পুতুলনাচের ইতিকথা এবং দ্য প্লেগ : একটি তুলনামূলক আলোচনা

Send
শাখাওয়াৎ নয়ন
প্রকাশিত : ০৭:০১, এপ্রিল ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০১, এপ্রিল ০২, ২০২০

আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, দুটি উপন্যাসই কালজয়ী। এই দুই মহান সাহিত্যিকের জন্ম কাছাকাছি সময়ে, কামু জন্মগ্রহণ করেন ৭ নভেম্বর ১৯১৩ সালে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ সালের ১৯ মে। ১৯৩৬ সালে মাত্র আটাশ বছর বয়সে ‘পতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসটি লেখেন মানিক। একই সময়ে তিনি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও পরে ‘জননী’ উপন্যাস লেখেন।

অপরদিকে ১৯৪৭ সালে একই অস্তিত্ববাদী সংকট, একই জ্যাঁ পল সার্ত্রীয় দর্শনকে মননে রেখে আলবেয়ার কামু ‘দ্য প্লেগ’ লেখেন এবং প্রকাশের ১০ বছর পর সাহিত্যে নোবেল জেতেন। যদি মানিকের আগে অন্য ভাষায়ও এমন লেখা কামু লিখতেন তাহলে বাঙালি স্বভাবে আমরা বলতাম, মানিক কামুর অনুকরণ করেছেন কিংবা উপন্যাসটি নিয়ে শুনে থাকবেন কোথাও। কিন্তু ব্যাপারটি একেবারেই ভিন্ন, কেউ কারো লেখা পড়েননি, কারণ পুতুলনাচের ইতিকথা প্রকাশের পরবর্তী এগার বছরে অনুবাদ হয়নি।

‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসটিতে বস্তুত তিরিশের দশকের প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিকতার লক্ষণগুলো নিহিত থাকলেও পাঠকমনে এর সংবেদন গভীরতর। আধুনিকতা-অনাধুনিকতার গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের এক গভীর উপলব্ধির আভাস দেয় এই উপন্যাস। নিজ অস্তিত্বকে ঘিরে ব্যক্তির যে যন্ত্রণা ও সংকট, জীবনের সঙ্গে মৃত্যুকে মিলিয়ে সত্তার যে অনিঃশেষ জিজ্ঞাসা, মানুষের চেতনা-দর্পণে জীবন-রহস্যের সেই চিরায়ত অনুভবগুলো এক অভিনব শিল্পের রূপ পেয়েছে এখানে। উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে ব্যক্তিসত্তার এক অপরূপ ‘ওডিসি’। জটিল অথচ গভীর চেতনালোকের আলো-ছায়ায় ব্যক্তি-মানুষের পথ চলার এক আশ্চর্য ‘ইতিকথা’ হয়ে উঠেছে শেষ পর্যন্ত।

দুই.

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসটিতে জটিল জীবনবোধের যে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, বলা বাহুল্য, তার অনেকটাই উপন্যাসের নায়ক চরিত্র দর্পণে। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র কাহিনি, বিবৃতির ভঙ্গি আসলে ইতিকথার ভঙ্গি; কোনো নাট্যরসপুষ্ট সংবৃত প্লট রচনার রীতি নয়। যেন এক বহতা জীবনের গল্প, যে জীবনের স্রোত শুধু দু-একটি উত্তাল তরঙ্গের সংঘাতে বিক্ষুব্ধ নয়, আপাত বিচ্ছিন্ন অনেক ছোট ছোট ঢেউয়ের সমষ্টি। শশীকেন্দ্রিক মূল কাহিনির সঙ্গে অন্য দুটি শাখা কাহিনি আছে : একটি মতি-কুমুদের, আরেকটি বিন্দু-নন্দলালের। সহোদরা বিন্দু আর প্রতিবেশি মতির বিপুল পরিবর্তন ওইসব চরিত্রের চলিষ্ণুতারই সাক্ষ্য দেয়। শশী চরিত্রের মুখ দিয়ে, চোখ দিয়ে, অন্তর দিয়ে উত্তম পুরুষে বর্ণিত উপন্যাসটি।

এদিকে কামুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত। এটি একটি প্রতীকধর্মী উপন্যাস, যদিও আপাতদৃষ্টিতে বাস্তব কাহিনির মতো রেখাপাত করে। আলজিরিয়ার উপকূলীয় শহর ওরানে প্লেগ মহামারির একটি ভয়াল চিত্র এই কাহিনির তাৎক্ষণিক বিষয়। এতে মানুষের কৃত্রিম বন্দি-দশার উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। এখানে ডা. বার্নার রিও-কেন্দ্রিক মূল কাহিনির সঙ্গে একাধিক শাখা কাহিনি চলমান। মহামারির মতো একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় চিকিৎসক সমিতির সম্পাদক, পৌরসভা প্রশাসন, ধর্মযাজক এবং মিডিয়ার ভূমিকাকে উপজীব্য করেছেন। ‘দ্য প্লেগ’ গল্পটি একটু ভিন্ন কৌশলে বা ঢঙে উপস্থাপিত। শেষ পরিচ্ছেদে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে লেখক বলেছেন, গল্পটি এত সময় ডা. বার্নারই বলেছেন।

পাঁচটি পরিচ্ছেদে রচিত উপন্যাসটিকে মনে হয় পাঁচ অঙ্কে রচিত একটি ধ্রুপদী নাটক, যা স্থান ও পাত্র-পাত্রীর ক্রিয়াকে একত্রিত করেছে, কিন্তু সময়ের খাঁচায় বন্দি করেনি। মাত্র ১০ মাস (এপ্রিল-জানুয়ারি) সময়কালের মধ্যে গল্পটি বর্ণনা করা হলেও গল্পের ইঙ্গিত কালজয়ী ও সর্বব্যাপী। উপন্যাসটিতে লেখক অভূতপূর্বভাবে সামান্য ইতর প্রাণী ইঁদুরের মৃত্যু সংবাদ দিয়ে মানব সমাজের জন্য প্লেগের মতো এক ভয়ংকর মহামারির অবতারণা করে মূল কাহিনিতে প্রবেশ করেছেন। তারপর কীভাব প্লেগ ছড়িয়ে পড়লো, প্রাচীর ঘেরা শহরবাসীর মনোভাব কীরূপ হলো, কয়েকজন শহরবাসী কীভাবে প্লেগের বিরুদ্ধে অভিযান চালালো ও শেষে জয়ী হলো, কীভাবে শহরের ফটকগুলো আবার খুলে দেওয়া হলো, এসব বর্ণনা দেওয়া হয়েছে একাধারে সমাজতাত্ত্বিত ও শিল্পীর চোখে।

প্লেগ মহামারির কারণে অবরুদ্ধ শহরের অধিবাসীদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তথা মৃত্যু যন্ত্রণা, ভয়, ভোগান্তি, ক্ষোভ, মুক্তির প্রচেষ্টা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং ভালোবাসার টান অত্যন্ত শক্তিশালী ও জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কামু। ভয়ংকর সংকটে একটি শহরের প্রশাসন, মিডিয়া, চিকিৎসক সমাজ, এমনকি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভূমিকার অতুলনীয় চিত্রায়ণ এই উপন্যাস। বিপদ বড় হোক আর ছোট হোক, মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সহজাত প্রবৃত্তি, বেঁচে থাকার সংগ্রামকে উপজীব্য করে কাহিনি বিধৃত করেছেন। লেখকের ধর্মবোধ এবং ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কেও গভীর চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায় উপন্যাসে।

ফাদার পানেলু মহামারির তাণ্ডবলীলার মধ্যেও পরমেশ্বরের করুণাময় উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত পেতে আগ্রহী, মহামারির আক্রমণ নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুকেও তিনি জগদীশ্বরের চরম মঙ্গলশক্তির অভিব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে উদগ্রীব। কিন্তু পরিশেষে ফাদার পানেলুর কর্মকাণ্ড এবং মৃত্যু দিয়ে কামু আস্তিকতা ও নাস্তিকতাকে এক জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে হিংসাত্মক বিপ্লব সম্পর্কে কামুর মোহমুক্তি, এমনকি বিতৃষ্ণাও প্রকাশ পেয়েছে তারুর চরিত্রের মাধ্যমে। কামু তারু চরিত্রের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, হিংসার চেয়ে সহিষ্ণুতা আর ক্ষমা অনেক বেশি কার্যকর। কোনো মানবিক উদ্দেশ্য সাধনের যুক্তি দিয়েই হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।

ওরান শহরে প্লেগ মহামারির রূপ নেওয়ায় শহরের সঙ্গে বহির্জগতের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলো। এ অবস্থাটা পরিষ্কারভাবে নাৎসিদের হাতে পরাজিত প্যারিসেরই প্রতিচ্ছবি। প্লেগ যাবতীয় ধ্বংসাত্মক ব্যধি, পাপ এবং যেকোনো মানবতাবিরোধী অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী, নাৎসির মতো অপশক্তির রূপক। তিনি নাৎসি বলতে একটি অশুভ চেতনাকে বুঝিয়েছেন। প্লেগ নামক রোগের বীজই এখানে অশুভ চেতনা। লেখক দেখিয়েছেন, ওই রোগের বীজ সর্বদাই চারপাশে উপস্থিত। তাই সর্বদাই সচেতন থাকতে হবে। তার মতে, যেকোনো বর্বরতার জবাব হলো তার প্রতি সৃষ্টিশীল বিরোধিতা। কামুর বিচারে এরই নাম মনুষ্যত্ব।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র প্রথম পৃষ্ঠায় হারু ঘোষের অপঘাত মৃত্যু সংবাদ দিয়েই কাহিনি শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি পাঠকদের সঙ্গে নিয়ে গাওদিয়া গ্রামে প্রবেশ করেন। অনেকটা একইভাবে আলব্যের কামু তার ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠায়ই বলেছেন, কোনো শহরের সঠিক পরিচয় পেতে হলে খোঁজ নিতে হয়, সেখানকার মানুষ কীভাবে কাজ করে, কীভাবে ভালোবাসে, আর কেমন করেই বা তারা মরণকে বরণ করে? তা জানা দরকার।

তিন.

যদিও দুটি উপন্যাসের পটভূমি ভিন্ন। একটি গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন-কাহিনির, অন্যটি শহুরে বন্দরনগরীর। এরপরও উপন্যাস দুটি সামগ্রিকতার দিক দিয়ে নায়কের তথা প্রধান চরিত্রের সব অভিজ্ঞতার এক সমবায়ী রূপ, চলমান জীবনের ইতস্তত অভিজ্ঞতার প্রবাহ, যা তার চেতনার গভীরে বিচিত্র আলো-ছায়ার রহস্যরূপ রচনা করে চলেছে। এদিক থেকে ‘দ্য প্লেগ’-এর নায়ক ডা. রিওর সঙ্গে শশী ডাক্তারের চরিত্রের একটা ভাবসাদৃশ্য হয়তো অনুভব করা যেতে পারে। জীবনের তাৎপর্য সম্পর্কে গূঢ় জিজ্ঞাসা তাদের দুজনের চেতনাকেই তীব্রভাবে বিক্ষুব্ধ, আলোড়িত করেছে। জীবনকে বিদ্ধ করেছে কঠিন যন্ত্রণায়। দুজনের চরিত্রই অনন্য, সন্দেহ নেই। দুটি চরিত্র অস্তিত্ববাদী দর্শনে বিশ্বাসী। দুটি চরিত্রই বিজ্ঞানমনস্ক এবং আধুনিক। দুটি উপন্যাসেই লেখকদ্বয়ের বুদ্ধিদীপ্ত এক সংযত নির্মোহ বিশ্লেষণী শক্তি ফুটে উঠেছে। এই নির্মোহ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিই উপন্যাসে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে, যা জীবনের বাস্তবতা উন্মোচনে বিশেষভাবে সহায়ক।

উপন্যাসের সব ঘটনা যদিও সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্থাৎ প্রথম পুরুষের জবানিতে বলা, তবু আসলে লেখক তার সর্বজ্ঞাতাকে সীমিত করে নায়কের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকেই অধিকাংশ ঘটনা ও চরিত্রকে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু প্লেগের এই কাহিনিকার নৈর্ব্যক্তিকভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। পাঠকরা উপন্যাসটি পড়তে পড়তে যে জগতে প্রবেশ করে, তা এক অর্থে রিওরই জগৎ। অন্যদিকে, গাওদিয়া গ্রামের শশী ডাক্তারের মনোজগৎই ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। তার জীবনের ঘটনা, মনের ভাবনা তথা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের, যন্ত্রণা-বেদনা-হতাশার জগৎ। সেই জগতের ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

উপন্যাস দুটির চরিত্রগুলো প্রায় কেউই বিভাজিত নয়, আলো-ছায়ায় নির্মিত। কেউ কোথাও স্থির দাঁড়িয়ে নেই, এমনকি কোনো কোনো চরিত্র এসে দাঁড়িয়েছে শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত, অভাবিত এক জায়গায়। এই পরিবর্তন আমূল হলেও আকস্মিক মনে হয় না। একেকটি চরিত্রের মনোলোক এমনই দ্বৈরথ বিপর্যস্ত হয় কিংবা অন্য চরিত্রের সঙ্গে সতত সংঘর্ষেই বদল হয় যে, তাদের পরিবর্তিত পরিণামকেই স্বাভাবিক মনে হয়। সব মিলিয়ে দুটি চরিত্রই একালের মনন ও চিন্তা-চেতনার বিক্ষুব্ধ এক যন্ত্রণাবিদ্ধ অন্তর্মুখিনতার মধ্য দিয়ে অস্তিত্ববাদী চিন্তায় আত্মপ্রকাশ করেছে।

প্লেগের মতো মহামারিতে মানুষের অসহায়ত্ব, তেমনি পুতুলনাচের ইতিকথায় ‘আকাশের দেবতা’র অলক্ষ্য হাতে মানুষের অসহায়-নিরুপায় মৃত্যুর ছবি পাঠক মনে এক গূঢ় জীবন-রহস্যের আভাস আনে। নায়ক শশী এবং রিও পাঠকের সেই মৃত্যু অভিজ্ঞতার সঙ্গী। শশী এবং রিও দুজনই চিকিৎসক, মৃত্যুর নিষ্ঠুর গ্রাস থেকে জীবনকে ছিনিয়ে আনাই তাদের কাজ। কিন্তু ডা. রিও একটি মৃত্যু থেকে আরেকটি মৃত্যুর কাছে ছুটে বেড়ান। ব্যর্থতা তাকে হতাশ করে, আবার অন্যদের বাঁচানোর জন্য নানা রকম চেষ্টায় ব্রতী হয়।

‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় জীবন-রহস্য চেতনার অন্যতম মুখ্য উপকরণ মৃত্যু ও ব্যধি। একইভাবে কামুও জীবন রহস্যের চেতনায় মৃত্যু ও মহামারিকে উপজীব্য করেছেন। জীবন-মৃত্যুর এই গূঢ় জটিল রহস্য প্রশ্নের সঙ্গে অনিবার্যরূপে জড়িত হয়ে যায় মানুষের কর্মপ্রচেষ্টার অর্থশূন্য পরিণাম। যাকে সার্ত্রীয় দর্শনে অস্তিত্ববাদী দর্শন বলে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গাওদিয়া গ্রামের অল্প কয়েকজনের রোগ এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের রহস্য উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, কামু ওরান শহরের শত শত মৃত্যুর মাধ্যমে একই কথা বলেছেন। মানিক যাদব পণ্ডিত এবং তার স্ত্রীর ‘ইচ্ছামৃত্যু’ তথা আত্মহত্যার মাধ্যমে এক করুণ আত্মপ্রবঞ্চনার চিত্র এঁকেছেন। একইভাবে কামুও আত্মহত্যার চেষ্টা করিয়েছেন এমন চরিত্র এঁকে, যার কাছে মরণ অপূর্ব ও লোভনীয় হয়ে উঠেছিলো।

‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় শশীর সারা জীবনের অর্জিত বিচিত্র অভিজ্ঞতার জট তার মনে আরেক ধরনের চেতনার গ্রন্থিলতা এনে দিয়েছে। সেই চেতনা নেতিবাচক। তার ছোট-বড় অনেক প্রত্যাশা-প্রচেষ্টার পরিণাম ব্যর্থতা, নিষ্ফলতা শশীর জীবন-ভাবনাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। তাই সে বিচ্ছিন্ন; নিঃসঙ্গতায় ভোগে। অস্তিত্বের এক নিদারুণ সংকট তথা নিরর্থকতার চেতনায় তার সত্তার বিমূঢ়তা দেখতে পাই, যা মর্মান্তিক। একইভাবে ‘দ্য প্লেগ’-এর শেষাংশে ভয়ংকর মহামারি প্লেগের বিরুদ্ধে মানুষের জয় আসতে শুরু করে। কিন্তু উপন্যাসের নায়ক ডা. রিও মন থেকে ভয় দূর করতে পারে না। তার মানসপটে প্লেগ আতংক দূর হয় না। তার মনে হয়, প্লেগ এখন হয়তো বিদায় নিয়েছে, কিন্তু আবারও ফিরে আসতে পারে। কারণ, মরণবাহী কোনো রোগই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেয় না।

চার.

উপন্যাস দুটি তাদের পরিণামী সংবেদনে আধুনিক-অনাধুনিকের সীমা অতিক্রম করে ইঙ্গিত দেয় চিরায়ত জীবনবোধের প্রতি। একাধারে আধুনিক এবং যুগভাবনাধর্মী অস্তিত্বের নিরর্থকতা তথা ব্যক্তি মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও রহস্য-উপলব্ধি এই দুইয়ের সমন্বয়ী সৃষ্টি কল্পনার মধ্যে এই উপন্যাস। আর এখানেই শিল্প সৃষ্টির আবেদনের চিরন্তনতা। দুটি উপন্যাসই ঔপনিবেশিক সমাজের পটভূমিতে রচিত। উপন্যাস দুটির বিষয়, পটভূমি এবং ইঙ্গিত ভিন্ন হলেও ব্যাপকতা, সমগ্রতা, বাস্তবতা, চরিত্র চিত্রণের ধরন, একই সঙ্গে সমাজের সভ্য কিংবা আগন্তুক হয়ে সমাজ পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজের প্রতি ব্যক্তির দায়বদ্ধতা, একাত্মতা, সমাজের বহুমুখী চরিত্রের বহুমুখী ক্রিয়াকলাপে ব্যক্তি এবং সমাজজীবনের সুখ-স্বপ্ন-মনস্তত্ত্বের টানাপড়েনের উপস্থাপনায় অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুটি উপন্যাসেই যম আর জীবনের এক নির্মম টানাটানির গল্পগাথা। প্রধান চরিত্র দুটি (শশী ডাক্তার এবং ডা. বার্নার রিও) জরা-ব্যাধির নিরাময়কারী। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও জয়ী হওয়ার জন্য তারা সংগ্রাম করেন। মোটকথা, লেখকদ্বয়ের মধ্যে অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রভাব লক্ষ করা যায় স্পষ্টভাবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ