কলকাতা থেকে জার্মানি যাত্রা | মার্টিন কেম্পশেন

Send
ভাষান্তর : অহ নওরোজ
প্রকাশিত : ১২:৫০, মে ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৩, মে ১৩, ২০২০

এই ব্যস্ত সামাজিক জীবন থেকে আমি সবসময়ই একটু পালাতে চেয়েছি, যাতে করে পুরো সময়টা আমার লেখালেখির ভেতরে ব্যয় করতে পারি। এই সময়ে খুব কম মানুষই জানেন যে, লেখকের বিচ্ছিন্নতা দরকার, মানুষের কোলাহল থেকে দূরত্ব দরকার। একমাত্র একা থেকেই কেবল নিজের ভেতর থেকে উঠে আসা কল্পনা আর দৃশ্যাবলী দেখার স্বাধীনতা পাওয়া যায়—কেবল একাকিত্বই আমাকে এইসব ধারণাগুলোর বিকাশ এবং ধীরে ধীরে সেগুলোকে সৃজনশীল কাজের একটি শৃঙ্খলে রূপ দেওয়ার পথ বলে দেয়—একটি প্রবন্ধ, একটি গল্প, একটি কবিতা কিংবা একটি ডায়েরি…

আমাকে এভাবে বিচ্ছিন্ন আর একাকি হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় করোনাকে এদিক থেকে ধন্যবাদ দেবো। ‘আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত! আজ সন্ধ্যায় আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারবো না’, ‘দুঃখিত! সিনেমা, থিয়েটার কিংবা কনসার্টে আমার যাওয়া হবে না’—এখন থেকে আমার কাউকে আর এসব বলতে হবে না, কিংবা কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে না। ‘আজ বাড়ি থাকবো, কোথাও যাবো না’ বলে আত্মপক্ষ সমর্থনের কারণও খোঁজার দরকার নেই।

একা থাকার আরাম পেতে আমাকে কঠোর যন্ত্রণা কিংবা কষ্টভোগ করতে হয়েছে। শুরু থেকেই বলি—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাসের মধ্যে শান্তিনিকেতনে আমার বসবাস। ১৯৮০ সালে আমি এখানে এসেছি, তখন থেকে এই জায়গাটা থেকে আমি নিজেকে বিচ্ছন্ন করতে পারিনি। আমি যখন পৌঁছেছিলাম তখন অব্দি এখানে বেশকিছু মানুষ ছিলেন যারা ‘কবিগুরু’কে মনে রেখেছিলেন, এবং কবিগুরুর সঙ্গে তাদের স্মৃতিকথা শেয়ার করতে ভালোবাসতেন। এখন এমন কেউ নেই—রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ যেন কাটা পড়েছে। বিশ্বভারতীতে প্রথমে আমি ছাত্র ছিলাম— পিএইচডি সম্পন্ন করেছি। এরপর এখানে থেকে রবীন্দ্রনাথের গবেষক এবং অনুবাদক হিসেবে কাজ করছি। আমি জায়গা বদলায়নি কারণ শান্তিনিকেতনে আমি আমার জীবনকে এমনভাবে গুছিয়ে নিয়েছিলাম যেটা আমার সকল প্রয়োজনের সঙ্গে যথাযথভাবে উপযুক্ত ছিলো। কিছু মানুষের কারণে বিরক্ত হয়ে দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত আমি সাক্ষাতের সময় ঠিক করি এবং এই সম্বলিত একটি সাইনবোর্ড আমার সদর দরজায় লাগিয়ে রাখি। দুপুর পর্যন্ত আমি একাকি থাকতে চেয়েছিলাম। কামাল নামে গ্রামের একটা ছেলে আমার দুপুরে রান্নার জন্য আসতো এবং বিকেল পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকতো। সেই কামাল এখন আর ছোট নেই, তার সন্তানেরাও কৈশোর পার করে ফেলেছে। কিন্তু এখনো সে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। শান্তিনিকেতনে আমার যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে সেখানে আমাকে সাহায্য করার লোকের অভাব নেই—বিদ্যুতের লাইন ঠিক করা থেকে শুরু করে, ইনভার্টার ঠিক করা, কম্পিউটারে কিছু ইনস্টল করা। তবে সবসময় আমার বাড়িতে টুকটাক সমস্যা লেগেই থাকতো আর সেজন্য আমার ক্ষুদে বাহিনির সঙ্গে দেখা করতে আমি সর্বদা প্রস্তুত থাকতাম।

শান্তিনিকেতনে আমার দিন এভাবে চলছিলো। ওদিকে দূরদেশে জন্ম হলো ভাইরাসটির। শান্তিনিকেতন থেকে এটা সতর্ক দূরত্বেই ছিলো। কিন্তু কী চালাক এই ভাইরাস! অদৃশ্য হওয়া সত্ত্বেও সে তার উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করেছে—প্রধানত আমাদের ভয়ের ভেতর। আমি জানুয়ারিতে কলকাতা থেকে জার্মানি যাওয়ার প্লেনের টিকেট কিনে রেখেছিলাম কারণ আগে থেকে কিনলে তুলনামূলক বেশ সস্তায় পাওয়া যায়। আমার যাত্রার সময় ছিলো এপ্রিলের শেষ দিকে। প্রতিবছরই আমি এই সময়টায় জার্মানি যাই।

কিন্তু ২০ মার্চের দিকে জানতে পারলাম ফ্লাইট বাতিল হবে। আমি এয়ারলাইন্সের হোমপেজে গিয়ে দেখি একটি স্মাইলি মুখ আমাদের বলছে যেখানেই যেতে চান যেকোনো সময় আপনি ভ্রমণ করতে পারবেন, একটি ফ্লাইট বুক করুন। কিন্তু পরদিন ওদের হোমপেজ আর কোনো কাজ করলো না। কলকাতায় আমার ভ্রমণের বিশ্বস্ত এজেন্ট ছিলো তারা এয়ারলাইন্সের কোম্পানিকে ফোন করার চেষ্টা করলো কিন্তু ফোন বন্ধ পাওয়া গেলো, এমনকি তারা এয়ারলাইন্সের অফিসে গেলো, কিন্তু সেটিও বন্ধ পাওয়া গেলো। শুধু অফিসের জানালার কাট-আউটের সঙ্গে তখনো বিজ্ঞাপনের সেই স্মাইলি ফেস ঝুলছিলো। সরকার একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করে যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছিলো পুরো দেশ একেবারে লকডাউন হতে যাচ্ছে। সরকার তার শক্তি এবং সংকল্পের জন্য প্রশংসিত হচ্ছিলো।

এই সময়ে হটাৎ অগণিত মানুষের সঙ্গে সবকিছু ফেলে রেখে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেই। কী জঘন্য যে এভাবে সবকিছু ফেলে বেরিয়ে আসা! আর প্রথমবারের মতো হাজারো মানুষের মতো নিজেকে অজ্ঞাত পরিচয়হীন আর অসহায় মনে হলো। সাধারণ পরিস্থিতিতে আমাদের জীবনের একটা কাঠামো রয়েছে যার উপরে আমরা নির্ভর করতে পারি। ট্রেন যদি চলে, পৌঁছাতে দেরি হতে পারে, কিন্তু তারা তো একদিন গন্তব্যে পৌঁছুবে। প্লেন উড়ছে, একটি ফ্লাইট বাতিল হলে হয়তো পরেরদিন আরেকটি যাবে, আজ না হলে কাল। কিন্তু ভাইরাসটির এতই শক্তি যে এটা সবকিছু থামিয়ে দিলো, কোথাও যাওয়া হলো না। যেন সিনেমার বিশাল গডজিলা।

এই গ্রীষ্মকালের পুরোটা শান্তিনিকেতনে থাকার ব্যাপারটা ভাবি, হয়তো এভাবে পুরোটা বছর থাকতে হতেও পারে। সারারাত আতঙ্কে আমার ঘুম হয় না। লকডাউনের প্রথম দিনে আমার রাঁধুনি কামাল এলো, রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশদের গাড়ি-মটরসাইলকেল থামানোর ঘটনা আমাকে বলল। তাকেও না কি ফিরিয়ে দিয়েছিলো, কিন্তু সে বেশ কষ্ট করে অন্য পথে আমার কাছে পৌঁছায়। তাকে বিজয়ী মনে হচ্ছিলো। কিন্তু তারপরের দিন সে আমাকে ফোন করে বলে, সকল রাস্তা বন্ধ, তার পৌঁছানোর কোনো পথ নেই। আমার প্রতিবেশি আমাকে রান্না করে দেয়।

আমি বুঝতে পারি, শান্তিনিকেতনে থেকে আমার সাধারণ জীবন চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমে কমে আসছে। লেখার জন্য আমার মনে শান্তি দরকার, কিন্তু এই কয়েকদিনের মধ্যেই আমি আমার মনের অবস্থার প্রতিফলন বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারছিলাম। গরম আসতেই তাপমাত্রা আর আর্দ্রতার পরিবর্তন টের পাই, যে কারণে প্রতিবছর গরমের সময়টা আসার একটু আগেই জার্মানি চলে যাই। আর সপ্তাহ দুয়েক পর গরম আরও বাড়লে থাকাটা আমার জন্য আরো কঠিন হয়ে যাবে, আমি হয়তো আগামী পাঁচ-ছয় মাস এখান থেকে বের হতে পারবো না। এই পরিবেশে যুদ্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো বয়সটা অনেক বড়ে গেছে। তাপ আর আর্দ্রতার বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছি, আর পারবো না।

এভাবেই কয়েকদিন মানসিক যন্ত্রণার পর এই অবস্থা থেকে মুক্তির একটা উপায় বের হলো, ভারতের কলকাতার জার্মান দূতাবাস শাখা আমাকে একটি ইমেইল লেখে। যেহেতু আমি একজন জার্মান এবং বহুদিন ধরে ভারতে বসবাস করছি সে কারণে বহু বছর ধরে কলকাতার জার্মান দূতাবাস শাখায় আমি নিবন্ধিত ছিলাম। শেষমেশ এর উপকারিতা বুঝতে শুরু করি। ইমেইলের মাধ্যমে আসা চিঠিটি আমাকে জানায়, অনেক ইউরোপিয়ান নাগরিক লকডাউনের কারণে তাদের দেশে ফিরতে পারেনি। চিঠিতে স্পষ্ট লেখা ছিলো : ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানির ফরেন অফিস কলকাতা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট পর্যন্ত একটি ইভাকুয়েট ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে—তৈরি থাকুন। ফোনে একের পর এক কল আসতে থাকে, ইমেইলেও এই সফর সম্পর্কিত সম্পর্কে অনেক তথ্য পাই। আমি জানতে পারি শান্তিনিকেতনে আরো পাঁচজন জার্মান আছেন যাদেরও ভারত ছাড়ার প্রয়োজন। যেহেতু আমি তাদের মধ্যে সবথেকে সিনয়র এবং তাদের সকলের চেয়ে আমি ভারতে বেশিদিন আছি সে কারণে অসাবধানতাবশত তাদের দায়িত্বও কাঁধে নিয়ে ফেলি।

এর পরে আমাদের সামনে নতুন যে প্রশ্নের উদয় হয় তা হলো, কলকাতা যাবো কীভাবে? কলকাতার দূতাবাস শাখা আমাদেরকে এয়ারপোর্টের কাছে একটি হোটেলে জড়ো হওয়ার কথা বলে দিয়েছিলো। এছাড়া আমাদের ‘নিরাপদ ভ্রমণ’ শিরোনামে জার্মান রাষ্ট্রদূতের সাক্ষর করা চিঠি পাঠিয়েছিলো। যে চিঠিটি আমাদের টাক্সি বা প্রাইভেটকারের জানালার কাচে লাগিয়ে আমরা কলকাতায় পৌঁছাতে পারবো।

কিন্তু কলকাতা যাওয়ার টাক্সি কোথায় পাবো? বাস, ট্রেন, প্রাইভেট কার সবকিছুই বন্ধ। এরমধ্যে আমরা কয়েকবার শুনেছি কোথাও কোথাও পুলিশ ট্যাক্সি ড্রাইভারকে মারধর করেছে, যাত্রীকে অপদস্ত করেছে। কিন্তু আমাদেরতো রাষ্ট্রদূতের সাক্ষর করা একটি চিঠি আছে। আমার সবথেকে বিশ্বস্ত ট্যাক্সি ড্রাইভার সৌমিত্র এই কথা শুনে হাসে, বলে, ‘আপনি কি কখনো শুনেছেন, পুলিশরা ভালোভাবে ইংরেজি পড়তে পারে?’ যা হোক, এরপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকে বুঝিয়ে অনুরোধ করার পর সে ঝুঁকিটি নিতে রাজি হয়।

যে ট্যাক্সির ধারণক্ষমতা পাঁচ জন সেখানে আমরা সাত জন উঠি, বাড়তি সঙ্গে আছে সবার লাগেজ। শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার উদ্দেশে আমরা ভোর চারটায় অন্ধকার থাকা অবস্থায় রওনা করি। রাস্তা একদম ফাঁকা ছিলো, ভাগ্যক্রমে পুলিশরা এখনো তাদের ডিউটি শুরু করেনি। আমরা নিরাপদে কলকাতা পৌঁছে যাই, এবং সৌমিত্রকে বীরের খেতাব দেই।

ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করে তিন রাত আমাদেরকে ঐ হোটেলে কাটাতে হয়। এরপর তিনটি পুলিশের গাড়ি দিয়ে গাইড করে বাসে করে আমাদেরকে এয়ারপোর্টে নেওয়া হয়। বিমানের ভেতরে আমরা পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা সাদা পিপিই পরা লোকদের মুখোমুখি হয়েছি, বাইরে থেকে বোঝাই যাচ্ছিলো না, তারা মেয়ে নাকি ছেলে। ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সকল যাত্রীর মুখ মাস্কে ঢাকা ছিলো।

ফ্রাঙ্কফুর্টে নেমে আমি বিস্মিত হই, আবহাওয়াটা আমাকে কেমন আরাম এনে দিয়েছে। কেবল পুলিশ নয়, যে কর্মকর্তারা আমাদের পাসপোর্ট চেক করছিলেন তাদের মুখও মাস্কে ঢাকা ছিলো। ভারত যেভাবে সবসময় আমাকে স্বাচ্ছন্দ্য এবং চাপমুক্ত মেজাজে অভ্যর্থনা জানায় সেরকম না হলেও ব্যাপারটা কাছাকাছি ছিলো।

//জেডএস//

লাইভ

টপ