লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা | আলেহো কার্পেন্তিয়ের | পর্ব-২

Send
তর্জমা : মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০৭:০০, জুন ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, জুন ১২, ২০২০

তারপর আবার আমি ঘুরে এসেছি ইসলামিক রাজ্য থেকে। আমার ভেতরটা অত্যন্ত আনন্দ-উদ্বেল হয়েছিল সেই-সব বাগানশিল্পীদের কারুকাজ দেখে যারা ভূমিকে বানাতে পেরেছে অমন ছবির মতো দৃশ্য। সে দৃশ্য অতি সবুজ প্রাকৃতিক ক্ষেত্রের চেয়ে আলাদা ও সুন্দর। শুধু গোলাপের ঝোপ আর সারি সারি ডালিম গাছের সে এক স্বর্গোদ্যান। এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আমার মাথায় আসছিল পারস্য মিনিয়েচার শিল্পের বিভিন্ন নিদর্শন। তবে ইরান থেকে আমি এখন অনেক দূরে, আর ইরান হয়তো আমার কখনো যাওয়াও হবে না, আর দেখাও হবে না সত্যিই পারস্য মিনিয়েচার শিল্পের সাথে এই বাগানশিল্পের কার্যকর কোনো সম্পর্ক ছিল কি-না। ইসলামিক সেই দুনিয়ায় আমি হেঁটেছি নীরব অলি-গলি ধরে, মনে হয়েছে আমি হারিয়ে গেছি জানালাবিহীন ঘরগুলোর গোলক ধাঁধার মাঝে, অনুভব করেছি আমার সঙ্গে সারা পথ ধরে ঘুরছে ছাগল বা ভেড়ার মাংস-চর্বির এক গন্ধ, মধ্য এশিয়ার অলি-গলিতে যে গন্ধ মুসলিম শহরের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। আমি দেখেছি মানুষের বা জীবের ছবি অঙ্কনের নিষেধাজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেও কীভাবে সেখানকার শিল্পীরা কী মনোমুগ্ধকর এক শিল্প উপহার দিয়েছেন যেখানে সব কাজ বুনন-বিন্যাস আর নকশার মাধ্যমে সম্পন্ন। বুনন আর বিন্যাসের ওপরে কাজ করে জ্যামিতিক ক্ষেত্রের সুষম প্রদর্শনের মাধ্যমে মুসলিম শিল্পীরা কী অসাধ্য সাধন করেছেন তা বুঝতে হলে একজন মেক্সিকান পুরো বিষয়টিকে তুলনা করতে পারে মিতলার মন্দিরের বহিরাঙ্গন বারান্দার অভ্যন্তরের অলৌকিক জ্যামিতির সঙ্গে। দুই ক্ষেত্রেই শিল্প গ্রহণ করেছে এক প্রতিকৃতিহীনতার আদর্শ যা আমাদের বিধ্বস্ত বাস্তবতাবাদের ওপর নির্মিত শিল্পতত্ত্ব থেকে অনেক দূরে। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি সরু সুদীর্ঘ মিনারগুলো আর উপভোগ করেছি রঙের খেলার মতো মোজাইকগুলো এবং গজল নামক সঙ্গীত-ধারার মোহনীয় সুর। মজার সঙ্গে উপভোগ করেছি কোরান-পূর্ব যুগের ইস্ট-ফ্রি রুটি যা বেকারি থেকে যেমন নামানো হয় তেমন পাওয়া যায় সব সময়। আমি অরাল সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছি। সে এক অন্যরকম হ্রদ, চেহারায় অদ্ভুত, আকারে অদ্ভুত, রঙে অদ্ভুত, যার একমাত্র মিল হতে পারে বৈকাল হ্রদের সঙ্গে। এর চারপাশের পাহাড়, সেখানে বিরল প্রজাতির জীবজন্তুর বাস আর সাথে দূরদেশের অসাধারণ সব বিষয় যেমন অনুবৃত্তি, অসীমতা এবং আমেরিকার বরফ বনভূমি তাইগার মতো অন্তহীনতা—এসব আমাকে পুলকিত ও শিহরিত করেছে। দেখেছি সাইবেরিয়ান নদী ইয়েনিসাই, সেভোলোদ ইভানভের বর্ণনা অনুযায়ী যার প্রশস্ততা ২৫ কিলোমিটারেরও বেশি। বর্ষায় সে নদী দুধারে নদী বানিয়ে ফেলে আরও অমন ২৫ কিলোমিটার।…এই সব দেখে যখন ফিরেছি নিজ ঠিকানায় তখন আবারো মনটাকে খুব ভারী মনে হয়েছে। মনে হয়েছে—যা দেখেছি তার অর্ধেকও কি বুঝেছি? যে ইসলামিক সংস্কৃতি আমি দেখেছি তা বোঝার জন্য অবশ্যই দরকার ছিল সেখানকার একটি ভাষা আমার জানা থাকা। অথবা পরিচয় থাকা উচিত ছিল সেখানকার কিছু সাহিত্য ও দর্শনের সঙ্গে। আমার কিছুটা পরিচয় ছিল স্প্যানিশে অনুদিত রুবাইয়াতের সঙ্গে, সিন্দবাদের কাহিনি আর শাহরেজাদির সঙ্গে, মিলি বালাকিরেভের (Mily Balakirev) সঙ্গীতজগৎ থেকে প্রাপ্ত ইসলামি ‘তামারা’ সঙ্গীতের অনুকরণের সঙ্গে—কিন্তু এটুকু মোটেই যথেষ্ট ছিল না ইসলামি সংস্কৃতি সম্পর্কে বোঝার জন্য। আর তাদের দর্শন সম্পর্কে আমরা যে আপ্তবাক্যভিত্তিক সাহিত্য পাই তাতে ঠিকভাবে তাদের দর্শন আসে না। ফলে যে তাদেরকে জানতে চায় কিন্তু তাদের ভাষা জানে না সে কখনো আংশিক ছাড়া পূর্ণাঙ্গভাবে তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে না। আমি দেখেছি বইয়ের দোকানে অদ্ভুত ধরনের এক বিশাল বই যে বইয়ের নাম লেখা অক্ষরে নয়, বরং অচেনা সাংকেতিক চিহ্নে। আমি যদি সেই চিহ্নগুলো পড়তে পারতাম! আমি এমনই মূর্খ, আমি ওগুলোও পড়তে জানি না, সংস্কৃতও পড়তে জানি না, ক্লাসিকাল হিব্রুও পড়তে জানি না। আমার কিশোরকালে লাতিন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ওগুলো পড়ানোর কোনো ব্যবস্থা তো ছিলই না, এমনকি লাতিন বা গ্রিক শেখানোর বিষয়টিও দেখা হতো লেখাপড়ার নামে সময় কাটানোর অজুহাত হিসেবে। আমি অবশ্য বুঝতাম যে, আধুনিক রোমান্স ভাষা অর্থাৎ ইতালিয়ান, ফরাসি ইত্যাদি শেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ কাটানোই বেশি কার্যকর। পরবর্তীতে বুখারেস্টে এসে আমি সে কথার প্রমাণও পেয়েছিলাম। যাই হোক, বইয়ের দোকানে দেখা সেই সব প্রতীক যখন আবার প্রতিদিনের খবরের কাগজের হেডলাইনে দেখলাম তখন ভাবলাম জীবনে যে কয়টা দিন বাকি আছে তা দিয়ে এই প্রতীক-সংকেত উদ্ধার করে ইসলামি আদব-তমদ্দুনের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেয়া আর সম্ভব নয়। আমি যা কিছু বিশাল ও মহৎ দেখলাম তারাই যেন আমাকে খুব ছোট করে দিলো। আমি তাদেরকে দেখলাম কিন্তু তাদের বড়ত্ব এবং মহত্ব আমি অনুধাবন করতে পারলাম না। আমি এসে আমার মানুষদেরকে বলতে পারলাম না—কী সার্বজনীন ও বিশ্বজনীন বিষয়াদি ঐ স্থাপত্য ও সংস্কৃতির পদমূলে রয়ে গেছে। সেটা বলতে পারার জন্য আমার দরকার ছিল কিছু অপরিহার্য জ্ঞান ও মৌলিক কিছু চাবিকাঠি যার মাধ্যমে আমি পারতাম সেই দর্শন ও সংস্কৃতির মর্মমূল উদ্ঘাটন ও অনুধাবন করতে।

 

দূর বিদেশ-বিভূঁয়ে অনেক দিন ভ্রমণ শেষে আমি সেবার গেলাম সোভিয়েত ইউনয়নে। সেখানকার ভাষাটা যদিও আমি বলতে পারি না, তবে একেবারে বুঝতে পারি না তা নয়। দেখার আগেই জানতাম লেনিনগ্রাদের স্থাপত্যগুলো একই সঙ্গে বারোক, ইতালিয়ান ও রাশিয়ান এবং সেগুলো আমার কাছে আগে থেকেই দৃষ্টিনন্দন সব স্থাপত্য নিদর্শন। আমি সেগুলোর বিশাল স্তম্ভ আর আস্ত্রাগাল দরজা সম্পর্কে জানতাম। আমি সেসব ভবনের বিশাল খিলান সম্পর্কে জানতাম যারা মনে করিয়ে দেয় খৃস্টপূর্ব ১ম শতকের স্থাপত্যশিল্পী ভিট্রুভিয়াসকে, মনে করিয়ে দেয় ইতালিয়ান স্থাপত্যশিল্পী ভিনিয়োলাকে, এমনকি মনে করিয়ে দেয় ইতালিয়ান শিলাশিল্পী পিরানেসিকেও। রোমে অনেক ঘুরে ফিরে ইতালিয়ান স্থাপত্যশিল্পী ফ্রান্সেসকো রাস্ত্রেলিও ওখানেই গিয়ে থিতু হয়েছিলেন। সেইন্ট পিটার্সবুর্গ শহরে নেভা নদীর পাড় ধরে স্থিত রস্ট্রাল কলামগুলো তো ছিল অনেকটা আমার নিজেরই সম্পত্তি। গাঢ় নীল আর ফেননিভ সাদা সেইন্ট পিটার্সবুর্গের উইন্টার প্যালেস সাগর দেবতা নেপচুনের কায়দায় বারোক রীতিতে যে ভাষায় কথা বলছিল সে আমার খুব পরিচিত এক ভাষা। সেখানে পানির ওপারে পিটার এবং পলের দুর্গ আমার কাছে ছিল যেন এক ঘরে-পোষা বা ঘরে-বানানো ছায়ামূর্তি। সে-ই শেষ নয়। আমাদের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক দেনি দিদেরোর (Mily Balakirev) পৃষ্ঠপোষক তো ছিলেন ওখানেরই মহামতি ক্যথারিন। আমেরকিার স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বসুরী ভেনেজুয়েলান বিপ্লবী ফ্রান্সিসকো দে মিরান্দা ছিলেন ওখানকার সামরিক বাহিনীর প্রধান গ্রিগরি পটেমকিনের বন্ধু। ইতালির বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ চিমারোসা রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিনের রাজদরবারের সঙ্গীতজ্ঞ নিয়োজিত হয়েছিলেন। এ ছাড়াও মস্কো ইউনিভার্সিটি গর্বের সঙ্গে বহন করে একাধারে কবি, বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ মিখাইল লোমোনোসোভ-এর নাম, যিনি ছিলেন ‘Ode to the Northern Lights’-এর বিখ্যাত রচয়িতা এবং এই কবিতা ছিল অষ্টাদশ শতকীয় এক ধরনের বৈজ্ঞানিক ও এনসাইক্লোপিডিক কবিতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ভাবে ও অর্থে এই কবিতা ছিল ফরাসি লেখক ভলতেয়ার বা ফন্তেনেইলা (Bernard Fontenelle) প্রমুখের লেখার অনুরূপ। আলেক্সান্ডার পুশকিন আমাকে মনে করিয়ে দেন জার সম্রাট বরিস গোদুনোভের কথা। তাঁর একটি গান আমি যথেষ্ট অসাঙ্গীতিকভাবে ফরাসিতে অনুবাদ করেছিলাম এক গায়কের অনুরোধে যিনি বুয়েনোস আইরেসের কলম্বাস থিয়েটারে গানটি গেয়েছিলেন। রাশিয়ান লেখক ও কবি ইভান তুর্গেনেভ ছিলেন ফরাসি লেখক গুস্তভ ফ্লবেয়ারের বন্ধু। ফ্লবেয়ার উষ্ণ ভালোবাসার সঙ্গে তুর্গেনেভকে বলতেন ‘আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বোকা মানুষটি’। আন্দ্রে জিদের একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে আমি দস্তয়েভস্কিকে প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম। ১৯২০-এর দশকে আমি তলস্তয়ের গল্প প্রথম পড়ি। মেক্সিকোর শিক্ষা বিভাগ থেকে সংকলনটি বের করা হয়েছিল। সেটা সঠিক অনুবাদ ছিল কি-না জানি না, তবে লেনিনের ‘ফিলসফিকাল নোটবুকস’ থেকেই আমি প্রথম জেনেছিলাম হেরাক্লিটাস, পিথাগোরাস, লিউসিপাস এবং জেনেছিলাম ‘সেই সকল আইডিয়ালিস্ট দার্শনিক সম্পর্কেও যাদের সাথে অথর্ব ম্যাটেরিয়ালিস্টদের চেয়ে ভালো মানিয়ে চলা যায়’। দি বলশয় থিয়েটারে—যেখানে পারফরমেন্সে ঘোড়সওয়ার পিটার দি গ্রেটকেও দেখা গেছে—সেখানে গিয়ে আমার মনে পড়ছিল রাশিয়ান হেরিটেজ মিউজিয়ামের দূর দিকের অস্বাভাবিক উঁচু ছাদের কক্ষগুলোর কথা। সেখানে আমি একটু অন্য রকম এক ছবিতে দেখেছিলাম ভ্যালেন্তিন সেরোভের আঁকা রাশিয়ান নৃত্যশিল্পী ইদা রুবিনস্টেইনকে। চেহারাটা একই সঙ্গে মায়াময় আবার রাগী। সেখানে আরও দেখেছিলাম সেরগেই দিয়াগিলেভ ও আন্না পাভলভাকে যারা ১৯১৫ সাল থেকে প্রতিবছর একবার হাবানায় যেতেন কিউবাকে ক্লাসিক্যাল নৃত্যের কারিগরি শেখাতে। হেরিটেজ মিউজিয়ামে এরপর হঠাৎ করেই সামনে পড়লেন বিখ্যাত আর্টিস্ট নিকোলাস রায়েরিখ (Bernard Fontenelle) যিনি ছিলেন স্ট্রাভিনস্কির বিখ্যাত অর্কেস্ট্রা কনসার্ট Rite of Spring-এর সেট ডিজাইনার ও শব্দ-যোজনা শিল্পী।…তিনিই প্রথম পশ্চিমা সঙ্গীতের কম্পোজিশন রীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। মস্কোর লেনিনগ্রাদে-এর স্থাপত্য, সাহিত্য ও থিয়েটারে—আমি পেয়েছিলাম এক পূর্ণবোধ্য বিশ্ববীক্ষা। এই বীক্ষণ আমি বুঝেছিলাম যদিও আমার ভূখণ্ডের বাইরের সাহিত্য-সংস্কৃতির কারিগরি বিষয়ক জ্ঞানে আমার অনেক ঘাটতি ছিল। অথচ কী কঠিনই না আমার কাছে মনে হয়েছিল পুরো বিষয়টা যখন পিকিঙে এক তিব্বতীয় লামা আমাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন তান্ত্রিকতার সঙ্গে মার্ক্সিজমের সম্পর্ক। একই রকম কঠিন লেগেছিল যখন কিছুদিন আগে প্যারিসে এক প্রজ্ঞাবান আফ্রিকান উপজাতীয় কিছু তুক-তাক জাতীয় আচার ও পর্বকে ব্যাখ্যা করছিলেন ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে। আমি দিনে দিনে অনেক বেশি স্থিরভাবে বিশ্বাসী যে, এই ভূলোকে একজন মানুষকে বিধাতা যে অংশটির মাটিতে পরিপুষ্ট করেছেন সেই অংশটির জীবন ও সংস্কৃতিকেও উক্ত মানুষটি তার এক জীবনে বুঝে ও জেনে শেষ করতে পারবে না। এই বলে সেই মানুষটি তার দৃষ্টিরেখার বাইরের বিষয়ে ঔৎসুক্য লালন করবে না, তা তো হতে পারে না। একথাও একই সঙ্গে স্মর্তব্য যে, যা নিয়ে ঔৎসুক্য থাকবে তা মানুষ সব বুঝে ফেলতে পারবে এমনটা না। চলবে

আরও পড়ুন : লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা | আলেহো কার্পেন্তিয়ের | পর্ব-১

//জেড এস//

লাইভ

টপ