মানুষ গল্পটাই চায় : রবিশংকর বল

.
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৫:১৩আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৫:১৯

মানুষ গল্পটাই চায় : রবিশংকর বল [রবিশংকর বল পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৬২ সালে। বিজ্ঞানে স্নাতক। ২০১১ সালে দোজখনামা  উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন। গতকাল তিনি কলকাতার বিআরসিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৪ সালে জেমকন সাহিত্য পুরস্কার-এর বিচারক হিসেবে বাংলাদেশে এলে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন জাহিদ সোহাগ।]  

 

জাহিদ সোহাগ : আপনার কাছে আমার যে জানতে চাওয়া সেটা হচ্ছে কনটেমপোরারি পোয়েট্রি বলেন বা স্টোরি বলেন বা নভেল বলেন, এই কথার মধ্য দিয়ে এক ধরণের লেখাকে একটা স্বীকৃতি দেয়ার প্রবণতা কাজ করে। গল্প বলতে সাধারণত যেটা বোঝায়, আখ্যান বলতে যেটা বোঝায় সেই জায়গায় কিন্তু না, কখনো কখনো সেটা প্রবন্ধ হয়ে যায়, কখনো কখনো সেখানে লেখকের একটা বিবৃতি বা মতামত থাকে। সেখানে ক্যারেক্টারাজেশন বলতে যা বোঝায় সেই জায়গাটা হয় না। এই ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

রবিশংকর বল : দেখুন, লেখালেখির ব্যাপারটা তো, মানে বিশ শতকের মাঝামাঝি বা তার অনেক আগে থেকেই ধরন ধারণটা বদলে গেছে। এটা মূলত আধুনিকতা মানে মডার্নইজম যেটাকে বলা হয় আরকি, সেই আধুনিকতার ফল। যেভাবে আমরা দেখি চিত্রকলার ক্ষেত্রে কিউবিজম এসেছে, স্যুররিয়েলিজম এসেছে অর্থাৎ আমাদের লেখার এতদিনকার যে ধরনটা ছিল যেটা, ফটোগ্রাফিক রিয়েলিটি অর্থাৎ যেটা আমরা দেখছি তাই উপস্থাপিত করছি এই টাইপটা ভাঙচুর করে দেওয়া হলো। সেখানে শিল্পীর তার নিজস্ব একটা পার্সপেক্টিভ দিয়ে দেখা— এটা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও বলা হচ্ছে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স যেটা আরকি— এমন কোনো রিয়েলিটি নেই যেটা দ্রষ্টা নিরপেক্ষ মানে যে দেখছে তার নিরপেক্ষ কোনো রিয়েলিটি নেই আরকি। অর্থাৎ দেখার ওপরে কোন সময় দেখছে, কী মেন্টাল সিচুয়েশনে দেখছে সমস্ত কিছুর ওপর নির্ভর করছে— সে একটা পার্টিক্যালকে কণা হিসেবে দেখবে না ওয়েভ হিসেবে দেখবে। এই জায়গা থেকে একসময় তো আইনস্টাইন আর রবীন্দ্রনাথের একটা তর্কও হয়েছিলো। অর্থাৎ যেটা হয় লেখালেখির ক্ষেত্রেও সেই বদলগুলো ঘটে গেছে আরকি। টানা আখ্যান মানে গল্প বলে যাওয়া, কাহিনি বলে যাওয়া এই যে ধারাটা ছিলো তার মধ্যে চোরাগুপ্তা আক্রমণ এখানে আরকি লেখকের নানারকম পার্সপেক্টিভ— লেখার মধ্যে ঢুকে গেছে চিত্রকলা, মিউজিকের নানারকম অনুষঙ্গ এবং আধুনিক ফটোগ্রাফি যেভাবে একটা এক্সট্রাকশনের স্তরে নিয়ে গেছে সেই সমস্ত অনুষঙ্গ ঢুকে গেছে। তারপর শুধুমাত্র বিজ্ঞান কেনো, মানে পদার্থবিদ্যা কেনো, মনোবিজ্ঞানের কথা যদি ধরো যে ফ্রয়েডের সময় থেকেই মানে মূলত দুটো আবিষ্কার তো পৃথিবীতে অনেক বড় আবিষ্কার— সেটা হচ্ছে একদিকে আইনস্টাইন আছেন আরেকদিকে ফ্রয়েড আছেন, ফ্রয়েড আবিষ্কার করলেন আমাদের যে চেতনাটা এই চেতনাটাই সব নয়, এর বাইরে এমন অনেক কিছুই রয়ে গেছে যা আমরা জানি না।

 

জাহিদ সোহাগ  : অবচেতন বলতে যে বিষয়টা আছে...
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, অবচেতন। সেই জগতটাকে ধরা আরকি— সেই জগতটা একটা সময় গিয়ে বিট জেনারেশনের এলেন গিন্সবার্গ এরা এই সমস্ত নানারকম মাদকদ্রব্য সেবন, এলএসডি ইত্যাদির মাধ্যমে নানারকম ক্যালাইডস্কোপিক দৃশ্য তারা দেখতে লাগলেন— সেগুলোকে তারা লেখার মধ্যে আনতে লাগলেন, মানে অবচেতনে সেই সময়ে যেটা ঘটছে সেটাকেই লেখার মধ্যে নিয়ে আসা; এই সমস্ত ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে আমাদের আখ্যানরীতির একটা বদল ঘটে গেছে। তো সেটা অবশ্যই একটা ভালো দিক তার কারণ হচ্ছে যে শুধুমাত্র একটা গল্প বলা বা নায়ক নায়িকা— কতগুলো চরিত্র, তাদের সংলাপ বুনে দেয়া এই সমস্ত কিছুর মধ্যে যে সীমাবদ্ধতা থাকে সে সীমাবদ্ধতাটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে এখানে। আমার কাছে এটা খুবই জরুরি।

 

জাহিদ সোহাগ : এই ধারায় কাফকার কথা তো বলা যেতে পারে। কাফকার গল্পগুলোও তো দেখা যায় ছোট ছোট...
রবিশংকর বল : না, ছোট বলতে, কাফকার চরিত্র...

 

জাহিদ সোহাগ : না মানে আমি সাইজের কথাটা বলতে চাই। সেখানে কোনো চরিত্র হয়তো ইনডিভিজুয়ালি নেই। 
রবিশংকর বল : কাফকার গল্পে একটা অদ্ভুত স্যুররিয়েলিস্টিক জগৎ তৈরি হয়। কিন্তু কাফকা অদ্ভুতভাবে যেটাকে তৈরি করেন সেখানে তার যে ন্যারেটিভ সেটা কিন্তু একটা অসম্ভব রিয়েলিস্টিক ন্যারেটিভ। যেটা একজন লেখকের পক্ষে একটা ভয়ঙ্কর শক্তি পরীক্ষার জায়গা যে তিনি একই সঙ্গে কাজ করছেন মনোজগতে— এই সমস্ত কিছু অর্থাৎ একেবারে দলাকার জায়গা নিয়ে অথচ তার যে বয়ানটা তিনি তৈরি করছেন সেই বয়ানটা কিন্তু রিয়েলিস্টিক বয়ান, মানে কাফকার গল্প পড়তে গেলে আমি হয়তো অনেক কিছু বুঝতে পারছি না কিন্তু যে বয়ানটা তিনি তৈরি করছেন সেই বয়ানটা বুঝতে কিন্তু আমার কোনো অসুবিধা হয় না। আমি আখ্যানরীতিতে এই জিনিসটা খুব বিশ্বাস করি যে তার মধ্যে সমস্ত কিছুই থাকবে কিন্তু তার পা-টা থাকবে রিয়েলিটির ওপরে; এমনভাবে যে এই গল্পটা কিন্তু সবাই পড়ে ফেলতে পারবে। যে রিডার যে স্তরে আছে সেই স্তর অনুযায়ী সে লেখাটাকে ইন্টারপ্রেট করবে, লেখাটাকে গ্রহণ করবে।

 

জাহিদ সোহাগ : দেবেশ রায় বা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের লেখকরা, তারা কিন্তু সবসময় আখ্যানধর্মী। এই দিকে তাদের একটা ঝোঁক আছে এবং তারা পরিবেশ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্র ও মানুষের সম্পর্ক, যেমন তিস্তাপারের বৃত্তান্তেও দেখা যায় সেখানে একটা বাম ধরনের রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সেখানে একেবারে প্রান্তিকের একটা মানুষের বাস্তবতা কী। 
রবিশংকর বল : দেখো, একটা ব্যাপার হচ্ছে শিল্প-সাহিত্যকে তো আমরা কোনো খাপে ফেলতে পারি না।

 

জাহিদ সোহাগ : না, খাপে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। নন্দনতত্ত্বের বিবর্তনও যেহেতু ঘটছে...
রবিশংকর বল : রবীন্দ্রনাথ যখন উপন্যাস লিখছেন সেই একই সময়ে জীবনানন্দও উপন্যাস লিখছেন। আমরা পরে হয়তো সেগুলো পাচ্ছি কিন্তু দুজনের আখ্যানরীতি, দুজনের বলার কায়দা সমস্ত কিছুই আলাদা। এইটা থাকা তো খুব সুস্থতার পরিচয়ও যে এক ধরনের একটা ন্যারেটিভ, এক ধরনের একটা থিওরিটিক্যাল জায়গাকে আমি কেনো প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবো? ফলে দেবেশবাবু এবং দেবেশবাবুর যারা অনুসারী তারা যে আখ্যানরীতি মেনে চলেন, যে আখ্যানরীতিতে লেখেন সেটাও আরেকটা ধরন। এই সমস্তকিছুই একসঙ্গে থাকাটা আমার মনে হয় জরুরি। হয়তো সেই আখ্যানরীতির সঙ্গে আমি যে ভাষায় লিখি তার একটা— মানে তার লেখা পড়তে পড়তে আমার মধ্যে অথবা আমার লেখা পড়তে পড়তে তার মধ্যেও সেই লেখাটা ঢুকে যায় এবং কোথাও অদল-বদল নিশ্চয় ঘটায় ফলে সবরকম জায়গাই খোলা রাখাটা জরুরি বলে আমার মনে হয়। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে এটাই একমাত্র জায়গা যেটাকে বেঁধে দেওয়াকে আমি খুব ভয়ঙ্কর, মানে এটাও এক ধরনের মৌলবাদ মনে করি।

 

জাহিদ সোহাগ : এমনিতে আপনার লেখার ক্ষেত্রে, চিন্তাভাবনা করার ক্ষেত্রে, পাঠের ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়ে আনন্দ পান? আখ্যানধর্মীতার দিকে নাকি এই যে এতক্ষণ যেটা বললাম সেটার দিকে...
রবিশংকর বল : আমার পাঠের ক্ষেত্রও তাই আরকি।

 

জাহিদ সোহাগ : মানে নির্দিষ্ট কোনো ছকে নয়?

রবিশংকর বল : আমি তো, ধরা যাক, বিভূতিভূষণের দৃষ্টিপ্রদীপ তো আমার ভয়ঙ্কর প্রিয় একটা উপন্যাস, বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী আছে অপরাজিত আছে— এগুলো তো আখ্যানধর্মীই। একটা গল্পই বলা হয় এখানে। এগুলো পড়ে আমি যেমন আনন্দ পাই অর্থাৎ সেই লেখাগুলো আমার ভেতরে যে ধরনের আক্রমণ চালায় একইভাবে কাম্যুর আউটসাইডার আমার ভেতরে আক্রমণ চালায়। ঠিক একইভাবে বোর্হেসের গল্পও আমার ভেতরে আক্রমণ চালায়। আমি এই জায়গাগুলোকে খোলা রাখতে চাই সবসময়। মানে আমি একটা জায়গাকে অফ করে দেব এটা আমার মধ্যে নেই। 

 

জাহিদ সোহাগ : মানে অনেকগুলো উইন্ডোই খোলা রাখতে চান?
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, অনেকগুলো দরজাই খোলা রাখতে চাই।

 

জাহিদ সোহাগ : কিন্তু দেখা যায় এর বাইরে যাদের পাঠকপ্রিয়তার কথা বলি, জনপ্রিয়তার কথা বলি যেমন এই যে মার্কেসের গল্পগুলোতে দেখা যায় সেখানে অনেককিছুর সঙ্গে কাহিনিও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, নিশ্চয়।

 

জাহিদ সোহাগ : বা হারুকি মুরাকামির কথাও যদি বলি সেখানেও- তার ব্যাপারটা অবশ্য ভিন্ন কিন্তু সেখানে একটা স্টোরির মত ব্যাপার থাকে। স্টোরিটাকে হাইড করে দেয় না। সেই স্টোরির মধ্য দিয়েই পাঠক তার গল্পের বিভিন্ন অন্ধিসন্ধির মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু এগুলো তো পাঠকের পক্ষে কমিউনিকেট করা সহজ।

রবিশংকর বল : আসলে গল্পটা হচ্ছে একটা আদি অকৃত্রিম বিষয়। যেটা মানুষের সভ্যতার শুরু থেকে চলে আসছে। যখন একজন আর্টিস্ট মানে আমাদের পূর্বপুরুষ একটা বাইসনের ছবি আঁকে তখন কিন্তু সে একটা গল্পই বলে। ফলে দেখা যায় গল্পটা মানুষের সভ্যতার একদম শুরু থেকে চলে আসছে। তো সেই গল্পটা যদি না থাকে কোনো লেখায়— আমি মূলত গল্প-উপন্যাসের কথাই বলছি, কবিতার কথা বলছি না— তো গল্পটাই যদি না থাকে তাহলে কিন্তু তা একসেপ্টেড হবে না কোনো জায়গা থেকেই। তোমাকে যা কিছুই করতে হবে তা কিন্তু এই গল্প বলার মধ্য দিয়ে বুনে বুনে দিতে হবে।

 

জাহিদ সোহাগ : মানে একটা গল্প থাকতেই হয়?
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, একটা গল্প থাকতেই হবে। মানুষ গল্পটাই মূলত চায় আরকি। তত্ত্বটা কিন্তু চায় না। সেই গল্পের মধ্য দিয়েই তত্ত্বটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে ওঠে।

 

জাহিদ সোহাগ : আমাদের এখানে কেউ কেউ এক ধরনের গল্পের চর্চা করেন যেটাকে সিকোয়েন্স বলা যেতে পারে— জাস্ট আমরা যতটুকু ঘুরে আসলাম এতটুকুকেই তারা কোনো একটা কিছুর সঙ্গে যুক্ত করে দিতে চায়— এতটুকুই। সেই গল্পের আকার ক্ষুদ্র হয়, এগুলোকে অণুগল্প বলে কেউ কেউ। কিন্তু অণুগল্প এবং সিকোয়েন্সধর্মী গল্পের মধ্যে কিন্তু আবার পার্থক্য আছে। এই ব্যাপারগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?
রবিশংকর বল : দেখো, এগুলো তো খুব নতুন কিছু নয়। ফ্রান্সে একসময় এই ধরনের সিকোয়েন্সিয়াল লেখালেখি হয়েছে। তারপর আমাদের পশ্চিমবাংলায় শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য বলে যে আন্দোলনটা একসময় হয়েছিলো— শেখর বসু, রমানাথ রায়, অতীন্দ্র পাঠক, অমল চন্দ্র এরা করেছিলেন।


জাহিদ সোহাগ : শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য বিষয়টা আসলে কী? 
রবিশংকর বল : এই যে সিকোয়েন্সিয়াল সাহিত্য— মানে আমি খুব গভীরে যাবো না— ওদের বক্তব্য হচ্ছে, মানুষের জীবনে গভীর কোনো তাৎপর্য নেই, ফলে মানুষের জীবন এইরকম সিকোয়েন্সিয়াল। এই রকমভাবেই ওরা লিখেছেন। তো, এই ঘটনাগুলো আগেও ঘটেছে। ধরা যাক, জাপানে একটা অদ্ভুত ধরনের লেখা আছে যেটাকে বলা হয় ‘হাইবুন’। সেটা সিকোয়েন্সিয়াল লেখা।

 

জাহিদ সোহাগ : হাইবুনের ব্যাপারটা কী?
রবিশংকর বল : হাইবুন হল এক রকমের গদ্য। তুমি নিশ্চয় জানো হাইকু বলে এক রকম কবিতা আছে যেটা তিন লাইনে লেখা হয়। এরকম হাইবুন এক ধরনের গদ্য যেটা একটা হাইকুতে গিয়ে শেষ হয়। ওইরকম সিকোয়েন্সিয়াল আরকি। এরকম লেখালেখি তো অনেক হয়েছে। হতেই পারে— এমন একটা লেখা তো হতেই পারে। 

 

জাহিদ সোহাগ : আমি সময়ের কথা বলছিলাম। মানুষের পাঠের সময় সংকুচিত হয়ে আসছে কিনা?
রবিশংকর বল : পাঠের সময় শুধু না। এখনকার জীবন-যাপনের যে পদ্ধতি— ধরো আজকের তরুণ প্রজন্মের যে জীবন-যাপন তাদের বেশির ভাগের চাকরি নেই বা তারা চাকরি করে বিপিওতে বা কল সেন্টারে যেখানে দীর্ঘসময় তাদের চাকরিতেই কেটে যায়। তাদের কাছে খুব গভীর অর্থবহ কিছু হয়তো আসে না— আমার মনে হয়। জীবনটাকে নিয়ে তেমন ভাববার মতো সময়ই তারা পায় না হয়তো। হয়তো স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সারাদিন চাকরি করে চার-পাঁচ ঘণ্টার জন্য রাত্রিবেলা হয়তো তারা শুতে আসে তারপর আবার সকালবেলা বেরিয়ে যায়। এখানে তাদের কাছে জীবনের যে কোশ্চেনগুলো— যেমন আমি কোত্থেকে এসেছি, কেনো এসেছি, আমার জীবনের অর্থ কী— এই কোশ্চেনগুলো অর্থহীন হয়ে গেছে আজকাল। এই জায়গা থেকে সিকোয়েন্সিয়াল গল্পগুলো তৈরি হতে পারে। কারণ তার জীবনে তো জাস্ট কতগুলো সিকোয়েন্সই পড়ে আছে। ফলে একজন লেখক সেটাকেও এক্সপ্লোর করতে পারেন। সেটা থেকেও নতুন কোনো আখ্যানের জায়গায় আমরা পৌঁছুতেই পারি।

 

জাহিদ সোহাগ : একটা কথা বললেন যে জীবনের অর্থ হলো সন্ধান করা, জীবনকে বোঝা, নিজেকে বাজিয়ে দেখা। এই ব্যাপারগুলো যারা শিল্পসাহিত্য চর্চা করে তাদের কাছে একটা বড় প্রশ্ন। এটাকে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে চায়। শেষ পর্যন্ত অনেকে অর্থহীনতাই খুঁজে পেয়ে হয়তো জীবনের প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ে। আপনার কাছে প্রশ্ন, আপনি নিজের জীবনটাকে কীভাবে দেখেন? আপনার নিজের জীবনের জিজ্ঞাসা কী? জীবনটাকে কি আপনি ইতিবাচক জায়গা থেকে কিংবা কীভাবে দেখেন?
রবিশংকর বল : দেখো, জীবনে আমি যখন থেকেই সচেতন হয়েছি তখন থেকেই নিজেকে খুঁড়তে খুঁড়তে চলেছি। এটা এখানে বলার মতো জায়গা নয় যে আমার জীবনযাপনের যে ইতিহাস সেই ইতিহাসটা যদি কোনোভাবে বর্ণনা করা যায় তবে দেখা যাবে যে তার মধ্যে একটা খনন প্রক্রিয়া ছিলো। এই খোঁড়াটা আমার কাছে জরুরি ছিলো। জীবনের বড় কোনো অর্থ আছে কিনা কিংবা কী অর্থ সেটা আমি এখনো জানি না। কিন্তু এটুকু আমি বলতে পারি— আমার বেঁচে থাকতে ভালো লাগে। আমার প্রিয়জনদের সঙ্গে, আমার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বেঁচে থাকতে আমার ভালো লাগে। আমার প্রিয় বইয়ের সঙ্গে, আমার প্রিয় গানের সঙ্গে। সেই অর্থে বলতে পারো যে বেঁচে থাকার প্রতি খুব সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই আমি বেঁচে আছি।


জাহিদ সোহাগ : জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন,“অর্থ নয়, বিত্ত নয়, স্বচ্ছলতা নয়/ আরো এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে।”—এটা বোধহয় তাকে অনেক বেশি তাড়িত করতো।
রবিশংকর বল : সেটা আমাদেরও করে। কিন্তু...

 

জাহিদ সোহাগ : তার মধ্য দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। অর্থহীনতাকে অস্বীকার করা। 
রবিশংকর বল : তার মধ্য দিয়ে একজন জীবনানন্দ দাশ হতে পারে যে জীবনানন্দ দাশ ভয়ঙ্করভাবে আক্রান্ত হন, মানে তার আসলে কোনো বর্ণ থাকে না, সে কোথাও মুখোশ পরতে জানে না— যেটা আমরা জানি। আমরা বর্ণ জোগাড় করে নিই, আমরা মুখোশ পরতে জানি— যেটা একজন জীবনানন্দ দাশ হয়তো সারা জীবনেও পেরে ওঠেন না। সেটা খেলা করে— সেই ক্লান্তিটা খেলা করে, কিন্তু আমরা সেটাকে চেপে রাখি।

 

জাহিদ সোহাগ : তার মানে যত রকম মুখোশ, যত রকম বর্ণ দিয়ে আমি নিজেকে ঢেকে রাখতে পারি তত বেঁচে থাকাটা আমার পক্ষে ইজি হয়ে যাচ্ছে? 
রবিশংকর বল : হ্যাঁ।

 

জাহিদ সোহাগ : আপনার দোজখনামাআয়নাজীবন এক ধরনের লেখা। প্রথমটা তো দোজখনামা?
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, প্রথম দোজখনামা।

 

জাহিদ সোহাগ : এটা কীভাবে আসলো? গালিব বা মান্টোর জীবন কী আপনাকে কোনোভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলো?
রবিশংকর বল : সেই অর্থে প্রেরণা এখন আর কাজ করে না।

 

জাহিদ সোহাগ : মানে, কেনো লিখলেন?
রবিশংকর বল : দোজখনামা লেখার আগে আমি একটা উপন্যাস লিখি। সেটার নাম ছায়াপুতুলের খেলা। তুমি সেটা পড়েছ কিনা আমি জানি না। এটা ২০০৭-এ লেখা সম্ভবত। ছায়াপুতুলের খেলা থেকে আমার লেখার গতিপথটা বদলাতে থাকে। আমি এর আগে অনেকদিন ধরে যে গল্প-উপন্যাসগুলো লিখে যাচ্ছিলাম সেই গল্প উপন্যাসগুলোর মুখোমুখি বসে আমি কোথাও এই লেখালেখিগুলোর এক ধরনের লিমিটেশন দেখতে পাচ্ছিলাম। লিমিটেশনগুলো এমন যে— সেই লেখাগুলোর মধ্যে হয়তো অনেক রকম ক্রাইসিস আছে, কোয়েস্ট আছে কিন্তু সাম হাউ সেটা একটা মিডলক্লাস পরিমণ্ডলের মধ্যে আটকে আছে। ছায়াপুতুলের খেলা লেখাটা আমি শুরু করি— এটাকে এক ধরনের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসই বলা যায়। এই কাহিনির কথকের কোনো নাম নেই। সে তার বাবা, তার মা, তার জীবনের কাহিনি বলে যাচ্ছে। এবং সে প্রায় একটা ইডিয়েট টাইপের ছেলে আরকি— মানে ইডিয়টের যে চরিত্র দস্তয়েভস্কির ওইরকম। সে স্মৃতির মধ্যেই বাঁচে। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে আমার লেখার ধরনটা এমনকি ন্যারেটিভটাও বদলাতে শুরু করে। সেখানে একটা চ্যাপ্টার আছে যেখানে দিল্লী যখন অধিকার করে ফেলেছে ইংরেজরা তখন মির্জা গালিব তার এক বন্ধুকে চিঠি লিখছে— কী করে এই দিল্লীতে বেঁচে থাকবো।

 

জাহিদ সোহাগ : সিপাহি বিদ্রোহের পর পর?
রবিশংকর বল : সিপাহি বিদ্রোহের পর পর। আমি কী করে এই দিল্লিতে বেঁচে থাকবো? আমার তো কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। নবাবরা মারা গেছে। তাদের বিবি বাচ্চারা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে বেড়াচ্ছে, এ কি একটা জীবন? এরকম একটা চ্যাপ্টার ছিলো। আর সে সময় আমি গালিব নিয়ে খুব বুদ হয়ে ছিলাম। গালিবের জীবনটাকে দেখছিলাম উল্টেপাল্টে নানাভাবে, তার চিঠিপত্র পড়তে পড়তে, তার বায়োগ্রাফি পড়তে পড়তে, তার গজল পড়তে পড়তে। কোথাও গালিবকে নিজের সঙ্গে একটা আইডেন্টিফাই করতে পারছিলাম। এই কলকাতা শহরটা তো বদলে যাচ্ছে— যেই কলকাতা শহরকে আমি আমার জন্মের পর থেকে আমার শৈশব থেকে মোটামুটি আশি সাল অব্দি আমার পরিচিত কলকাতাকে দেখেছিলাম— সেই কলকাতা বদলে যাচ্ছে। কোথাও গালিবের সঙ্গে আমার একটা...

 

জাহিদ সোহাগ : একটা সিমিলারিটি আছে?
রবিশংকর বল : একটা সাদৃশ্য অনুভব করছিলাম। মানে তার মানসিকতার সঙ্গে। তখন আমি ভাবলাম যে গালিবকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা করি। তো সেই লেখাটা অনেকটা লেখাও হয়। তো লিখতে লিখতে সেই সময় আমি আবার ফের মান্টো পড়তে শুরু করি। মান্টোর বায়োগ্রাফি ইত্যাদি খুব ডিটেইলে তখন পড়তে থাকি। দেখতে পাই যে মান্টোরও খুব প্রিয় কবি ছিলেন গালিব। গালিবকে নিয়ে একটা সিনেমা হয়েছিলো ভারতবর্ষে। সেখানে ভারতভূষণ গালিবের চরিত্রে অভিনয় করেছিলো, সুরাইয়া। সেই সিনেমাটা প্রথম ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পায়। কিন্তু ছবিটা যখন রিলিজ করে মান্টো তখন পাকিস্তান চলে গেছে। তখন আমার মাথায় এলো, আচ্ছা এমন কিছু ভাবা যায় কিনা যে, মান্টো একটা উপন্যাস লিখছেন গালিবকে নিয়ে আর সেই উপন্যাসের বয়ানটা লিখছি আমি। ফলে আগের লেখা যতোটা লেখা হয়েছিল সবই আমাকে ফেলে দিতে হলো।

 

জাহিদ সোহাগ : কতখানি লিখেছিলেন?
রবিশংকর বল : একশো পাতার মতো লেখা আছে। ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে আমি লেখাটা শুরু করলাম। আর মান্টোর সঙ্গে আমি কোনোভাবে একটা রিলেট করেছি। তারপর লেখাটা যখন শুরু হয়ে গেল তখন আমি প্রতিটা ইনস্টলমেন্ট— মানে পুরোটা উপন্যাস একসঙ্গে জমা দিইনি। প্রতিটা ইনস্টলমেন্ট লিখতাম সপ্তাহে। তো সেরকম দুটো ইনস্টলমেন্ট যখন বেরিয়ে গেছে সেই সময় আমার মদ্যপান খুব বেড়ে গিয়েছিলো এবং আমাকে একটা রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে রাখা হয়েছিল। আমি ওখানে বসেই কিস্তি পাঠাতাম উপন্যাসের। ওখানে বসেই লিখতাম। সেই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে বসে আমি গালিব এবং মান্টোর মতো মানুষদের যে কী রকম একাকীত্ব হতে পারে তা বাস্তবে অনুভব করলাম।

 

জাহিদ সোহাগ : মানে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া...
রবিশংকর বল : হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া। যেটা নিয়ে আমি পরে এটা ছোট উপন্যাস লিখি— চন্দ্রাহতের কুটির। সেই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারটাকে নিয়ে শুধু, সেখানে থাকা লোকগুলোকে নিয়ে। এইভাবেই লেখা হয়ে গেল।


জাহিদ সোহাগ : দুই জনকে দুই জায়গায় কবরে শোয়ানোর এই কনসেপ্টটা কীভাবে আসলো?
রবিশংকর বল : এটা মাথায় এসে গিয়েছিলো আরকি। জাস্ট ফ্লাশ করেছিলো। তুমি কবিতা লেখো, তুমি জানো যে আর আমি কবিতা পড়তেই বেশি ভালোবাসি— শুধু কবিতা নয়, যেকোনো সৃষ্টির ক্ষেত্রে তুমি দেখবে কতগুলো জিনিস ফ্লাশ করে। যেগুলোর তোমার কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই। তুমি নিজেই বলতে পারবে না কেনো করলে তুমি। 

 

জাহিদ সোহাগ : সেই যুবকটা যে অনুসন্ধান করতে চায়, মানে কথক, যে ভাষা শেখার জন্য একজন মহিলার কাছে যায়। মহিলাটা সুন্দরীও। আমরা তো আশা করছিলাম যে তার সাথে কথকের একটা প্রেমের সম্পর্ক হয়ে যাবে। এটাকে আপনি সচেতনভাবে কেনো এড়িয়ে গেলেন? তারা তো একে অপরের অন্তর্জগত বুঝে ফেলেছিল।
রবিশংকর বল : আমার উপন্যাসটা তো এদের নিয়ে। ন্যারেটরকে নিয়ে নয়। আর বাস্তব কথা যদি বলতে বলো, আমি তার কাছে যখন উর্দু শিখতে গেলাম তার তিনমাসের মাথায় তার বিয়ে হয়ে গেল। 

 

জাহিদ সোহাগ : উপন্যাসে যতোখানি সিপাহি বিদ্রোহ বা দেশভাগের কথা বলা হয়েছে— এই প্রসঙ্গটা কিন্তু তাদের জীবনের শেষের দিকে— পরিণতির দিকে। উপন্যাসের শেষের দিকে হয়তো শেষের ২০ পৃষ্ঠার মধ্যে এই ঘটনাগুলো এসেছে যে, ভারতবর্ষ ওলটপালট হয়ে গেল— দুজনের জীবনেই। তা থেকে ধারণা করা যায় যে এই উপন্যাসে আপনি শুধুমাত্র গালিব আর মান্টো এই দুটো জীবনকেই বুঝতে চেষ্টা করেছেন— ততটা সিপাহি বিদ্রোহ বা দেশভাগ নয়।
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, বুঝতে চেষ্টা তো করেছিই, তাছাড়া আমার কাছে আরো একটা বিষয় ছিলো যে, এরা দুজনেই ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট। এই দুজন ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট তাদের সময়ে যে ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল এই ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারা কীভাবে নিগৃহীত হচ্ছে এবং সেই ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনফ্রন্ট করেও কীভাবে তাদের লেখা চালিয়ে যাচ্ছে, সেটা আমার কাছে বোঝা জরুরি বিষয় ছিলো, তার কারণ আমাকেও আজকে সেরকম অনেক ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানের কাছে নিগৃহীত হতে হয় এবং আমাকে সে লড়াইটা এমনভাবে চালাতে হয় যে, সেই ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানের কাছে যেনো আমি আবার এক্সেপ্টেডও হই। এই খেলাটা আমি বুঝতে চাইছিলাম। 

 

জাহিদ সোহাগ : মানে, মোটকথা ক্ষমতা যেনো আপনাকে গ্রাস করতে না পারে।
রবিশংকর বল : হু, কিন্তু আমাকে তো ক্ষমতার বৃত্তে কোনো না কোনোভাবে ঢুকতেই হবে। পুরো বিষয়টাই তো একটা বাণিজ্যিক জায়গা তৈরি হয়ে আছে। আমি তো আর আজকে বিশ্বভারতী বানাতে পারবো না।

 

জাহিদ সোহাগ : না, সেটাতো সম্ভব না। এই উপন্যাসটা পাঠকপ্রিয়তা মানে লেখাটা সাড়া পাওয়ার পর কি আয়নাজীবন লেখা শুরু করলেন?
রবিশংকর বল : না, আমি ওই দোজখনামা যখন লিখছি— দোজখনামার বহু অংশে রুমির রেফারেন্স আছে— তখন থেকেই আবার রুমি পাঠ শুরু হয়ে গেছে। মানে আমি চাইছিলাম এমন দুটো উপন্যাস— যে দুটো উপন্যাসের একটা হচ্ছে ভয়ঙ্কর দহনের উপন্যাস, আর একটা উপন্যাস হচ্ছে ভয়ঙ্কর শান্তির উপন্যাস। আমি রুমিতে সেই শান্তির উপন্যাসটার কাছে পৌঁছুতে চেয়েছি।

 

জাহিদ সোহাগ : সুফিবাদে যেমন ফানাফিল্লাহ বাকাবিল্লাহ ব্যাপার আছে সেটা রুমির মধ্যেও আছে। এরপর এই ধাঁচের আর কোনো কাজ করেছেন?
রবিশংকর বল : না, এরপর আর কাজ করিনি। এক অর্থে করিনি— সেটা হচ্ছে যে আমাদের বাংলা সাহিত্যে— আমি পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের কথা বলছি, বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিমণ্ডল তো আমি খুব বেশি জানি না— পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যে সবসময় লেখককে কোনোভাবে দেগে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যেমন আমার দোজখনামা যখন বের হয়— আয়নাজীবন তো পরে বের হয়, তখন আমার অনেক বন্ধুবান্ধব— এখনও যারা আমার বন্ধুবান্ধব— যারা আমার লেখা খুব পছন্দ করতো এবং অন্যান্য পাঠকও— তারা দোজখনামাকে একসেপ্ট করতে পারেনি। আমার দোজখনামার পাঠক একেবারে নতুন পাঠক। একসেপ্ট করতে পারেনি তার কারণ হচ্ছে তারা আগের রবিশংকর বলের সাথে মেলাতে পারছিলো না। তো এই রকমভাবে আমি আবারও একটা স্ট্যান্ট হয়ে যেতে চাই না যে রবিশংকর বল শুধু এই নিয়েই লেখে। ফলে আমি গতবছর যে উপন্যাসটা লিখেছি সেই উপন্যাসটা আজকের সারা পৃথিবীর একটা।

 

জাহিদ সোহাগ : কোনটা, জিরো আওয়ার?
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, জিরো আওয়ার। যেটা সন্ত্রাসবাদ, একজন কবির সঙ্গে— ওখানেও একজন কবির সঙ্গে পাওয়ারের রিলেশনই— মানে পাওয়ারের রিলেশনটা সবসময় থেকে যাচ্ছে— সেটা গালিবের সময় হোক, মান্টোর সময় হোক কিংবা এই সময় একজন কবির ক্ষেত্রে হোক। এই ব্যাপারটাকে ধরা আমার কাছে খুব জরুরি। তাকে পাওয়ারের মধ্যে থাকতে হচ্ছে কিন্তু পাওয়ারটাকে সে ইউটিলাইজ করছে আবার একইসঙ্গে ইউটিলাইজড্ হচ্ছেও— দুটোই একইসঙ্গে ঘটছে। তার মধ্য দিয়ে কীভাবে ফিল্টারড্ হয়ে তার লেখাটা বের হচ্ছে।

 

জাহিদ সোহাগ : মানে, আপনার এই কথা থেকে বলা যায় যে আপনি পুরোপুরি এন্টি-এস্টাবিলিশমেন্টবাদী না?
রবিশংকর বল : আমি একদমই এন্টি-এস্টাবিলিশমেন্টবাদী নই। কিন্তু আমি সেই অর্থে— ধরা যাক আমাদের হাংরি লিটারেচার, সুবিমল মিশ্র— এদের অর্থে আমি এন্টি-এস্টাবিলিশমেন্টবাদী নই যে, আমি শুধুমাত্র দু’একটা খবরের কাগজের প্রতিষ্ঠানকে এস্টাবিলিশমেন্ট মনে করি না। আমি মনে করি আমার পরিবার একটা এস্টাবিলিশমেন্ট, আমি মনে করি আমি নিজে একটা এস্টাবিলিশমেন্ট। আমার নিজের ভেতরে এমন কিছু যা আমাকে অনেককিছু বলতে বাধা দেয়। সেটি কি আমি ভাঙতে পেরেছি আজ অব্দি? আমার মনে আছে, আমি মতি নন্দীর একটা ইন্টারভিউ করতে গিয়েছিলাম কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য। তো মতিদা আমাকে বলেছিলেন যে, ‘আমি অনেককিছু লিখে যেতে পারলাম না। এই কারণে লিখে যেতে পারলাম না যে, যদি লিখতাম তাহলে আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, আমার চারপাশের লোকজন আমার দিকে ঢিল ছুড়তো।’ তো, আমার ভেতরেই এই যে ব্যারিয়ারগুলো কাজ করে, দ্যাটস্ আ পাওয়ার। ওইখানেই তো এস্টাবিলিশমেন্ট লুকিয়ে আছে। এস্টাবিলিশমেন্ট অত সহজ না যে আমি দুটো পত্রিকাকে গালাগাল দিলাম বা বইমেলায় আলাদা টেবিল নিয়ে বসে নিজের বই বিক্রি করলাম— এটা এস্টাবিলিশমেন্ট বিরোধিতা নয়। এই লড়াইটা আরো কঠিন। সেটা— যদি ফুকো পড়া যায় তাহলে বোঝা যাবে যে, ক্ষমতা তোমার কাছে খুব ভালো চেহারায় হাজির হয়। মানে ক্ষমতা আজকে কিন্তু আর তোমাকে অত্যাচার করে না। ক্ষমতা তোমাকে কী করে? ক্ষমতা তোমাকে পুরস্কৃত করে আজকে।

 

জাহিদ সোহাগ : বুঝতে চাই ব্যাপারটার।
রবিশংকর বল : আবার সেই পুরস্কারটা তোমাকে গ্রহণও করতে হবে। তার কারণ তুমি এমন একজন থার্ড ওয়ার্ল্ডের, যাকে কোনো প্রকাশক ঠিকঠাক রয়্যালটি দেয় না— দু’একজন প্রকাশক ছাড়া— যাকে একটা চাকরি করতেই হয়। সে লেখার জন্য এমন কোনো সময় পায় না যে, সে একবছর ধরে একটা উপন্যাস লিখবে— তার জন্য কেউ টাকা যোগাবে। ফলে তোমাকে সেই পুরস্কারটা নিতেও হয়— হয়তো বিরাট অঙ্কের একটা টাকা। কিন্তু সেই পুরস্কারটা নিয়েও তারপর তুমি কীভাবে নিজের লেখাটার দিকে যাবে— এই লড়াইটা হচ্ছে আমার কাছে এন্টি-এস্টাবিলিশমেন্টর লড়াই। দূরে সরে থাকাটা আমার কাছে এন্টি-এস্টাবিলিশমেন্টের লড়াই নয়। 

 

জাহিদ সোহাগ : সেটা তো আপোসকামিতাও বলা যায়, মানে দূরে সরে যাওয়াটা?
রবিশংকর বল : না, আমি আপোসকামিতাও বলছি না। এটা হয়তো তাদের কাছে একটা কৌশল বলে মনে হয়। দেখো, আমি চাই আমার লেখা আরো কিছু বেশি পাঠক পড়ুক। 

 

জাহিদ সোহাগ : সব লেখকেরই আকাঙ্ক্ষা থাকে এটা।
রবিশংকর বল : আমি কমলবাবুর মত বিশ্বাস করি না যে, আমার পাঁচজন পাঠক হলেই চলে যায়।

 

জাহিদ সোহাগ : একজন রবিশংকর বলকে বুঝতে চাইলে বা পড়তে চাইলে আপনি আপনার কোন কোন উপন্যাসের নাম বলবেন?
রবিশংকর বল : এটা বলা খুব কঠিন।

 

জাহিদ সোহাগ : মানে আমি বলছি এই কারণে যে, আমাদের বাংলাদেশে রবিশংকর বলকে চেনা হচ্ছে দোজখনামা দিয়ে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন? মানে এখানেও একটা ট্যাগ আছে।
রবিশংকর বল : এটা বলা কঠিন, তবু যদি বলো তবে আমি বলব, আমার মধ্যরাত্রির জীবনী উপন্যাসটা পড়া উচিত, বাসস্টপে একদিন উপন্যাসটা পড়া উচিত, এখানে তুষার ঝরে উপন্যাসটা পড়া উচিত। স্মৃতি ও স্বপ্নের বন্দর, ছায়াপুতুলের খেলা অবশ্যই। এই কটা লেখা অন্তত। আর পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন এই লেখাটা।

 

জাহিদ সোহাগ : মানে ৫-৭ টা লেখা পড়লেই আপনার মেজাজটাকে ধরা যাবে। পশ্চিমবঙ্গে আপনার সমসাময়িক লেখক-বন্ধু কারা? মানে কাদের সঙ্গে আপনার আড্ডা হয়, শেয়ার হয়, গল্প হয়?
রবিশংকর বল : সেই অর্থে আমি তেমন আড্ডা-ফাড্ডা মারি না এখন আর। কোথাও যাই না। অফিস করি, অফিস করে বাড়ি ফিরি, হয়তো লিখি, পড়ি বা গান শুনি— এইটুকুই। কদাচিৎ সাহিত্যসভায় যাই। কফি হাউজে যাই না।


জাহিদ সোহাগ : আপনাকে দেখেও মনে হয় যে, আপনি মঞ্চে ওঠার লোক না— মানে মঞ্চ আলোকিত করার স্পৃহাটা নেই। আমি আপনাকে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে জিজ্ঞেস করবো না, জাস্ট বাংলাদেশকে আপনি কীভাবে ফিল করছেন— এইটা জানতে চাই। এই নিয়ে তো প্রায় তিন চারবার আসলেন। যদিও আপনি খুব বেশি ঘুরতে পারেননি।
রবিশংকর বল : বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বা রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে তো আমি বলতে পারবো না।

 

জাহিদ সোহাগ : না, সেসব বিষয় জানতেও চাই না। জাস্ট আপনি কেমন দেখলেন?
রবিশংকর বল : মানে, আমি যেসব মানুষদের সঙ্গে থেকেছি এই দু’তিনবারে, তারা যে উত্তাপটা আমাকে দিয়েছে সেটা আমার কাছে খুব মূল্যবান— যে উত্তাপটা আমি কলকাতায় পাই না। আমি কোথাও গিয়ে থাকি না। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে কোনো অনুষ্ঠানে যদি দূরে কোথাও যাই, হয়তো একদিনের জন্যই যাই। বাংলাদেশে সারাক্ষণ বাংলা ভাষাটা শুনতে পাচ্ছি এটাও আমার কাছে খুব আনন্দদায়ক। যেই বাঙ্গাল ভাষাটা আমার বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যেহেতু আমার কলকাতায় জন্ম এবং শিক্ষার পরিবেশ তেমনই— তাই আমার টানে আর আসে না সেটা। কিন্তু এটা শুনতে আমার ভালো লাগে। আমার বয়স্ক আত্মীয় পরিজন যেরকম বলেন— সেটা শুনতে আমার ভালো লাগে। সেই ভাষাটাকে আমি খুব এনজয় করি। তার কারণ আমি কলকাতায় বসে তো চারপাশে একটা বহুপ্রকাশে মিশ্রিত ভাষা শুনতে পাই— রাস্তাঘাটে, মলে অবশ্য যাই না— যদিও যাই কদাচিৎ। ধরা যাক যে লাইনগুলো শুনি রেডিওতে, এফএম চ্যানেলগুলোতে, যে লাইনগুলো শুনি কখনো কখনো— বাংলা ভাষাকে ধর্ষিত করা হয় সেখানে— অন্তত সেই জায়গা থেকে, তোমাদের এখানে ভালো লাগে। আমার কাছে আনন্দদায়ক।

 

জাহিদ সোহাগ : আমাদের এখানেও এফএম রেডিওগুলোর একই অবস্থা। মানে এই চেষ্টাটা চলছে বাংলাদেশে এখন।
রবিশংকর বল : আসলে এফএম-টেফএম করে তো ভাষাকে বদলানো যায় না। ভাষা ততদিন ঠিকঠাকভাবে বেঁচে থাকে যতদিন মুখে থাকে। তোমাদের এখানে তো এটা মুখে মুখে আছে তাই এফএম করে কিছু হবে না। আর এটাতো আমাদের ওখানে মুখ থেকেই চলে গেছে। 

 

জাহিদ সোহাগ : একটা বিষয় দেখেন যে, আমাদের এখানে যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে আঞ্চলিকতাকেও রক্ষা করে। আমরাও সচেতনভাবে কখনোই আমাদের আঞ্চলিকতা পরিহার করি না।
রবিশংকর বল : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

 

জাহিদ সোহাগ : আঞ্চলিক উচ্চারণটাকে রক্ষা করি আঞ্চলিকতার মাধ্যমে। 
রবিশংকর বল : এটা আমার মনে হয়েছে। ধরা যাক— আমি এই কয়েকবার এসে বাংলাদেশের অনেক উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীর সাথেও তো আমার আলাপ হয়েছে— সেই রকম রাজকর্মচারীদের সাথে কলকাতাতেও আমার আলাপ আছে— এখানে, মানে বাংলাদেশে তারা যে স্বচ্ছন্দে বাংলা ভাষায় কথা বলেন এবং আঞ্চলিকতা— প্রত্যেকে তার নিজের নিজের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট বজায় রেখে— সেটা আমার খুব ভালো লাগে। যেটা আমি কলকাতায় বসে পাই না।

 

জাহিদ সোহাগ : কিন্তু এই ভাষাটাও আবার লেখ্যরূপের মধ্যে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কোনো কোনো লেখকের লেখায় দেখা যায়। আমাদের এখানে প্রমিত বাংলা বলে একটা কথা আছে। সেটা অনেকাংশে কেতাবি চলিত ভাষার মত।
রবিশংকর বল : দেখো, প্রমিত বাংলা বলে তো কিছু হয় না সত্যিকারে। তুমি যদি বলো, কলকাতার লোকজন যে ভাষাটায় কথা বলে তাকেও বলে প্রমিত বাংলা। ধরা যাক, রবীন্দ্রনাথের গদ্যকে যদি আমরা প্রমিত বাংলা বলি— সেই বাংলাটা হচ্ছে নদীয়া জেলার বাংলা। এখন পশ্চিমবঙ্গে আরো অনেকগুলো জেলা আছে। তাদের ভাষার যে বৈশিষ্ট সেটা সম্পূর্ণই আলাদা। কিন্তু নদীয়ার ভাষাটাকে প্রমিত বাংলা বলে দেগে দেওয়া হয়েছে।

 

জাহিদ সোহাগ : এটা কি রবীন্দ্রনাথ চর্চা করেছেন বলেই?
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, আরো বিকাশ হয়েছে। ফলে ওটা যতটা না আনা যায় ততটাই ভালো বলে আমার মনে হয়।

 

জাহিদ সোহাগ : আপনার নিজের গল্প উপন্যাসে এই ভাষার ব্যপারটাকে কীভাবে মীমাংসা করেন?
রবিশংকর বল : দেখো, সত্যিকথা বলতে কি— আমি কলকাতায় বড় হওয়া একজন মানুষ। ফলে আমার কাছে ওই প্রমিত বাংলাটাই ছিলো। আবার এদেশি যারা কলকাতায়— যারা পশ্চিমবঙ্গের আদি নিবাসী যারা কলকাতার তাদের বাংলাটা আবার— ধরো পূর্ববঙ্গের যারা বাঙালি— পূর্ববঙ্গ থেকে গিয়ে যারা ওখানে থেকেছে— তাদের বাংলার চেয়ে আলাদা। তাদের কলকিয়ালটা এবং অনেককিছু আলাদা— কলকাতাইয়ান করা আছে তাদেরটা। কিন্তু পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা ওখানে মোটামুটি— হয়তো বাড়িতে কথা বলে— কিন্তু সেই প্রমিত বাংলাটাকেই— সেই নদীয়ার ভাষাটাকেই একসেপ্ট করেছে। আমার কাছে কোনো তো অল্টারনেটিভ নেই। এই বাংলা ছাড়া আমি অন্য কিছু জানি না। আমাকে যদি বলতে হয় তবে— আমাদের ওখানে অনেকেই লেখেন— চাষাভূষারা বাকুড়ার ভাষায় কথা বলে, কেউ পূর্ণিয়ার ভাষায় কথা বলে— ওরা হয়তো চাকরিসূত্রে কিছুদিন কেউ বাকুড়ায় থেকেছে, কেউ পূর্ণিয়ায় থেকেছে— তারা ডায়ালেক্ট ব্যবহার করে— আমি আসলে এই ধরণের জিনিসে বিশ্বাসী নই। যদি স্বতস্ফূর্তভাবে একটা ভাষা না আসে— আমি চরিত্রের মুখে একটা ডায়ালেক্ট বসিয়ে দিলাম— সেটা ভুলভাল ডায়ালেক্ট বসিয়ে দিলাম তাহলে। এই জিনিসটা আমি বিশ্বাস করি না ফলে আমার পক্ষে ওটা লেখাও সম্ভব নয়। আর আমি কী করে লিখবো তাদের কথা যাদের জীবনের সঙ্গে আমার কোন সংযোগই নেই? আমি দশবছর-বিশবছর একটা গ্রামে চাকরি করে তাদের জীবন নিয়ে লেখার অধিকারী হতে পারি না। 

 

জাহিদ সোহাগ : আসলে ভাষা তো তার মাটির সঙ্গে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সম্পর্ক।
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, তাইতো।

 

জাহিদ সোহাগ : দাদা, আপনার পূর্বপুরুষ তো বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চলে গেলেন। নিশ্চয় আপনি বাংলাদেশে আসার আগে আপনার পরিবারে বাংলাদেশ নিয়ে আলাপ হয়েছে, বাবা-ঠাকুরদা এরা নিশ্চয় গল্প করেছেন— তো তাদের মুখে শুনে শুনে বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার পূর্বপুরুষদের মাটির সম্পর্কে কী ধরনের প্রি-কনসেপ্ট ছিলো?
রবিশংকর বল : দেখো, বাংলাদেশ থেকে আমার বাবা তো চলে গেছেন স্বাধীনতার আগে। আমার বাবা, জেঠা...

 

জাহিদ সোহাগ :  স্বাধীনতা মানে দেশভাগ?
রবিশংকর বল : হ্যাঁ, দেশভাগ। দেশভাগের আগেই চলে গেছেন। তার আগে কলকাতায় কোনোমতে মাথা গুঁজে থেকেছেন। খুচরো কাজটাজ করেছেন। তারপর আমার বাবা একটা চাকরি জোগাড় করেছেন, আমার জেঠা তার পরিবার নিয়ে... রিফিউজি... যে রিহ্যাবিটেশন্স হয় সেখানে চলে যান। আমার মারও সেই অবস্থা— তিনিও বরিশাল থেকে চলে গিয়েছিলেন। তারপর মা’র জীবন কাটে বিভিন্ন উদ্বাস্তু ক্যাম্পে— বিভিন্ন জায়গায়। আমি যে একটা স্বর্ণোজ্জ্বল দেশের কথা আমার বাব-মা আমার জেঠার মুখে শুনেছি তা নয় আরকি। আমার বাবা বলতেন যে, তখন এক পয়সায় কটা ইলিশ পাওয়া যেত নাকি— তখনও বাংলাদেশের মুসলমান চাষীরা ইলিশ খেতে পেতো না। কোনোদিন যদি এক টুকরো ইলিশ মিলতো তবে সেইটা দিয়ে চার বেলা ভাত খেতো আরকি। মানে ইলিশটা পাশে রেখে সেই গন্ধে ভাত খেতে খেতে চারবেলা তারা ভাত খেতো। তবে কতগুলো জিনিস আছে— যেটা বললাম আরকি— বোঝানো যায় না। যেমন আমি যখন আমাদের স্বাধীনতা— মানে ১৯৪৭— এর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গিয়েছিলাম উদ্বাস্তুরা কেমন আছে তার একটা কাভারেজ করতে। 

 

জাহিদ সোহাগ : কত সালের দিকে?
রবিশংকর বল : ৯৭ সালে। তো তখন আমি পুরো উদ্বাস্তু শিবির ঘুরে সেটার কাভারেজ করি। আমার জেঠার বাড়িতেও যাই— গিয়ে দেখি যে তারা কোনোরকমে— পুনর্বাসন সে অর্থে পায়নি আসলে। তারা টিনের একটা বাড়িতেই থাকে— কোনোরকম দলিল টলিলও পায়নি— আমার জেঠতুতো ছোটভাই— সে ট্রাক চালায়। তো আমার জেঠা খুব ভালো আবৃতি করতেন— রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করতেন। তো সেই সময় আমি যখন গিয়েছি তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো— আমি জেঠার বাড়িতে কয়েকদিন আটকে পড়ি— মানে কাজে বের হতে পারিনি আরকি— সমস্ত জায়গা বন্যায় ভেসে যাচ্ছিলো। তখন জেঠার কাছ থেকে অনেক গল্প শুনি। ওইসব মিলিয়ে মিশিয়ে অদ্ভুত একটা ইয়ে তৈরি হয় যে, আমি বরিশালে একবার যাবো— আমি জানি সেখানে এখন কিছুই নেই। আমার বাবার মুখে শুনেছি যে, আমার ঠাকুরদাদা নায়েব ছিলেন। তিনি রাতে যখন খাজনা-টাজনা আদায় করতে যাচ্ছিলেন তখন তাকে ডাকাতরা কেটে কীর্তনখোলায় ভাসিয়ে দেয়। 

 

জাহিদ সোহাগ : ঠাকুরদাকে? 
রবিশংকর বল : তখন আমার বাবা তিন-চার মাসের গর্ভে। সেখানে কিছু আছে কিনা তাও আমি জানি না। কিন্তু ওইটাইতো টান— এটাই বলতে পারো— নস্টালজিয়াও বলতে পারো— যা খুশি বলতে পারো।

 

জাহিদ সোহাগ : ভয়ঙ্কর ব্যাপার। আমি যদিও উদ্বাস্তু মানুষের জীবনের কিছুটা আাঁচ করতে পেরেছি সুনীলের আত্মজীবনীর মধ্য দিয়ে।
রবিশংকর বল : সেটা আঁচ করতে পারবে না। সুনীলের আত্মজীবনীতে আঁচ করা যায় না। আমি যেভাবে দেখেছি— তোমাকে বলি— দণ্ডকারণ্য দেখেছি— তুমি যদি যাও— সেটা পশুর জীবন আরকি। এর মধ্যে অনেকেই এখন বাড়ি-টাড়ি করে নিয়েছে। কিন্তু কতগুলো ব্যারাক টাইপের আছে। সেখানে মূলত থাকে বিধবা আর অবিবাহিত মহিলারা। তারা যে কুকুর বিড়ালের মত থাকে আরকি। তারপর মহারাষ্ট্রের গণ্ডিয়াতে আমি গেছি। মহারাষ্ট্রের গণ্ডিয়াতে একটা রিফিউজি ক্যাম্প আছে। সেখানে একটা এয়ারোড্রোম ছিল— মানে এয়ারফোর্সের যারা সৈনিক তাদের যে ব্যারাকটা— সেই ব্যারাকটাতে রিফিউজিরা থাকে এখন। কুকুর-বিড়ালের মতো থাকে। সেখানে জলে আর্সেনিক, সবার গলা ফোলা। এগুলো আমি সমস্তটা ঘুরে ঘুরে দেখেছি। তারা যে কীভাবে বেঁচে আছে— তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা দাঁড়িয়ে গেছে। তারা খুব লড়াই করেই দাঁড়িয়েছে আরকি।

 

জাহিদ সোহাগ : এটা তো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উচ্চাশার ফলে— দেশভাগটা যে হল— তারই ফলাফলে ভুগতে হতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। যেটা পেশোয়ার এক্সপ্রেস ইত্যাদি গল্পে দেখা যায় বা এই জাতীয় লেখার মধ্যে— দেশভাগের গল্প নামে একটা সংকলন আছে— সেই গল্পগুলোতে পড়েছে। মান্টোর গল্পের মধ্যেও এই উদ্বাস্তু-দাঙ্গার বিষয় তো আছে।
রবিশংকর বল : খুশবন্ত সিং-এর আ ট্রেন টু পাকিস্তানেও ।

 

জাহিদ সোহাগ : দেখা যায় যুগে যুগে রাজনীতির কাছে, রাষ্ট্রের কাছে, ক্ষমতার কাছে মানুষ পরাজিতই হচ্ছে। আমি মানুষ বলতে বোঝাচ্ছি বৃহত্তর মানুষ। এটা কি চলতেই থাকবে? এটাই কি মানুষের অনিবার্য? মানুষের কি মুক্তি নেই? মানুষের কি কোনো সম্ভাবনা নেই? শেষমেষ সৌন্দর্য নেই? স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নেই? সুস্থতা নেই? সুস্থিরতা নেই?
রবিশংকর বল : পৃথিবী যে পথে চলেছে সত্যিকারে— সেই কারণে জীবনানন্দ এই কথাটা বারবার বলতেন— “পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ”—এই অসুখটা কবে কাটবে সেটা আমরা সত্যিই জানি না। আমরা কেউই জানি না। আমরা অনেকটা মানিকবাবুর উপন্যাসের— পুতুলনাচের ইতিকথার সেই চরিত্রের মতো— কারো স্ত্রীর মতো— মানে সে নাচছে আরকি— পুতুলনাচ। 

 

জাহিদ সোহাগ : একটা জিনিস দেখা যায় যে— দেশভাগের কথা যদি বলা হয়— এই পূর্ববঙ্গ থেকে যারা গেছেন তাদের অনেকেই তো লেখক হয়েছেন— তাদের লেখালেখির মধ্যে, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে দেশভাগের একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু আমাকে যদি বলা হয় যে দেশভাগ নিয়ে আমাদের পূর্ববঙ্গের মানে বাংলাদেশের লেখকদের— বর্তমানে বাংলাদেশের লেখকরা— তাদের কী কী লেখা আছে? শুনেছি চারটা উপন্যাস নাকি আছে। নাম চারটা ভুলে গেছি— এবং সেগুলো খুবই নাম না-শোনা লেখকদের। দীর্ঘদিন সেগুলো ধুলোর নিচেই চাপা পড়ে আছে। যেহেতু পড়েই দেখিনি তাই বলতে পারবো না সেসময়ের বাস্তবতা কী। বা সচরাচর গল্পের মধ্যেও এই প্রসঙ্গটা নেই। যদিও থাকে তাহলে এরকম যে তারা ভারতে চলে গেল। কিন্তু ব্যাপারটাতো শুধুমাত্র এই পর্যায়ের না। কিংবা আজকে দেখা যাবে যে, এখানে যারা খুব প্রোপার্টির মালিক হয়ে উঠেছে— তার পেছনে হয়তো হিন্দুদের ছেড়ে দেওয়া সম্পত্তি— যেটাকে শত্রু সম্পত্তি বা এনিমি প্রোপার্টি নামে জায়েজ করা হয়েছে— সেই সম্পত্তির ব্যাপার আছে। এই বিষয়টা নিয়েও কিন্তু এখানে লেখালেখির ব্যাপারটা— গবেষণার ব্যাপারটাও ওই অর্থে কিন্তু নেই। এটা কী এখানকার লেখকদের উটপাখির মতো বালুর মধ্যে নাক গুঁজে দেওয়ার মত ব্যাপার যে, এগুলো আমরা দেখতে চাই না বা বুঝতে চাই না?
রবিশংকর বল : হয়তো তাই। আমাদের এ দু’দেশের— একটাই দেশ যেটা ছিলো— সে দু’দেশের স্বাধীনতা দিবস দু’দিনে, মানে দু’সময়ে। ফলে পুরো ব্যাপারটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। হয়তো তারা এই স্মৃতির কাছে ফিরতে চায় না— হয়তো— যদি বলি যে, এখানে তো অনেক হিন্দুও রয়ে গেছেন— তাদের মধ্যে অনেকে নিশ্চয় লেখালেখিও করেন— এবং তারা নিশ্চয় নানারকম ক্রাইসিসের মধ্যেও থাকেন সোসাইটির মধ্যে— হয়তো তাদের পক্ষেও সেটা লেখা সম্ভব হয় না। যেহেতু তারা সংখ্যালঘু এখানে। 

 

জাহিদ সোহাগ : নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে।
রবিশংকর বল : নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। এ সমস্ত জায়গা থেকেই...

 

জাহিদ সোহাগ : আবার দেখা যায় যে— সেই পাকিস্তান আন্দোলনটা— সেই আন্দোলনে সবচেয়ে বড় সমর্থনের জায়গা ছিলো কিন্তু পূর্ববঙ্গই। পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে যারা ছিলো এমন লোকজনের— কারো কারো লেখায় দেখেছি— পাকিস্তান আন্দোলন বলতে তারা কিন্তু ইসলামি স্টেট চিন্তা করেনি। তারা চিন্তা করেছে হিন্দু জমিদার, মহাজন— এদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে— কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষদের একটা অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক একটা বিকাশের কথা তারা ভেবেছে। কিন্তু আসলে পাকিস্তান আন্দোলনটা কী ছিল তারা কিন্তু তা বুঝতে পারেনি। হয়তো তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভবও ছিল না। এই পাকিস্তান আন্দোলনের পর পাকিস্তান যখন গঠিত হল তখন এই পূর্ববঙ্গের মানুষগুলোই কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলো যে, পাকিস্তান আন্দোলনটা কী আসলে। এবং যা অনিবার্য একটা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিলো। আবার দেখা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধ করে এদেশের মানুষ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করলো— আজকে মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পার হয়ে গেল— তার সুফলটা কোথায়— রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক? মানুষের মুক্তির? নেই। 
রবিশংকর বল : আমি তো দেখতে পাই নাই। সেই হতাশাকর পরিস্থিতি। 

 

জাহিদ সোহাগ : দেশভাগেরও কোনো সুফল হলো না।
রবিশংকর বল : না না, দেশভাগের তো কোনো সুফল হতেই পারে না।

 

জাহিদ সোহাগ : একটা কুফলের বীজ।
রবিশংকর বল : সবটাইতো কুফলের বীজ বপন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও বোধহয় অন্য অনেকে লোপাট করে দিয়েছে আরকি। বা বলা যেতে পারে— লোপাট করার চেয়েও বলা ভালো...

 

জাহিদ সোহাগ : মানে গায়েব করে দেওয়া আরকি।
রবিশংকর বল : গায়েব করে দিয়েছে।

 

 

//জেডএস//
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিসহ ৪৯ প্রবাসী আটক, ৪৯টি যানবাহন জব্দ
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিসহ ৪৯ প্রবাসী আটক, ৪৯টি যানবাহন জব্দ
সিঙ্গাপুর-কলম্বোর দক্ষতায় পরিচালিত হবে চট্টগ্রাম বন্দর, সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী 
সিঙ্গাপুর-কলম্বোর দক্ষতায় পরিচালিত হবে চট্টগ্রাম বন্দর, সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী 
আপনি গুলি করলে আমরা কি চুড়ি পরে বসে থাকবো, বিএসএফকে বিজিবি
আপনি গুলি করলে আমরা কি চুড়ি পরে বসে থাকবো, বিএসএফকে বিজিবি
৪১২ কোটি ৭১ লাখ টাকার টিকা ক্রয়ের অনুমোদন দিলো সরকার
৪১২ কোটি ৭১ লাখ টাকার টিকা ক্রয়ের অনুমোদন দিলো সরকার
সর্বাধিক পঠিত
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
একনেকে অনুমোদন পায়নি চীনা ইকোনমিক জোন
একনেকে অনুমোদন পায়নি চীনা ইকোনমিক জোন