বুকারজয়ী উপন্যাস লেখার কৌশল জানালেন ৬ লেখক

অনুবাদ : শাহরিয়ার হিরাজ
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:২৯ আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:২৯

একটি উপন্যাসের ভাবনা কীভাবে লেখা হয়? কোনো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে, হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা থেকে, নাকি বহুদিন ধরে মনের মধ্যে জমে থাকা বিচ্ছিন্ন কিছু ভাবনা থেকে? একজন লেখক কীভাবে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত স্মৃতি, ইতিহাস কিংবা চারপাশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উপন্যাসের উপাদানে পরিণত করেন?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, প্রত্যেক লেখকের সৃষ্টির পথ আলাদা। ২০২৬ সালের বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনয়ন পাওয়া ছয়জন লেখক তাদের উপন্যাসের জন্মকথা, লেখার অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণার উৎস নিয়ে কথা বলেছেন। 

ডগলাস স্টুয়ার্টের উপন্যাস 'জন অব জন'

একটি উপন্যাসের জন্ম আসলে কোথা থেকে হয়, তা কে বলতে পারে? বছরের পর বছর ধরে আমি নানা বিচ্ছিন্ন ভাবনা ও অভিজ্ঞতা জমিয়ে রাখি। একসময় যখন মনে হয়, সেগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে একটি শক্তপোক্ত গল্প তৈরি করা সম্ভব, তখনই লেখার কাজ শুরু করি।

আমার মনে হয়, ১৯৯৪ সাল থেকেই 'জন অব জন' উপন্যাসের ভাবনা ধীরে ধীরে আমার মধ্যে তৈরি হচ্ছিল। সে বছর আমি কলেজে ভর্তি হই। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, নিজেও একজন তাঁতি হব।

তবে ২০১৯ সালে, আমার প্রথম উপন্যাস 'শাগি বেইন' প্রকাশের অপেক্ষায় যখন উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছিলাম, তখনই নতুন উপন্যাসটির মূল ভাবনাটি খুঁজে পাই। সিদ্ধান্ত নিলাম, স্কটল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জে যাব। জায়গাটি দেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। মনে মনে ভাবছিলাম, সেখানে গিয়ে এমন একটি উপন্যাস লিখতে পারি, যেখানে এক প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে তার কঠিন স্বভাবের বাবার দেখাশোনার জন্য নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে।

ভেবেছিলাম, ভ্রমণ থেকে যদি কোনো উপন্যাসের জন্ম নাও হয়, অন্তত নিজের দেশটাকে আরও ভালোভাবে জানা হবে।

পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রতি আমার আকর্ষণের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। আমি হ্যারিস টুইডের তাঁতিদের কাজ দেখতে চেয়েছিলাম। এর আগে 'ইয়াং মুঙ্গো' লিখেছিলাম। সেটি ছিল সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে একটি উপন্যাস। সেখানে গ্লাসগোর তরুণদের মধ্যে সৌন্দর্য ধ্বংস করার প্রবণতা দেখা যায়। হয়তো নিজের অজান্তেই এবার এমন একটি পরিবেশের খোঁজে বেরিয়েছিলাম, যেখানে কোমলতা ও সৃজনশীলতার উপস্থিতি আছে। শ্রমজীবী মানুষের জীবনে সৌন্দর্য, রং, প্রকৃতি ও সংগীতের ভূমিকা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম।

দ্বীপগুলো সম্পর্কে মানুষের মনে একধরনের রোমান্টিক ধারণা আছে। আমার মধ্যেও হয়তো তা ছিল। দ্বীপগুলো সত্যিই অসাধারণ সুন্দর। কিন্তু এগুলো একই সঙ্গে মানুষের জীবনসংগ্রামের জায়গাও। সেখানে জীবিকা অর্জন করা এবং পরিবার প্রতিপালন করা কঠিন হতে পারে। ছোট একটি জনপদে অন্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্যাটারসে দ্বীপ থেকে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত হ্যারিস দ্বীপে পৌঁছাই। সেখানেই এক স্থানীয় নারীর বাড়িতে বসে বুঝতে পারি, আমার তৃতীয় উপন্যাসটি কেমন হতে পারে। আমরা তার রান্নাঘরের টেবিলে বসে স্থানীয় গির্জার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলছিলাম। আমি তাকে বললাম, ভ্রমণের পথে অনেক অবিবাহিত নারী ও পুরুষের দেখা পেয়েছি। বিষয়টি আমার কাছে একটু অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কারণ, সেখানে কৃষিকাজ ও খামার পরিচালনার জন্য বড় পরিবারের প্রয়োজন হয়।

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন কিছু মানুষ সারা জীবন বিয়ে না করে কাটিয়ে দেন? তিনি বললেন, হয়তো তারা জীবনের উপযুক্ত সময়ে ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজে পাননি। আমি বললাম, এমন ছোট একটি জনপদে ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পাওয়া নিশ্চয়ই কঠিন। বিশেষ করে সেই অবিবাহিত মানুষদের কেউ সমকামী হলে তো আরও কঠিন। আমার কথা শুনে ওই নারীর মুখে যে শীতল আতঙ্ক ফুটে উঠল, তা দেখে বুঝতে পারলাম, উপন্যাসটি আসলে বাবার কাছে ফিরে আসা কোনো ছেলেকে নিয়ে হবে না। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র হবে সেই বাবা, যাকে তার ছেলে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

তিনি একজন তাঁতি। নিজের জমি ও জন্মভূমির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক। কিন্তু যে জায়গাটিকে তিনি নিজের পৃথিবী বলে জানেন, সেখানেই তিনি কখনো ভালোবাসা খুঁজে পাননি, নিজের পরিচয়ও প্রকাশ করতে পারেননি।

এলিজাবেথ স্ট্রাউটের উপন্যাস 'দ্য থিংস উই নেভার সে'

আমি যে শহরে থাকি, সেখানকার একটি ওষুধের দোকানে একজন নারী কাজ করেন। প্রায় দুই বছর আগে একদিন দোকানে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন সেখানে আর কেউ ছিল না। তিনি খুব নিচু স্বরে আমাকে বললেন, ‘আমি শুধু চাই, সবকিছু শেষ হোক!’

তিনি দুই হাত মুখের পাশে রেখে ফিসফিস করে বললেন, ‘নির্বাচনটা।’

আমি বললাম, আমারও একই অনুভূতি।

তিনি চারদিকে তাকিয়ে আবার বললেন, ‘আমি কখনো কারও সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলি না। কিন্তু আমি শুধু চাই, নির্বাচনটা শেষ হোক।’

আমি তাকে বললাম, তার অনুভূতি আমি বুঝতে পারছি। এরপর সেখান থেকে চলে এলাম।

তিনি কাকে ভোট দিয়েছিলেন, তা আমার জানা নেই। কিন্তু তার মনের কষ্ট আমি বুঝতে পেরেছিলাম। একই কষ্ট আমিও অনুভব করছিলাম।

'দ্য থিংস উই নেভার সে' উপন্যাসটি সেই নারীর মতো মানুষদের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। যারা মূলত গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশ, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছেন।
আমরা এই পরিস্থিতির মধ্যেই বাস করছি। প্রতিদিন এর প্রভাব অনুভব করছি। সবকিছু যেন আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। মানুষ কখনো কখনো নিজের মতের সঙ্গে মেলে এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেক কথাই আমরা একে অপরকে বলতে পারি না।

আমি যখন উপন্যাসটি লিখছিলাম, তখন যেমন এই অবস্থা ছিল, এখন তা আরও বেশি সত্য হয়ে উঠেছে। বইটিতে আমাদের গণতন্ত্রের অবনতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এসব ঘটনার মধ্যেও আমরা প্রতিদিনের জীবনযাপন চালিয়ে যাই। কাজে যাই, বাজার করি, বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে বের হই, হাসি-আড্ডা দিই, সেলাইয়ের ক্লাবে যোগ দিই। অথচ আমাদের চারপাশে ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটতে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ সেসব নিয়ে কথা বলে না।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আর্টি ড্যামের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে আমি আগে প্রকাশ্যে কথা বলেছি। একবার একটি মৃত্যুসংবাদে প্রকাশিত পুরোনো ছবি দেখে তার মুখটি আমার চোখে পড়ে। ছবিতে একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ মুখাবয়ব ছিল। সেটিই আমাকে চরিত্রটির বাহ্যিক রূপ কল্পনা করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু উপন্যাসটির মূল অনুপ্রেরণা এসেছে আমাদের দেশের চলমান পরিস্থিতি থেকে।

আমি আর্টিকে একজন হাইস্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক করেছি। কারণ, ইতিহাস সম্পর্কে তার কিছুটা গভীর ধারণা থাকার কথা। হয়তো তিনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন কী ঘটতে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে।

আমি তার ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের সঙ্গে দেশের ইতিহাস ও সময়ের ঘটনাগুলোকে মিলিয়ে দিয়েছি। কারণ, ইতিহাসের প্রতিটি সময়ের মধ্য দিয়ে চলার সময় আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ব্যক্তিগত গল্প থাকে।

আমি চেয়েছি, আর্টির মনের ভেতরের জগৎ যেন তার বাইরের পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রতিফলন হয়ে ওঠে। ইতিহাসের সময় ও পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত আর্টির জীবনকেও গ্রাস করেছে। এটাই তার গল্প। একই সঙ্গে আমাদের সবার গল্প।

মার্লন জেমসের উপন্যাস 'দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারার্স'

মায়োর্কায় একজন অন্ধ মানুষ আছেন, যিনি আমার চেয়েও ভালোভাবে এই গল্পটি বলতে পারতেন। তার গল্পে হয়তো আমার মতো শিল্পগুণ থাকত না, কিন্তু থাকত সত্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

তিনি বলতে পারতেন, অন্ধ হওয়ার আগে তার জীবন কেমন ছিল, জামাইকায় থাকার সময় তার স্বপ্ন কী ছিল, কোন রাতে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন, কোন জনতা তাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল এবং তার চোখ উপড়ে নেওয়া মানুষটিকে শেষবারের মতো তিনি কেমন দেখেছিলেন।

অবশ্য এসবই কথিত ঘটনা। সবকিছুই অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে।

সেই অন্ধ মানুষটি সমকামী ছিলেন, এখনো আছেন। শেষবার তিনি যা দেখেছিলেন, তা ছিল সমকামী মানুষের প্রতি জামাইকার কিছু পুরুষের নিষ্ঠুর আচরণ।

তিন বছর আগেও আমি তাকে শহুরে লোককথার একটি চরিত্র বলেই মনে করতাম। এই গল্প আমার তরুণ বয়সের সমকামী সত্তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভয়ে আমি নিজের পরিচয় লুকিয়ে ফেলেছিলাম, নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। বিষয়টি হলো, আমি জানতাম ঘটনাটি ঘটেছিল। গুজব ছিল, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে এক রাতে কিংস্টনে একদল সমকামী পুরুষের ওপর জনতা হামলা চালায়। তারা কোনো একটি সহায়তা গোষ্ঠীর সভায় অথবা জামাইকা এইডস সহায়তা সংস্থার একটি শাখায় জড়ো হয়েছিলেন।

কথিত আছে, হামলাকারীদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ব্যবসায়ী এবং একজন অত্যন্ত বিখ্যাত সংগীতশিল্পীও ছিলেন। অবশ্য সবই অভিযোগ। এ ঘটনার কোনো লিখিত নথি কখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশের কোনো প্রতিবেদন নেই, সংবাদপত্রে কোনো খবর নেই, রাতের সংবাদেও কোনো উল্লেখ নেই। তবু আমি নিশ্চিত ছিলাম, ঘটনাটি ঘটেছিল।

গুজব খুব বেশিদিন টেকে না। এ কারণেই জামাইকায় গুজবকে প্রায়ই সত্য বলে মনে করা হয়। আমরা জানি, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর একটা মূল্য দিতে হয়। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সত্য বললে নিজেকেই বিপদের মুখে পড়তে হয়। সত্য প্রকাশ করতে গেলে অনেক সময় ক্ষমতাবানেরাই সেই সত্যকে থামানোর জন্য এগিয়ে আসে।

যেসব খবর সহজেই হারিয়ে যায়, যেগুলোর কোনো প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় না, সেসব খবর ছড়ানোর ক্ষেত্রে গুজবের বাহকের একধরনের নিরাপত্তা থাকে। সে জানে, তার বলা সত্য কোনো দিন তাকে শনাক্ত বা অভিযুক্ত করার জন্য ফিরে আসবে না। তাই সে নির্ভয়ে কথা বলে।

তারা একজন সমকামী মানুষকে হত্যা করেছে। হামলাকারীদের মধ্যে জামাইকার সবচেয়ে বড়ো রেগে সংগীতশিল্পীও ছিলেন। ওই সমকামী পুরুষেরা নিরাপদ যৌনজীবন সম্পর্কে পরামর্শ নিতে জড়ো হয়েছিলেন। আবার এমন কথাও শোনা যায়, তারা হয়তো সেখানে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য গিয়েছিলেন। তাদের সবাই কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন, নাকি কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ উভয়েই ছিলেন, তা নিয়েও নানা কথা প্রচলিত আছে। তাদের সবার এইডস ছিল বলেও দাবি করা হয়।

সবই অভিযোগ। সবই শোনা কথা।

যেসব গল্প আমাকে দীর্ঘদিন তাড়া করে বেড়ায়, সেগুলো থেকেই আমি সাধারণত উপন্যাস তৈরি করি। যে গল্পগুলো আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়, সেগুলোতে অনেক সময় তথ্য থাকে খুব কম। গল্পের মধ্যে ফাঁক থেকে যায়, নানা অসংগতি থাকে, অনেক কিছুই পরিষ্কার হয় না।

একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে আমি নিজেকে সবচেয়ে বেশি কার্যকর মনে করি এই জায়গাতেই। আমি যেন ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিকের মাঝামাঝি কেউ। কল্পিত মানুষের জীবনকে বাস্তব করে তোলাই আমার কাজ। কখনো কোনো একমাত্রিক ঘটনার অন্য দিকগুলো কল্পনা করে তুলে ধরি। আবার কখনো একটি বিশেষ ঘটনার পর মানুষের জীবনে কী কী পরিণতি ঘটতে পারে, তা কল্পনা করি। আমার কাছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মায়োর্কার সেই অন্ধ মানুষটি যেভাবে গল্পটি বলতেন, আমার উপন্যাস হয়তো ঠিক সেভাবে বলা হয়নি। এমনও হতে পারে, গল্পটি সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু একটি গল্প বাস্তব ঘটনা না হয়েও সত্য হয়ে উঠতে পারে। কখনো কখনো কল্পনার সেই সত্য বাস্তবের চেয়েও গভীর সত্য প্রকাশ করে।

রেবেকা পেরির উপন্যাস 'মে উই ফিড দ্য কিং'

একসময় আমার কাছ থেকে কবিতা যেন হারিয়ে গিয়েছিল। আবার লেখার জন্য মন ছটফট করছিল।

প্রতিযোগিতামূলক ট্রাম্পোলিন খেলোয়াড় হিসেবে আমার শৈশব নিয়ে সৃজনশীল নন-ফিকশনধর্মী একটি ছোট লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর কিছুটা সাহস পেলাম। ভাবলাম, এবার কথাসাহিত্য লেখার চেষ্টা করা যাক। আমি দুটি আলাদা ছোটোগল্প লেখা শুরু করলাম। একটি গল্প ছিল মৃত্যুপথযাত্রী এক রাজার তরুণ পরিচর্যাকারীকে নিয়ে। অন্য গল্পটি ছিল এক নিঃসঙ্গ নারীকে নিয়ে। তিনি নিজের বাড়িতে নকল খাবার ব্যবহার করে নানা দৃশ্য সাজাতেন। সেসব দৃশ্যের মধ্যে বসবাসকারী আত্মাদের কল্পনা করতেন। তার উদ্দেশ্য ছিল শেষ পর্যন্ত সেই আত্মাদের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করা।

লিখতে লিখতে একসময় বুঝতে পারলাম, ওই নারী চরিত্রটি ধীরে ধীরে রাজার তরুণ পরিচর্যাকারীর গল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আমি দুটি আলাদা গল্প লিখছি না, বরং একটি উপন্যাস লিখছি।

এর প্রায় এক বছর আগে গ্লাস্টনবারির রয়্যাল ম্যাগডালেন আলমসহাউসেস দেখতে গিয়ে দুই বন্ধুকে বলেছিলাম, সাজানো পরিবেশ ও নকল জিনিসপত্র নিয়ে লিখতে আমার আগ্রহ আছে। সেখানে একটি ঘর এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল যেন অন্য কোনো সময়ে চলে গেছি।

আর তারও ত্রিশ বছর আগে একটি আসবাবপত্রের শোরুমে সোফার ওপর রাখা প্লাস্টিকের একটি আঙুর হাতে নিয়ে চাপ দিয়েছিলাম।

তখন অবশ্য আমার কোনো ধারণাই ছিল না, এসব অভিজ্ঞতা একদিন একটি উপন্যাসের উপাদান হয়ে উঠবে। লেখা শুরু করার সময় আমি জানতাম না, বইটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে বা এর পরিণতি কী হবে। আইরিস মারডক একবার বলেছিলেন, ‘চুপচাপ বসে থাকতে হয়, যাতে লেখাটি নিজেই নিজের রূপ তৈরি করতে পারে।’

আমি এই কথাটিকে নিজের লেখার মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। বইটিকে নিজের মতো করে তৈরি হতে দিয়েছি। তবে কাজটি মোটেও সহজ বা গোছানো ছিল না। বইটির চূড়ান্ত রূপ খুঁজে পেতে বেশ সময় লেগেছে।
প্রথম দিকে অধ্যায়গুলোতে বর্তমান সময় ও অতীতের কাহিনি পালাক্রমে সাজানো ছিল। একসময় বইটির প্রায় অর্ধেক অংশ বাদ দিয়ে নতুন করে লিখতে হয়েছিল।

কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। যেমন, ছোট ছোট অধ্যায় লেখার সিদ্ধান্ত। আবার কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে ভাষা ও লেখার ধরন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে।

উপন্যাস লেখার স্বাভাবিক জটিল প্রক্রিয়ায় এসব ঘটেছে। অবশ্য আমি মাত্র একটি উপন্যাস লিখেছি, তাই একে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলার অভিজ্ঞতা আমার খুব বেশি নেই! এই লেখার যাত্রায় সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি একটি বিষয় দেখে। উপন্যাসের মধ্যযুগীয় অংশটি লেখার সময় সমসাময়িক পৃথিবীর ঘটনাবলি আমাকে যতটা প্রভাবিত করেছে, বর্তমান সময়ের অংশটি লেখার ক্ষেত্রে ততটা করেনি।

আমি আগে থেকেই ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু গাজায় গণহত্যার ভয়াবহ সময়ের মধ্যে বসে লেখা এবং লাগামহীন, প্রশ্নহীন চূড়ান্ত ক্ষমতার ভয়াবহ পরিণতি দেখে উপন্যাসের রাজা ও তার চারপাশের চরিত্রগুলো লেখার ক্ষেত্রে নতুনভাবে প্রভাবিত হয়েছি।

নিশ্চয়ই কখনো কখনো এমন হয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বর্তমান ও মধ্যযুগের জগৎ দুটিকে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে।

লুক কেনার্ডের উপন্যাস 'ব্ল্যাক ব্যাগ'

২০২১ সালের মার্চ মাসের কথা। কোভিডের লকডাউনের সময় প্রতিদিন আট ঘণ্টা জুমে ক্লাস নেওয়ার কারণে আমার ঘাড় ও পিঠে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তৈরি হয়েছিল।

একই সময়ে সাময়িকভাবে নিজের বিভাগের প্রধানের দায়িত্বও পালন করছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা জানেন, এই দায়িত্ব কতটা ক্লান্তিকর এবং অনেক সময় কতটা কৃতজ্ঞতাহীন।

একদিন রাতে নিজেকে একটু অবসর দিয়েছিলাম। কিছু কবিতা লেখার পরিকল্পনা ছিল। কারণ, আমি যখন লিখি না, তখন ভীষণ অস্থির বোধ করি।

রাত তখন প্রায় দশটা। সম্ভবত পাশে একগ্লাস ওয়াইন রাখা ছিল। আমি সামাজিক মনোবিজ্ঞানের কিছু গবেষণাপত্রে আকর্ষণীয় বাক্য খুঁজছিলাম। কম্পিউটারে তখন বারোটি ট্যাব খোলা ছিল। এমন সময় একটি গবেষণাপত্রের পাদটীকায় ১৯৬৭ সালে ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত ‘ব্ল্যাক ব্যাগ এক্সপেরিমেন্ট’ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ চোখে পড়ে। বিষয়টি আমার কাছে একই সঙ্গে অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।

পরীক্ষাটির ফলাফল নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। সেখানে মূলত দেখানো হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটি কালো ব্যাগের প্রতি ক্রমশ বেশি স্নেহশীল হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু আমার কৌতূহল তৈরি হয়েছিল অন্য জায়গায়। একজন মানুষ যদি এই পরীক্ষায় কালো ব্যাগের ভূমিকায় অভিনয় করেন, তার অভিজ্ঞতা কেমন হবে? কী ধরনের অভিনেতা এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী হবেন? একুশ শতকে একজন শিল্পীর অবস্থানেরও বেশ ভালো প্রতীক বলে মনে হয়েছিল।

আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবিয়েছিল। আমি নিজেও হয়তো এমন একটি ভূমিকায় অভিনয় করতে আপত্তি করতাম না। কারণ, মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটাই কখনো কখনো ভীষণ ক্লান্তিকর মনে হয়। গবেষণাটি ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক একটি আবিষ্কার। কিন্তু ধারণাটি আমাকে নতুন করে লেখার শক্তি দিয়েছিল। আমি এমন লেখা পছন্দ করি, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা সীমাবদ্ধতা থাকে। যেমন, জর্জ পেরেকের 'আ ভয়েড' উপন্যাসটি লেখা হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালার ‘e’ অক্ষর ব্যবহার না করে। এ ধরনের নিয়ম লেখার কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবার একই সঙ্গে নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণাও জোগায়।

কিন্তু এবার বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় মনে হলো। কারণ, সীমাবদ্ধতাটি লেখকের নিজের জন্য নয়, উপন্যাসের একটি চরিত্রের জন্য তৈরি করা হয়েছে। গবেষণাটি পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি নিজেকে যেন সেই কালো ব্যাগের জায়গায় কল্পনা করতে শুরু করলাম। আমার মাথার ভেতরের অবিরাম কথোপকথন আরও গভীর ও বিচিত্র হয়ে উঠল।

আমি যে কবিতাটি লিখছিলাম, সেটি সঙ্গে সঙ্গেই বাদ দিলাম। শুরু করলাম প্রথম পুরুষে একটি দৃশ্য লেখা। সেখানে একজন বেকার অভিনেতা মনোবিজ্ঞানের একজন শিক্ষকের সঙ্গে কালো ব্যাগের ভূমিকায় অভিনয় করা নিয়ে কথা বলছেন। এরপর থেকে প্রায় পুরো বইটিই লিখতে শুরু করি। একটি নোটবুকের প্রচ্ছদে বড়ো করে লিখে রাখি ব্ল্যাক ব্যাগ। সিদ্ধান্ত নিই, এ বিষয়ে যতটা সম্ভব কম গবেষণা করব।

এম. জন হ্যারিসনের উপন্যাস 'দ্য অ্যান্ড অব এভরিথিং'
আমি সাধারণত কোনো চরিত্র, দৃশ্য বা গল্পের ধারণা থেকে লেখা শুরু করি না। আমার লেখার শুরু হয় লেখার আঙ্গিক বা কাঠামো নিয়ে আগ্রহ থেকে। চরিত্র, দৃশ্য ও গল্পের ভাবনা পরে আসে।

কোনো একটি লেখার কাঠামো খুঁজে পাওয়ার পর আমি প্রথমেই তার দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজতে শুরু করি। কারণ, আমি চাই সেই কাঠামো ভেঙে দিতে।

'দ্য অ্যান্ড অব এভরিথিং' লেখার কথা ভাবার সময় আমার মাথায় দুটি ধরনের উপন্যাসের কথা এসেছিল। প্রথমটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনে লেখা বিপর্যয়ভিত্তিক উপন্যাস। এ ধরনের উপন্যাসের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ জন উইন্ডহ্যামের 'দ্য ডে অব দ্য ট্রিফিডস'। সেখানে হাঁটতে পারে এবং মাংস খায়, এমন উদ্ভিদের আক্রমণের ঘটনা রয়েছে।

দ্বিতীয়টি হলো পৃথিবীতে ভিনগ্রহের প্রাণীদের আক্রমণ নিয়ে লেখা উপন্যাস। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ এইচ. জি. ওয়েলসের 'দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস'। এই দুই ধরনের উপন্যাসেই বিপর্যয়কে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা হয়। বিপর্যয়ের কারণ বোঝা যায় এবং শেষ পর্যন্ত তার সমাধানও হয়।

কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে বিপর্যয় সব সময় এমন হয় না। বাস্তব বিপর্যয় একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে থাকে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। অনেক সময় যাদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য সরাসরি বিপদের মুখে পড়ে না, তারা এসব বিপর্যয় স্বীকারই করতে চান না।

প্রচলিত বিপর্যয়ভিত্তিক গল্পে হঠাৎ কোনো দুর্যোগ এসে মানুষের জীবন এলোমেলো করে দেয়। তারপর সেই দুর্যোগ পরাজিত হয়। সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এ ধরনের গল্প পাঠককে একধরনের স্বস্তি দেয়। কারণ, সেখানে অনিশ্চিত বিপর্যয়ের পর আবার পরিচিত ও পছন্দের পৃথিবী ফিরে আসে।

আমি আমার উপন্যাসে এর সম্পূর্ণ বিপরীত একটি কাঠামো তৈরি করতে চেয়েছি। এখানে এমন একটি বিপর্যয় থাকবে, যার প্রকৃতি বোঝা অসম্ভব। অদূর ভবিষ্যতে থেমে যাওয়ার কোনো লক্ষণও থাকবে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি প্রকৃত পরিবর্তনের কথা বলতে চেয়েছি।

উপন্যাসের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যঙ্গ, অনুকরণ, রাজনৈতিক রূপক এবং কিছুটা অদ্ভুত হাস্যরস রয়েছে। 'দ্য অ্যান্ড অব এভরিথিং' মূলত এমন এক পৃথিবীর গল্প, যেখানে কিছুই ঠিকঠাক চলছে না, অথচ মানুষ এমনভাবে জীবন কাটানোর চেষ্টা করছে যেন কিছুই ঘটেনি। উপন্যাসে আমি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছি।

প্রথমত, ট্রাম্পের রাজনীতি ও ইন্টারনেটের প্রভাবে যুক্তিবোধের অবক্ষয়। এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কোনো বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা সত্য কথা বলাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

দ্বিতীয়ত, মানুষ কীভাবে সেই পরিবেশকেই ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, যার ওপর তার নিজের বেঁচে থাকা নির্ভরশীল।

তৃতীয়ত, পৃথিবীকে কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সে সম্পর্কে মানুষের আত্মবিশ্বাস ও বোধ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজছি নেটফ্লিক্সের কল্পনাপ্রসূত ক্ষমতায়নের গল্পের মতো সহজ উপায়ে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় বছরে নিশ্চিহ্ন প্রায় ৩০০ পরিবার: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন
সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় বছরে নিশ্চিহ্ন প্রায় ৩০০ পরিবার: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন
মগবাজারে ক্রেনচাপায় প্রকৌশলীর মৃত্যু: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি পরিবারের
মগবাজারে ক্রেনচাপায় প্রকৌশলীর মৃত্যু: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি পরিবারের
বুকারজয়ী উপন্যাস লেখার কৌশল জানালেন ৬ লেখক
বুকারজয়ী উপন্যাস লেখার কৌশল জানালেন ৬ লেখক
ইরান যুদ্ধের বিরোধীদের মন শয়তান অন্ধ করে দিয়েছে: মার্কিন রাষ্ট্রদূত
ইরান যুদ্ধের বিরোধীদের মন শয়তান অন্ধ করে দিয়েছে: মার্কিন রাষ্ট্রদূত
সর্বাধিক পঠিত
রেডি হও জামায়াত, তোমাদের উপযুক্ত জায়গা পাকিস্তান পাঠানো হবে: পাপিয়া 
রেডি হও জামায়াত, তোমাদের উপযুক্ত জায়গা পাকিস্তান পাঠানো হবে: পাপিয়া 
১০ লাখ টাকা থাকলে কোথায় বিনিয়োগ করবেন
১০ লাখ টাকা থাকলে কোথায় বিনিয়োগ করবেন
পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ১৫ টাকা
পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ১৫ টাকা
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
আজই বাংলাদেশের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হতে পারে 
আজই বাংলাদেশের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হতে পারে