পাগলি

Send
শাহানা সিরাজী
প্রকাশিত : ১৮:৫০, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫০, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যআট বছর যাবত দেখছি পৌরমার্কেটের বিভিন্ন দোকানের সামনে গড়াগড়ি খেতে। মুখে কোনো শব্দ নেই। বেশ স্বাস্থ্যবতী প্রৌঢ়া। কে খেতে দেয়,কোথায় প্রাকৃতিক কাজ সারে, কে যে পরতে দেয় জানি না। কিন্তু তার খাবারের অভাব হয় না। মাঝেমধ্যে থমকে যাই কে এই নারী? নিশ্চয়ই তার মা আছে, বাবা আছে,ভাইবোন আছে। তার নিশ্চয়ই সন্তান থাকতে পারে। স্বামীও ছিল হয়তো! তার স্থলে নিজেকে ভাবতেই শিউরে উঠলাম। এত যত্নে নিজেকে আগলে রেখেছি, মস্তিষ্ক বিগড়ে গেলে আমিও কি ওই বোবা লোকটির ছায়াতলে বসে থাকব! একজন লোকের ভাষায় পাগল আর একজন জন্মসূত্রে বোবা। পাগলির নিরাপদ আশ্রয়। বোবা লোকটির বালিশ-বেডের দোকান। পাগলি তার সামনেই হাত পা ছড়িয়ে বসে বিড়বিড় করে। কী যে বলে বোঝা যায় না; কিন্তু বোবা লোকটি হাসে। খুব হাসে। পাগলিকে বিস্কুট খেতে দেয়।পাগলি মাথা নাড়ে।খাবে না। আঙুল দিয়ে পাশের দোকান দেখায়।সেখানে পুরি ভাজা হচ্ছে। বোবা হাসতে হাসতে পুরি এনে দেয়। পাগলি আপনমনে কামড় বসায়, এদিক ওদিক তাকায় পুটুলি বগলে করে হাঁটুসমান কাপড় উঁচু করে হাঁটে; কিন্তু কোথায় যাচ্ছে,গন্তব্য কোন দিকে বোঝা যায় না। তার পিছু নিই। কিন্তু কতক্ষণ? কতদূর যাব! থেমে যাই। সে চলতে থাকে এ যেন ধু ধু মরুতে পথহারা মরুযাত্রী। চলছেই সম্মুখে কী আছে জানা নেই। আকাশ কিছুক্ষণ থমকে যায়, নীলাভ রং আরও নীলাভ হয়,গাঢ় থেকে গাঢ়। পাগলি দৃষ্টিসীমার বাইরে বিন্দু হতে বিন্দুতে মিলায়। গাঢ় রং ধপ করেই নিভে যায়। নেমে আসে রাতের থাবা। আঁধারে হারায় আলো। অপেক্ষা করি সে কি এ পথেই ফিরবে? পথে পথে কাকে খুঁজে বেড়ায়? গভীর ভালোবাসার কাউকে? যে একদিন চিবুক ছুঁয়ে বলেছিল,আহ,কী মায়াবি চোখ!কী গৌর বরণ!যে আলতো চুমু দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে কপালে ছড়িয়ে থাকা চুল। বলেছিল,মন কেন খারাপ, এই যে আমি এসে গেছি। নাকি দেহ বেয়ে বেয়ে বেড়ে ওঠা কোলের সন্তান।যার মা মা ডাকে সে দিগ্বিদিক ছুটত? কাকে হারিয়ে সে এক অচেনা পৃথিবীতে বাস করছে যেখানে হারিয়ে যায় তার আসল নাম। সে এখন পাগলি! এক বোবা বোঝে তার ভাষা। তার জন্য অপেক্ষা করে,দুটো ছোলা,দুমুঠো মুড়ি সাজিয়ে রাখে। কোথা থেকে মেঘ ফুঁড়ে উদয় হয়। বোবার সঙ্গে চোখাচোখি, তারপর দিগন্ত বিস্তৃত বোবার হাসি। পাগলি মুড়ি খায় বোবা মাথা দোলায়। জলের পাত্র এগিয়ে দেয়। লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। অগোছাল কাপড় এদিক ওদিক ছুটে যায়,বোবা ঠিকঠাক করে দেয়। তারপর কী ইশারা করে যে পাগলি চোখ বুজে। ঘুমের কোলে হারিয়ে যায়। তাকে মাড়িয়ে হেঁটে যায় পথচারি। বোবা টুল পেতে বসে থাকে। পাগলি নিরাপদ। মুখের কাছে মাছি ওড়ে, মশা আসে। বোবা পালকের ঝালর দিয়ে তাড়ায়। মাঝেমধ্যে কলতলায় নিয়ে যায়। ইশারায় কী বলে পাগলি জলের নিচে মাথা দেয়। বোবা নিজ হাতে সাবান মেখে স্নান করিয়ে দেয়।

হঠাৎ শুরু হলো মহামারি করোনা। সারা দেশ লকডাউনে। দোকানপাট সব বন্ধ। বোবার দোকানে তালা। পাগলি দোকানের সামনেই বসে আছে। মুখে হাত। পা ছড়ানো।মাঝেমধ্যে দুহাতে মাথার চুল ধরে টানছে। বারবার দোকানের দিকে তাকায়। কী খোঁজে? পনেরো দিন দোকানপাট বন্ধ। ত্রাণ নিচ্ছে সবাই। পাগলি? তার নাম কে রেজিস্ট্রেশন করল? সে কেমন আছে? কারফিউ মাথায় নিয়ে ছুটলাম। নেই কোথাও নেই।

বোবা চুপচাপ পাগলির জায়গায় বসে আছে। চোখ ভেজা। আমাকে দেখেই হাউমাউ কেঁদে উঠল। তারপর যা বোঝাল,ক্ষুধায় কাতর পাগলি এখানেই শুয়ে ছিল। ত্রাণের গাড়ি থেকে সবাই খাবার নিচ্ছিল,পাগলি ভিড়ের মাঝে চাপা পড়ল। একদল ক্ষুধার্ত মানুষের উদ্ভ্রান্ত পদচ্ছাপে পিষ্ট পাগলি একটি শব্দ উচ্চারণ করল। উহ্।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ