গল্পগ্রন্থ ‘সোয়েটার’-এর পাণ্ডুলিপি থেকে

Send
সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৫:৫১, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৪, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তরুণ গল্পকার সুস্মিতা জাফর-এর গল্পগ্রন্থ ‘সোয়েটার’, প্রকাশ করেছে পরিবার পাবলিকেশন্স, প্রচ্ছদ করেছেন হিমেল হক, দাম রাখা হয়েছে ২০০ টাকা। গ্রন্থমেলায় পরিবার পাবলিকেশন্স-এর ২৭০ নম্বর স্টলে পাওয়া যাবে বইটি।

বইটির মোট ২৫টি গল্পের মধ্যে পাণ্ডুলিপি থেকে একটি গল্প বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

টু-লেট

বাসা খুঁজতে গিয়ে আমার, প্লাবন, জীবন আর রাজেদের—মানে আমাদের চার বন্ধুর পায়ের ঘাম মাথায় ওঠার মত অবস্থা হয়েছে! ‘টু-লেট’ লেখা দেখলেই আমাদের চারজনের মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিন্তু বুড়ো বাড়িওয়ালা-বাড়িওয়ালি যখনই শোনেন আমরা মেডিকেল কলেজের থার্ড ইয়ারের ছাত্র, বাসাটা ভাড়া নিতে চাচ্ছি, তখনই মুখটা ভেংচি কেটে বলে ওঠেন, sorry বাবারা, আপনারা রাস্তা মাপেন, আমরা ব্যাচেলর ভাড়া দেই না। এই বলে ধড়াম শব্দে মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দেন। আর আমরাও প্রতিবারের মত রাস্তা মাপতে বেরিয়ে পড়ি। বুঝলাম আমরা না হয় ব্যাচেলর।

সেদিন কী হয়েছে শোনেন—ছোট বোন দিনাজপুর মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় আম্মু তাকে নিয়ে সেখানে বাসা ভাড়া করে থাকবেন। বাড়িওয়ালাকে এই কথা বলতেই উনি চোখ রাঙ্গিয়ে বলে উঠলেন, আমরা ফ্যামিলি ছাড়া বাসা ভাড়া দেই না! এখন মা আর মেয়ে মিলেও ফ্যামিলি হয় না, আরও মানুষ থাকা লাগবে বাড়িতে! তা হলেই বুঝুন, একটা বাসা ভাড়া পাওয়ার জন্য আমাদের দেশে কত ভোগান্তি সহ্য করতে হয়!

অবশেষে অনেক ঘোরাঘুরির পর সাততলার উপর ২ রুমের একটা বাসা খুঁজে পেলাম। এমনিতে বাসাটা ভালো। তবে উঠতে নামতে দুবেলা শ্রদ্ধেয় বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের জেরার মুখোমুখি হতে হয়। জানি না, কীভাবে কীভাবে যেন ঠিক দোতলার দরজার কাছে এলেই দরজাটা আপনা থেকেই খুলে যায়। ‘কেমন আছো বাবা?’ ফোকলা দাঁতে হেসে জিজ্ঞেস করেন তিনি।

‘জি আঙ্কেল ভালো’।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। বাইরে আজ অনেক আলো-বাতাস। তা তোমরা সবাই ভালো তো?’

‘জি আঙ্কেল। ভাল আছি।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাদের একটা কালো বেড়াল আছে। তা তোমরা ভাল আছো তো, না?’

প্রথম প্রথম রীতিমতো ভড়কে গিয়েছিলাম। ব্যাপারটা কী? আঙ্কেল বারবার একই প্রশ্ন করছেন কেন? পরে প্লাবনের কাছে জানতে পারলাম, উনি আসলে কানে কম শোনেন!

নতুন বাসাটা চিলেকোঠায় হওয়ায় আমার জন্য বেশ সুবিধা হল। ছোট-বড় টব কিনে ছোট-খাটো একটা বাগান করে ফেললাম ছাদের ওপরে। কিছুটা শখের বশে কিন্তু বেশিরভাগটাই ছয়তলার ভাড়াটিয়ার দুই মেয়েকে দেখানোর জন্য। প্রতিদিন বিকেলেই মেয়েদুটো ফুলপরী হয়ে ঘুরে বেড়ায় আমার বাগানে। মেয়েরা সুন্দরী হোক আর না হোক, আমার পটে যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগে না। এক বিকেলে সেই দুই পরী বাগানে হেঁটে হেঁটে গল্প করছিল। বগানটা যে আমারই নিজ হাতে গড়া তা বোঝানোর জন্য ঝাঁঝরি হাতে গাছগুলোতে পানি ঢালতে চলে এলাম।

আমাকে অবাক করে দিয়ে ওদের মাঝে এক ফুলপরী বলে উঠল, ‘কী করছেন?’ বিগলিত হয়ে বলে ফেললাম, ‘কেন, গাছে পানি দিচ্ছি।’ আমার কথা শুনে দুই কন্যা হেসেই কুটি কুটি। কেন এমন হাসছে, আর অমন আজব প্রশ্ন করারই বা কী দরকার ছিল বুঝলাম না। নাকি আলাপ জমানোর জন্য কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না? এমনভাবে হাসতে লাগল যেন আমি তাদের বিশ্ব নন্দিত কোন কৌতুক শুনিয়েছি। তারাও দুলে দুলে হাসছে, আমিও ঝুলে ঝুলে গাছে পানি দিয়ে যাচ্ছি।

একসময় তাদের অট্টহাসি বন্ধ হল। একজন খুব কষ্ট করে হাসি চেপে বলল, ‘বৃষ্টির মাঝে গাছে পানি দিচ্ছেন কেন, জীবন ভাই?’ এই যা, এতক্ষণে আমার টনক নড়ল, এদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, বাইরে বেশ অনেক্ষণ ধরেই রিমঝিম বৃষ্টি পড়ছে, এটাই খেয়াল করিনি! বোকা বোকা হাসি মুখে ধরেই জবাব দিলাম, ‘ওহ বৃষ্টি পড়ছে বুঝি। এরপর মনে করে ছাতা নিয়ে আসব গাছে পানি দিতে’। এ-কথায় শুধু তারা নয়, চিলেকোঠার ভেতর থেকে দেখি লাভলু ভাইও ফিক ফিক করে একচোট হেসে নিচ্ছেন। যত্তসব!

সেদিন বাজার করে ফিরছিলাম। দূর থেকেই তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখেছি। কয়েকদিন থেকেই লক্ষ করছি মেয়েটা আমার যাওয়া-আসার সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। কী জানি, হয়তো আমাকে পছন্দ করে। পছন্দ না হওয়ার অবশ্য কোনো কারণ নেই। আমি দেখতে কিন্তু বেশ ভাল—ফর্সা, লম্বা, সুদর্শন। যাক, নিজের প্রশংসা একটু বেশিই করে ফেলছি মনে হচ্ছে। প্লাবনের কাছে শুনলাম, ওর নাম নাকি তারিন।

বাজার নিয়ে তিনতলা বরাবর উঠতেই বুকটা আজান্তেই দুরুদুরু করে উঠল। ঠিক এমন সময় দরজার ছিটকিনি খোলার শব্দ হল, আর পরমুহূর্তেই দরজাটা হাট হয়ে গেল খুলে। এক্কেবারে ‘চিচিং ফাঁক’ যাকে বলে আর কী! সামনে তারিনকে দেখব কল্পনাও করিনি! কী হতে কী হয়ে গেল। হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা গেল পড়ে। আলু-পটল, লেবু সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে চলে গেল, চাল-ডাল এর ব্যাগ ছিড়ে তারিনের পায়েই সব ছড়িয়ে পড়ল। সে এক এলাহি কাণ্ড হয়েছিল সেদিন!

ওফ! রাত-দিন তারিনের চিন্তায় আমার নাওয়া-খাওয়া হয় না, ঘুম হয় না। নিজের অজান্তেই লক্ষ করলাম, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামার সময় প্রতি বারই আমার চলার গতি শ্লথ হয়ে আসে। আজ হঠাৎ করে আবারও খুলে গেল সেই  তিনতলার দরজা। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বপ্নের রাজকন্যা!

‘শুনুন’, মিষ্টি রিনরিনে গলায় ডেকে উঠল তারিন।

‘জ্বি, আমাকে বলছেন?’ আমি একটু কেশে শার্টের কলারটা ঠিক করে নিলাম।

‘হ্যাঁ, আপনাকে একটা কথা বলবো। কাউকে বলবেন না, দয়া করে।’

এই কথা শুনে আমারতো মাথা ঘুরতে লাগল। চোখে সরষে ফুলের পরিবর্তে লাল-নীল ‘love’ প্রতীক ভাসতে লাগল। বুকে বেজে উঠল খুশির দামামা। চারদিকে সিনেমার মত কাল্পনিক বেহালাবাদকে ভরে গেল, আর বেহালার মোহনীয় সুর-ধ্বনির আবেশে যেন প্রাণ জুড়িয়ে গেল আমার! হায় হায়! এ মেয়ে দেখছি আমারই মনের কথা বলতে যাচ্ছে আজ!

‘কী ব্যাপার কথা দিবেন না’? মিষ্টি গলার আওয়াজে বাস্তবে ফিরে এলাম। বুঝতে পারলাম, ইতোমধ্যেই আমার কান আর গাল টমেটোর রঙ ধারণ করেছে। বাধ্য ছেলের মত লাজুক গলায় বললাম, ‘জ্বি, পারবো। বলুন’।

মেয়েটা খুকখুক করে কেশে নিয়ে বলল, আপনাদের ফ্ল্যাটে রাজেদ নামে যে ছেলেটা থাকে, ওর ফোন নম্বরটা একটু দিতে পারবেন, দয়া করে?

আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো! এ কী শুনলাম আমি! মাতাল মাতাল লাগতে থাকল আমার। কোনোমতে নিজেকে সামলে, জড়ানো গলায় প্রশ্ন করলাম, ‘কী বললেন, রাজেদের নম্বর’?

তারিন মাথা দোলালো। এ কী সর্বনাশ হলো আমার, রাজেদের নম্বর চাইল, আমার নম্বর না? রাজেদ আর আমি এক সঙ্গেই কলেজে যাতায়াত করি, কোনোদিন ভাবতেও পারিনি যে, তারিন আমার জন্য নয়, রাজেদের জন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।

বিকেল বেলা মোড়ের দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলাম। দূর থেকেই দেখলাম রাজেদ আসছে হেঁটে হেঁটে। বাসার সামনে আসতেই রাজেদ আমাকে দেখে সুন্দর করে হাসল। ওর হাসি দেখে মেজাজটা আরও গরম হয়ে গেল। ওর হাসিটা চোখ রাঙিয়ে ফিরিয়ে দিলাম। ভেতরে ঢুকে গেইট লাগাচ্ছি, এমন সময় আমাদের বয়সি একটা মেয়ে রিকশা থেকে স্যুটকেস হাতে গেটের কাছে এসে দাঁড়ালো। আমার দিকে চোখ রেখে বলল, ‘গেটটা খোলা রাখুন,আমি ঢুকবো’।

গরম মেজাজে মেয়েটার কথাগুলো আমার কাছে তখন রীতিমত আদেশের মত শোনাল। বললাম, ‘জ্বি না, গেট খোলা রাখতে পারব না। যে তলায় যাবেন, সেই তলার কলিংবেল চাপুন। অপরিচিত মানুষকে ঢুকতে দিতে বাড়িওয়ালার নিষেধ আছে।’ এই বলে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখের ওপর ঝনাৎ করে কলাপসিবল গেটটা লাগিয়ে দিলাম।

সেই মুহূর্তে রাজেদ বলল, ‘দোস্ত,শোন...। আমি ধমক মেরে ওকে থামিয়ে দিলাম, ‘চোপ শালা! ওপরে চল, কথা আছে’!

তিনতলা বরাবর যেতেই কষ্টে বুকটা মুচড়ে উঠলো। ছি ছি, কী ভেবেছি আমি এতদিন। রাজেদ ওই মুহূর্তে আবার কী যেন বলতে যেতেই ধমক দিলাম আর একটা।

বাসায় পৌঁছে শার্ট খুলতে খুলতে বললাম, ‘কীরে, কী বলবি, বল’?

রাজেদ বলল, ‘জীবন, তুই নিচে মেয়েটার মুখের ওপর গেটটা লাগিয়ে দিয়ে কাজটা ঠিক করিসনি।’

‘এই ব্যাটা, গেট লাগানোর সময় আমি কি তোর অনুমতি নিয়ে চলব নাকি?’ চিৎকার করে বললাম।

‘না মানে, মেয়েটা হল...”

‘কেন মেয়েটা কি প্রধানমন্ত্রী নাকি?’

‘প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বড়, মেয়েটা হল বাড়িওয়ালার ছোট মেয়ে ত্রয়ী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তাই তুই হয়তো আগে দেখিসনি ওকে।’

‘কী, আগে বলবি না!’ মাথায় হাত দিয়ে সোফায় বসে পড়লাম।

‘তোকে তো আমি তখনই বলতে গিয়েছিলাম কিন্তু তুইই তো উল্টো আমাকে ধমক লাগালি মেয়েটার সামনে। আমি আর কী বলব। ঘরে লাভলু ভাই আর সলিলও সেসময় এমন মারমুখী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল যে ওখান থেকে তখন পালাতে পারলে বেঁচে যাই।’

সেদিন রাত আটটার আগেই, আমাদের কানে কমশোনা বাড়িওয়ালা আঙ্কেল, বাসা ছাড়ার নোটিশ দিয়ে খবর পাঠালেন। আমার তিন বন্ধু : রাজেদ, সলিল আর প্লাবন সারারাত কোন কথা বলেনি আমার সঙ্গে। লাভলু ভাই তো ঘোষণা দিয়ে দিলেন, এবারই শেষ, আমি যেন এরপর হোস্টেলের গণরুমে উঠে যাই তাদের সাথে মিলেমিশে থাকতে ভালো না লাগলে। সেই ঘোষণা অবশ্য এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আর এক কান দিয়ে বের করে দিলাম মুহূর্তের মাঝে।

পরদিন থেকেই সেই চিরচরিত নিয়ম শুরু হলো, ঢাকা শহরে আমাদের চার বন্ধুর বাসা খোঁজা, মানে ব্যাচেলরদের বাসা খোঁজা আর কী। বড় সমস্যার মধ্যে আছি। আশেপাশে ‘টু-লেট’ দেখলে কেউ একটু কষ্ট করে জানাবেন, প্লিজ!

//জেডএস//

সম্পর্কিত

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

টপ