জীবাণু-অস্ত্র ও দোষারোপ-তত্ত্ব

Send
নাসরিন জে রানি
প্রকাশিত : ১৬:৫৩, মে ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, মে ১০, ২০২০

‘যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে যাচ্ছি আমরা।’ ১৫ এপ্রিল, বুধবার, হোয়াইট হাউজ আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ডোনাল্ট ট্রাম্প এ-কথা বলেন।

নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) চীনের উহান শহরের গবেষণাগার থেকে ছড়িয়েছে কিনা; তা যুক্তরাষ্ট্র খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু হোয়াইট হাউজের প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত সাংবাদিকরা এত সামান্য জবাবে তুষ্ট হন না কখনোই। তারা প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক ব্যবহার করেন; যতক্ষণ কোনো প্রেসিডেন্ট নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন। তাই স্বাভাবিকভাবে জোরালো যে প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় সেই দিনের সংবাদ সম্মেলনে—'চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং-এর সঙ্গে আলাপে এই বিষয়টি তুলবেন কিনা?' এমন এক ত্যাদড় প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে সাংবাদিকদের নিরস্ত করতে ট্রাম্প বলেন, ‘গবেষণাগার সম্পর্কে তাকে যা বলেছি, তা এখানে আলোচনা করতে চাই না। আমি এ ব্যাপারে আরও অনেক কিছু জানতে পেরেছি। সেসব পরে আমি জানাবো। কারণ এখন সেটার উপযুক্ত সময় নয়।’

চলুন এবার জানা যাক, চীন কী জবাব দিচ্ছে এই অভিযোগের:

‘আমরা বারবার যে দাবিটি করে আসছি তার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)ও একমত। চীনের ল্যাব থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়নি।’ জেং শ্যুয়াং, ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রকে বলেন।

পাল্টা অভিযোগের সিলসিলা জারি রাখতে, ট্রাম্প প্রশাসনের আরেক মুখপাত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আমেরিকার প্রথম সারির জনপ্রিয় নিউজ চ্যানেলগুলোর অন্যতম ‘ফক্স নিউজ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা জানি, এই ভাইরাসের উৎপত্তি চীনের উহানে। এমনকি ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজির অবস্থান বন্যপ্রাণীর বাজারের অদূরে। এবং এ বিষটি চীন সরকারেরই খোলাসা করা উচিত। কীভাবে ভাইরাসটির বিস্তৃতি ঘটলো তাও জানানো দরকার। এইসব বিষয়ে পরিষ্কার করতে চীনা সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।’

প্রথমে ডোনাল্ট ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এলেন ফক্স নিউজ চ্যানেলে। বললেন সেখানে ট্রাম্পেরই আওড়ানো বুলি। এর আগে হোয়াইট হাউজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অফিসার জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ চেয়ারম্যান মার্ক মিল্যে, তিনি পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলনের পূর্বেই, অর্থাৎ আগের দিন বিবিধ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়ে দেন, ‘ভাইরাসটি গবেষণাগারে সৃষ্টি হচ্ছে কিনা, তা জোরালোভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমি কেবল বলতে পারি, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ভাইরাসটি প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিতভাবেই কিছু জানি না।’

চলুন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো দোষারোপ করার স্ট্রাকচারাল চিত্রটি আমরা দেখে নিই—হোয়াইট হাউজ প্রশাসন>প্রেসিডেন্ট>পররাষ্ট্রমন্ত্রী>চিফ অফ স্টাফ>সংবাদ সম্মেলন।

একটি ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বা অন্য রাষ্ট্রের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে তা পাকাপাকি প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এগোয় তার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত এটি। কিন্তু কীভাবে ঘটছে তা? বা, অতীতেও ঘটেছে।

১৪ এপ্রিল, ওভাল অফিস থেকে চিফ অব স্টাফ, আমেরিকান প্রেসকে বিবৃতি দিলেন—সেই তথ্যগুলো যা পরদিন ১৫ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলবেন বা বলার সম্ভাবনা আছে। সেই তথ্যগুলোই—ডিসেম্বরের শেষদিকে উহান থেকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই ট্রাম্প বলে আসছেন, এই ভাইরাস ‘চাইনিজ ভাইরাস’, ‘উহান ভাইরাস’, চীনের উহান থেকে পরিকল্পিতভাবে এই ভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়ানো হয়েছে বলে ইঙ্গিত করেছেন। এবং পরদিন ১৫ এপ্রিল হোয়াইট হাউজে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সওয়াল-জওয়াব। এবং তাকে জোরালোভাবে সমর্থন করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকার। যা আমরা শুরুতে পড়েছি।

এইবার আসি গণমাধ্যম নিয়ে আলাপে। আমেরিকান নিউজ চ্যানেলগুলো সবধরনের নিউজকেই কভার করে থাকে। যেকোনো হুজুগে সংবাদ, বিশ্নেষণধর্মী প্রতিবেদন থেকে শুরু করে সব রকমের তথ্য-সন্নিবেশ, সর্বশেষ সংবাদ পরিবেশনে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তারা নিত্য কর্মরত।

এদিকে ১৪ এপ্রিল হোয়াইট হাউজের বিবৃতি, ১৫ এপ্রিল প্রেসিডেন্টের সংবাদ সম্মেলনে সাওয়াল-জওয়াব এবং একই দিনে পরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার, এবং এরই মাঝে এক প্রতিবেদন প্রচার ঐ একই চ্যানেল কর্তৃক—'জীবাণু-অস্ত্র হিসেবে উহানের গবেষণাগার থেকে এই ভাইরাসের উদ্ভব ঘটেনি। কিন্তু ভাইরাস শনাক্ত ও মোকাবেলার ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সমান কিংবা তার চাইতেও বেশি সক্ষম। সেটি প্রমাণের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখাতে গিয়ে ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।’ ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উহানের যে গবেষণাগারে ভাইরাস-বিদ্যা নিয়ে কাজ করা হয়, সেখানে সুরক্ষাজনিত অসতর্কতার কারণে কেউ আক্রান্ত হন। তার মাধ্যমে ভাইরাসটি কাছের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের সামুদ্রিক বন্যপ্রাণীর বাজারে চলে আসে। এরপর সেখান থেকে ভাইরাসটির বিস্তৃতি শুরু হয়।

ফক্স নিউজ থেকে সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যম তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এইসব তথ্য দেশ থেকে বিদেশের গণমাধ্যমে একইসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারও করা হয়। আমরা জানলাম ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বা দোষারোপ তত্ত্ব নিয়ে আমেরিকা কীভাবে প্রচারণা চালায়।

করোনা ভাইরাসে ইউরোপের দেশগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কিছুদিন ধরে কমে এলেও যুক্তরাষ্ট্রে এখনো আক্রান্ত ও মৃত্যুহার সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রে এই আক্রান্তের হার তের লাখের ওপরে। মৃত্যুর সংখ্যা ৮০ হাজারের ওপরে। বিশ্বে এ পর্যন্ত ২১০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এতে মোট রোগীর সংখ্যা ৪১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে মারা গেছে আড়াই লাখের অধিক মানুষ।

উহান ল্যাব থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার যে অভিযোগ তুলেছেন, তা আবারো অস্বীকার করে একে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব’ বলে উল্লেখ করেছে চীন। গত ফেব্রুয়ারি থেকেই এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে আসছে উহান ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজি। চীনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য হলো, এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়নি বা গবেষণাগার থেকে ছড়ায়নি। ১৬ এপ্রিল তারা অর্থাৎ চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোরালোভাবে বলেছে, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকার করেছে করোনাভাইরাস চীনের ল্যাবে তৈরি হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই।’ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প বিষয়টি মোকাবেলায় ডাব্লিউএইচও ‘ব্যর্থ হয়েছে’ অভিযোগ তুলে সংস্থাটিকে অর্থায়ন করা বন্ধ ঘোষণা করেছেন।

বলছিলাম মার্কিন গণমাধ্যমের কথা। ফক্স চ্যানেলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানলাম আমরা। এবার আসুন আরেকটি জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন তাদের চ্যানেলের এক প্রতিবেদনে কী বলেছে তাতে আলোকপাত করি, ‘এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা করোনাভাইরাসকে প্রাকৃতিক বলেই মনে করছেন। এরপরেও চীনের গবেষণাগার থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার যে গুজব আছে, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। এই তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এবং কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, করোনা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র আসলে চীনকে বিপাকে ফেলতে চাইছে। তবে মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসার আগে এ নিয়ে এগোতে চায় না তারা। তবে শেষ পর্যন্ত ভাইরাসটির উদ্ভব নিয়ে তথ্য সংগ্রহ চালিয়ে যাবে তারা।’

কোভিড-১৯ বিদ্যমান বাস্তবতায় এক আতঙ্কের নাম। চীনের উহান শহরে এর উৎপত্তি; কিন্তু ছড়িয়ে গেছে সারা বিশ্বজুড়ে। কোনো কোনো বিশ্লেষকের লেখায় যে ইঙ্গিতটি রয়েছে তা হচ্ছে— এটা কি শুধুই একটি ভাইরাসজনিত রোগ? এক ধরনের ফ্লু? নাকি এটা এক ধরনের জীবাণু অস্ত্র, যা ল্যাবে তৈরি করা হয়েছে? চীনের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্যই কি এই জীবাণু অস্ত্র চীনে ছড়িয়ে দিয়ে চীনকে দোষারোপ করা হচ্ছে?

বেশ কিছুদিন আগে এক প্রতিবেদনে জেনেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার একটি ল্যাবরেটরিতে এ ধরনের প্রাণঘাতী জীবাণু-অস্ত্র তৈরি হচ্ছিলো, এমনকি বিভিন্ন মাধ্যমের, ফোরামের আলাপেও তা বারবার উঠে এসেছে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি প্রচারিত তথ্য হলো—উহান শহরে চীনের সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ল্যাবে এ ধরনের অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছিলো। অসাবধানতাবশত তা ল্যাব থেকে ‘লিক’ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কোনো বিশ্বস্ত সূত্র থেকে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জীবাণু-অস্ত্র মানবসভ্যতার জন্য এক ধরনের বিরাট হুমকি। এই হুমকি পারমাণবিক বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ। জীবাণু-অস্ত্রের মাধ্যমে মানব শরীরে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগি প্রবেশ করিয়ে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা এতোটাই মারাত্মক যে, এর মাধ্যমে পুরো মানব সভ্যতাকে ধ্বংস বা বিলুপ্ত করা সম্ভব। এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই বিশ্বের সিংহভাগ দেশগুলো ১৯৭২ সালে বায়োলজিক্যাল উয়েপন কনভেনশন ট্রিটি স্বাক্ষর করেছিল। পৃথিবীর মোট ১০৯টি দেশ ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, যা ১৯৭৫ সালের মার্চ থেকে কার্যকর রয়েছে। আমেরিকা এই চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ১৯৭৫ সালে চুক্তিটি অনুমোদনও করে। চীন অনুমোদন করে ১৯৮৪ সালে এবং বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে।

শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা এবং চীনে জীবাণু-অস্ত্রের নানা রকমের গবেষণাগার রয়েছে। গবেষণা চলছে সমানতালে। এখন করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে জীবাণু অস্ত্রের বিষয়টি সামনে চলে এলো। এর ভয়াবহতা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। এই জীবাণু অস্ত্র উৎপাদন, পরীক্ষা এবং গবেষণা পরিচালনা তাহলে কি মানব সভ্যতার জন্য বড় সংকট বয়ে আনছে সামনের দিনগুলোতে?

'করোনাভাইরাস প্রাকৃতিক নয়, গবেষণাগার থেকে ছড়িয়ে পড়েছে।' সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন ফোরামে এমন বিতর্ক যখন চলছে ভাইরাসটির সংক্রামণ হওয়ার শুরু থেকেই। ঠিক এমনই একটি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত ঘোষণা এবং তাদের ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে সমর্থন জানিয়ে মতামত দিয়েছেন চিকিৎসা-বিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী ফরাসী ভাইরোলজিস্ট লিউক মন্তানিয়্যের। তার মতে, ‘করোনা মানুষের তৈরি ভাইরাস। এইডস-এর টিকা তৈরি করতে গিয়ে চীনের এক গবেষণাগার থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে।’

লিউক মন্তানিয়্যের এইচআইভি ভাইরাস আবিষ্কারকারীদের একজন, ২০০৮ সালের নোবেল বিজয়ী। ফরাসি এক টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘করোনাভাইরাসে এইচআইভি ও ম্যালেরিয়ার জীবাণু পাওয়া গেছে। যা খুবই সন্দেহজনক। এছাড়া ভাইরাসটির যেসকল বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়ার কথা নয়। উৎপাদনের সময় কোনো দুর্ঘটনার কারণে উহান ন্যাশনাল বায়োসেফটি ল্যাবরেটরি থেকে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। গত দশকের প্রথম থেকে এই গবেষণাগারে বিভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা হয়ে আসছে।’

তবে লিউক মন্তানিয়্যের এসব দাবি উড়িয়ে দিয়ে আরেক ফরাসি ভাইরোলজিস্ট এতিয়েন সিমন-লারিয়্যের বলেন, ‘মন্তানিয়্যের দাবি করা সব তথ্য অর্থহীন প্রলাপ। এই ভাইরাসগুলো খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির উপাদান। এইসব উপাদান আমরা প্রকৃতিতে করোনাভাইরাস জাতীয় অন্যান্য ভাইরাসেও দেখতে পাই।’

এইদিকে চীন সরকার বারবার অস্বীকার করেই যাচ্ছে এবং জবাবে বলছে—'গবেষণাগারে এই ভাইরাসটি তৈরির কোনো প্রমাণ নেই। এছাড়া এই ধরনের দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি-প্রমাণ নেই।’ করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতির উৎস খুঁজতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে দাবি উঠেছে। কিন্তু এই দাবি খারিজ করেছে চীন। আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাজ্যে চীনের এক শীর্ষ কূটনীতিক চেন ওয়েন বলেছেন, ‘তদন্তের এই দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এতে করোনার বিরুদ্ধে চীনের চলমান লড়াই বাধাগ্রস্ত হবে।’

ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চীনের বিরুদ্ধে ভাইরাস নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছে। মার্কিন অঙ্গরাজ্য মিজৌরি এই নিয়ে চীনা সরকারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে। ২৩ এপ্রিল, ২০২০ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, ‘আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড হেলথ এসেম্বেলিতে তিনি তদন্তের বিষয়টি উত্থাপন করবেন।’ এই ওয়ার্ল্ড হেলথ এসেম্বেলি হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রদানকারী পরিষদ।

এতকিছুর পরেও চীনের শুধুই এক জবাব—‘আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমরা এখন এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। আমরা আমাদের সর্বশক্তি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োগ করেছি। এর মধ্যে তদন্তের দাবি শুধু মনোযোগই নয়, সম্পদের অপচয়ও ঘটাবে।’—২৪ এপ্রিল, শুক্রবার, ২০২০।

করোনাভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে পরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার, ঔষধ ও প্রতিষেধক বা টিকা উদ্ভাবন এবং সেগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে সম্মত হয়েছেন বিশ্ব-নেতারা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই উদ্যোগে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার অনেক দেশ যোগ দিলেও যুক্তরাষ্ট্র এ জোটে নেই। চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো বড় দেশের নেতারাও উদ্বোধনী ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেননি। কিন্তু ভিডিও কনফারেন্সে এমানুয়েল মাখোঁ, আঙ্গেলা মেরকেল, সিরিল রামাদোসা, পেদ্রো সানচেজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতি দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। মাখোঁ শিল্পোন্নত সাতদেশের জোট জি-৭ এবং ১৯ দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোট জি-২০ এর সদস্যদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই উদ্যোগে সমর্থন জানানোর জন্য আহবান জানান।

২৭ এপ্রিল ২০২০। হোয়াইট হাউজ প্রেস ব্রিফিং। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে করা ভিন্ন একটি প্রশ্ন এক সাংবাদিকের তরফ থেকে—‘জার্মানির মতো আপনিও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কথা ভাবছেন?’

জবাবে ট্রাম্প বলেন—'জার্মানি নানা বিষয় নিয়ে ভাবছে, আমরা নানা বিষয় নিয়ে ভাবছি। আমরা এখনো চূড়ান্ত অংক নির্ধারণ করিনি।’

এই প্রশ্নের পটভূমিকায় আছে একটি ঘটনা :

সম্প্রতি জার্মানির এক সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়’র মাধ্যমে চীনের প্রতি আহবান জানিয়েছে—করোনাভাইরাসের কারণে জার্মানি যে অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছে, সেজন্য চীন যেন জার্মানিকে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। জার্মান সংবাদপত্রের এমন অবস্থার কথা জানিয়ে এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে উপরে উল্লেখিত প্রশ্নটি করেন।

যথারীতি ২৮ এপ্রিল, পরদিন চীন পাল্টা জবাব দেয়, ‘আমেরিকান রাজনীতিকরা বারবার সত্য উপেক্ষা করে আসছেন। এবং নির্লজ্জের মতো মিথ্যাচার করে আসছেন। তাদের স্রেফ একটা লক্ষ্য—মহামারি সামাল দেওয়া ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে নিজেদের দিনহীন অবস্থার দায়ভার এড়িয়ে যাওয়া এবং জনতার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের উচিত নিজেদের সমস্যার দিকে নজর দেওয়া এবং যত দ্রুত সম্ভব মহামারি নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজে বের করা।’ জেং শ্যুয়াং, চীনা পররাষ্ট্রে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন এই কথাগুলো।

সেই আমেরিকা...

উহান শহরে করোনাভাইরাস সংক্রামণের তথ্য গত ডিসেম্বরে চীন স্বীকার করে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর লকডাউন কর্যকর করে সফলতা লাভ করেছিল এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ঐ সময়ের বিশেষজ্ঞদের মতামতগুলো আমলে নেননি এক বিন্দুও।

এবার চলুন দৃষ্টি ফেরাই চীনের দিকে...

উহানের ল্যাব থেকে ভাইরাসের উৎপত্তি ও ছড়িয়ে পড়া নিয়ে অভিযোগে চীন কম নাকাল হচ্ছে না। আত্মপক্ষ সমর্থনে চীনকে যথেষ্ঠ প্রমাণ দেখাতে হয়েছে। কাজটি করোনা মোকাবেলার চেয়েও কোনো অংশে কম কঠিন হচ্ছে না। নিজের ঘর সামাল দেবার পর চীন এখন বিশ্বের অনেক দেশকে সংকট মোকাবেলায় সাহায্য করছে। তবু প্রশ্ন থেমে নেই। চীন কি তাহলে ভিলেন? করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারী?

যদিও শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। এশিয়া ও আফ্রিকার মতো অনুন্নত মহাদেশের বহু দেশেই তারা বিপুল পরিমাণ মেডিকেল সরঞ্জামাদি পাঠিয়েছে। তবুও সমালোচনার হাত থেকে তারা রেহাই পাচ্ছে না।

কিন্তু চীন বিশ্বের চোখে ‘ভিলেন’ হয়ে থাকতে ইচ্ছুক নয়। সমালোচনা যা-ই আসুক কূটনৈতিকভাবে তা মোকাবেলা করছে এই এশিয়ান সুপার পাওয়ার। এই কাজে তাদের সহযোগিতা করছে তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া। এছাড়াও চীনের কূটনীতিকরা টুইটার, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করছে। এইসব মাধ্যমকে ব্যবহার করে তারা তাদের বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছেন।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিশ্বমাধ্যমে একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে—'নভেল করোনাভাইরাসের মহামারির সময়ে দক্ষিণ চীনে অবস্থানরত আফ্রিকান নাগরিকরা চিকিৎসার ক্ষেত্রে উপেক্ষিত, এমনকি বর্ণবাদের শিকার হচ্ছেন।’ এ খবরে নড়েচড়ে বসেন চীনা কর্মকর্তারা। কেননা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকা মহাদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ওই মহাদেশটির রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুসম্পর্ক তৈরি করেছে চীন।

চীনা বর্ণবাদ নিয়ে মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় যে খবর এসেছে, সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করে চীন। চীন অভিযোগ তুলেছে—চীনের সঙ্গে তাদের আফ্রিকান মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরাতে এটি পশ্চিমা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি অপপ্রচার।

করোনা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব মোকাবেলা করতে চীন সরকার বেশ নমনীয় আচরণ করছে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ক্ষেত্রে। স্বল্পদিন আগে সংবাদ মাধ্যম সিনহুয়া এবং কিছু চীনা কর্মকর্তা টুইটারে নাম লিখিয়েছেন। যাদের কি-না দীর্ঘদিন ধরেই নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন চীনা সরকার। গোটা বিশ্বের কাছে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার প্রয়াসে তারা এখন টুইটারের ব্যবহারকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আমরা এই প্রবন্ধের শুরুতেই এক চীনা পররাষ্ট্র মুখপাত্রের নাম জেনেছি—তিনিজেং শ্যুয়াং।

জেং শ্যুয়াং টুইটার ব্যবহার করে নিয়মিতই পশ্চিমা বিশ্বকে ঝাঁঝালো জবাব দিচ্ছেন। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান মহামারির এই সময়ে জেং ও তার মতো অন্যান্য চীনা সরকারি কর্মকর্তারা একনিষ্ঠতার সঙ্গে বেশ শক্তভাবেই পশ্চিমা মিডিয়াকে সামাল দিয়ে চলেছেন।

আগে আমরা দেখতাম, চীনা কূটনীতিকরা বাইরের বিশ্বের কাছে পরিচিত ছিলেন শান্ত ও ধীরস্থির হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে এ পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সেটি কেমন? নিচের অভিমতটি পড়ুন।

‘চীনা কূটনীতিকরা একটি সময় চীন কিংবা বহির্বিশ্বে পরিচিত ছিলেন রক্ষণশীল হিসেবে। বিশ্বব্যাপী আমাদের কূটনীতিক ও জনগনকে রহস্যময় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এখন সময় এসেছে পশ্চিমা বিশ্বের অযাচিত সমালোচনার যথোচিত জবাব প্রদানের।’—দ্য গ্লোবাল টাইমস, একটি চাইনিজ ট্যাবলয়েড/পত্রিকা।

উপসংহারে একটি প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে শেষ করব। ভবিষৎদ্রষ্টা হিসেবে নস্ট্রাদামুসের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। ১৬ শতকে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এই জ্যোতিষীকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং লন্ডনে ১৯৬৬ সালে ঘটা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডসহ অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করার কৃতিত্ব দেয়া হয়। এখন করোনাভাইরাস ষড়যন্ত্রতত্ত্বের সমর্থকরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে ৫০০ বছর আগেই জেনেছিলেন নস্ট্রাদামুস। 

নস্ট্রাদামুসের সেই তথাকথিত ‘টুইন ইয়ার বা যমজ বছর’ নামে করা ভবিষ্যদ্বাণীতে প্রাচ্যে আগত একটি প্লেগের কথা বলেন, যেটি গোটা পৃথিবীকে ধ্বংস করবে। নস্ট্রাদামুস তার বেশিরভাগ ভবিষ্যদ্বাণী চার লাইনের কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তার কাজের বেশিরভাগ প্রকাশিত হয়েছিল ১৫৫৫ সালে প্রকাশিত বই ‘লা প্রফেটিসে’, যে বইটির জন্য তিনি বেশ পরিচিত। কিছুদিন আগে এক ব্যক্তি টুইটারে লিখেছেন, ‘নস্ট্রাদামুস কি ১৫৫১ সালেই করোনাভাইরাস নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন?' একইভাবে আরেক ব্যক্তি সন্দেহ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘আপনারা কি নস্ট্রাদামুস পড়েছেন? আমি সাধারণত পুরনো সাহিত্য পড়ি না। কিন্তু আমার ধারণা সম্ভবত করোনাভাইরাস এমন কিছু যা আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল।’

কিন্তু কী লিখেছিলেন নস্ট্রাদামুস? ১৫৫১ সালে তিনি লিখেছিলেন, একটি টুইন ইয়ার (২০২০) আসবে। যখন একজন সম্রাটের (করোনা) উত্থান হবে, যিনি পূর্ব (চীন) দিক থেকে আসবেন এবং রাতের আঁধারে প্লেগ(ভাইরাস) ছড়িয়ে দেবেন। সাতটি পাহাড়সমৃদ্ধ দেশ (ইতালী) এবং মানুষকে ধুলোয় মিশিয়ে (মৃত্যু) দেবেন।

তথ্যসূত্র:

এক্সপ্রেস, বিবিসি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, রয়টার, দ্য গ্লোবাল টাইমস চায়না, ডেইলি মেইল, বিবিধ কূটনীতিক ও রাজনীতিকবৃন্দের টুইটার ফ্যান-পেইজ, ফেসবুক ফ্যান-পেইজ, এএফপি, ফক্স নিউজ টুয়েন্টি ফোর ফেসবুক ফ্যান পেইজ, এনবিসি নিউজ, সিএনএন ফেসবুক ফ্যান পেইজ, ইউ টিউব, নেচার ম্যাগাজিন

//জেডএস//

লাইভ

টপ