সাভানা শহরের ভাইরাস ভারাক্রান্ত দিনকাল

Send
মঈনুস সুলতান
প্রকাশিত : ১৬:১০, মে ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১২, মে ০৯, ২০২০

সাভানা শহরের ডেভ্যোন পার্কের দিকে যেতে যেতে আমি হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠা উইন্ডশীল্ড ওয়াইপারের দিকে তাকাই। একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন ঝকমকে রোদে গাছপালার সবুজ পত্রালিতে ঝলমল করছে জলের রূপালি ফোঁটা। মাত্র সপ্তাহ কয়েক আগে আমি বাস করছিলাম পানামার এক সৈকত-সংলগ্ন কাকাও প্ল্যানটেশনে। ওখানে করোনার প্রাদুর্ভাব প্রকট হতেই পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়ে আসলাম যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট শহর সাভানায়। এখানে আসার পরদিন মহামারির সংক্রমণ নিয়ে তেমন কিছু শোনা যায়নি। তবে সপ্তাহ দুয়েকে তামাম যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর পরিসংখ্যান দশ হাজার ছাড়িয়ে গেলে ছোট্ট এ শহরের প্রশাসকদের টনক নড়ে। রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায় জরুরি নয় এমন সব স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান। বেশুমার মানুষ হয়ে পড়ে চাকুরিচ্যুত। এখানকার শহরতলীর লো-ইনকাম হাউজিংয়ে বাস করছে—পৃথিবীর হরেক দেশ তথা সুদান, কঙ্গো, লাইবেরিয়া কিংবা আফগানিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা কিছু পরিবার। বিত্তের নিরিখে এরা অত্যন্ত দরিদ্র, শ্রম বিক্রয় করে সপ্তাহ শেষে পে-চেক না পেলে হাট-বাজার করতে পারে না। এদের মধ্যে অনেকে বেকার, কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে হঠাৎ করে। মেডিকেল ইন্সুরেন্সের অভাবে চাইলেই এরা হাসপাতালে যেতে পারছে না। এ মুহূর্তে আমি আমাদের প্রতিবেশীদের দুর্যোগ মোকাবেলায় তৈরি অনেকটা ঘরোয়া সংগঠন নেক্সডোরের হয়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছি। আমাদের দ্বায়িত্ব ডোনেশন সংগ্রহ করে যাদের ঘরে দানাপানি নেই, কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কেনা নিয়ে যারা সংকটে আছেন, তাদের সহায়তা দেওয়া।

আমি যে জংধরা টয়োটা গাড়িতে চড়ে ডেভ্যোন পার্কের দিকে যাচ্ছি, সেটা ড্রাইভ করছে আমার প্রতিবেশী গ্যারি ও লিনের কন্যা ফিমা। স্বভাবে মেয়েটি ভারি অস্থির প্রকৃতির, ডিসলেকসিয়া বা লার্নিং ডিসএবিলিটিতে ভুগছে, তাই স্কুল-কলেজে অ্যাকাডেমিকভাবে ভালো করেনি। সে নগরীর আপস্কেল রেস্তোরাঁগুলোতে ইনটিরিওর ডেকোরেশনের ছোটা কাজ করতো। এ রাজ্যে করোনার সংক্রমণ বিস্তৃত হতে থাকলে কর্মচ্যুত হয়ে পড়ে ফিমা। বর্তমানে নেক্সডোরের হয়ে ভলানটারি করছে। একটু আগে সে আমাকে লিফট দিয়ে নিয়ে যায় ফার্মারর্স মার্কেটে। প্রতি শনিবারে কৃষকরা ওখানে তাজা শাকসবজি বিক্রি করতেন। প্রশাসন মার্কেটটি বন্ধ করে দিয়েছে, দূর দূরান্তের গ্রামাঞ্চল থেকে আসা কোনো কোনো চাষি শাকসবজি ডোনেট করে দেওয়ার উপায় খুঁজছিলেন। তারা আমাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে আটটি রিফিউজি পরিবারকে দান করেছেন আলু, মটরশুঁটি, কপি, মাশরুম, আপেল ইত্যাদি। আমরা এগুলো ক্যারি করে রওনা হয়েছি ডেভ্যোন পার্কের দিকে। ওখান থেকে আমরা তুলে নিতে চাচ্ছি ত্রাণ-সংস্পর্কিত আরেকটি পণ্য।

পার্ক ঘিরে আধখানা চাঁদের মতো বাঁকানো সরণিতে ফিমা আস্তে-ধীরে গাড়িখানা চালায়। আমরা অ্যাপোয়েন্টমেন্টের মিনিট বিশেক আগে এসে পৌঁছেছি। সময় কাটতে হয়। আমি জানালার কাচ নামাতেই দেখি আধভেজা ঘাসে রাবারের ম্যাট পেতে রোদ্রস্নানে মেতেছে কিছু তরুণী, সাথে সঙ্গী পুরুষ, সামাজিক দূরত্ব বলে যে বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে—স্পষ্টত তা পালিত হচ্ছে না। শহরের মেয়র পার্ক ইত্যাদি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাঁধ সেধেছেন রাজ্যের রিপাবলিকান গভর্নর। তার বক্তব্য হচ্ছে, পরিস্থিতি এখনো নিউইয়র্কের মতো ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি, উদ্যান ও সৈকত বন্ধ করে দিলে চাকুরিচ্যুত হয়ে মানুষের হাতে এসেছে যে অঢেল সময়—তারা যাবে কোথায়? কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি খুব কি ভালো? সপ্তাহ কয়েক আগে আমি যখন পানামা থেকে এখানে ফিরি, তখনো সংক্রমণের কোনো সংবাদ দেখিনি। আজ পর্যন্ত, যখন আমি লিখছি, করোনা কেসের কনফার্ম সংখ্যা তেরো হাজার ছাড়িয়েছে, আজ সকালেই শুনেছি—এ অব্দি রাজ্যে চারশত সাতত্রিশ জন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ।

একটি বিরাট ওক গাছের ছায়ায় ফিমা গাড়িটি পার্ক করে। তার স্মার্ট ডিভাইসে কল আসে। মেয়েটি মাস্ক একটু সরিয়ে কথা বলতে শুরু করে। আজকাল কোথাও মাস্ক কিংবা ডিসইনফেকশন লোশন পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ফিমা তার মা লিনের রুমাল দিয়ে বানানো মাস্ক পরে আছে, তাতে রেশমে তোলা বিড়ালের চিত্র থাকায় কথা বলার সময় এ তরুণীকে বিচিত্র দেখায়। একটি বিষয় খেয়াল করি, এদেশে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন তৈরি হয় আকসার, কিন্তু মাস্ক আসে চীন থেকে, তো সে দেশের সঙ্গে বর্তমানে ট্রেড ওয়ার চলছে, সুতরাং মাস্ক ছাড়াই মনে হয় আমজনতাকে করোনা-কাল অতিক্রম করতে হবে। ফিমা ডিভাইসটি এক পাশে সরিয়ে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে জানায়, তার বয়ফ্রেন্ড স্কটল্যান্ড থেকে রিং করেছে, ‘স্যরি, কলটা যে নিতে হয়।’ আমি দুয়ার খুলে বেরিয়ে আসি গাড়ি থেকে।

গাছতলায় দাঁড়িয়ে আমি পরপকারী মেয়েটির সংকট নিয়ে ভাবি। তার বয়ফ্রেন্ড কিছুদিন আগে স্কটল্যান্ড যায় পাহাড়ে হাইক করতে। হাইল্যান্ডের একটি আপাত বিচ্ছিন্ন পর্বতে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের বিমান যোগাযোগ বাতিল হয়। বেচারা আটকা পড়েছে, স্বল্প বাজেটে ট্র্যাভেল করছে, দীর্ঘদিন হোটেল-ফোটেলে থাকার মতো সঙ্গতিও তার নেই।

দাঁড়িয়ে থেকে থেকে আমি সেলফোনে নিউজ ফিডের আইটেমগুলো স্ক্রল করি। মাস্কের সংকট এতো প্রবল যে, হাসপাতালের নার্সরা রোগীর সেবা দিতে গিয়ে মাস্ক-গ্লাভস্ ও সুরক্ষা গাউনের অভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ শহরের দু-এক জন স্বাস্থ্যকর্মী চেহারা আড়াল করে স্যোশাল মিডিয়ায় এ নিয়ে কথাও বলছেন। মিশিগান রাজ্যের প্রশাসকরা ট্যাটু পারলার, কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার প্রমুখদের কাছে তাদের মাস্কগুলো ডোনেট করে দেয়ার আহ্ববান জানিয়েছেন। জানি না, এ শহরের প্রশাসকরা এ বাবদে কী করছেন? অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর গলায় দাবি করছেন—যুক্তরাষ্ট্রে এ সব পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। তার এ দাবিকে প্রেস ‘ডাহা মিথ্যা’ আখ্যায়িত করছে। কিন্তু তিনি হামেশা এতো মিথ্যাচার করেন যে—এ নিয়ে কেউ তেমন কিছু বলছে না। তার মতো দিন-দুপুরে বেইমানি করার নজির বিশ্বে বিরল। আমরাও আজ ডেভ্যোন পার্কে এসেছি উচ্চমূল্যে দশটি মাস্ক কিনতে। বড় খিন্ন লাগে, এদেশে আজকাল মাস্ক কেনার চেয়ে অনেক সহজে বোধ করি রকেটের টিকিট কেটে মহাশূন্যে গিয়ে ঘুরপাক করা যায়।

বাঁকানো সরণির গোঁড়ায়—বেশ খানিকটা দূরে, ট্রাইসাইকেল হাঁকানো মি. ল্যারি হুগানের আউটলাইনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রিকশার মতো দেখতে তিন চাকার সাইকেলটির হ্যান্ডেলে লাগানো ‘ভিয়েতনাম ভেট’ লেখা ধাতব প্রতীকটি এতো দূর থেকেও দেখি—ঝলসে ওঠছে বারবার। এ ত্রিচক্রযানের আরোহী ল্যারি ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষ বছর ইউএস নেভির যুদ্ধজাহাজে দ্বায়িত্বরত ছিলেন টংকিং উপসাগরে। হামেশা ব্যায়াম করে শারীরিকভাবে ফিট থাকা এই বৃদ্ধের বয়স ৭৬ থেকে ৭৯-এর মধ্যে। অনিচ্ছায় ভিয়েতনামে যুদ্ধ করতে হয়েছিলো বলে আজঅব্দি গিল্ট ফিলিংয়ে ভোগেন। লড়াই থেকে ফিরে যুদ্ধ-বিরোধী তৎপরতার জন্য জেল খেটেছেন, অনেক বছর কাজ করেছেন টেকনিশিয়ান হিসাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। স্ত্রী বিয়োগের পর ডেভ্যোন পার্কের কাছাকাছি একটি কাঠের বাড়িতে একাকি বাস করছেন।

রিফিউজিদের জন্য খাবার সংগ্রহের প্রয়াসে আমি ডোনার খুঁজছিলাম। টেলিফোনে বিষয়টা জানতে পেরে নিজে থেকে বলেছেন, ‘হাউ আবাউট মি? লুক ম্যান, এ মানুষগুলো আদতে তাদের স্বদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো পারমানবিক শক্তিওয়ালা দেশের যুদ্ধনীতির কারণে। এদেশে এসে আজ তারা আমাদের দোরগোড়ায় অনাহারে সাফার করবে, লুক আই অ্যাম নট গোয়িং টু এলাও দিস।

পিচ ঢালা সরণিতে পড়ে থাকা লালচে-সোনালি ঝরাপাতা মাড়িয়ে তার ট্রাইসাইকেলটি আমার দিকে এগিয়ে আসে। এর পিছন দিকের ক্যারিয়ার-বাস্কেটে সচরাচর তার বাত ব্যাধিতে পঙ্গু বয়োবৃদ্ধ কুকুর ক্যাপ্টেন স্নিফার রাইড নিয়ে থাকে। আজ বাস্কেটে ক্যাপ্টেন স্নিফার নেই দেখে একটু অবাক হই! তার জায়গায় স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধা একটি কুলার, বুঝতে পারি না তাতে করে ল্যারি কী নিয়ে আসছেন? খানিক দূরের বাইকস্ট্যান্ডে থেমে ল্যারি এ মুহূর্তে ট্রাইসাইকেলটি লক করছেন। আমি মনে মনে আজ ভোরে তার সঙ্গে আমার টেলিফোন কনভারসেশন নিয়ে ভাবি। আগামী সপ্তাহে ল্যারির শরীরে একটি মেজর সার্জারি হওয়ার কথা ছিলো। গতকাল হাসপাতাল থেকে অস্ত্রপচার বাতিল করার সংবাদ জানিয়ে তাকে ইমেইল পাঠানো হয়েছে। কারণ হাসপাতালটি ব্যস্ত আছে দিন-কে-দিন ক্রমবর্ধমান হারে ভর্তি হওয়া করোনার ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে।

আমার দিকে এগিয়ে আসা ল্যারি একটি পশমী স্কার্ফ দিয়ে মুখ, মাথা, কান অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়েছেন। বুঝতে পারি, তিনিও আমার মতো মাস্ক সংগ্রহ করতে পারেননি। তাকে মুভিতে দেখা লরেন্স অব এরাবিয়ার মতো দেখায়। আমরা হ্যান্ডশেক করি না, তিনি স্কার্ফ ফাঁক করে জানান, সাভানার টেন্ডি রেস্তোরাঁ ‘বেটি বোমার’ খদ্দেরের অভাবে খাবার বিক্রি করতে পারছে না, আমরা ফুড কালেক্ট করছি জানতে পেরে তারা ফ্রোজেন চিকেনের ষোলটি প্যাকেট ডোনেট করেছে। এ প্রাপ্তিতে আমি খুশি হয়ে বলি ‘চিয়ার্স।’ ল্যারি হাতের মুদ্রায় পানপাত্র মুখে তোলার ইশারা করেন। আমি এবার তার সার্জারি ক্যানসেল হয়ে যাওয়াতে দুঃখ প্রকাশ করি। তিনি স্কার্ফের ফাঁকে রহস্যময়ভাবে হেসে বলেন, ‘লেট মি টেল ইউ সামথিং… অপারেশন হলে মেডিকেল ইন্সুরেন্সের কোপেমেন্ট হিসাবে আমাকে পে করতে হতো অ্যাট লিস্ট চার হাজার সাতশ ডলার। তো ধরা যাক, অপারেশন হলো, আমি টাকাপয়সা খরচ করলাম, তারপর যদি করোনার করাল গ্রাসে বেঘোরে খরচ হয়ে যাই…দেন হোয়াট? পুরো ব্যয়টাই তো হতো ব্যাড ইনভেস্টমেন্ট।’ এ দুঃসময়েও নিজের স্বাস্থ্য-সংকট নিয়ে হিউমার করে কথার বলার ক্ষমতায় আমি ইমপ্রেসড্ হই।

গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে ফিমা। সে বারবার সেলফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ইশারায় হতাশা প্রকাশ করে। আজ ড্যোভেন পার্কে সম্পূর্ণ আজানা একজনের কাছ থেকে চাপলিশে দশটি মাস্ক কেনার কথা আছে। স্যোশাল মিডিয়া সূত্রে কীভাবে যেন ফিমা উচ্চমূল্যে দশটি মাস্ক কেনার বন্দোবস্ত করেছে। তার ভাষ্য মোতাবেক, কমলালেবু রঙের কার্ডিগান পরা এক নারীর ঠিক দশ মিনিট আগে মাস্কের চালান নিয়ে এসে—খানিক দূরের ম্যাগনোলিয়া গাছের তলায় বেঞ্চে বসার কথা ছিলো। সে এখনও এসে পৌঁছেনি, তাই ফিমা দারুণভাবে অস্থির হয়ে সরণিতে আগ-পিছ পায়চারি করে। আমি তাকে ধৈর্য ধরতে অনুরোধ করি। মাস্কগুলো কিনতে পারাটা খুবই ক্রিটিক্যাল।

সাভানার ‘ব্রাইটার ডে’ নামক একটি হেলথ ফুডের দোকানের মালিক দম্পতির সামাজিকভাবে দ্বায়িত্ববান ও অত্যন্ত প্রগতিশীল বিজনেস পার্সনস্ হিসেবে সুনাম আছে। তারা অর্গানিক ফুড বা সার ও কীটনাশকের ব্যবহার হয়নি এ ধরনের শাকসবজি, ফলমূল ও খাবার বিক্রয় করে থাকেন। তাদের পণ্য সামগ্রীর এক ব্যাপক অংশ হচ্ছে, হারবাল মেডিসিন বা প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন বনজ ওষুধ-টসুধ। এ দোকানের ক্রেতাদের সিংহভাগ হচ্ছেন ক্যান্সার বা অন্যান্য মারাত্মক রোগ থেকে সারভাইভ করা বয়োবৃদ্ধ সিনিয়র সিটিজেনস্। ব্রাইটার ডের আরেকটি বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে—বিদেশ থেকে আগত অল্পবয়সী ছাত্র-ছাত্রীদের সেলস্ পার্সন হিসেবে চাকুরি দেওয়া। এদের অনেকে ইমিগ্রেশন পদ্ধতির জটিলতার জন্য অন্যত্র কাজ করতে পারে না। করোনা সংক্রমণ প্রকট হওয়ার পর থেকে ব্রাইটার ডে টেলিফোনে লেনদেন সেরে সিনিয়র সিটিজেনদের বাড়ি বাড়ি গ্রোসারি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। ভ্যান গাড়িতে করে স্টুডেন্ট কাম সেলস্ পার্সনরা বৃদ্ধদের সংসারে খাবার সরবরাহ করছে। এরা হয়তো অ্যাসিমটোমেটিক, অর্থাৎ শরীরে জীবাণু থাকলেও আলামতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে না। মাস্ক না থাকলে এদের নিঃশ্বাস বাহিত হয়ে দূষিত বাতাস হয়তো স্পর্শ করবে বয়োবৃদ্ধ মানুষদের, সুতরাং মাস্ক সংগ্রহ করাটা ব্রাইটার ডের জন্য প্রায়োরিটি হয়ে উঠেছে। ফিমার মাধ্যমে আমরা তাদের যৎসামান্য সহায়তা করছি।

কমলালেবু রঙের কার্ডিগান পরা এক পৃথুলা নারী এসে মেগনোলিয়া গাছটির তলায় দাঁড়ান। আমাদের ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। খামে ক্যাশ দেড়শত ডলার নিয়ে ফিমা দ্রুত এগিয়ে যায়। পুরো অপারেশনে সময় ব্যয় হয় সাড়ে তিন মিনিট। আমরা গাড়িতে উঠে পড়ি। অত্যন্ত সাদামাটা সুতি কাপড়ের মাস্ক, এক সময় এ বস্তু মাত্র পঁচাশি সেন্টে বিক্রি হতো, তা পনেরো ডলারে কিনতে হলো বলে আমাদের কোনো খেদ হয় না। আমি কৈশোরে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমার টিকিট ব্ল্যাকে কিনেছি, এখানেও ব্ল্যাক হচ্ছে, অবাক হওয়ার কিছু নেই, তবে এ প্রক্রিয়াকে তৃতীয় বিশ্বে কালোবাজারি বলা হলেও প্রথম বিশ্বে এ ধরনের লেনদেনের পোশাকি নাম হচ্ছে ‘প্রাইস গাউজিং’।

স্থানীয় একটি স্কুলের পাশ দিয়ে ড্রাইভ করে যেতে গিয়ে ল্যারির অনুরোধে ফিমা গাড়িটি রোডসাইডে দাঁড় করায়। সারি দিয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি হলুদ রঙের স্কুলবাস। গেল তিন-চার সপ্তাহ্ ধরে সাভানার স্কুল-কলেজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ছাত্রদের পয়ষট্টি শতাংশ বাস করছে দরিদ্রসীমার নিচে। স্কুল চালু থাকলে এরা প্রতিদিন ফ্রি ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চ খেতে পারতো। বর্তমানে এ শিশুরা ঘরবন্দি, প্রায় প্রতিটি ক্ষেতে এদের পিতামাতা সাময়িকভাবে চাকুরিচ্যুত হয়েছে। এদের সঙ্গতি নেই শিশুদের পুষ্টিকর খাবার জোটানোর। তাই নগরী উদ্যোগ নিয়েছে স্কুল-বাসে করে মহল্লায় মহল্লায় প্যাকেট ফুড পাঠানোর। নির্দিষ্ট স্টপে গিয়ে বাসগুলো দাঁড়াবে, ছাত্রছাত্রীরা আইডি কার্ড দেখিয়ে তুলে নেবে খাবারের প্যাকেট।

একটি একটি করে স্কুল-বাসগুলো রওনা হয়। রোডসাইডে দাঁড়িয়ে পড়া গাড়িগুলো মৃদু আওয়াজে হর্ন বাজিয়ে ড্রাইভারদের ধন্যবাদ জানায়। রোডসাইডের কোনো কোনো গাড়ি থেকে আরোহীরাও নেমে পড়েছেন। তারা হ্যাট খুলে মাথা ঝুঁকিয়ে রিস্ক নিয়ে কাজে আসা বাস-ড্রাইভারদের সম্মান জানান। আমি ও ল্যারি নেমে পড়ে বারবার ওয়েভ করে দুঃসময়ে ছোট্ট শহরটির শিষ্ঠাচারে শরিক হই।

আমাদের পরবর্তী স্টপ হয় ক্রুগার গ্রোসারি স্টোর। দুপুর বারোটা থেকে একটা অব্দি পুরো এক ঘণ্টা শুধুমাত্র সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য হাট-বাজার করার বন্দোবস্ত হয়েছে। স্টোরটির এনট্রেন্সয়ে বড়-সড় ব্যানার টাঙিয়ে ঘোষাণা করা হয়েছে, যাদের বয়স ষাটের নিচে তারা যেন বেলা একটার পর শপিং করতে দোকানে ঢোকে। ল্যারিকে সঙ্গে নিয়ে কাটায় কাটায় বারোটা দশে আমি স্টোরে ঢুকি। গেটে শপিংকার্ট নেয়ার সময় খেয়াল করি—যে ডিসপেনসারে হ্যান্ড-সেনিটাইজার থাকার কথা, তা খালি। পকেট থেকে বের করে এক জোড়া কিচেন গ্লাভস্ বাড়িয়ে দিতে দিতে ল্যারি মিনিট পনেরো-বিশের মধ্যে শপিং সারার অনুরোধ করেন। কে কী কিনবো আমরা সে দ্বায়িত্ব ভাগ করে নেই। শেলফ থেকে চাল ও গুড়া-দুধের প্যাকেটগুলো শপিংকার্টে তুলতে তুলতে খেয়াল করি, তুমুল নির্জনতায় বিশাল গ্রোসারি স্টোরটি রীতিমতো খাঁ খাঁ করছে। ক্রেতা নেই বললেই চলে, কেবলমাত্র বেইসবল ক্যাপ পরা এক বৃদ্ধ লাঠি ভর দিয়ে ঠির-ঠিরিয়ে এসে শেলফের সামনে দাঁড়ান। তার হাত-পায়ের কাঁপন থেকে অনুমান করি, ইনি ভুগছেন পার্কিনসো ডিজিজে। তিনি একটি কফিজার তুলে নিয়ে হাই-পাওয়ার চশমার ফাঁকে আমার দিকে তাকান। চোখ নামিয়ে আমি ফটাফট তুলে নেই আটটি লিপটন চায়ের প্যাকেট। শরণার্থীদের পরিবারে আছে অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে, আমি সচেতন যে—তাদের পছন্দমাফিক খাবার জোটাতে মা-বাবারা নস্তানাবুদ হচ্ছেন। তাই আরেকটি শেলফে এসে ফ্রোজেন পিৎজা ইত্যাদি কিনে রওনা হই টয়লেট্রিজের শেলফের দিকে।

শপিংকার্ট ঠেলতে ঠেলতে আড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে—বোধ করি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বেঁকে অন্য দিকে ঘুরে যান মিউজিশিয়ান জেনি কবরেরো। চেনা মুখ এই বৃদ্ধা এক যুগে নাকি শহরের হাইএন্ড হোটেল দ্য মেনশনের লবিতে পিয়ানো বাজাতেন। হোটেল তাঁকে বয়সের কারণে জবাব দিয়েছে। কোথায় বাস করেন মিসেস কবরেরো—আমি ঠিক জানি না। তবে প্রায় শনিবারে তাকে ফরসাইথ পার্কে দেখা যায়—হালকা একটি কিবোর্ড বাজিয়ে ছড়াচ্ছেন জনপ্রিয় গানের টিউন। তার কাছেই সিমেন্টের পেভমেন্টে উল্টো করে রাখা থাকে ক্রিসেনথিমাম গাঁথা একটি জবরজং হ্যাট। পার্ক-বিহারীরা তাতে রাখে সিকি কিংবা আধুলি।

দেখি—উল্টো দিক থেকে শপিংকার্টে রাজ্যের টয়লেট পেপার রোল চাপিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন ল্যারি। শরণার্থীদের অ্যাপার্টমেন্টে এ বস্তুর আক্রা প্রকট হয়ে ওঠেছে। যাক, ল্যারি তা অলরেডি পিক করে নিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফার্মেসি আইল থেকে তুলেছেন, জ্বর কমানোর ওষুধ টাইনানোল, কফ কমানোর লিনটাস ইত্যাদি ও সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে পড়া একজন শরণার্থীর অ্যাজমার টানের জন্য ইনহেলার। ক্যাশ কাউন্টারের সেলস্ পার্সন টয়লেট পেপারের এতগুলো রোল দেখে আপত্তি তোলেন। ল্যারি তাকে আটটি ভিন্ন ভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে সরবরাহের কথা বুঝিয়ে বলে কনভিন্স করে তার ক্রেডিট কার্ডে বিল পে করেন। আমরা গাড়ির দিকে যেতে যেতে সম্প্রতি এ দেশে টয়লেট পেপারের সংকট নিয়ে কথা বলি। বেশ কিছু ক্রেতা এ বস্তু প্রচুর পরিমাণে কিনে নির্ঘাত মজুত করেছেন। ল্যারি বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘লুক…আই থিং দেয়ার আর অ্যাওয়ে টু মেনি অ্যাসহৌলস্ ইন দিস কান্ট্রি দেন উই হ্যাড এভার থট অব…।’ হেসে উঠি আমরা।

ফার্মারর্স মার্কেটের কৃষকরা বেশ বড়সড় পলিথিনের ব্যাগে তাদের শাকসবজি ও আলু ভরে দিয়েছেন। গাড়িতে এসে দেখি, ফিমা ব্যাগগুলোর গিট্টি খুলে রেখেছে। আমরা হাত চালিয়ে দ্রুত তাতে পুরি চাল-চা-পিৎজা ও গুড়া-দুধ এবং ওষুধ-টসুদ প্রভৃতির প্যাকেট।

সড়ক সম্পূর্ণ সুনসান ফাঁকা। তাই শহরতলীর লো-ইনকাম হাউজিংয়ের পার্কিংলটে এসে পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র বারো মিনিট। স্প্যনিশ মস্ ঝুলে সবুজ পাতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকা একটি গাছের বাঁধানো গোড়ায় প্যাকেটগুলো রেখে, গাড়ি বেশ দূরে পার্ক করে আমি শরণার্থীদের এক এক করে রিং করি। খাবার পিক করে নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাড করি—সাবধান বাণী; আমরা পার্কিলটে দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের কাছাকাছি দৈহিকভাবে না এসে তাদের কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যেন টেলিফোনে বলেন।

দেখি, হাউজিংয়ের গেট দিয়ে ঢুকছেন, দুটি ছোট্ট ছেলের হাত ধরে আবদাল্লা চৌল-মাজক। একটু আগে তাকে রিং করে পাইনি, তাই টেক্সট্ পাঠিয়েছি। সাউথ সুদান থেকে আগত এ শরণার্থী ক্রনিক্যালি বেকার। গেল বছর দেড়েকে নানা ধরনের কাজের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু চাকুরিতে টিকতে পারেন না। তার স্ত্রী মাগদাও কাজ পাচ্ছিলেন না, মাস তিনেক আগে মাগদা একাই নিউইয়র্ক শহরে যান কাজের তালাশে। ওখানে তার দেশের মানুষের সহায়তায় একটি হোটেলে ক্লিনিংয়ের কাজ জুটেছিলো। প্রথম মাসের মাইনাও পাঠিয়েছিলেন স্বামী আবদাল্লার ঠিকানায়। তারপর তো হঠাৎ করে তাবৎ কিছু বদলে গেলো। দেশওয়ালী এক চেনা জনের বাসায় জ্বর ও কফ-কাশিতে চৌদ্দ দিন সাফার করে মহিলা হাসপাতালে যান। ওখানে ভেন্টিলেটার নিয়ে বেঁচেছিলেন পুরো সাত দিন। তারপর আরও শত শত মৃতদেহের সঙ্গে তার গোর হয় লং আইল্যান্ডের এক গণকবরে। আবদাল্লা এগিয়ে এসে ফুট দশেক দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের ধন্যবাদ জানান। কাছাকাছি একটি চার্চের স্যুপ কিচেনে ফ্রি লাঞ্চ বিতরণ করা হয়, তিনি ছেলে দুটি নিয়ে ওখানে গিয়েছিলেন খাবারের সন্ধানে। কিন্তু কপাল খারাপ, স্যুপ কিচেনের সার্ভিস আজ বন্ধ। আমি বুকের ডান পাশে হাত রেখে তার স্ত্রী মাগদা চৌল-মাজকের মৃত্যুতে আন্তরিকভাবে শোক প্রকাশ করি। বিভ্রান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, বাচ্চা দুটির জন্য তার খুব কষ্ট হয়, মায়ের মৃত-মুখ দেখার সুযোগ থেকে খোদাতালা তাদের বঞ্চিত করলেন।

ত্রাণ সামগ্রীর ব্যাগ জাপটে ধরে আবদাল্লা ও তার বাচ্চা দুটি যাচ্ছে লিফটের দিকে। ওখান থেকে বেরিয়ে এসে কঙ্গোর শরণার্থী মায়োরেমা চারদিকে ইতিউতি তাকায়। অল্পবয়সী অত্যন্ত সুদর্শন এ তরুণীর সন্তান সংখ্যা তিন। কোথায় যেন পার্টটাইম কাজ করতো। শুনেছি, ওয়ার্ক প্লেসে দৈহিক সৌন্দর্যের জন্য হামেশা শিকার হতো অনভিপ্রেত দৃষ্টিপাত ও যৌন হয়রানির। এ নিয়ে মেয়েটি দারুণভাবে অস্বস্তিতে ভোগে। মায়োরেমার স্বামী আলংগি বাদিনাবি এক যুগে গেরিলা যুদ্ধ করেছেন। সপ্তাহ চারেক আগেও তিনি এরোপ্লেন নির্মাণের কারখানায় গেটম্যানের কাজ করতেন। মারকুটে প্রকৃতির মানুষটি ড্রিংক করেন, বউ পেটানোরও স্বভাব আছে তার। এদেশে অভিবাসী হয়ে এ কারণে সপ্তাহ তিনেক জেলও খেটেছেন। আমরা অবগত যে, আলংগি বাদিনাবি বর্তমানে অসুস্থ। ত্রাণের ব্যাগ নিয়ে ফেরার পথে আমি ইশারায় মায়োরেমাকে থামাই। ল্যারি এগিয়ে এসে বেশ দূর থেকে ইনহেলার ও থার্মোমিটার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা দেখিয়ে দিয়ে সিমেন্টের উপর বস্তু দুটি রেখে সরে যান। মায়োরেমা পা কয়েক আগ বেড়ে জিনিসগুলো তুলে নিয়ে আমাদের দিকে তাকায়। জানতে চাই কেমন আছেন আজ আলংগি? জবাবে সে বলে, জ্বর আরও বেড়েছে, সাথে হাঁপানির টান ও কফ-কাশি। ল্যারি প্রশ্ন করেন, আলংগিকে আইসোলেটেড্ করা হয়েছে কি? কপাল কুঁচকে কী যেন ভেবে সে জানায়, এক কামরার অ্যাপার্টমেনেন্টে সম্পূর্ণ আইসোলেটেড করা মুশকিল, তাই বুদ্ধি করে সে অসুস্থ স্বামীর বিছানা মশারি টাঙিয়ে আলাদা করে রেখেছে। আমরা তাকে বিশেষ একটা ভরসা দিতে পারি না, তবে বলি—হেলথ ডিপার্টমেন্টে টেলিফোন করে বিষয়টি রিপোর্ট করবো।

আজ আমাদের শেষ অ্যাক্টিভিটি হচ্ছে ব্রাইটার ডে নামক হেলথ ফুডের দোকানে মাস্কগুলো ড্রপ করে দেয়া। ফিমা ওদিকে গাড়ি ছুটিয়ে রেডিও অন করে। স্থানীয় সংবাদে শুনি—এ রাজ্যে ভাইরাস সংক্রমণের পিক আসবে আরও সপ্তাহ চারেক পরে। বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে নিউজ কাস্টার জানাচ্ছেন, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াতে পারে ২,৬০০ জনের কাছাকাছি। ‘দিস ইজ টু ডিপ্রেসিভ…’ বলে ল্যারি প্রতিক্রিয়া জানান। ফিমা রেডিও অফ করে দিয়ে সিডি-টেপ অন করে। ভরাট গলায় ফ্র্যাংক সিনাত্রা গেয়ে ওঠেন, ‘দেয়ার মে বি ট্রাবোল অ্যাহেড/বাট হোয়াইল দেয়ার ইজ মুনলাইট অ্যান্ড মিউজিক/অ্যান্ড লাভ অ্যান্ড রোমান্স/লেটস্ ফেস দ্য মিউজিক অ্যান্ড ড্যান্স…।’

১৫.০৪.২০২০

//জেডএস//

লাইভ

টপ