ছিল আত্মহত্যা, অন্যদিকে তাঁর কাছের মানুষেরা মনে করেন নিছক দুর্ঘটনা। তাই প্রায় চল্লিশ বছর পরে তাঁর মৃত্যুর রহস্য আজও রহস্যের বেড়াজালে আটকা পড়ে আছে।

‘প্রিমো লেভি: মৃত্যু নিয়ে রহস্যের ধোঁয়াশা’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো তাঁর মৃত্যু নিয়ে রহস্যের ধোঁয়াশা—পরিকল্পিত আত্মহত্যা, নাকি দৈবাৎ দুর্ঘটনা, এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ (বিশেষ করে মৃত্যুর আগে তাঁর মানসিক ও শারীরিক অবস্থা) নিয়ে আলোচনা করা। এছাড়া কবে, কোথায় ও কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, মৃত্যুর পরে ঘনিষ্ঠদের অনুভূতি ও মন্তব্য, এবং উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসবের আগে প্রিমো লেভির জীবন এবং সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি রয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমান লেখায় লেখকের সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়নি, কিন্তু প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখযোগ্য রচনার কথা এসেছে।

প্রিমো লেভি (পুরো নাম প্রিমো মিচেল লেভি) ১৯১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি ইতালির তুরিন শহরের এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর জীবন কেটেছে। ইতালিতে মুসোলোনির সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত অ্যান্টিসেমিটিজম আইন সত্ত্বেও তিনি ১৯৪১ সালে তুরিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালে যখন জার্মান সৈনিকেরা ইতালির উওরাঞ্চল আক্রমণ করেছিল, তখন লেভি ফ্যাসিবাদবিরোধী দলে যোগ দেওয়ার জন্য পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ধরা পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে দক্ষিণ পোল্যান্ডের আউশভিৎস বন্দি শিবিরে নির্বাসিত করা হয়। সেখানে বন্দি থাকার আট মাস পরে রসায়নবিদ হিসাবে তাঁর দক্ষতা কার্যকর প্রমাণিত হয় এবং তাঁকে আউশভিৎছের নিকটবর্তী একটি সিন্থেটিক রাবার কারখানায় ক্রীতদাস শ্রমিক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। অবশেষে ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত লাল ফৌজদের (রেড আর্মি) হাতে আউশভিৎস বন্দি শিবির মুক্ত হওয়ার পর তিনি তুরিন শহরে ফিরে আসেন। উল্লেখ্য, আউশভিৎস বন্দি শিবিরে আটক সাড়ে ছয় শ’ ইতালীয় ইহুদিদের মধ্যে মাত্র কুড়িজন সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ছিলেন এবং প্রিমো লেভি ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত তুরিনের একটি কেমিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রিমো লেভি তাঁর আউশভিৎস বন্দি শিবিরের অভিজ্ঞতা এবং সেখান থেকে বেলারুশ হয়ে তুরিন শহরে ফিরে আসার কাহিনি লেখা শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর দু’টি ক্লাসিক আত্মজীবনী বা স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে রূপ নেয়: Se questo è un uomo (প্রকাশিত: ১৯৪৭) এবং La tregua (প্রকাশিত: ১৯৬৩)। ইংরেজিতে অনূদিত গ্রন্থ দু’টির শিরোনাম যথাক্রমে ইফ দিস ইজ অ্যা ম্যান এবং দ্য ট্রুস,  যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়েছিল সারভাইভাল ইন আউশভিৎস এবং দ্য রিএওয়েকেনিং নামে। উল্লেখ্য, ইফ দিস ইজ অ্যা ম্যান গ্রন্থটি বিশ্বের অনেক দেশে অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ক্লাসিক গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। অন্যদিকে দ্য ট্রুস গ্রন্থটি প্রথম বার্ষিক ‘প্রিমিও ক্যাম্পিয়েলো লিটারারি প্রাইজ’ লাভ করে। গ্রন্থটি ইতালির স্কুলে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে পড়ানো হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে প্রিমো লেভি অল্পসংখ্যক কবিতা রচনা করেছিলেন। সেসব কবিতার বিষয়বস্তু ছিল যুদ্ধ এবং ক্ষয়-ক্ষতি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ ও প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত বিস্তৃত। ইংরেজিতে অনূদিত কাব্যগ্রন্থ কালেক্টেড পোয়েমস: প্রিমো লেভি (প্রকাশিত: ১৯৮৮)। এই গ্রন্থে পূর্বে প্রকাশিত ইতালীয় ভাষায় দু’টি কাব্য গ্রন্থের কবিতা এবং ১৮টি অপ্রকাশিত কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া প্রিমো লেভি আরও দু’টি প্রশংসিত আত্মজীবনীমূলক বই লিখেছেন, মোমেন্টস অব রিপ্রাইভ এবং দ্য পিরিয়ডিক টেবিলমোমেন্টস অব রিপ্রাইভ গ্রন্থে তিনি তাঁর আউশভিৎস বন্দি শিবিরে থাকার সময় যেসব বন্দিদের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন এবং খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের নিয়ে লিখেছেন। অন্যদিকে দ্য পিরিয়ডিক টেবিল গ্রন্থটি মূলত তাঁর জীবনের ছোট ছোট অংশ নিয়ে রচিত গল্পের সংকলন এবং তাতে দু’টি কাল্পনিক ছোটগল্পও রয়েছে, যা তিনি গ্রেফতার হওয়ার আগে রচনা করেছিলেন। এসব লেখা কোনো না কোনোভাবে একটি রাসায়নিক মৌল পদার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশন গ্রন্থটিকে ‘সবচেয়ে ভালোভাবে লিখিত বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ’ হিসাবে ভোট দিয়েছিল।

প্রিমো লেভির শেষ দিকের সাহিত্য রচনার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হলোকাস্টের উপর লেখা তাঁর শেষ বই দ্য ড্রাউন্ড অ্যান্ড দ্য সেভড, যেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে, জার্মান জাতিকে ঘৃণা করেননি এবং তাদের ক্ষমাও করেননি। নিজের কাজ এবং সহকর্মীদের নিয়ে তাঁর সবচেয়ে পরিচিত ছোটগল্প সংকলন দ্য মাংকি’স রেঞ্চ, যা ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর সবচেয়ে মনের মতো গ্রন্থ দ্য রেঞ্চ এবং এই গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে ইতালির সম্মানিত স্ট্রেগা প্রাইজ জিতেছিলেন।

প্রিমো লেভির একমাত্র উপন্যাস ইফ নট নাউ, হোয়েন? প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। এ উপন্যাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর পেছনে থাকা রাশিয়ান ইহুদি পৃষ্ঠপোষকদের ভাগ্য অনুসন্ধান করেছেন, যারা দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিল এবং ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিল। এছাড়া রয়েছে তাঁর সম্পূর্ণ রচনা-সংগ্রহের ইংরেজি অনুবাদ দ্য কমপ্লিট ওয়ার্কস্ অব প্রিমো লেভি (২০১৫) সংকলন। এ সংকলনে এমন রচনাও রয়েছে, যা আগে কখনো ইংরেজিভাষী পাঠকের জন্য অনূদিত হয়নি।

অবশেষে নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রিমো লেভির সাহিত্যকর্ম কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়, বরং মানবতার প্রতি ন্যায়বিচার ও ইতিহাসের স্মরণীয়তা রক্ষার প্রচেষ্টা হিসাবে অমর হয়ে থাকবে।

প্রিমো লেভি ১১ এপ্রিল ১৯৮৭ সালে তুরিন শহরের নিজের তিন তলার অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে তুরিন শহরের মনুমেন্টাল কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

সেদিন ছিল শনিবার, ১৯৮৭ সালের ১১ এপ্রিল।

সকাল ১০টার অল্প সময় পরেই ইতালির তুরিন শহরের ৭৫ কর্সো রে উমবার্তো ঠিকানায় অবস্থিত উনিশ শতকের শেষভাগের কোনো এক সময়ে নির্মিত একটি ভবনের তৃতীয় তলায় গেটের দারোয়ান, ইওলান্ডা গ্যাসপেরি, লেভির অ্যাপার্টমেন্টের দরজার কলিংবেল বাজিয়েছিল।

কলিংবেলের শব্দ শুনে প্রিমো লেভি দরজা খোলেন এবং ইওলান্ডার কাছ থেকে তাঁর চিঠিপত্র, সংবাদপত্র এবং কয়েকটি বিজ্ঞাপন পুস্তিকা সংগ্রহ করেন, ঠিক যেমন তিনি প্রতিদিন করতেন। পরে ইওলান্ডার ভাষ্য মতে জানা যায়, তখন লেভির পরনে ছিল খাটো-আস্তিনের শার্ট এবং তাঁকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, কিন্তু তাঁর সেই পরিস্থিতি কোনোভাবেই অস্বাভাবিক ছিল না। তিনি ইওলান্ডার হাত থেকে সবকিছু নিয়ে ধন্যবাদ জানান এবং অবশেষে দরজা বন্ধ করেন। ইওলান্ডা পায়ে হেঁটে ঘূর্ণায়মান প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকে। গোলাকৃতি প্যাঁচানো সিঁড়ির মাঝখানে একটি খাঁচাবদ্ধ লিফট ছিল। ইওলান্ডা তখনো নিচের তলায় তার নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছায়নি, সেই সময় সিঁড়িঘরে বেশ জোরে কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পেল সে। তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে দেখে প্রিমো লেভির দেহ লিফটের পাশে নিচের সিঁড়ির তলায় পড়ে আছে।

সেই সময় লুসিয়া মোরপুরগো, প্রিমো লেভির চল্লিশ বছরের স্ত্রী, বাজার থেকে ফিরছিলেন। তাঁর দু’হাতে সওদাপাতির ব্যাগ ছিল এবং তা নিয়েই কাচের দরজা খুলতে যাচ্ছিলেন। দারোয়ান তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তিনি তাঁর স্বামীর অসাড় দেহের পাশে রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং রক্তাক্ত মাথা তোলার চেষ্টা করেন। তাঁদের ছেলে, রেঞ্জো, গোলমাল শুনে দ্রুত প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন দন্তচিকিৎসক ফ্রান্সেসকো কুয়ালিয়া। তিনি হাই স্কুল থেকে প্রিমো লেভির পরিচিত ছিলেন এবং একই ভবনে তাঁর অফিস ছিল। লেভির স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘তিনি মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলেন। আপনি তা জানতেন, তাই না?” 

প্রিমো লেভির মৃতদেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, তিনি মাথায় গূঢ়তর আঘাত পেয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে মারা গিয়েছেন। ঘটনার প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যে, দুপুর বারোটায়, রোমের রেডিও প্রিমো লেভির মৃত্যুর খবর আত্মঘাতী হিসাবে ঘোষণা করে। পরে পুলিশ তদন্ত কেবল রেডিওর প্রচারিত খবরকে সরকারিভাবে নিশ্চিত করেছে।

প্রিমো লেভির আত্মহত্যার সরকারি সনদপত্র

প্রিমো লেভির অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর খবর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কারণ ইতালি ও বহির্বিশ্বে অবস্থিত তাঁর অনেক অনুরাগী এবং পাঠকদের জন্য প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা হিসাবে এসেছিল। যাহোক, প্রিমো লেভির মৃত্যু পরবর্তী সময়ে কয়েকজন বিশিষ্ট ও ঘনিষ্ঠ মানুষের অনুভূতি এবং মন্তব্য তুলে ধরা হলো।

  • প্রিমো লেভির কাছের এক বন্ধু, নরবের্তো বোব্বিও, যিনি একাধারে ইতালীয় দার্শনিক, রাজনৈতিক কর্মী, লেখক এবং অধ্যাপক, মৃত্যুর সংবাদ শুনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মারা যাওয়া দিন পর্যন্ত আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, তিনি (লেভি) ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় মানুষ।’
  • ইতালিয়ান ইহুদি নারী লেখক নাতালিয়া গিন্সবার্গ লিখেছিলেন, ‘তিনি অবশ্যই আউশভিৎস বন্দি শিবিরের ভয়ঙ্কর স্মৃতি নিয়ে এত দিন বেঁচে ছিলেন: এমন এক ক্ষত, যা তিনি সবসময় সাহসিকতার সঙ্গে বহন করেছেন, অথচ তা তাঁর জীবনকে নরকে পরিণত করতে পারত। আমি মনে করি, বন্দি শিবিরের সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।’
  • প্রিমো লেভির আরেক বন্ধু এবং বিশিষ্ট লেখক ফেরদিনান্দো কামোন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এই আত্মহত্যা অবশ্যই ১৯৪৫ সালের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘটনাটি তখন ঘটেনি, কারণ প্রিমো চেয়েছিলেন আউশভিৎস বন্দি শিবিরের অভিজ্ঞতা লিখতে। এখন তিনি তাঁর কাজ সম্পন্ন করেছেন (দ্য ড্রাউন্ড অ্যান্ড দ্য সেভড ছিল তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা শেষ গ্রন্থ)। তাই তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন এবং তাই করেছেন।’
  • প্রিমো লেভির মৃত্যু সম্পর্কিত সবচেয়ে স্পর্শকাতর মন্তব্যটি তাঁর ছেলে রেঞ্জোর কাছ থেকে এসেছে। সে বলেছে, ‘এখন সবাই বোঝার, উপলব্ধি করার, এমনকি অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছে। আমি মনে করি আমার বাবা ইতোমধ্যেই তাঁর জীবনের শেষ অংশটুকু লিখে ফেলেছেন। আপনারা তাঁর দ্য ট্রুস বইয়ের সমাপ্তি পড়ুন এবং সহজেই বুঝতে পারবেন।’

আউশভিৎস বন্দি শিবিরের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা প্রিমো লেভির আত্মহত্যার জন্য দায়ী ছিল—এমন ধারণা শুধু ইতালি কিংবা ঘটনার সরাসরি পরবর্তী সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ছড়িয়ে পড়েছিল অন্য দেশে এবং সময়ে। যেমন:

  • ফেরদিনান্দো কামোনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে রুমানিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন ইহুদি লেখক এলিয়ে ভিয়েজেল বলেছিলেন, ‘প্রিমো লেভি আউশভিৎস বন্দি জীবনের চল্লিশ বছর পরে মারা গেলেন।’
  • প্রিমো লেভির মৃত্যুর চার বছর পরে আউশভিৎস আন্তর্জাতিক কমিটির সভাপতি মরিস গোল্ডস্টাইন লিখেছিলেন: ‘আউশভিৎস তাঁকে ফেরত নিয়েছে।’

প্রিমো লেভির মৃত্যুর পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত এবং মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।  প্রিমো লেভির মৃত্যু কী পরিকল্পিত আত্মহনন, নাকি দৈবাৎ দুর্ঘটনা?

যদিও পরিবারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সমালোচকরা যুক্তি দিয়েছেন যে, প্রিমো লেভির তিন তলা অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়া ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত হতে পারে, তবে তাঁর বেশিরভাগ জীবনী লেখক এবং ময়নাতদন্তকারী দলের কর্মকর্তার একমত হয়েছিলেন যে, প্রিমো লেভি আত্মহত্যা করেছিলেন।

যাহোক, প্রিমো লেভি মৃত্যু নিয়ে দু’টি আলাদা মতবাদ—আত্মহত্যার পক্ষে এবং বিপক্ষে, অর্থাৎ দুর্ঘটনার পক্ষে, আলোচনা করা হলো।

প্রিমো লেভির মৃত্যুর ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, লেভির মৃত্যু কেবল আত্মহত্যা হতে পারে।। তার কারণ হলো স্বাভাবিক অবস্থায় সেই অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে ‘রেলিংয়ের উপর থেকে পড়ে যাওয়া’ কারোর পক্ষে সম্ভব না। তাই পরবর্তীতে মৃত্যু সংক্রান্ত সমস্ত প্রমাণ শুনে তুরিন আইন আদালতও একমত হয়েছে এবং আত্মহত্যার পক্ষে রায় দিয়েছে।

প্রিমো লেভির চারজন জীবনী লেখক—মিরিয়াম আনিসিমোভ, ইয়ান থমসন, ক্যারোল অ্যাঞ্জিয়ার্স এবং বেরেল ল্যাং—যারা লেভির জীবনের উপর প্রচুর কাজ করেছেন, যারা লেভিকে খুবই কাছ থেকে দেখেছেন, ভালো করে চিনতেন ও জানতেন এবং তাদের অনেকেই লেভির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন—সকলেই পুলিশের সিদ্ধান্ত ও আদালতের রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে যে, আসলেই প্রিমো লেভি আত্মহত্যা করেছেন। 

বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায় যে, আত্মহত্যার পক্ষে বেশ কয়েকটি যুক্তি রয়েছে। কারোর কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রিমো লেভি জীবনের শেষ পর্যায়ে হতাশায় ভুগছিলেন। রবার্ট ওয়েইল, যিনি প্রিমো লেভির সম্পূর্ণ রচনা-সংগ্রহের ইংরেজি অনুবাদ দ্য কমপ্লিট ওয়ার্কস্ অব প্রিমো লেভি সংকলনের সম্পাদক ছিলেন, লেভির নিজের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে মর্মস্পর্শী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন: 

লেভির মৃত্যুর দু’দিন আগে, অর্থাৎ ১৯৮৭ সালের ৯ এপ্রিল, অ্য্যালভিন রোসেনফেল্ড (মার্কিন অধ্যাপক এবং হলোকাস্ট এবং নতুন অ্যান্টিসেমিটিজম বিষয়ে পণ্ডিত) তাঁর বন্ধুর (অর্থাৎ প্রিমো লেভি) কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছিলেন, যাতে লেভি লিখেছিলেন, ‘আমি এক কঠিন অবসাদে ভুগছি এবং আমি তা থেকে পালানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনো সুফল পাচ্ছি না। . . . এত সংক্ষিপ্ত আকারে লেখার জন্য দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন; কেবল একটি চিঠি লেখাও আমার জন্য খুবই কঠিন কাজ, কিন্তু সুস্থ হওয়ার ইচ্ছা শক্তিশালী। . . . চলুন, দেখি আগামী মাসগুলো আমাদের সকলের জন্য কী নিয়ে আসে, কিন্তু আমার বর্তমান অবস্থা এতই নাজুক যে, আমি আগে কখনোই এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করিনি, এমনকি আউশভিৎস বন্দি জীবনের ভয়ঙ্কর সময়েও না।’

যাহোক, প্রিমো লেভির হতাশার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে ছিল তাঁর বৃদ্ধ মাতা এবং শাশুড়িকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব (তাঁরা তাঁর সঙ্গে বসবাস করতেন) এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাতের স্মৃতি। রোমের প্রধান ইহুদি ধর্মযাজক এলিও তোয়াফের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, দুর্ঘটনার দশ মিনিট আগে লেভি প্রথমবারের মতো তাঁকে ফোন করেছিলেন এবং বলেছিলেন, তিনি নিজের ক্যান্সারে আক্রান্ত মাকে দেখার সময় আউশভিৎস বন্দি শিবিরের বেঞ্চে বসে থাকা অসহায় এবং আতঙ্কিত মানুষের মুখগুলো মনে পড়ত এবং সেই স্মৃতি ভুলে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এছাড়া ১৯৫৯ সালের প্রিমো লেভি তাঁর জার্মান অনুবাদক হাইনজ রেইডটকে লিখেছিলেন, যে ‘আত্মহনন হলো ইচ্ছার কাজ, একটি স্বাধীন সিদ্ধান্ত।’ জানা যায়, ১৯৮১ সালে যখন লেভির জার্মান শিক্ষক, হান্স এঙ্গার্ট, গলায় দড়ি ঝুলিয়ে আত্মহনন করেন, তখন লেভিকে একটি আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে, হান্স এঙ্গার্টের মৃত্যু ছিল হত্যা। কিন্তু প্রমাণ এতই জোরালো ছিল যে, পরে লেভি অস্বীকার করেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘হান্স নিজের প্রাণ নিয়েছেন। আত্মহনন হলো এক ধরনের অধিকার, যা আমাদের সবারই আছে।’

অন্যদিকে অনেকেই প্রিমো লেভির মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে অভিহিত করাকে অযৌক্তিক মনে করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে অবস্থিত ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক তত্ত্বের অধ্যাপক দিয়েগো গাম্বেত্তা অন্যতম। তিনি তাঁর তত্ত্বের (থিয়োরি) পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি তুরিন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রিমো লেভির মৃত্যুর নথিপত্র (ফাইল) দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। নয়-পৃষ্ঠার সেই দলিলে ছিল পুলিশ রিপোর্ট, প্যাথলজিস্টের রিপোর্ট এবং লেভির অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ান ও লেভির মায়ের নার্সের সাক্ষ্য। সেই ফাইলে কোনো আত্মহত্যার চিরকুট (সুইসাইড নোট) ছিল না। এছাড়া পুলিশ রিপোর্টে কোনো ধরনের অপরাধমূলক হস্তক্ষেপের কথা নাকচ করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

তুরিন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন এবং সাক্ষ্য অনুযায়ী অধ্যাপক দিয়েগো গাম্বেত্তা উল্লেখ করেন যে, সেই সময়ে, অর্থাৎ মৃত্যুর আগে, প্রিমো লেভির স্বল্পকালীন এবং দীর্ঘমেয়াদি একাধিক পরিকল্পনা ছিল। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে, তিনি তাঁর চিকিৎসকের কাছে অভিযোগ করেছিলেন মাথা ঘোরা এবং তন্দ্রালু হওয়ার বিষয়ে, যা তিনি প্রায় তিন সপ্তাহ আগে প্রোস্টেট অপারেশনের কারণে অনুভব করেছিলেন। অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স পরিদর্শন করার পর অধ্যাপক গাম্বেত্তা বলেছিলেন যে, লেভি তাঁর ভারসাম্য হারিয়েছিলেন এবং দুর্ঘটনাবশত তিন তলার সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে অধ্যাপক গাম্বেত্তা নিশ্চিত হতে পারেননি যে, প্রিমো লেভি অসতর্ক মুহূর্তে হঠাৎ পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

প্রিমো লেভির দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর কারণ হিসাবে অধ্যাপক গাম্বেত্তা একাধিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি পরের সোমবারের জন্য এক সাক্ষাৎকার নির্ধারণ করেছিলেন, একটি প্রকাশনা সংস্থার সভাপতির পদ নিয়ে ভাবনা-চিন্তায় মগ্ন ছিলেন, কয়েকদিন আগে প্রকাশের জন্য একটি উপন্যাস জমা দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর দিন সকালে তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-সহ একটি চিঠি পোস্ট করেছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডের কথা বিবেচনা করলে আর যা-ই বোঝা যাক না কেন, অবশ্যই আত্মহত্যা বোঝা যায় না।

এছাড়া প্রিমো লেভির নিকটস্থ চিন্তাশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অনেকে প্রথমে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুকে আত্মহত্যা মনে করেছিলেন, কিন্তু পরে তাঁরা পুরো ঘটনা পুনর্বিবেচনা করেন। তাঁদের মধ্যে আছেন লেভির হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডেভিড মেন্ডেল, তাঁর আজীবন বন্ধু নোবেল বিজয়ী রিতা লেভি মোন্তালচিনি (১৯৮৬ সালে ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীনি) এবং ফেরদিনান্দো কামোন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি বাহিনীর বন্দি শিবিরে নৃশংস গণহত্যা, জঘন্য ইতিহাস ও মানবিকতার বোধকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রিমো লেভি ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এছাড়া তাঁর উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) ইতালীয় সাহিত্য এবং সমাজের উপর গভীর প্রভাবের এক উজ্জ্বল প্রমাণ। বিতর্কিত এবং অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পরে তাঁর জীবন ও সাহিত্য কর্ম বিভিন্ন বিষয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ ও অধ্যয়ন করা হয়, যেমন সাহিত্য, জীবনবৃত্তান্ত, ইতিহাস, ধর্মতাত্ত্বিক, দর্শন এবং নৃবিজ্ঞান। 

প্রিমো লেভির আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, বিশেষ করে ইফ দিস ইজ অ্যা ম্যান, অনেক দেশের অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং নাটক ও চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন শিল্প রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর লেখনী পাঠকদের অনুপ্রাণিত ও শিক্ষিত করে তোলার জন্য অব্যাহত রেখেছে এবং গণহত্যা ও তার পরবর্তী সময় সম্পর্কে অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার ও আলোকিত চিন্তাধারার সঙ্গে তাঁর সমালোচনামূলক যুক্তি এবং হলোকাস্টের পরে মানুষের অবস্থার অনুসন্ধানের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। হলোকাস্ট সাহিত্য এবং মানব মর্যাদা ও আশা প্রচারের ক্ষেত্রে লেভির অবদান সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণে অমোছনীয় চিহ্ন রেখে গেছে।

প্রিমো লেভির সাহিত্য সম্পর্কে অনেকেই ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং অনেক লেখক অনুপ্রাণিত হয়েছেন। পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন কথাসাহিত্যিক ফিলিপ রথ প্রিমো লেভিকে এমন একজন লেখক হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যিনি নাৎসি জার্মান সৈন্যবাহিনীর অমানবিক অত্যাচার ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের নিজের চোখে দেখেছেন এবং পরে তাঁর সেই অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি সাহিত্যে প্রকাশ করে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ব্রিটিশ লেখক মার্টিন অ্যামিস তাঁর নিজের উপন্যাস দ্য জোন অফ ইন্টারেস্ট লেখায় সহায়ক হিসাবে প্রিমো লেভির সাহিত্যকে স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার চাক্ষুষ দর্শনার্থী এবং এ বিষয়ে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত লেখক।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় শিল্প-সংস্কৃতিতে প্রিমো লেভির সাহিত্যকর্মের বিশেষ অংশ কিংবা স্মৃতির শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর নাম বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো।

  • ব্রিটিশ-মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেন্সের বই দ্য পোর্টেবল অ্যাথিয়েষ্ট গ্রন্থটি প্রিমো লেভির স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত এবং উৎসর্গীকৃত উক্তিটি নেওয়া হয়েছে লেভির দ্য ড্রাউন্ড অ্যান্ড দ্য সেইভড গ্রন্থ থেকে।
  • ওয়েলশ রক ব্যান্ড ‘ম্যানিক স্ট্রিট প্রিচারস্’-এর ‘গোল্ড অ্যাগেইনষ্ট দ্য সৌল’ অ্যালবামের কভারে প্রিমো লেভির সং অব দৌজ হু ডাইড ইন ভেইন কবিতার অংশ।
  • রুয়ান্ডার হত্যাযজ্ঞের বেঁচে থাকা কেট অ্যাশবি তাঁর আত্মহত্যার প্রচেষ্টা এবং বেঁচে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করার সময় থেরাপিস্টকে বলেছেন, তিনি প্রিমো লেভির বইটি পড়েছেন, যা লেভি তাকে পড়ার জন্য দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, আমি যদি আত্মহত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই, তাহলে ‘আমি যেন তাঁর বই থেকে একটি পাতা ছিঁড়ে নিয়ে সরাসরি জানালা দিয়ে লাফ দেই।’
  • ইংরেজ গায়ক, গীতিকার, সঙ্গীতজ্ঞ এবং গানের রেকর্ড প্রযোজক পিটার হ্যামিলের ‘দ্য নয়েজ’ অ্যালবামের শেষ ট্র্যাকের নাম ‘প্রিমো অন দ্য প্যারাপেট’, যার মাধ্যমে তিনি প্রিমো লেভির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
  • মার্কিন যাদুকর ও স্টান্ট ডেভিড ব্লেইন প্রিমো লেভির আউশভিৎস বন্দি শিবিরে কয়েদি নম্বর (১৭৪৫১৭) নিজের বাম কনুইতে উল্কি (ট্যাটু) করিয়েছেন।

মৃত্যুর পরে প্রিমো লেভিকে বিভিন্ন ভাবে সম্মানিত করা হয়েছে, যেমন প্যারিসে ও নিউ ইয়র্কে আলাদাভাবে নির্মিত হয়েছে ‘প্রিমো লেভি সেন্টার’, যেখানে জার্মান সৈন্যদের অমানবিক অত্যাচারে বেঁচে যাওয়া মানুষদের পরিষেবা দেওয়া হয় এবং ইতালীয় ইহুদিদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন করার ব্যবস্থা আছে। এছাড়া তাঁর সাহিত্যকর্ম রক্ষা এবং প্রচার করার জন্য তুরিন শহরে স্থাপন করা হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রিমো লেভি স্টাডিজ সেন্টার’।

পরিশেষে বলা যায়, প্রিমো লেভির সাহিত্যকর্ম, বিশেষ করে আউশভিৎস বন্দি শিবিরের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি নিয়ে লেখা বিভিন্ন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, তাঁকে নিঃসন্দেহে অমর করে রাখবে। ইতালীয় সাহিত্যে তাঁর প্রভাব এখনও গুরুত্বপূর্ণ, যা তাঁকে বিশ শতকের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে।

প্রায় চল্লিশ বছর পরেও প্রিমো লেভির মৃত্যু নিয়ে রহস্যের ধোঁয়াশা রয়ে গেছে—পরিকল্পিত আত্মহনন, নাকি অসতর্ক মুহূর্তের দুর্ঘটনা? তবে যেহেতু সরকারিভাবে বলা হয়েছে যে, প্রিমো লেভি আত্মহনন করেছেন, তাই বলা যায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে আত্মহত্যার কারণে।  

যাহোক, প্রিমো আত্মহত্যার মৃত্যুর নেপথ্যে যে কারণই থাকুক না কেন, সরকারিভাবে আত্মহত্যা বলা হলেও তাঁর মৃত্যুর রহস্য আজও অসম্পূর্ণ ও অমীমাংসিত। তাই তাঁর মৃত্যুর পরপরই অনেকে পূর্ণাঙ্গ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু তা কখনই করা হয়নি। হয়তো কোনদিনই জানা যাবে না তাঁর আত্মহত্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল কারণ। এ কথা সত্যি যে, তিনি জীবনের শেষ সময়ে গভীর বিষণ্ণতা এবং নতুন প্রকল্পের জন্য বিরল উৎসাহের পরম মুহূর্তের অপেক্ষায় দোদুল্যমান ছিলেন। তবে তিনি ছিলেন অনেকের মতো একজন স্বাধীন মানুষ। এ প্রসঙ্গে মৃতদেহ দেখে স্ত্রী লুসিয়া মোরপুরগো মন্তব্য করেছিলেন, ‘তিনি যা সবসময় বলতেন, তাই করেছেন।’

সবশেষে বলা যায়, প্রিমো লেভির অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং মর্মান্তিক মৃত্যুর পরিস্থিতি সাহিত্য সমালোচক, ভক্ত এবং জীবনী লেখকদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে আছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করবে। কেননা প্রিমো লেভির জীবন ও কাজের বৈশিষ্ট্য হলো অন্ধকার এবং আশাবাদের এক অপূর্ব মিশ্রণ। বলা যায়, নিঃসন্দেহে তিনি আউশভিৎস বন্দি শিবিরের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং ভয়ঙ্কর সময় নিয়ে লেখা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য অমর হয়ে থাকবেন।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কিছু টিপস মেনে চললেই গরমে ত্বক সুন্দর রাখা যায়
কিছু টিপস মেনে চললেই গরমে ত্বক সুন্দর রাখা যায়
সত্যি কি বাংলাদেশের শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজ করানো হয়
সত্যি কি বাংলাদেশের শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজ করানো হয়
জয়পুরহাটে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারালেন ২ জন
জয়পুরহাটে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারালেন ২ জন
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, জানা যাবে রায়ের তারিখ
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, জানা যাবে রায়ের তারিখ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম