কালে কালে মহামারি

Send
হেমায়েত মাতুব্বর
প্রকাশিত : ১২:৫৫, মে ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০২, মে ১২, ২০২০

সৃষ্টির শুরু থেকেই রোগ-ব্যাধির সঙ্গে মানুষের ওঠাবসা। রোগ-ব্যাধি কখনো সুখের হয় না, তা সকলের জানা। এমিথিউস যদি দেবতা জিউসের পাঠানো উপহার পান্ডোরাকে এবং তার সাথে দেয়া বাক্স গ্রহণ না করতেন তাহলে এ সকল রোগ-ব্যাধির পৃথিবীর ভেতরে আজ থাকতো না—এরূপ ধারণাই প্রাচীন গ্রীকদের ভেতরে ছিল। রূপকথার পর্দা ছিঁড়ে এবার বাস্তবতায় আসা যাক।

যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈন্যদের মাধ্যমে টাইফয়েড জ্বর সমগ্র এথেন্সে ছড়িয়ে পড়ে, এই ঘটনা অনেককাল আগের, সময়টা ৪৩০ থেকে ৪২৬ খ্রিস্টপূর্ব। এই জ্বর এথেন্স থেকে সারাদেশে দ্রুত ছড়িয়েছিল এবং তাতে দেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ মারা যায়। সে লাশগুলোর দেহাবশেষ পরবর্তীকালে পরীক্ষা করে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে দায়ী করা হয়।

মহারাজ মারকুস আউরেলিউস আন্তনিনাস তখন রোম-সম্রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল। সৈন্যরা যুদ্ধ করে ‘নেয়ার ইস্ট’ থেকে ফিরেছে, আর সঙ্গে নিয়ে এসেছে অদৃশ্য শত্রু। এটি ছিল গুটিবসন্ত, যা তখনকার মধ্যপ্রাচ্যে দেখা যেতো। এই গুটিবসন্তের মহামারি ১৬৫ থেকে ১৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ধারণা করা হয়, এ মহামারিতে তখন প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এ সময় মহারাজের মৃত্যু হয়, তার নাম অনুসারে ‘আন্তনিন প্লেগ’ নাম দেয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে ২৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে গুটিবসন্তের মহামারি আবার দেখা দেয় এবং ২৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তার প্রকোপ থাকে।

৫৪১ খ্রিস্টাব্দে মিশর থেকে শুরু হয়ে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে একধরনের অপরিচিত রোগ, মাত্রারিক্ত কাশি, আর তা সঙ্গে রক্তমাখা কফ, এরপর জ্বর হয়ে মৃত্যু। তখন পূর্ব রোমের রাজা ছিল জাস্তিনিয়ান, তাই এ অপরিচিত রোগটির নাম ‘জাস্তিনিয়ান প্লেগ’ দেয়া হয়। এ সময় রোমে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার মানুষ মারা যেতো, যা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিল। এই মহামারির কারণে ইউরোপের অর্ধেক মানুষ মারা যায়। রোমান সম্রাজ্যের পতনের জন্য এই প্লেগটিকে দায়ী করা হয়।

রোমান সম্রাজ্যের পতন হলেও মহামারিটির ক্ষমতা কয়েকশ বছর সুপ্ত থেকে ১৩৪৬ সালে আবার আত্মপ্রকাশ ঘটায়, তবে কোথায়, তা এখনো রহস্যে ঘেরা। ভারত হয়ে মহামারিটি সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে। মৃত্যুর নির্মমতা চোখের সামনে তুলে ধরে মানুষের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পিত্তি গলিয়ে দেয়। মৃত্যুর এ মিছিলের নাম ‘ব্ল্যাক ডেথ’ রাখা হয়। মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা কারো জানা নেই, তবে ধারণা করা হয় যে, ৭.৫ কোটি থেকে ২০ কোটি মানুষ এ ভয়াল মহামারিতে প্রাণ হারায়। ইয়ারজিনিয়া পেস্টিস নামক ব্যাকটেরিয়া এই দানব মহামারির বিস্তার ঘটায়।

১৬৬৫ সালে নতুন করে আরেকটি প্লেগ দেখা দেয়। যেই জীবাণু ইঁদুরের শরীর থেকে মানুষের দেহে খুবই দ্রুত আক্রান্ত হতে থাকে। বলা হয়, ক্রিমিয়াতে উৎপত্তি এবং সেখান থেকে কৃষ্ণ সাগর হয়ে ইতালিতে সৈন্য বা বণিকদের মাধ্যেমে রোগটি বিস্তার করে। এরপরে দ্রুত ইউরোপে ছড়িয়ে পরে। এ মহামারিতে শুধু লন্ডনেই এক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।

চীনের ইউহান থেকে ১৮৫৫ সালে বের হয় ‘বুবনিক প্লেগ’, যা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে, যা ‘তৃতীয় প্লেগ’ নামে পরিচিত। এ প্লেগটির কারণে শুধু ভারতেই ১ কোটি মানুষ মারা যায়। এরপরে দ্বিতীয় দফা ১৯০০ সালে আবার দেখা দেয় এবং ১৯২০ সাল অব্দি এর দাপট লক্ষ্য করা যায়। এই প্লেগটি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত থেকে কয়েক লক্ষ প্রাণ নিয়ে সম্পূর্ণ বিদায় নেয়। 

১৯১৮ সাল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে, কে জানতো যে, এক অদৃশ্য শক্তি শত্রু হয়ে আরেকটি যুদ্ধের ডাক দেবে। শুরু হয় অপ্রস্তুত পৃথিবীর মানুষের ওপরে ইনফ্লুয়েঞ্জার আক্রমণ। রোগটি পাখির মাংস খাওয়ার মধ্য দিয়ে তৎকালীন আমেরিকান সৈন্যদের, এবং পরবর্তীতে তাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পৃথিবীতে। আমেরিকান সৈন্যরা যখন স্পেনে আসে, তা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। স্পেনে প্রবলভালে মানুষ আক্রান্ত হতে থাকে এবং পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়, তাই এর নাম দেয়া হয় ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। যা স্পেন থেকে ছড়িয়ে পরে সমগ্র ইউরোপে। ভারতীয় সৈন্যরা ইংল্যান্ডের হয়ে তখন ফ্রান্সে যুদ্ধ করছিলো, তারা যুদ্ধ শেষে এই অদৃশ্য শত্রুকে ঘরে নিয়ে আসে। মাঠে-ঘাটে মৃত্যুর মিছিল বয়ে যায়। শুধু ভারতেই এই ইনফ্লুয়েঞ্জা বা স্প্যানিশ ফ্লুতে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বলা হয়, জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ মানুষ ভারতে মারা যায়। এই ফ্লুতে সমগ্র পৃথিবীতে ২ কোটি ৭ লক্ষ থেকে ৫ কোটি, মতান্তরে ৫ থেকে ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়, এবং ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলো।  

পানির অপর নাম জীবন। আবার এই পানিই যে মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে, তা কলেরার মাধ্যমে মানুষ টের পেয়েছিল। কলেরার আক্রমণ শুরু হয় ভারতবর্ষ থেকে। অপরিষ্কার পানিতে এ রোগের ব্যাকটেরিয়া বংশ বিস্তার করে এবং পানি পান করার মধ্যমে তা মানুষের দেহে প্রবেশ করে। কলেরা প্রথবারের মতো দেখা যায় ১৮১৭ সালে, বলা হয় বঙ্গ থেকে কলেরার সংক্রমণ শুরু। কারণ এ দেশে তখন স্যানিটেশন ব্যাবস্থা ছিল না। মানুষ যত্র-তত্র মল ত্যাগ করতো, যা পানিতে মিশে পানিকে দূষিত করতো। এই দূষিত পানির মাধ্যমে কলেরা এই ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এখান থেকে চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়ায় সংক্রমিত হয়। এরপর ১৮২৪ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করে কয়েক লক্ষ জীবন নিয়ে কলেরা বিদায় হয়। এরপরে দ্বিতীয় দফা ১৮২৯ সাল থেকে শুরু করে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপে তাণ্ডব চালিয়ে লক্ষাধিক প্রাণ নিয়ে কিছুদিনের জন্য শান্ত হয় কলেরা। এরপর ১৮৪৬ থেকে শুরু হয় কলেরার তৃতীয় দফা এবং ১৮৬০ সাল পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়। চতুর্থ বার ১৮৬৩ থেকে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত থাকে। পঞ্চম বার ১৮৮১ সাল থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত। ষষ্ঠ বার ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত এবং সপ্তম বারের মতো শুরু হয় ১৯৬১ সালে। শেষবারের মতো কলেরা মহামারি আকার ধারন করে ১৯৭৫ সালে।

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রতি বছর কলেরায় ৪২ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৪২ হাজার মানুষ মারা যায়। সেই যে ১৮১৭ সালে শুরু হল কলেরার রাজত্ব তা আজও শেষ হয়নি। এখনো ইয়েমেনে কলেরা রোগের প্রকোপ রয়েছে। যেখানে দূষিত পানি আছে, সেখানে কলেরা থাকবে, কলেরাকে পুরোপুরি বিদায় দেওয়া তাই সম্ভব নয়।

৫ জুন ১৯৮১, পাঁচজন হোমো-সেক্সুয়াল পুরুষ লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে নতুন কিছু উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়, যাদের ইম্যুনিটি একবারে ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। তাই একে প্রথমে acquired immune deficiency syndrome (AIDS) এবং পরবর্তীকালে Human immunodeficiency virus (HIV) নাম দেয়া হয়। রোগটি ১৯৮১ সালে দেখা দিলেও তার শুরু ১৯০০ সালে সেন্ট্রাল আফ্রিকা থেকে। বানর থেকে মানুষের মাঝে এই রোগের সংক্রমণ। এরপরে ১৯৬০ সালে হাইতি হয়ে ইউএসএ পৌঁছায় রোগটি। অল্পদিনেই রোগটি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়, কারণ যৌন-মিলনের মধ্যমেই এ রোগটি অন্যকে আক্রান্ত করে। নিরাপদে থাকার জন্য কনডমের ব্যবহার এখান থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়। এ পর্যন্ত ৩ কোটি মানুষ এর ছোবলে প্রাণ হারিয়েছে এবং এখনো পৃথিবীর সবখানেই এর অস্তিত্ব রয়েছে।

১৯৭৬ সালে কঙ্গোর ছোট একটা নদীর কিনারায় অবস্থিত গ্রাম ইয়াম্বুকু-এর দুজন মানুষ অপরিচিত জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং দু’দিন পরে মারা যায়। এরপরে সেখনকার ডাক্তার, নার্স আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২৮০ জন হয় এবং সকল আক্রান্ত মানুষ মারা যায়। অপরিচিত এ রোগটি যেহেতু ওই নদীর তীর থেকে শুরু হয়েছে তাই রোগটি নদীর নামে নামকরণ করা হয় ‘ইবোলা’। সেখান থেকে রোগটি সুদানে ছড়িয়ে পড়ে। রোগটির দশা ছিল, যে আক্রান্ত হত, সেই মারা যেত। ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত রোগটি সেন্ট্রাল আফ্রিকায় ছিল। ২০১৪ সালে এটি পশ্চিম আফ্রিকায় দেখা দেয় এবং তাতে এগারো হাজার মানুষের প্রাণ হারায়। বিজ্ঞানীরা সন্ধান করে মারবুক ভাইরাস নামে একটি ভাইরাস আবিষ্কার করেন। এ ভাইরাস সাধারণত বানরের দেহে রোগ সৃষ্টি করে, তাই ধারণা করা হয় রোগটি বানর থেকে এসেছে। কঙ্গো বা সেন্ট্রাল আফ্রিকার মানুষের কাছে বন্যপ্রাণীর মাংস অনেক সুস্বাদু, তাই তারা বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড় এবং অন্যান্য প্রাণী খেয়ে থাকেন। ধারণা করা হয়, এ সকল প্রাণী থেকেও রোগটি ছড়াতে পারে। এরপরে আমেরিকার স্বাস্থ্য গবেষণা ইন্সটিটিউট এর টিকা আবিষ্কার করে, যার মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসে।

চীনের উহান শহরে ৩১ ডিসেম্বর করোনা ভাইরাস গ্রুপের একটি ভাইরাসের আত্মপ্রকাশ ঘটে, যার নাম হল কোভিড-১৯। এ ভাইরাসটি উহানের সামুদ্রিক খাবারের একটি বাজার থেকে ছড়ায়। এ বাজারে অবৈধ বন্যপ্রাণী বিক্রি হয় এবং এ সকল প্রাণী থেকেই ভাইরাসটি মানুষের সংস্পর্শে আসে এবং চীনের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এরপরে ইউরোপ, আমেরিকা এবং সমগ্রবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত দুই লক্ষ আশি হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মরেছে এবং চল্লিশ লক্ষ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে কলেরা এবং গুটিবসন্তে সবচেয়ে বেশি মানুষের জীবন খরচ হয়েছে। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্লেগের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরেছেন, এই প্লেগে তার স্ত্রী এবং সন্তানের মৃত্যু হয়েছিল।

প্রকৃতি কখনো মানুষের ক্ষতি করে না। মানুষ তার আপন কৃতকর্মের জন্যই দায়ী। মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকে স্বভাবজাত উচ্ছৃঙ্খল এবং অবাধ্য, তাই কখনোই তারা অন্যকোনো প্রাণী বা প্রকৃতির উপাদানকে সাদরে গ্রহণ করেনি, করেছে সংঘাতের মাধ্যমে। পুঁজি (মুনাফা) শব্দটা চেনার পর থেকেই মানুষ আরও আগ্রাসী হয়েছে এবং নিজেরা নিজেদের ক্ষতি করতে উঠে-পড়ে লেগেছে, যার ফলে প্রকৃতির আরও উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে নিজেদেরকেই ধ্বংস করার জন্য। এ সকল উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন জীবাণু নিয়ে আসে নিজেদের দেহের ভেতরে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ যতদিন না সহাবস্থান বজায় রাখে, এরকম মহামারি আসতেই থাকবে। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ