ইকুয়েডরে আইসোলেশনে থাকার অভিজ্ঞতা | জন হার্পার

Send
ভাষান্তর : অজিত দাশ
প্রকাশিত : ১৫:১৮, মে ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, মে ২১, ২০২০

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য আমেরিকা বিভিন্ন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার প্রায় এক মাস আগে যখন ইকুয়েডরে কুইটো শহরে অবতরণ করি তখনই করোনা মহামারির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারি। দিনটি ছিলো ২০ ফেব্রুয়ারি। ততদিনে দক্ষিণ আমেরিকার এই ছোট্ট দেশটিতে করোনা আক্রান্ত একজন সনাক্ত হয়েছে, যিনি স্পেনের মাদ্রিদ থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ইকুয়েডর এসেছিলেন।

ফেব্রুয়ারি ২৯ তারিখ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে পুরোদমে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু ছিলো এবং তখন পর্যন্তও সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি কারো অতটা মনোযোগে আসেনি।

যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নমুনা পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেতে অনেকের ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায় সেখানে ইকুয়েডরে করোনা পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেতে আমার সময় লেগেছিলো মাত্র ১২ ঘণ্টা।

আমি জানতাম, আমার শরীরের তাপমাত্রার ব্যাপারটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে যখন দ্বিতীয়বারের মতো কুইটো ম্যারিসকেল সোর্স ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের এসকেলেটরে পা রাখবো। স্বাস্থ্যকর্মীরা নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত সুরক্ষা গাউন পরে—থার্মাল মেশিন মাথার দিকে তাক করে দলবাঁধা যে যাত্রীরা লিমা থেকে এসেছে তাদেরকে কুইটো প্রবেশ করতে দিচ্ছে।

অপ্রত্যাশিতভাবে, আমি বিমানের প্রথম সারিতে বসে ছিলাম, এবং তারা থার্মাল দিয়ে আমার তাপমাত্রা পরীক্ষা করেনি। যাত্রীদের পরীক্ষার আগেই আমি বিমান থেকে নেমে এসেছি।

যদিও এটা তেমন কিছু না। কারণ আমি আরেকটি দেশ ব্রাজিল হয়ে এসেছি। সেখানেও করোনাভাইরাস আক্রান্ত মাত্র একজনকে পাওয়া গিয়েছিলো তখন। এটা সত্যি আমার খারাপ সময় ছিলো, কারণ ব্রাজিলের খ্যাতনামা কার্নিভ্যাল স্ট্রিট পার্টিতে আগের দশ দিন অতিবাহিত করার পরে আমার শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে শুরু করে। আমি সাধারণত দু’সপ্তাহ ঘুমোইনি এবং আমার শরীর প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিলো। যদিও আমার শরীরের করোনাভাইরাসের লক্ষণ ছিলো না; কোনো হাঁচি, কাশি কিংবা নাক দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়া বা মাথাব্যথা, কোনোটাই ছিলো না। শরীরের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রির মতো বেশি ছিলো কেবল।

আমি অনুমান করেছি, খারাপ কিছু একটা হতে চলছে। তবে বগলের নিচে থার্মোমিটার চাপিয়ে আমি ঠিক ধারণা করতে পারছিলাম না যে, আমার সঙ্গে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। আনুমানিক একশ’জন করোনা রোগী সনাক্ত না হওয়ার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে আগত আন্তর্জাতিক যাত্রীদের পরীক্ষা করার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা আমার বগল এবং মুখ বার বার অনুসন্ধানের পরে, জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিমানবন্দর চেকপয়েন্টের ছয়জন চিকিৎসকের মধ্যে পাঁচজন একমত হয়েছিলেন যে, আমার মধ্যে করোনার কোনো লক্ষণ নেই এবং তারা প্যারাসিটামল সেবনের একটি প্রেসক্রিপশনও দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন লম্বা লোকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং করোনাভাইরাস পরীক্ষা করানো হয়।

কোয়ারেন্টাইনে থেকে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা

ওই সময়ে আমার মুখের একটি মাস্ক পরানো হয়েছিলো। কোনো একটি খবরের কাগজের একজন ফটোগ্রাফার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি আমার ছবি তুলতে পারেন কিনা। আমাকে বিমানবন্দর স্বাস্থ্য-ক্লিনিকের পিছনের অফিসের একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিলো। আমার লাগেজ পরে আমাকে দেওয়া হবে বলা হয়েছিলো। ভাগ্য ভালো যে, আমি আমার পাসপোর্টটি ফেরত নিতে পেরেছি।

এক ঘণ্টা বা তার কিছু পরে একটি অ্যাম্বুলেন্স ইমিগ্রেশন হল থেকে এয়ারপোর্টের বাইরের প্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। নভোচারীদের মতো দেখতে, সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরিধান করা তিনজন ব্যক্তি এসেছিলেন। এরপর আমাকে স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর প্রবেশ করানো হয়। অ্যাম্বুলেন্সটি বিমানবন্দরের টারম্যাক থেকে এবং পাহাড়ের রাস্তায় সর্বাধিক গতিতে কুইটোর দিকে যাত্রা করল, এমনভাবে অ্যামুলেন্স হর্ণ বাজিয়ে ছুটছিলো যেকোনো সাধারণ নাগরিকদের যেন ভয় পাইয়ে দিবে।

অ্যাম্বুলেন্সটি আক্রমণাত্মকভাবে পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা রাস্তা অতিক্রম করতে যখন দুলছিলো, আমাকে প্রশ্ন করা হলো, আমি (নিউ ইয়র্ক) কোথা থেকে এসেছি, আমি কতদিন অসুস্থ ছিলাম (যদিও আমার নিজেকে অসুস্থ মনে হয়নি), কবে থেকে আমার মধ্যে লক্ষণগুলো দেখা গিয়েছে (আমার কোনো লক্ষণ আছে বলে আমার মনে হয়নি)। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে বা বমি বমি ভাব দূর করার জন্য অ্যাম্বুলেন্স যাত্রায় জরুরি চিকিৎসায় নিয়োজিত অ্যাম্বুলেন্সে থাকা চিকিৎসক পুনরায় আমার জ্বর আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করলে জ্বর পায়নি। 

আমি বিমানবন্দরে থাকাকালীন দূতাবাসকে ফোন করেছিলাম, যেন তারা নিশ্চিত হতে পারে আমাকে করোনা সন্দেহভাজন হিসেবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি আমি অফিসার কোভিনকে আমার গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্যও অবহিত করেছিলাম। তিনি বলেন, তারা একটি সার্বভৌম জাতি, সুতরাং তাদের নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে এবং যদি তারা মনে করেন আপনার শরীরে করোনাভাইরাস রয়েছে, আমরা যোগাযোগ রাখবো।

 হাসপাতালে আইসোলেশন

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একেবারে কোণে একটি ঘরে একাকি রাখা হয় আমাকে। আমার পাশে অন্যান্য রোগীদের উঁচু পর্দা দ্বারা পৃথক করা হয়েছিলো। ঘরের উপরের কাছে একটি খোলা জানালা এবং লাইট ঝোলানো ছিলো।

আমি আমার চারপাশ ঠিকমতো উপলব্ধি করার আগে জরুরি চিকিৎসায় নিয়োজিত একজন ডাক্তার আমার হাতের মুঠিতে ধরে একটি আইভি আমার ডান হাতে ঢুকিয়ে দিলো। ২৯ বছর বয়সে এই প্রথম আমার এমন একটি অভিজ্ঞতা হলো। আমার মাংসপেশীতে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো কেউ আমার ধমনীতে বর্শার ফলার মতো আঘাত করছে। কয়েক মুহূর্ত পরে, যখন আমার হাতে ঠান্ডা তরল প্যারাসিটামল চালানো হলো তখন আমি প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলাম।

বিছানার অপর পাশে আরেকজন চিকিৎসক কিছু তার গুটিয়ে রাখে। বিছানার একপাশে একটি ইসিজি সংযুক্ত করা হলো এবং বাম বগলের নিচে একটি থার্মোমিটার অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করা হলো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিলো। প্রতিবার অস্বচ্ছ দরজা খোলার সময় আমি হলের ওপাশ থেকে চারদিকে চিকিৎসারত ডাক্তার এবং নার্সদের দেখতে পাই। আমার ইন্দ্রিয়গুলো ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলো। বিশৃঙ্খলার সমুদ্র থেকে নিদ্রায় বিলীন হয়ে গেলাম।

অবশেষে যখন আমি জেগে উঠি কয়েক ঘণ্টা পরে—চারপাশে তখন অন্ধকার। কোনো চিকিৎসক, নার্স কেউ নেই। আমার শরীরের সঙ্গে যুক্ত মেশিনটি আওয়াজ শুরু করে। বিছানার উল্টো দিকে ইসিজি মনিটর দেখা যাচ্ছিল। আমাকে প্রস্রাব করতে হয়েছিল, তবে কীভাবে তা ঘটেছিলো তা এখন ঠিক নয়। আমি যতদূর মনে করতে পারি, দরজার বাইরে কেউ ছিলো না। আমি প্রায় পনের মিনিট ধরে স্প্যানিশ ভাষায় সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলাম, কিন্তু কেউ আসেনি। নীরবতার জন্য আমি আইভি মনিটর ও ইজসিজি মেশিনের আওয়াজ বন্ধ করার চেষ্টা করছিলাম গুগুলের সহায়তা নিয়ে। শেষমেশ দুটো মেশিনকেই আমি বন্ধ করতে সক্ষম হই এবং আবার ঘুমিয়ে পড়ি।

কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার আওয়াজ হলে আমি জেগে উঠি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রতিরক্ষামূলক গাউন পরা একজন নারীকে দেখা যায়। তিনি ধীরে ধীরে আমার বিছানা পাশে এসে উপস্থিত হলেন। তারপর একটি বড় কটনবার, যেটা প্রায় ১৮ ইঞ্চির মতো লম্বা হবে, সেটা আমার নাকের সামান্য ভেতরে প্রবেশ করালেন। তখনো আমি জানতাম না, এটা দিয়ে আমার করোনাভাইরাস পরীক্ষা হচ্ছিলো।

এর মধ্যে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কুইটো দূতাবাসে ফোন করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। বারবার চিৎকার করে ফোনটি চাইলেও সেটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। তারপর আমার হাতে আবার আইভি প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হলে আমি নিস্তেজ হয়ে পড়ি।

আমার পরিস্থিতি সম্পর্কে কেভিনকে জানালেও এখানে আসার পর থেকে আমাকে জানানো হয়নি কখন আমাকে ছাড়া হবে। বিমানবন্দর থেকে আসার পর নয় ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেলেও আমাকে ওয়াশরুমে যেতে দেওয়া হয়নি, কোনো খাবার দেওয়া হয়নি।

তবে আমি আগের চেয়ে একটু সচল হই, নড়াচড়া করতে পারি। হাসপাতালে উপস্থিত চিকিত্সক, যিনি নিখুঁত ইংরেজি ভাষায় কথা বলেছিলেন, তিনি আমার কাছে আসেন। আমার একটু অবাক লেগেছিলো, তিনি মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক ছাড়া কোনোরকম প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পরেননি। বয়স প্রায় ত্রিশের মতো হবে। তার মৃদু এবং মিষ্টভাষী আচরণ ইকুয়েডর থেকে ফিরে আমার এক বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলো।

‘আমি দুঃখিত যে, আপনি আসার পর থেকে যোগাযোগ হয়নি, এই বলে তিনি শুরু করেন।

‘একটু বুঝতে চেষ্টা করুন, আপনার শরীরে করোনাভাইরাস নেই তা, নিশ্চিত করার জন্য আমাদের বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করতে হবে।’

‘আপনারাও কেন বুঝতে পারছেন না, করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ আমার মধ্যে দেখা দেয়নি’, এমনকি এখানে আসার পর থেকে আমার আর জ্বরও বাড়েনি। জ্বর একদম কমে গিয়েছে।’

‘দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন’, তিনি বলেছিলেন, ‘দয়া করে আমাদেরকে কিছু পরীক্ষা শেষ করার অনুমতি দিন। যদি পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসে তাহলে আপনাকে এখান থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’

এই আলোচনার পর আমি বুঝতে পারি, এখানে আমার থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে একটি খোলা কামরায় এক্স-রে’র জন্য নেওয়া হয়, (আমি শুনেছি কিছুটা আয়নাইজিং রেডিয়েশন রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভালো হতে পারে)। কেউ একজন এসে আমাকে একটি সফট ড্রিংক্স, একটি স্যান্ডউইচ এবং প্রস্রাব করার জন্য একটি পাত্র দিয়ে গেল।

আমি এক পর্যায়ে ইসিজি মেশিন থেকে আমার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলাম আমার প্রস্রাব করা পাত্রটি ঘরের এককোণে রাখা ডাস্টবিনে ফেললাম। নিজের অজান্তেই ঘরের মেঝেতে রাখা একটি থকথকে লাল তরলের ওপর আঘাত করি, তারপর সেটির দিকে ঠায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবি, যদি আমি অসুস্থ না হতাম, তাহলে পৃথিবীর এমন একটি অপরিচিত অসুখের দিনে বাড়িতেই থাকতাম। তারপর আমার ব্যাগ হাতড়ে ঘুমানোর জন্য আমার চোখের মাস্কটি বের করলাম ব্যাগ থেকে তারপর অত্যন্ত অস্বস্তিকর সামরিক সজ্জার এই হাসপাতালের বিছানায় বসলাম। আমার হাতে আইভি তারগুলো লাগানো আর মাথার ওপরে লাইটের আলো।

এক ঘণ্টা বা তার কিছু পর একেবারে সাধারণ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি আমার ঘরে প্রবেশ করেন। এমনকি মাস্ক পর্যন্ত তার মুখে নেই। তিনি স্প্যানিশ ভাষায় আমার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা বলেন এবং আমার ইকুয়েডর ভ্রমণ সম্পর্কে জানতে চান।

আরেকবার আমি জেগে দেখি কোথাও কোনো শব্দ নেই। এমনকি পুরো হল ঘরে কোনো মেডিকেল ইকুইয়েপমেন্ট-এর কোনো আওয়াজ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। ভাবছিলাম সবাই কি চলে গেলো? বাস্তবে বুঝতে পারলাম, সবাই চলে গেছে। জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রাতারাতি হাসপাতালটিকে সরিয়ে অন্য কোথাও নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। আমি চারপাশে ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ পাচ্ছিলাম। ঘড়িতে দেখলাম রাত পৌনে চারটা বাজে। এদিকে ঠিকমতো বিছানায় না শোয়ার কারণে শরীরে ব্যথা অনুভব হচ্ছে।

 ছবিতে আইসোলেশনে নিবন্ধের লেখকপরদিন সকাল

বাথরুমের প্রয়োজনে চার ঘণ্টা পর আমার ঘুম ভাঙে। দরজা বন্ধ ছিলো। ইকুয়েডর জনস্বাস্থ্য সেবার অবস্থা দেখে ক্রমান্বয়ে আমি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছি। সকাল নয়টার দিকে আবারও ভয়ংকর পোশাক পরিহিত এক যুবক আমার ঘরে প্রবেশ করে। সে পুনরায় ইসিজি তারগুলো সংযুক্ত করার জন্য এসেছিলো, এবং আমাকে নাস্তা করার কথা বললো। এই প্রথম আমার মনে হলো আমি কোনো সেবা পাচ্ছি।

ইসিজি রিপোর্টে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখালো। শরীরের কোনো জ্বর ছিলো না। হৃদযন্ত্রও স্বাভাবিক। আমি তখন প্লাস্টার খসে পড়া একটি ঘরে আটকে আছি। একটি জানালা আর মেঝেতে আঠালো শুকনো তরল এদিকে-সেদিকে ছড়ানো-ছিটানো।

আমি জানতে চাইলাম আমার করোনাভাইরাস টেস্টের খবর কী? সে তখন উত্তর দেয়, আপনার করোনাভাইরাস টেস্ট প্রক্রিয়াধীন।

এই কথা শুনে, আমি তাকে বললাম, কিন্তু ডাক্তার বলেছে রাতেই আমার পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে। সে আমার কথার কোনো পাত্তা দিলো না। শুধু বলল, আপনার ফলাফল কখন এসে হাতে পৌঁছাবে আমরা কেউ তা জানি না। এই কথা শুনে উপলব্ধি করতে পারলাম, কীভাবে আমি হারিয়ে যেতে পারি। এদিকে অনলাইনে পড়েছি যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের রিপোর্ট পেতে চারদিনের মতো সময় লাগে। আচ্ছা ইকুয়েডরে কি টেস্ট করার কিট আছে? এমন মনে হতে কেমন জানি কেঁপে উঠলাম।

এদিকে শহরে থাকা আমার এক বন্ধুকে ক্ষুদে বার্তা দিয়েছি, ‘আমাকে যে করে হোক এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও।’

প্রায় এক ঘণ্টা পর তরুণ নার্স আমার নাস্তা নিয়ে আসে। একটি কাপে লাল তরল, একটি কাপে হলুদ তরল আরেকটি ওয়ানটাইম বাটিতে আপেলে ভিজানো কুইনোর মতো মনে হচ্ছিলো। আমি ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না সকালের নাস্তায় আমার কতটা স্বস্তি পাওয়ার কথা ছিলো। বাইরে থাকে আসা ক্ষুদে বার্তাগুলো পেয়ে আমি চিন্তিত হয়ে পড়ছিলাম। জোসেফ বলছিল, সবগুলো দরজা বন্ধ। প্রবেশমুখে একজন প্রহরী বসে আছে। কোনোরকম সুরক্ষা পোষাক পরিধান ছাড়া কাউকেই প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।

সে আরও লিখেছে, ‘আমার মনে হয়, একমাত্র তোমার দেশের সরকারই তোমাকে এখান থেকে উদ্ধার করতে পারবে।’ ঠিক ঐ সময়ে আমার মোবাইলটি বেজে উঠে। লক্ষ্য করলাম নম্বরটির শুরুতে ওয়াশিংটন ডিসির কোড রয়েছে। রিসিভ করার পর অন্যরকম একটি কণ্ঠ শুনলাম। দূতাবাসের একজন কূটনৈতিক নিজের পরিচয় দিলেন। তারপর বললেন, ‘আমরা জেনেছি আপনি হাসপাতালে ছিলেন এবং আজ সকালেই আপনাকে দেখার পরিকল্পনা করেছি।’

আমি তখন তাকে বললাম, আমার বন্ধুও আমার সঙ্গে দেখার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু তাকে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

তিনি তখন আরও বললেন, হ্যাঁ আমাদেরকেও কর্তৃপক্ষ তাই বলেছিলেন। আপনাকে সেখানে নেওয়ার পর ওরা পুরো হাসপাতালটিকে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলেছেন। তারাও আমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছেন না, আপনাকে দেখার জন্য।

আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম, আমার ভেতরটা শুকিয়ে গেলো। আমি লোকটিকে আমার অবস্থা বর্ণনা করলাম। বাথরুমের অবস্থা জানালাম। এমনকি আমাকে এই প্রথম ১৮ ঘণ্টা পর খাবার দেওয়া হলো, সেই কথাও জানালাম। তিনি সবকিছু শুনছিলেন মনযোগ দিয়ে। তিনি আরও জানালেন, তিনি হাসপাতাল প্রধান-এর সঙ্গে আলাপ করবেন আমার পরিস্থিতি জানিয়ে। তিনি ফোনটি রেখে দিলেন, আমিও মাথাটা বালিশে হেলিয়ে দিলাম। পরবর্তী ৩০ মিনিট আমার কাছে ঘণ্টার মতো মনে হলো। কবে এখান থেকে ছাড়া পাবো এই কথা ভাবতে ভাবতে একটা অনিশ্চয়তা বাড়তে লাগলো। আরেকবার একজন মাস্ক-পরা স্বাস্থ্যকর্মী এসে আগের প্রশ্ন জানতে চাইলেন, ‘কেন এসেছি ইকুয়েডরে? কোথা থেকে এসেছি? আমার মধ্যে লক্ষণ পাওয়া গেছে কি-না?’ 

এই ব্যক্তি সম্ভবত সচেতনতা বা নির্দেশাবলীর অভাবের কারণে আমাকে আমার বিছানা থেকে তুলে বাথরুমে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিগত ২৪ ঘণ্টায় এটা আমার প্রথম বাথরুম যাওয়া। ফিরে আসার পর আবার ফোন বেজে ওঠে। ‘জন, আপনি যে হাসপাতালে রয়েছেন সেখানে প্রধান চিকিত্সকের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি এবং বাথরুমের পরিস্থিতি নিয়ে আমার উদ্বেগ প্রকাশ করেছি,’ দূতাবাস থেকে কূটনৈতিক বলেছিলেন। তিনি আরও বলেন, আপনাকে কষ্ট করে গিয়ে বাথরুম ব্যবহার করতে হবে না, তারা একটি বাথরুম আপনার এখানে ব্যবস্থা করে দেবে।

তারপর আমার করোনাভাইরাস রিপোর্ট দুইটার মধ্য চলে আসবে বলে সে জানায়। আমি তাকে তিনবারের মতো ধন্যবাদ দিলাম। এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার অবস্থার কথা জানালাম। এবং ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আমার আর কোনো পথ নেই বলে তাদেরকে জানালাম।

একা

ঘণ্টাখানেক পর জেনারেটরের ব্যাক-আপ নেওয়ার আওয়াজ এর মতো শোনা গেল বাইরে জানালার দিকে। কিছুক্ষণ পর ধোঁয়ার কুণ্ডুলি গোলাকারে সিলিং ছড়িয়ে পড়ছিলো, আমি সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে লাগলাম কিন্তু কারো কোনো সাড়া-শব্দ পাচ্ছিলাম না। ডিজেলের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, আমি কাশতে শুরু করি। এই প্রথমবার ইকুয়েডরে এসে আমি জোরে শ্বাস নেই, এর মধ্যে কখন জানি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। তারপর জেগে উঠে দেখি সব শান্ত। কোনো শব্দ বা গন্ধ নেই। নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারি।

কোনোরকম কারো সঙ্গ ছাড়া পরবর্তী দুই ঘণ্টা যেন অনন্ত সময় মনে হলো। আমার হাতে ব্যথা হচ্ছিল। আইভি দিয়ে শরীরের প্রবেশকৃত প্রতিটি তরলের ফোঁটা যেনো টের পাচ্ছিলাম। তারা আমার ধমনীতে আঘাত করছিল অনেকটা বালির ঘড়ি যেভাবে কাচে তলায় আছড়ে পড়ে।  

এইটুকু শান্তনা দিতে পারি যে, অন্তত আমি ইকুয়েডোরের কোনো কারাগারে নেই। কমপক্ষে আমার দূতাবাস আমার ডাকে সাড়া দিয়েছে। ভ্রমণের সময় আমার সঙ্গে এর চেয়ে খারাপ ঘটনা ঘটতে পারতো, আমি কতটা ভাগ্যবান! তারপর আমি দেওয়ালের চারপাশে তাকাতে শুরু করি। জানালার দিকে তাকাই। ভাবতে লাগলাম আমি যদি কারাগারে থাকতাম তাহলে কেমন হতো? কারাগারের চেয়ে এই ঘরের পার্থক্য কতটুকু?

নিজের ছাড়া পাওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে কৃতজ্ঞতা অনুভব করতে শুরু করি। তারপর হাসপাতালের অন্যান্য রোগীদের কথা মাথায় এলো। তারা কোথায় গেলো? তারা কি এখনো চিকিৎসা পাচ্ছে? আমি তাদের উপস্থতির কোনো আলামত খুঁজে পাই না। তাছাড়া আমার ওপর নজর রাখা লোকগুলো যাদের চোখ এড়াতে না পেরে আমার মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছিলো। ভাবি, বাইরে থেকে এসে এমন পরিস্থিতি পড়ে আমি যদি ইকুয়েডরের একটি সংবাদ শিরোনামে পরিণত হতাম!

এমনটা ভেবেই ভয় পাই। মনে হচ্ছিলো, আমার চারপাশের পৃথিবী আয়নার মতো ভেঙে পড়েছে। অসুস্থতা এবং দুর্ভোগের কথা ভুলেই গেছি। এই প্রথম সত্যিকার অর্থে ভয় কী জিনিস, টের পাই।

পুরো দেশটিতে তখনও কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত রোগী ছিলো মাত্র একজন। তারপর হঠাৎ করে একজন লোকের উপস্থিতির কারণে হাসপাতালের আর সব রোগীদের সরিয়ে অন্যান্য স্থানান্তর করার কারণ কী? নিশ্চই আমার উপস্থিতিতেই। কিন্তু আমি যখন হাসপাতালে পৌঁছাই আমার কোভিড ১৯ আক্রান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ ছিলো না।

হাসপাতালের অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে একটা ভয় আমি লক্ষ্য করেছি, তাদের ভয়ার্ত চেহারা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। আমার মনে হয়েছে এমন ভয়ই মানুষকে অন্য মানুষের প্রতি নূন্যতম মানবিকতা নিয়ে তাকাতে বাধা দেয়।

যেকোনো রোগ বা মানসিক বিক্ষেপণে এই ভয় শরীরে ঘাতক-রূপে দাঁড়িয়ে থাকে। আর আমিও যেন এই দুইয়ের মাঝে বসে আছি।

দুপুরের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি মানসিকভাবে নিজেক প্রস্তুত করে রাখি, হয়তো তারও বেশি অথবা পুরো দিনের জন্যও বলা যায়। সকালে নাস্তার পর থেকে আমি আর কাউকে দেখতে পাইনি। আরেকবার প্রস্রাবের জন্য আমি নিজের সঙ্গে যুক্ত মেডিকেল তারগুলো বিচ্ছিন্ন করি।

এর পনের মিনিট পর দুইজন নারী স্বাস্থকর্মী দরজা খুলে সাধারণ পোষাকে প্রবেশ করেন। আমি বুঝতে পারি, ঘটনা কিছু ঘটেছে। তাদের কথা বার্তায় শেষ-মেশ যেটা বুঝি, তা হলো—আমার কোভিড ১৯ ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। 

তারপর আমাকে সেই রুম থেকে বের হতে আরও দুই ঘণ্টা লাগে। কিন্তু সেই দুই ঘণ্টার প্রতিটি মিনিট উপলব্ধি করতে পারি। এরপর ইমার্জেন্সি রুমটি পুরো ঘুরে দেখে হঠাৎ বিলাস-বহুল মনে হয়েছিলো।

হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরা সকলেই তরুণ ছিলেন। সম্ভবত ত্রিশ-চল্লিশ বছরের মধ্যে হবেন। আমি এমন উষ্ণ করমর্দন এর আগে কখনো অনুভব করিনি। তারা দৃষ্টি প্রসারিত করে আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন যেন বলতে চাইছিলেন আপনি এখনো মানুষ।

আমার হাতে লাগানো ক্যাথেটারটি খুলে, রক্তের ফোঁটাগুলো মুছতে মুছতে ডাক্তার আমার সামনে একটি বড় খাবারের থালা রাখলেন। মুরগীর মাংস, ভাত, স্যুপ ছাড়াও কেকের টুকরো ছিল থালাটিতে। তারপর ২০টি প্যারাসিট্যামলের একটি প্রেসক্রিপশন দেন, ঔষধগুলো হাসপাতাল থেকেই সংগ্রহ করতে বলেন। বিস্তৃত বাদামী বেইজ কমপ্লেক্সের মধ্যে দিয়ে পরিত্যাক্ত জরুরি রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসতে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়। কোণার দিকে বাথরুম খুঁজতে গেলে এক নিরাপত্তাকর্মী জিজ্ঞেস করে আমি কে? যদিও তিনি জানেন না, সন্দেহভাজন কোভিড ১৯ রোগীটিকে ছাড়া হবে। তিনি আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন যেন কোনো ভীনগ্রহের মানুষকে দেখছেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে পৌঁছে যাই। এদিকে হাসপাতালের গেইটটি বাইরে থেকে লক করে দেওয়া। সেখানে দাঁড়িয়ে প্রায় ত্রিশজনের মতো ভেতরে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদেরকে দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছিলো, কেউ কেউ কাশি দিচ্ছেন। 

রাস্তা পার হয়ে আমি একটি উবার ডেকে উঠে পড়ি। এক হাতে আমার করোনাভাইরাসের নেগেটিভ রিপোর্ট এবং সেই সঙ্গে ছুটি।  

[নিবন্ধটি ‘পয়েন্ট মি টু দ্য প্লেন’ ওয়েবসাইটে ২৮ মার্চ ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিলো]

//জেডএস//

লাইভ

টপ