মুখোমুখি কবি শামীম রেজা ও কথাসাহিত্যিক মামুন হুসাইন‌

Send
শ্রুতিলিখন : মুশফিকুর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:৫১, মে ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০১, মে ১৬, ২০২০

কবি শামীম রেজা গত ২৭ এপ্রিল কথাসাহিত্যিক মামুন হুসাইনের সঙ্গে ফেসবুক লাইভে মহামারি, গণস্বাস্থ্য ও তার লেখক জীবন-সহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সেই আলাপের অংশবিশেষ প্রকাশ করা হলো।

শামীম রেজা : শুভরাত্রি। পৃথিবীব্যাপী মহামারির এই দুর্যোগময় মুহূর্তে বন্ধুদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। বর্তমান সময় এবং মহামারি-উত্তর সময়ের মানসিক স্বাস্থ্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলছি বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মামুন হুসাইনের সঙ্গে।

সাঁওতালদের মধ্যে মনোরোগের বিস্তার ও ধরন শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য ২০০৯ সালে মামুন হুসাইন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সাইকিয়াট্রি বিষয়ে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন ২০১১ সালে। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ২০০৪ সালে পেয়েছেন কাগজ সাহিত্য পুরস্কার, যা জেমকন সাহিত্য পুরস্কার নামে এখন পরিচিত। তিনিই প্রথম এই পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। ‘নিক্রপলিস’ উপন্যাসের জন্য ২০১১ সালে পেয়েছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্য পুরস্কার। ২০১৭ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার।

প্রিয় শ্রোতা, মামুন হুসাইন আমাদের সঙ্গে আছেন। মামুন ভাই, নিশ্চয়ই এই দুর্যোগময় মুহূর্তে আপনি ভালো আছেন, ঘরে আছেন।

মামুন হুসাইন‌ : হ্যাঁ, শামীম। ভালো আছি, আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম।

 

শামীম রেজা : জ্বি ভালো আছি। আপনার কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। আপনি পাচ্ছেন? বলুন এই পরিস্থিতি নিয়ে।

মামুন হুসাইন‌ : আমি শুরু করি অনেকটা গৌরচন্দ্রিকার মতোই। বলতে পারো অনেকটা কনফেশন। আমরা বলি না যে, শব্দ হচ্ছে ব্রহ্মা, শব্দ আক্রমণ করতে পারে, শব্দ আমাদের দ্রবীভূত করতে পারে। বেশ কিছুদিন ধরেই এবং আজকে তো বটেই, বলি যে, আমরা সবাই লাইফে যাচ্ছি, তার মানে কী? আমরা সবাই মরে বেঁচে আছি? এটাকে বেঁচে থাকা বলে কি-না!

আমাদের ছেউড়িয়ার কথা আপনারা জানেন, সেখানে আমাদের বাউলরা সাধনা করে ‘জিন্দা দেহে মরার বসন’ নিয়ে। মাঝে মাঝে এই একটা কথা ভাবি। আরেকটা কথা মনে হচ্ছে যে, বলি, ভাইরাল করে ফেলা। এই যে আমার কথা, আমার গল্প, আমদের বলবার, আমাদের ছবি সবকিছু মেঘের ভিতর ছড়িয়ে দিয়ে আমরা ভারি একটা আত্মমগ্ন, ভারি একটা আহ্লাদি বোধ করি।

আজকে সেইসব মেঘের, সেইসব ভাইরাল কোথা থেকে ভেসে এসে সমস্ত মানুষকে আক্রান্ত করে ফেলেছে। আমার কাছে মনে হয়, এটা বাক্য-শব্দের প্রতিশোধ কি-না! এবং বলতে পারেন যে, ‘আপনি রচিত জালে আপনিই জড়িয়ে!’ যাওয়া।

ওই যে বলে না, বিবাহের আগে মানুষ থাকে দ্বিপদে, আর বিয়ের পর হয় চতুষ্পদ, সন্তানরা এলে ষষ্ঠপদ-অষ্টপদ, শেষে একেবারে জালে আচ্ছন্ন। আজকে বলতে দ্বিধা কী, ভয়ও লাগছে, সবই এই রকম একটি মনোহর বিপদজ্জনক জাল ছড়িয়ে বসেছি। সেই জাল থেকে যে কবে মুক্ত হওয়া যাবে!

পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এই পরিস্থিতির মধ্যে যারা আমাদের বাঁচানোর কাজ করছেন—চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সাংবাদিক, পুলিশ সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

কৃতজ্ঞতা অনেকটা কনফেশনের মতোই বলছি। যেন মানুষের কাছে মনে হবে আমি আর তুমি বোধহয় ভারি একটা আলস্য উদযাপন করতে শুরু করেছি। আমার মনে হয়, এই মানুষদের প্রতি আসলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় না। তারা এখন প্রায় জীবন-মৃত্যুর কিনারা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছেন।

শামীম, যদি আমাকে একটু অনুমতি দাও, আমাদের বন্ধু ছিলো, রাজা হাসানের একটি কবিতা পড়ি।

 

শামীম রেজা : জ্বী, প্লিজ। পড়ুন।

মামুন হুসাইন‌ : একটা কবিতা আছে, NDE, তুমি শব্দটার সাথে পরিচিত কি-না জানি না, আমরা বলি ‘Near death Experiance’ মানে, যখন বেঁচে থাকি, কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় মৃত্যু বোধহয় ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমি ওর লেখা থেকে সামান্য একটু পাঠ পড়ে শোনাই, লেখাটির নাম NDE—

অপারেশন টেবিলে ঝুঁকে পড়া আলোর নিচে

কীভাবে… [অস্পষ্ট]

যদিও ঘাসের ডগায়, জমে থাকা শিশিরে—

প্রতিবিম্বিত তোমার মুখ এবং তুমি কেবল ভয় পাচ্ছিলে

কীভাবে যে বর্ণিত হয়েছিল ধূসরিত সন্ধ্যাগুলো,

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর কাগজের নির্জনতাও কর্কশ হয়ে ওঠে

শিল্পীবন্ধুরা জমাট রক্তের রঙ শিকার করছে,

তাদের ক্যানভাসে মাংসের জ্বলন্ত উদ্ভাস,

তুমি কাউকে বলতেও পারছো না, ফিরে আসবো,

ডাক্তারের চাপা স্বর, অচেতনে খসে পড়ছে।

শামীমের কথা এখন আমাকে একটু বলতেই হবে। ইতোমধ্যেই আপনারা লক্ষ্য করেছেন, শামীম আমার সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বলেছেন, সুবচন প্রয়োগ করেছেন। এবার আমি একটু বলবো। শামীমকে আমি ঠিক প্রথম কখন দেখেছি এক্ষুনি মনে করতে পারছি না। ও যখন পত্রিকায় ছিলো। নানা স্বজনপ্রীতি করে না কি আমাকে পুরস্কারটা দিলো, সে সময় প্রথম পরিচয় হলো কি-না, এক্ষুনি মনে করতে পারছি না।

শামীমকে দেখে মনে হয়, ৭১-এর প্রজন্ম কী, তার আদল কেমন হয়। ১৯৭১, উত্তাল সময়, ৭ মার্চের অগ্নিগর্ভ ভাষণের ঢেউ সারা বাংলাকে উন্মাতাল করে ফেলেছে। শামীম সেই সময়ে, ৮ মার্চ পৃথিবীতে এসেছে, আমি বলতে পারি এক ধরনের গৌরবান্বিত সময় সে পেলো, স্বাধীনতার বীজ যখন বপন করা হয়ে গেছে।

শামীম সম্পর্কে আপনারা জানেন যে, শামীম একটা বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইন্সটিটিউটে পরিচালক হিসেবে কাজ করছে। শামীম কৃত্তিবাস পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছে। শামীমের কথা আমি জানি, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওর একটি কবিতার বই ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ পাঠ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব আমার কাছে খুবই আনন্দের বিষয়।

ওর কবিতা সংগ্রহ এক্ষুনি হাতের কাছে নেই, তবু আমার কিছু লেখার কথা মনে পড়ছে, যেমন—ওর মা সিরিজ, আবার নালন্দা, কীর্তনখোলা এবং একটি পঙক্তি আমার খুব মনে পড়ছে—‘মেয়েটি উদ্ভিদ হয়ে বেঁচে আছে...’

শামীমের একটা প্রিয় উক্তি—‘সময় মানুষের না, কেউ কেউ সময়ের।’

শামীমের একটি নভলেট আছে, এটা আমার হাতের কাছেই আছে, এখন পাঠ করছি। জীবননান্দ ও মায়াকোভস্কিকে নিয়ে লিখেছিলো ‘জীবননান্দ ও মায়াকোভস্কি জোৎস্না দেখতে চেয়েছিলেন।’ 

ফেসবুক লাইভে কবি শামীম রেজা ও কথাসাহিত্যিক মামুন হুসাইন‌

শামীম রেজা : ধন্যবাদ, মামুন ভাই। এবার আমরা প্রশ্নের মধ্যে ঢুকে পড়ি। আমরা মহামারির ইতিহাস জানি যে, খ্রিস্টপূর্ব ১২ শতকে মমির ভেতরে গুটি বসন্তের জীবাণু মিলেছিলো। এরপর থেকে ৬ষ্ঠ, ৭ম শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত প্রায় প্রতি শতকেই হাম, গুটি বসন্ত, প্লেগ, ব্লাক ডেথ ইত্যাদিতে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এইসব মহামারিতে কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধে এত মানুষ মরেনি, তার চেয়ে মরেছে স্প্যানিশ ফ্লুতে।

এগুলো আমরা এখন সবাই এই কয়দিনে জেনে ফেলেছি যে, ১৯১৮ থেকে ১৯২০ এই দুই বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। একবার কাশি দিলে ৫০ লক্ষ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে এবং সেটা প্রথম আমেরিকায় ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘটেছিল। কিন্তু তারা পাত্তা দেয়নি, কারণ যুদ্ধটাই তখন তাদের কাছে ছিল প্রধান।

তো এই করোনা মহামারির সময়ে শারীরিক স্বাস্থ্যের সঙ্কটের কথা প্রচুর কিছু শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু সমান্তরালভাবে মানসিক স্বাস্থ্যও তো ভেঙে পড়ছে। আমাদের দারিদ্রের কথা অবর্ণনীয়।

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার পথ কী? এ সম্পর্কে আপনি যদি আমাদের কিছু বলেন। একজন ডাক্তার এবং সাহিত্যিক হিসেবে, দুই জায়গা থেকেই।

মামুন হুসাইন‌ : আমি তোমার তথ্যের সঙ্গে একটু যোগ করি। যখন পেলোপোনিসিয়ান যুদ্ধ হয়, তখন আমরা দেখেছি, এথেন্সে ব্লাক ডেথে ৭৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ মারা গেছে। লন্ডনে একটা বিরাট প্লেগ হয়, সেখানে একটি কূপ খুঁড়ে মানুষের মৃতদেহ সৎকার করতে হয়। একটি বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, তখন লন্ডনে রাস্তার মধ্যে ঘাস জেগে উঠেছে। আমরা যারা ৭১ দেখেছি, তারা দেখেছি যে, আমাদের পতিত উঠানে, বাড়িতে বুক সমান ঘাস জমে গেছে আমারা যখন ফিরেছি। এটার সঙ্গে আমি একটু ভারতবর্ষের বাস্তবতার কথা যুক্ত করি। ১৮৯৭ সালের দিকে পুনেতে আমরা লক্ষ্য করলাম যে, সেখানে প্লেগ প্রবেশ করেছে এবং সেখান থেকে কলকাতা তারপর মুম্বাই হয়ে করাচি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এর একটা সামাজিক ইতিহাস আছে। সেটার সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাই। সে সময়ে একটা করে সার্চ পার্টি তৈরি করা হতো, তিনজন ব্রিটিশ সৈনিক এবং একজন স্থানীয় থাকতো সেই দলে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্লেগ খুঁজে বেড়াতেন। এতে জনমনে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এতে তারা খুব ক্ষিপ্ত হয় এবং প্লেগের চেয়ারম্যানকে হত্যা করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাল গঙ্গাধর তিলক একটি সম্পাদকীয় লেখেন এবং তার জন্য তাকে জেলে যেতে হয়।

প্লেগ বা এ সমস্ত মহামারি সামাজিক ইতিহাসের একট বড় বিষয়, এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের রিউমার যুক্ত হয়। তোমার ধারণা আছে, যখন প্লেগ ছড়িয়ে যাচ্ছে তখন অনেকে বলছিলো, ব্রিটিশরা আসলে চাইছে ভারতবর্ষের লোকসংখ্যা কমাতে, এজন্য তারা পুকুর বা জলাশয়ে বোধহয় বিষ প্রয়োগ করছে।

আজকে আমরা যখন করোনার কথা বলছি, তখন দেখা গেল যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট এই ভাইরাসটির নামই দিয়েছেন চায়না ভাইরাস। কেউ কেউ বলছেন এটি বায়োলজিক্যাল উয়েপন। আমার কাছে এটা একটা বাস্তবতা। এর আরেকটা সামাজিক ইতিহাস আছে, প্লেগের সঙ্গে চার্চের খুব বড় একটা সম্পর্ক আছে; দেখা গেছে যখন মানুষ পালায়ন করছে, তখন মার্টিন লুথার কিং বলছেন : ‘না, পালায়ন করা যাবে না, কারণ জিসাস বলেছেন—‘I was seen you but you didn’t visit me.’ এতে করে অনেকে বলছেন, প্লেগের সঙ্গে আমদের এই ক্রিশ্চিয়ানিটির প্রকাশ এবং বিকাশের বড় সম্পর্ক আছে। এটা একটা সামাজিক ইতিহাস, আমার স্মরণে এলো।

তুমি যে কথাটা বলছিলে মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্কট, এটা তো খুবই সত্য কথা। আসলে আমরা মনোরোগ নিয়ে কাজ করি, আমরা একটু জোর দিয়েই বলি, No health without mental health. এখন একটি নতুন শব্দ তৈরি হয়েছে, আমরা বলছি করোনাফোবিয়া। মানে করোনা থেকে ভয় কাজ করছে। এখন ভয় কেন হয়? আমাদের মস্তিষ্কে একটা ফিয়ারসার্কিট থাকে, এখান থেকে আমাদের ভয় তৈরি হয়। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, সব মানুষ কিন্তু সমানভাবে আক্রান্ত হচ্ছে না। এটা নির্ভর করছে প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন তার উপর।

তারপর খাপ খাওয়ানো অর্থাৎ অভিযোজনের ক্ষমতা কেমন, সেটাও একটা বড় ব্যাপার, এবং এই মুহূর্তে তার যে শারীরিক অবস্থা সেটাও ভাবতে হবে। এই মিথস্ক্রিয়াতেই বোধহয় মানসিক রোগ হয়। তাহলে মানুষ কিন্তু এখন নানাভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটা হচ্ছে যে, কিছু মানুষ সত্যিই অসুস্থ, কিছু মানুষ অসুস্থ নন, কিন্তু হতে পারেন, কিছু মানুষ রয়েছেন যে হয়ত তার স্বজনের মৃত্যু দেখেছে, কিছু মানুষ অসুস্থ না, কিন্তু একদম সম্মুখ-সমরে আমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।

সত্যি কথা বলতে কী, ভয় কোনোদিনই দূর করা যায় না, ভয়কে ধারণ করতে হয়। দেখবে আমরা যখন প্লেগের কথা বলি, বেইয়াতিনের প্লেগ নিয়ে একটা কথা আছে—‘প্লেগ আসলে মানুষের মধ্যেই থাকে, নির্বাসনে পাঠানো যায় না।’

উদ্বেগের সঙ্গে কীভাবে বন্ধুত্ব তৈরি করা যায় সেটা ভাবতে হবে। আমার এক্ষুনি মনে পড়ছে, আমরা ওই কথাটিই বলবার চেষ্টা করছিলাম যে, যখন ভয় থাকে, তখন তার মধ্যে একটা অস্থিরতা থাকে, উদ্বেগ থাকে, তার মধ্যে বিষাদ থাকে, তবে তা যদি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে, তখন আত্মহননের প্রবৃত্তি হয়। অনেক সময় আমরা দেখেছি, যে মানুষ বাঁচার জন্য নেশাজাতীয় দ্রব্যের আশ্রয় গ্রহণ করে, সে বাড়তি নেশার ঝুঁকির দিকে চলে যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার দুটো জিনিস দেখা, এই মুহূর্তে যারা আক্রান্ত হচ্ছে অথবা এর আগেই যারা আক্রন্ত হয়েছেন—সিজফ্রেনিয়া, বাইপোলার যারা, তাদের কষ্টটা নতুন করে বেড়ে যেতে পারে।

আমাদের একটা সাজেশন—এখন প্রচুর তথ্য আসছে, প্রচুর তথ্যও কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এটাও একটা তথ্যের দারিদ্র্য। কাজেই সঠিক তথ্য কোথা থেকে আসছে সেটা জানা দরকার। তথ্যটা গ্লোবাল কি-না, মানে একটা তথ্যের পরিপ্রেক্ষিত থাকে, হয়তো এই তথ্যটা খুবই আন্তর্জাতিক প্রক্ষিতে, এটা হয়ত আমাদের জন্য প্রযোজ্য না, কাজেই এর একটা স্টেট লিমিট থাকা দরকার।

এখন নিজের যত্ন নেওয়া তো বটেই এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার যেটা আমরা যারা ঘরে বসে আছি, এই সময়টাকে কী করে বাঁচানো যায়, কী করে আনন্দময় করা যায়, সৃষ্টিশীল করা যায়।

কখনো কখনো এমন হয়, এরকম ভীতির মধ্যেও মানুষ প্রথমে ডিনাই করতে চায় যে, বোধহয় আমাদের রোগটা হবে না, তারপর তার মধ্যে একটা ক্রোধ জন্মায়, তারপর নিজের সঙ্গে একটা তর্কের জায়গা তৈরি হয়, তারপর সে বিষাদে আক্রান্ত হয়। নিজের এই উদ্বেগকে কখনো কখনো অনুমোদন দেওয়া দরকার, আমার হয়তো একেবারে অস্বীকার করতে চাই।

এই যে বারবার যে কথা বলছি, যেটাকে আমরা বলি ‘Reflecting listening’—যা বেঁচে থাকার জন্যই আসলে গল্প বলা দরকার। লিওনার্দ বলেছেন, মানুষ তো আসলে গল্প-পোষ্য জীব। আজকে হয়তো পরামর্শ দেবার বিষয়টা ততটা নয়, নিকট মানুষদের কাছে শুধুই কথা বলা। জানি না ঠিক ব্যাপারগুলো গুছিয়ে বলতে পারলাম কি-না।

 

শামীম রেজা : আচ্ছা মামুন ভাই। আপনার কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ছিল ফ্রান্সের মানসিক কেস-স্টাডিগুলো,  যুদ্ধোত্তর আলজেরিয়ার ঘটনাগুলো, কীভাবে মানুষ বীভৎস মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল।

আমরা এর পরের প্রশ্নে যাচ্ছি, পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে স্টামফোর্ড, কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আর্টস হিউম্যানিটিস মেডিসিন প্রোগ্রাম চালু করেছে বহু আগেই, আপনি অন্য একটি ইন্টারভিউতে বলেছেন এ কথা, নেপালেও এ বিষয়ে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হচ্ছে।

কিন্তু এই যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানববিদ্যা বিষয়ে পড়ানোর চিন্তা—আপনি তো এ বছর LPR-এ চলে গিয়েছেন, আপনি সর্বোচ্চপদ মানে অধ্যাপক এবং ডক্টর হয়ে গিয়েছেন, আপনি এ সম্পর্কে কোনো প্রস্তাবনা উঠিয়েছেন? কিংবা আমাদের উচ্চমহলগুলো মানববিদ্যা, বিশেষ করে মনস্তত্ত্ব, সামাজিক এবং সমাজবিজ্ঞানও যে বিজ্ঞান এটা তো স্বীকার করছে না। এ বিষয়ে আপনি যদি কিছু বলেন।

মামুন হুসাইন‌ : এটা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার ধারণায় ছিল না যে, তুমি এই প্রশ্নটা করবে। কারণ হয় কী আজ পর্যন্ত আমার যারা সহকর্মী আছেন, যারা সহযোগী আছেন, তাদের মুখ থেকে আমি এই শব্দটি শুনিনি। আমাদের একটা মেডিকেল জার্নাল হয়, সেই পত্রিকায় আমি একটি এডিটোরিয়াল লিখেছিলাম, মেডিকেল হিউম্যানিটিস নিয়ে। সেখানে কয়েকবার এই কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি।

আমাদের একজন বড় মেডিসিনের পণ্ডিত আছেন, প্রফেসর হ্যারিসন, তার বইটা সারা পৃথিবীতে অনুবাদ করে পড়ানো উচিত। প্রফেসর হ্যারিসনের একটা ছোট্ট লেখা আছে, স্মৃতি থেকে বলছি, ফিজিশিয়ানের কাছে আসলে মানুষ কী চায়, অনেক কথাই তিনি বলেছেন, একটা কথা বলেছেন—‘One's should have Shakespearian breath of interacted moment.’ এখন মেডিসিনের লোক হঠাৎ করে শেক্সপিয়ার শব্দটা ব্যবহার করলেন। আমি অনেক দিন ভেবেছি। উনি বলেছেন, শেক্সপিয়ার মানুষের মধ্যে যেমন নানা মানুষ খুঁজে পান—দস্যু পাওয়া যাচ্ছে, রাজা পাওয়া যাচ্ছে, ভূত-ডাইনি পাওয়া যাচ্ছে, আমরা যখন মানুষ দেখছি এই মানুষ তো আসলে বান্ডেলস অব সিনড্রোম না, নানা জায়গার, নানা রকমের বিচিত্র মানুষ—এই মানুষের শৈশব থাকে কৈশোর থাকে। কাজেই আমি যদি মানুষটাকে বুঝতে চাই তো বোঝার জন্য একটা চোখ তৈরি করতে হয়, সেজন্য এই মনোবিদ্যা খুবই খুবই একটি জরুরি বিষয়। এটা নেপালে তো বটেই  ‘The General Medical Council’ বিলেতের মতো জায়গায়ও আছে।

এই কথা আমাদের দেশে প্রকাশ্যে ভরা সভাতে আমি কখনো বলতে পারি নাই, আজকে বলার সুযোগ হলো। আমি মনে করি এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কারণ আমি যদি মেডিকেল সোসিওলজি না জানি, মেডিকেল এনথ্রোপলজি সম্পর্কে ধারণা না থাকে, তবে বারবার বলছি মানুষকে দেখার মতো চোখ তৈরি হবে না।

আমাদের এখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় তার সামনাসামনি বলেছিলাম যে, এই বিষয়গুলো নিয়ে কখনো কাজ করা যায় কি-না।

যেমন তুমি তোমার ইন্সটিটিউটে কাজ করছ, সেখানেও এটা করতে পারো, সবসময় চিকিৎসকরাই করবে বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়।

 

শামীম রেজা : হ্যাঁ, আমরা সেটা সিলেবাসে রেখেছি।

মামুন হুসাইন‌ : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং আমার বলে ভালোই লাগলো যে, আমি এই প্রথম আমার ফোরামের বাইরে হিউম্যানিটিজ শব্দটা ব্যবহার করার সুযোগ পেলাম, ধন্যবাদ তোমাকে।

 

শামীম রেজা : মামুন ভাই, আপনি কি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বলতে? আপনার একটি ইন্টারভিউতে পড়েছি ইউরোপে—‘World Union of Physician-Writer’ নামে একটা ব্যাপার আছে, সেখানে কি আপনি গিয়েছেন?

মামুন হুসাইন‌ : আসলে আমি কখনো চিকিৎসক-লেখক হিসেবে কোথাও তেমন যাইনি। মনে করিনি যাওয়াটা খুব জরুরি কি-না। বেশির ভাগ সময়ে প্রফেশনাল কাজে গিয়েছি।

 

শামীম রেজা : কোথায় কোথায় গিয়েছেন? ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন?

মামুন হুসাইন‌ : হ্যাঁ, ঘুরে বেড়াতে তো চাইই। কিন্তু সে তো নানা সময় নানাভাবে হয়ে ওঠে না। তুমি তো জানো ভ্রমণের সঠিক সঙ্গী যদি না হয়, তাহলে অনেকটা সেই বুড়ি-ছোঁয়ার মতোই হয়। শুধু গেলাম আর কিছু নিম্ন মানের সুভিনিয়র কিনলাম, ছবি তুললাম। জায়গাটাকে স্পর্শ করা সেটা আসলে হয় না। ইউরোপের কিছু কিছু জায়গায় গিয়েছি এই পর্যন্তই।

 

শামীম রেজা : যেমন?

মামুন হুসাইন‌ : আমি গিয়েছিলাম বার্লিনে, ‘World Psychiatrist Association’-এ, ওখানে আমি একটা পেপার প্রেজেন্ট করেছিলাম ‘Suicide Bombing’-এর ওপরে। তার আগে গিয়েছিলাম লখনৌতে ‘গ্লোবালাইজেশন এবং কালচার’ কী করে আমাদের নতুন এনজাইটি তৈরি করছে সেটা নিয়ে একটা সেমিনারে। কখনো স্পেনে গিয়েছি বা ফরাসি শহরে এক আধবার আরকি। একবারই গিয়েছি সেই যে বিখ্যাত বইয়ের দোকান যেটা শেক্সপিয়ারের আমলের।

 

শামীম রেজা : কতদিন ছিলেন?

মামুন হুসাইন‌ : না, খুব বেশি না। এটা তো ধরো আমাদের ভ্রমণের, আমরা তো সরকারি মানুষ, আমাদের তো খুব লিমিটেড ছুটির মেয়াদ থাকে। তো সেখান থেকে যাওয়া, সেখান থেকে সময় বাঁচিয়ে। ওই যে বলে না, পলায়ন করা, পলায়ন ছাড়া তো আর বাঁচা যায় না, সেই আর কী।

 

শামীম রেজা : ওই যে জার্নাল অব পোয়েট্রি থেরাপি, মেডিকেল হিউম্যানিটিজ নিয়ে একটু কিছু বলবেন আরও?

মামুন হুসাইন‌ : দেখো, জার্নাল অব পোয়েট্রি থেরাপি আমি নিজে হাতে নিয়ে কখনো দেখিনি। তবে আমাদের অনলাইন বা গুগলের বদান্যতায় এর প্রচ্ছদ দেখেছি, এর কনটেন্ট দেখেছি, কখনো কখনো আমার নিজের লেখার জন্য তা থেকে কিছু কিছু ম্যাটার ডাউনলোডও করেছি। এখন সেটা হয় কী, এটা একটা ইন্টার ডিসিপ্লিনারি পত্রিকা, সেহেতু হিউম্যানিটিজের কথা আমরা বারবার বলছি, এর মধ্যে একটা সোশ্যাল সাইন্স চলে আসে, সাইকোলজি আসে এবং অবশ্যই ওই মানুষটি আসে—রোগীটি আসে। যেমন কিছু কিছু বিষয়, আমি তোমাকে বলতে পারি, একটা হচ্ছে, একটা কনটেন্ট আমি দেখেছিলাম, পোয়েট্রির সঙ্গে ন্যারেটিভ কীভাবে যুক্ত করা যায়, ফ্রী পোয়েট্রির সঙ্গে স্টোরি যে লিংকড তা যুক্ত করা যাচ্ছে কি না। অথবা পোয়েট্রি এজ থেরাপি আমাদের ওয়েলবিংকে কীভাবে এনসিওর করছে। একটা স্টাডি দেখেছিলাম যে Carcinoma of Breast অর্থাৎ যারা ব্রেস্ট ক্যান্সারে ভুগছেন, এসব মানুষের ওপর একটা গবেষণা করে তার কোনো পোয়েট্রি রিড সেশন হচ্ছে কি না। তো এটা তো বুঝতেই পারছো যে, পোয়েট্রি আমাদের আবেগের এত বড় একটা পরিশ্রুত জায়গা, এটা আমাদেরকে হয়তো ওই কষ্ট, ওই সম্মান, ওই বেদনা অনেকখানি আমাদের বলতে সাহায্য করে। তো এই কারণেই হয়তো পোয়েট্রি থেরাপি একটা নতুন বিষয় তৈরি হয়েছে। তুমি যেহেতু কবিতার মানুষ, তো তোমার সম্মানে আমি বলতে পারি, যেমন বোদলেয়ার বলতেন—‘যিনি গদ্যের তাকেও যেন কবিতার মধ্যে থাকতে হয়।’ গদ্যের হলেও তাকে কবিতার মধ্যে থাকতে হয়, এবং দেকার্ত বলতেন—‘সবচেয়ে পরিপূর্ণ শিল্প হচ্ছে কবিতা।’ এবং আমি পরবর্তীকালে দেখেছি যে, এহেন মানুষ নেই যারা কবিতা বলছেন না। এই যে কবিতা মানে যে কবিতা, যে একটা ছোট বাক্য, ছোট একটা পৃষ্ঠায় লিখলাম সেটা কবিতা নয়, কবিতা একটা জীবন-যাপন, কবিতা একটা অবস্থান।

 

শামীম রেজা : কবিতা একটা ভাবনার পূর্ণ আখ্যান।

মামুন হুসাইন‌ : আমার পছন্দের একজন ফিল্মমেকার আছেন, Theo Angelopoulos, উনি বলছেন—‘দেখো আমি তো ছবিতে ভাষার ভাষাতত্ত্বের নানারূপ অনুসন্ধান করি।’ এবং তার একটা ছবি আছে—The Beekeeper (1986), তো ‘The Beekeeper’—এ দেখো ওখানে যে মৌমাছির প্রতিপালক, ওর মধ্যে কিন্তু কবির আত্মা আছে। ফেল্লিনিরও কথা স্মরণ করো, সে একজন film-maker, বলেছেন—‘No before you become a poet, তুমি তো film-maker হতেই পারো না।’ তো আমার কাছে এই জিনিসটা মনে হয়, পোয়েট্রি মানুষের এত বড় একটা অর্জন, এই asset-কে কেন আমরা একটা প্রায়োগিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো না?

 

শামীম রেজা : এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি, আপনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাঁওতালদের মনোরোগের বিস্তার ও ধরন শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন ২০১১ সালে। এ সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা এবং থিসিস থেকে কিছু যদি বলেন।

মামুন হুসাইন‌ : আমি প্রথমে একটু ধারণা দেই। তুমি যদি বল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, আমি হয়তো শুধু সাঁওতালদের নিয়ে কাজ করেছি, কিন্তু এই বরেন্দ্র ভূমিতে আরও অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে। যেমন রাজবংশী আছে, ওঁরাও আছে, তারপর ধরো যদি পার্বত্য অঞ্চলে যাই সেখানে নানা রকমের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সামাজিকভাবে যেহেতু এরা প্রান্তিক মানুষ, কাজেই মূল যে সাংস্কৃতিক স্রোত, তার দ্বারা তারা নানাভাবে নিষ্পেষিত হতে পারে। অর্থাৎ বড় বা প্রধান যে কালচার, তার সঙ্গে এদের একটা acculturation একটা খুব বড় সমস্যা হতে পারে। এটা আমরা খুব লক্ষ্য করে দেখেছি এবং প্রান্তিক মানুষ হিসেবে এদের জীবন জীবিকা, এদের দারিদ্র্য সীমাহীন। আরেকটা জিনিস দেখা যায় যে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপরে রাষ্ট্র কিন্তু নানাভাবে হস্তক্ষেপ করে উন্নয়নের নামে—হয়তো তার জায়গা, তার জমি, তিনি যে অঞ্চলে বসবাস করছেন সেখান থেকে উচ্ছেদ হন। এর ফলে একটা নতুন রিফিউজি তৈরি হয়,  ডেভলপমেন্টাল রিফিউজি। তো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে কিন্তু এরকম নানা রকমের প্রবণতা অর্থাৎ জীবন-জীবিকার যে কষ্ট-দাহ এগুলো কিন্তু হতেই থাকে।

যেটা বলবার বিষয় যে, মনোরোগের প্রকোপ আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন যে, এরা এত মাটি-ঘনিষ্ঠ মানুষ, এরা এত সাধারণ বৃত্তের মানুষ, এদের এত লোভ কম, এদের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এত সীমিত তাহলে এরা কেন আক্রান্ত হবে? আমরা বলছি, যে কোনো মানুষই আক্রান্ত হতে পারে। কাজেই সমানভাবে লক্ষ্য করছি, এখানে যেটা হয় কী, যে ভঙ্গিতে ওরা সমস্যাগুলো বলতেন, যে বাক্য, তা হয়ত আমাদের টেক্সটবুকের ভাষার সঙ্গে যাচ্ছে না।

আমি একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই, যে সাঁওতাল আদিতে উপাসনা করত বনগাঁর, অর্থাৎ বঙ্গাদের এই অঞ্চলে দেখলাম, একটা বড় অংশ তারা খ্রিস্টধর্মে পরিবর্তিত হচ্ছে। একই বাড়িতে আবার সবাই খ্রিস্টভক্ত হচ্ছেন না, কেউ কেউ আগের ধর্মে আছেন। আবার কেউ হয়তো খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন, কিন্তু সে হয়তো ক্যাথলিক নন, সে হয়তো ব্যাপিস্ট কিংবা চার্চ অব বাংলাদেশ বা অ্যাডভান্টিজ।

কাজেই অনেক সময় দেখা গেল, এই যে বেঁচে থাকা, তার অস্তিত্ব, তাকে নানাভাবে এইসব নিয়ে এক ধরনের conscious বলো unconscious বল, সে সাফার করতে হচ্ছে। খুব সহজ কথা এই, মনোরোগের প্রকোপ সারা পৃথিবীতে সকল মানুষের মধ্যে প্রায় একইভাবে দেখা দিয়েছে। হয়তো প্রকাশ নানাভাবে ভেরি করে। এটা খুব সোশালাইজড পার্ট, যারা কাজ করে তারা কালচারাল সাইক্রেট্রি বা সাইক্রেটিক এনথ্রোপলজি নিয়ে কাজ করে। আমার কাজটা যেহেতু একেবারেই এখানের ছিলো না, কারণ সাঁওতালদের নিয়ে প্রধান কাজ করে মূলত সোশ্যাল সাইন্টিস্টরা। বলতে পারো আমি অনেকটা দলছুট হয়ে কাজটা করেছি। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ