তাকে শিশুসাহিত্যিক বললে ঠিক মন ভরে না, কোনো না কোনোভাবে ছড়াকার শব্দটা উচ্চারণ করতেই হয়, নইলে যে পরিচয় পূর্ণতা পায় না। ‘ভুল’ পরিচয় দেওয়া হচ্ছে কিনা এমন একটা আশঙ্কা মনে খুঁতখুঁতানি সৃষ্টি করে। মৃত্যুর দুইদিন আগে থেকেই ছড়িয়ে পড়া গুজবকে সত্যতা দিতেই হয়তো অবশেষে চলেই গেলেন। কোনো কোনো সেলিব্রিটির অসুস্থতার সময় মৃত্যুর গুজব ছড়ানোটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছিল, এখন মূলধারার গণমাধ্যমও পিছিয়ে থাকছে না। এটা কি কেবল ভিউ বা কাটতির লোভে! নাকি ‘সবার আগে খবর দিই’ এমন বেহুদা মাতব্বরির প্রলোভনে?
আমীরুল ইসলাম ভদ্রলোকদের প্রমিত ভাষায় কথা বলতেন না। পুরান ঢাকার টোনে বাতচিত যেন তাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। অনেককেই কথায় কথায় সম্বোধনসূচক ‘মিয়া’ ডাকতেন। তার মুখে যারা ‘আরে মিয়া’, ‘ওই মিয়া’ শুনতেন হৃদ্যতা ও সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করতেন সহজেই। অবশ্য আমীরুল ইসলাম অজাতশত্রু। তাকে পছন্দ করেন না বলতে গেলে এমন মানুষ বিরল। দেশ-মাতৃকার প্রতি নিবেদিত অবস্থান থেকে তার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন ছিল। এই দর্শন অন্যদের সঙ্গে বড়ো কোনো বিরোধ সৃষ্টি করত না। সহজাত উদারতায় অনেক কিছুই তিনি মেনে নিতেন, মানিয়ে নিতেন। যে তরুণদের তিনি আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন এদের একটা অংশের মুখোশ খুলে স্বরূপে আত্মপ্রকাশে হয়তো ব্যথিত হয়েছেন তিনি। সহজাত উদারতায় সেসব চেপেও গিয়েছেন। কার সঙ্গেইবা বিরোধে জড়াবেন! এসব রূপ-অরূপের অপরূপ খেলাধুলাও তো নতুন নয়।
শীর্ষস্থানীয় লেখক হয়েও তরুণদের সঙ্গে ছিল তার আজন্ম সখ্য। শহরে, শহরতলিতে, মফস্বলে বা গ্রামে যেখানেই যে থাকুক, কারও লেখা ভালো লাগলে আমীরুল ইসলাম কল করে জানাতেন। উৎসাহ দিতেন। নম্বর সংগ্রহ করা হয়তো বড়ো কোনো ব্যাপার ছিল না। বিভাগীয় সম্পাদকদের কাছ থেকে অথবা পরিচিত মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করতেন। এর বাইরেও অনেক শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকারকে নিয়ে লিখেছেন তিনি। ঢাউস আকারের বইয়ে সেগুলো স্থানও পেয়েছে। অগ্রজরা যেখানে অনুজদের লেখকই মনে করেন না, সেখানে আমীরুল ইসলামের স্বপ্রণোদিত মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি বিরল ঘটনা অবশ্যই। তরুণদের জন্য বিশেষ স্মরণীয়।
তার সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল চ্যানেল আই। এই টেলিভিশন চ্যানেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। বড়ো কর্তার পরিচয়ও তাকে জনবিচ্ছিন্ন করেনি, এলিট শ্রেণিতে পৌঁছে দেয়নি। বরাবরই মাটির মানুষ থেকেছেন। পা ছিল ধূলি-বালি-কাদার উপরেই। তাই তো চারপাশে ছিল তরুণ সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মীদের ভিড়। চ্যানেল আই হয়ে উঠেছিল তরুণদের মিলনস্থল। ঢাকার বাইরে থেকে কেউ এলেও তেজগাঁওয়ের দিকে ছুট দেয়। একদিন হিরণ্ময় হিমাংশু এক তরুণকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেন ওখানে বারবার যাও? কী পাও!’
তরুণ হেসে বলেছিল, ‘আমীরুল ভাই দেখা হলেই ৫০০ টাকা দেন।’
এভাবে অনেককেই নগদ টাকা দিতেন তিনি। যার প্রয়োজন তাকে দিতেন, যার প্রয়োজন নেই তাকেও। অবশ্য এমন ঘটনায় কেউ কেউ বিব্রতও হতেন। তিনি খেতে ও খাওয়াতে পছন্দ করতেন। এটা নিয়ে তার একটু বিতৃষ্ণ-অভিজ্ঞতাও ছিল। ছড়াকার আদিত্য রুপুকে বলেছিলেন, ‘কোনো কোনো মানুষের ছোটোলোকি চোখে পড়ার মতো। হোটেলে খাওয়া শেষে বিল দেওয়ার সময় এলে এরা ইচ্ছা করেই অনেক সময় নিয়ে হাত ধোয়!’ এমন অভিজ্ঞতা কম-বেশি অনেকেরই আছে।
লেখক ও শিল্পীর অলিখিত জুটি আমীরুল ইসলাম-ধ্রুব এষ। দুজনের পারস্পরিক সম্পর্ক চমৎকার। ধ্রুব এষকে কেন্দ্র করে একধরনের লেখক আড্ডা হয়। ভাই-বেরাদররা পরস্পর অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে জমায়েত হোন। আমীরুল ইসলামের প্রকাশিত তিন শতাধিক বইয়ের মধ্যে আড়াইশ’ প্রচ্ছদই ধ্রুব এষের করা। তবুও কি খেদ ঘোচে? সময়মতো প্রচ্ছদ না পেয়ে একবার তিনি ছড়া লিখে ফেললেন— ‘ধ্রুব কি প্রচ্ছদ আঁকবে না?’ শিরোনামে। আমীরুল ইসলাম ও আদিত্য রুপু যৌথভাবে ছড়াগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। ধ্রুব এষের চিত্রণে। হিজিবিজি আঁকিবুকিতে ভরা। আদিত্য রুপু এটাকে ‘পাগলা আঁকা’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
আমীরুল ইসলামের সঙ্গে আমার আজিজ সুপারমার্কেটের প্রথমায় দেখা হয়েছিল শেষবার। ভিজিটিং কার্ড চেয়ে নিয়েছিলাম। এমন অনেকেরই কার্ড জমিয়ে রেখেছি। কখনো কোনো কাজে লাগেনি। কার্ড জমাই কিন্তু বন্ধু জমাই না। বিশেষ করে মৃত্যুর পর। আগামীকাল থেকে আমীরুল ভাইও আমার বন্ধুতালিকায় থাকবেন না। দুর্বহ স্মৃতি ও বেদনার ভারে ভারাক্রান্ত থাকতে চাই না বলেই মৃত বন্ধুদের তালিকায় রাখি না। ফেসবুক থেকে তারা আমার বুকে চলে আসেন। যেখানে দেখনদারি নেই।
তখন আমি ‘ভ্রমণচিত্র’ ম্যাগাজিনের নির্বাহী সম্পাদক। উৎস প্রকাশন থেকে বের হয় ভ্রমণবিষয়ক এই ম্যাগাজিন। ঈদসংখ্যা করা হবে। আমীরুল ভাইয়ের লেখা চাইলাম। তার কাছের এক তরুণ লেখা এনে দিল। আমীরুল ভাইয়ের হাতের লেখা চমৎকার। গোটা গোটা হরফ। ডাক্তার কিংবা লেখকসুলভ দুর্বোধ্যতা নেই। প্রথম পৃষ্ঠায় তিনি শুরু লেখার শিরোনাম ও নিজের নাম লিখেছেন। শিরোনাম দিয়েছেন— ‘বারবার যেতে চাই ইতালি, রোমে’। প্রথম পৃষ্ঠাটাই ‘নতুন’, মূল লেখাটা ফটোস্ট্যাট। পড়তে পড়তে মনে হলো এটা অন্য কোথাও পড়েছি। সঙ্গে সঙ্গে গুগল সার্চ করলাম। বেরিয়ে এল সাম্প্রতিক দেশকাল-এর লিংক! উপস্থাপক ফারজানা ব্রাউনিয়াসহ আরও কাকে কাকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছিলেন আমীরুল ভাই। দেশে ফিরে লিখেছেন সেই বৃত্তান্ত। প্রকাশিত লেখা তাই ছাপার প্রশ্নই ওঠে না। সেই তরুণের সামনেই আমীরুল ভাইকে বকাবাদ্য করলাম।
আরেকবার লেখা চেয়ে কল করলাম ফরিদুর রেজা সাগরকে। সাগর ভাই নিজে হ্যাঁ/না কিছু না বলে বললেন, ‘আমীরুল সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’ যোগাযোগ করতে গিয়ে দেখলাম, আমীরুল ভাইয়ের নম্বরটা নেই। ওইদিনই রাগের চোটে ডিলিট করে দিয়েছিলাম। সরাসরি দেখা বা আলাপ না হলেও অন্যদের মুখে আমীরুল ভাইয়ের বিভিন্ন গল্প শুনতাম। কেউ লেখা চাইলে তিনি দেওয়ার চেষ্টা করতেন। কোনো সমস্যার কথা বললে সমাধান করার চেষ্টা করতেন। চাকরির জন্য সুপারিশ করতেন। অন্যকে ভরপেট খাওয়ানোর ক্ষেত্রে আমীরুল ভাইয়ের জুড়ি ছিল না। তিনি যেন বাস্তবের মানুষ নন, বইয়ে পড়া সেই ‘আদর্শ চরিত্র’। যিনি কেবলই অন্যের পাশে থাকেন, বরাভয় দেন।
২০১২ সালে আমি বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্প’র শিক্ষার্থী ছিলাম। একদিন ক্লাস নিতে এসে প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ছড়ার কথা বললে অনিবার্যভাবেই দুইটা নাম আসবে। লুৎফর রহমান রিটন ও আমীরুল ইসলাম। দুঃখজনকভাবে এরা দুজনই আমার বন্ধু।’ এটা নিঃসন্দেহে খারাপ বিষয়। তার বন্ধু, এজন্য এই দুই ছড়াকারকে নিয়ে কিছু বলা বা লেখা যাবে না। তাতে লোকজন বন্ধুকৃত্য ভেবে ভ্রূ কোঁচকাবে!
বাংলাদেশে ছড়াকে জনপ্রিয় করতে যে দুজন মানুষ বড়ো ভূমিকা রেখেছিলেন লুৎফর রহমান রিটন ও আমীরুল ইসলাম। লুৎফর রহমান রিটনও বাংলা একাডেমিতে আমাদের ক্লাস নিয়েছিলেন। ছড়াকে নিয়ে তাদের সংগ্রামের কথাও শুনিয়েছিলেন। ছড়াকে আজকের জায়গায় আনতে সংগ্রামের অন্ত ছিল না। দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় ছড়া ছাপানোর সংগ্রামও ছিল কণ্টকাকীর্ণ। সম্পাদকদের বোঝানোর চেষ্টা করতেন— ‘কলামের পাশে ১০০ লাইনের একটা ছড়া নেমে গেলে সমস্যা কী!’
একদিন মন খারাপ করে তিনি কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। পথে সিনিয়র একজন বললেন, ‘কী রিটন, মন খারাপ নাকি!’
রিটন ভাই বলেছিলেন, ‘হুদা (মুহম্মদ নূরুল হুদা) তো ছড়া পড়তে দেয় না।’
একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে শুধু কবিতা পাঠ হতো। ধীরে ধীরে ছড়ার পথও খুলে যায়। বর্তমানে যে দৈনিক পত্রিকায় ছড়া প্রকাশিত হয় এর পেছনে যে রিটন ভাইদের বহুল অবদান—এটা হয়তো আজকের অনেক ছড়াকারেরই জানা নেই। তেমনি বাংলা একাডেমিতে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও। ওই ক্লাসেই রিটন ভাই আরেকটা মজার কথা বলেছিলেন— ‘বাংলাদেশের দুজন লেখককে লেখক মনে হতো না। আমরা জিন্স পরতাম, লম্বা চুল রাখতাম। গুণ্ডার মতো দেখাত। একজন আমি, অন্যজন ইমদাদুল হক মিলন।’
আমীরুল ভাইও জিন্স পরতেন। লম্বা-চওড়া শরীর। দেখতেও অনেকটা গুণ্ডার মতো! অবশ্য সেটা তার সঙ্গে মেশার আগের ধারণা। মিশলে বেরিয়ে আসত তার শিশুর মতো সরল রূপ। প্রচণ্ড আড্ডাবাজ মানুষ। খুব মজা করে গল্প বলেন। কোনো কোনো অনুজকে আদর করে ‘মাস্তান’ ডাকতেন। তার মতো এভাবে লেখক জীবন যাপন করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। অনেক লেখকেরই হাপিত্যেস থাকে। তাদের মনে হয়—চাকরির কারণে কিছুই করতে পারলাম না; লিখতে পারলাম না! বোধকরি আমীরুল ইসলামের এমন কোনো খেদ ছিল না। কিংবা কে জানে, থাকলেও থাকতে পারে! সব কি নিজের জন্যই লিখেছিলেন? অন্যদেরও রচনাসমগ্রের একাংশ লিখে দেননি! অন্যের জন্য যদি লেখা না লিখে দিতে হতো, তার রচনাসম্ভার নিশ্চয়ই আরও বড়ো হতো।
দৈনিক বাংলায় তিনি শিশুদের পাতা সম্পাদনা করেছেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’র শিশুতোষ ম্যাগাজিন ‘আসন্ন’ সম্পাদনা করেছেন। শিশুসাহিত্যের বাইরে তার ভুবন বলতে গেছে ছিলই না। রূপকথা, কল্পকথা ও গল্পকথা এসব নিয়েই একজন আমীরুল ইসলামের স্বপ্নের জগৎ। দেশের ভালো মানুষদের একাংশ আমাদের মিরপুরে বসবাস করেন। মিরপুরের শেষপ্রান্ত (কিংবা শুরুর) গোলারটেকে আমীরুল ভাইয়ের বাসা। আমার বাসার কাছেই। তুরাগ নদীর পাড়ে দিয়াবাড়িতে বেড়াতে যেতাম অবসর সময়ে। কখনো কখনো মনে হতো টুলু (তার ডাকনাম) ভাইয়ের বাসাটা চিনে যাই। লজ্জা-দ্বিধার বাধা ঠেলে কখনো যাইনি। এখন মনে হচ্ছে, বড়ো অন্যায় কাজ করেছিলাম। লজ্জা দ্বিধা ভয়/ এতকিছু থাকতে নয়/ ব্যক্তিটা যদি টুলু হয়!
বইমেলা তখন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই হতো। বর্ধমান হাউজের ডান পাশে চ্যানেল আই লাইভ সম্প্রচার করত— বইমেলা প্রতিদিন। লাইন ধরে লেখকরা সাক্ষাৎকার দিতেন। প্রকাশিত নতুন বই নিয়ে বলতেন। এখানে আমীরুল ভাইয়ের উপস্থিতি অনিবার্য ছিল। একবার আমাদের এক বন্ধুর সঙ্গে তার ভুল বোঝাবুঝি হয়। বোধকরি ক্যামেরার সামনে প্রচারের জন্য কবিতার বই হাতে দাঁড়িয়েছিল সে। বন্ধু প্রত্যাশিত আচরণ না পেয়ে অপমানিত হয়ে ফিরেছিল বয়রাতলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে। পরদিন আমীরুল ভাইয়ের কুৎসা রটনা করে কিছু কাগজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল স্টলে স্টলে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে দারুণ উত্তেজনা। কার এত বড়ো সাহস, তরুণ কবির গায়ে হাত তোলে! ওই কাগজে আমীরুল ভাইয়ের নাম লেখা হয়েছিল ভুল বানানে— আমিরুল ইসলাম। কাগজটা হাতে পেয়ে তিনি মজা করে বলেছিলেন, ‘এটা তাহলে আমি নই!’
পরে এই ঘটনার সুরাহা হয়েছিল। উভয় পক্ষের কোলাকুলির মাধ্যমে। কিন্তু আমীরুল ইসলাম আর কখনো ছড়ার হুল ফোটাবেন না, এই ‘সুরাহা’ মানতে পারি কীভাবে! ছড়ার হুল বা ফুল সবই যে তার হাতেই চমৎকারভাবে ফোটে...









