বইমেলা এবং আমার আক্ষেপ

Send
খন্দকার মনিরুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:০৪, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৬, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

একটা হতাশা দিয়েই শুরু করা যাক—আমাদের প্রাণের মেলার যাত্রা শুরু একজন প্রকাশকের হাত ধরে এবং পরবর্তীকালে তার দৈর্ঘ্য বেড়েছে প্রকাশকদের হাত ধরে। কিন্তু আজ মেলা প্রকাশকদের হাতে নেই। প্রকাশকবান্ধব মেলার আয়োজন সবার আগে জরুরি, কারণ একজন প্রকাশক বা একটা প্রকাশনাই জানে পাঠকের চাহিদা কী, পাঠক কী পড়তে ভালোবাসেন। আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বইমেলায় যাই, কিন্তু সেখান থেকে কিছু শিখে আসি কিনা, কিংবা শিখে এসে সেটা প্রয়োগ করি কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আদতে একুশে বইমেলা এখন বাংলা একাডেমিরও নয়, প্রকাশকদেরও নয়, মেলা হয়ে গেছে বাংলা সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের অংশ। যার কারণে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে লেখক-শিল্পী-পাঠক এমনকি গণমানুষও যার যার অবস্থান থেকে প্রচার-প্রচারণা করেন। আমি বলতে চেয়েছি প্রকাশকবান্ধব মেলা এখনও হয়ে ওঠেনি। মেলা উপলক্ষে যে ৩০ জনের কমিটি থাকে সেখানে মাত্র প্রকাশকদের দুই সমিতির দুইজন করে মোট চারজন প্রতিনিধি থাকেন, যা খুবই নগণ্য।

যা-হোক, এবার আমার নিজের কথায় আসি—সবার আগে আমি একজন পাঠক, একজন বইপ্রেমী, পরে প্রকাশক। এই পাঠকের জায়গা থেকে মেলা নিয়ে খুব আগ্রহে থাকি কখন কীভাবে বইয়ের ঘ্রাণ নেবো, কিনবো, ঘুরবো, লেখক-পাঠকদের সঙ্গে আড্ডা দেবো। কিন্তু একজন প্রকাশকের সবক্ষেত্রে সব হয়ে ওঠে না। ভালো বই খুঁজে পাই না।

প্রায় সব প্রকাশনীই গতানুগতিক বইয়ে ঠাসা। দেখা যাচ্ছে, একই হাসান আজিজুল হকেরই গল্পসমগ্র, নির্বাচিত গল্প, গল্পসংগ্রহ ইত্যাদি নামে বই বের হয়। যার কোনো ভিত্তি নেই। হাসান আজিজুল হকের একশ গল্পই এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে, যার যার মতো, কোনো গবেষণা ছাড়াই এসব বের করে। তেমনি সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ সবার ক্ষেত্রেই। এতে করে পাঠকরা বিভ্রান্ত হন। পাঠকদের ঠকানো হয়।

এরপর যদি আমি একটু ভিন্নধারার বই খুঁজতে চাই, তাও পাই না। এই উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এর বাইরে বইমেলায় বই পাওয়া দুষ্কর। বইয়ের কোনো ভেরিয়েশন নাই। তাই মেলা নিয়ে আমি বরাবরই হতাশ হয়ে যাই। অথচ কলকাতার বইমেলা সম্পূর্ণ উল্টো।

এ সমস্যা বইমেলার না। লেখক এবং প্রকাশকেরই। আমাদের এখানে অধিকাংশ প্রকাশকের বই নিয়ে বিশদ জানাশোনা নেই, এখানে অনেকেই একজন বাইন্ডার প্রকাশক হয়ে যান, এখানে একজন ডিজাইনার প্রকাশক হয়ে যান, এখানে একজন ব্যবসায়ী প্রকাশক হয়ে যান। ‘ভাষাচিত্র’ সেদিক থেকে পাঠকদের নতুন কিছু দেওয়ার জন্য সবসময়ই চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা প্রায় সব ধরনের বইকেই গুরুত্ব দেই— আমরা সিনেমার বই প্রকাশ করি, গানের বই প্রকাশ করি, খেলাধুলার প্রকাশ বই, গণমাধ্যম নিয়ে প্রকাশ বই, চিত্রকলার বই প্রকাশ করি অর্থাৎ সৃজনশীল বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল শাখায় বই প্রকাশ করার প্রয়াস আমাদের আছে। আমরা গুরুত্ব দেই টেক্সটকে, ছোট লেখক কিংবা বড় লেখক—এ ধরনের কোনো চিন্তা মাথায় রাখা হয় না। তরুণদের গুরুত্ব দিতে গিয়ে অনেকের অনেক কথা শুনেছি। আমাদের অনেক তরুণ লেখক পড়তে রাজি না, গবেষণা করতে রাজি না, নিজের শিকড় চিনতে রাজি না, তারা শুধু লিখতে চায় আর জনপ্রিয় হতে চায়।

প্রচুর বই খুঁজি আমি। পরিশ্রমের বই। শেকড়ের বই। শেকড়ের বই বলতে এরকম হতে পারে, কেউ একজন একটা উপন্যাস লিখল যার ভিত্তি ভাওয়াল রাজ্যের কোনো চরিত্র, কিংবা সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে, কিংবা লোক উপাখ্যানকে নতুন করে দেখা এসব। তাই বইমেলা, বই, টেক্সট সবকিছু নিয়ে আমি মোটামুটি হতাশ।

আরেকটি কথা না বললেই নয়, প্রতিবার মেলা আসলেই লেখক-প্রকাশক বৈরিতা শুরু হয়। লেখকের বিরুদ্ধে প্রকাশকের অভিযোগ আবার প্রকাশকের বিরুদ্ধে লেখকের অভিযোগ। অথচ তা হওয়ার কথা ছিল না। লেখক-প্রকাশক এমনকি পাঠকও এ তিন সূত্র একত্র হয়েই একটা প্রকাশক পরিবার। যেখানে লেখক জানবে প্রকাশকের দুর্বলতা, সফলতা, ব্যর্থতা এবং সমস্যা। তেমনি প্রকাশককেও অবগত থাকতে হবে লেখক সম্পর্কে।

একে-অন্যের শিল্প-সহযোগী না হলে প্রকাশনা গড়ে ওঠে না। নাটকের যেমন শুধু অভিনেতাই সব না, এখানে নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, মেকাপম্যান, লেখক, দর্শক সর্বোপরি একটা পারফেক্ট সেট না হলে সার্থক নাটক হয় না, প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তেমন। আর তেমন হলে কারো ওপর কারো অভিযোগ থাকে না।


খন্দকার মনিরুল ইসলাম ‘ভাষাচিত্র’-এর প্রকাশক

শ্রুতিলিখন : মো. ইব্রাহিম

//জেডএস//

লাইভ

টপ