শিকারি

Send
কাজী সাইফুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:৪৭, জুলাই ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৮, জুলাই ১৩, ২০২০

 

বাবার কাঁধে চড়ার বয়স থেকেই মালভূমির গল্প শুনত হাফিজ। মাজেদ বারবার ছেলেকে বলত—জীবনে একবার হলেও মালভূমি দেখতে যাবি, নইলে জীবনের স্বাদ পাবি না।

তখনো মালভূমি শব্দটি একেবারেই নতুন হাফিজের কাছে, আর মালভূমি সম্পর্কে বিন্দু-বিসর্গ কিছুই জানা নেই। কিন্তু বাবার মুখে বারবার শুনে-শুনে বুকের ভেতর মালভূমি দেখার অদম্য ইচ্ছে জেগে উঠেছিল হাফিজের। হাফিজের বাবা মাজেদ ছিল দুরন্ত শিকারি। তার শিকারের কৌশল ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর—চিকন লোহার শলাকার মাথায় বিষ মেখে পাখির বুকে বিঁধিয়ে দেয়া। মাজেদ ছিল খুবই শক্ত সমর্থ পুরুষ। অবসর পেলেই লাঠি আর কুস্তি খেলে বেড়াতেন। তার সাথে কুস্তি খেলতে এসে অনেক সেরা কুস্তিগিরের পাজরের হাড় ভেঙ্গে গেছে, কিন্তু কোনোদিন কিছু হয়নি মাজেদের।

একবার শিমুলগঞ্জের মেলায় বিশাল কুস্তির আয়োজন করা হলো। মেলায় কুস্তি আর জুয়ার কোটই আসল, নাহলে মেলা ঠিক জমে না। আবার কুস্তি নিয়েও শতশত টাকার জুয়া চলে! সেবার জিপসিদের একটি নৌকার বহর এসে তাবু ফেলেছিল কর্ণফুলি নদীর পাড়ে। শিমুলগঞ্জের মেলায় তাদের জন্যও একটু জায়াগা রাখা হয়েছিল যাদু দেখাবার জন্য। জিপসিরা যাদু দেখাত—মহিষের শিং, বুনো হাতির দাঁত, মানুষের কঙ্কল, এক টুকরো কাচ আর ধারালো চাকু দিয়ে। ওরা যাদু দেখায় ইহুদিদের ত্রান কর্তা—দাজ্জালের মতো। আল্লাহ্ জীবন আর মৃত্যুর ক্ষমতা দেবেন তার হাতে। জিপসিরা ধারালো চাকুতে গলা কেটে দিত একটি কিশোর ছেলের—ছিটকে রক্ত বেরিয়ে যেত। যাদু দেখা প্রতিটি মানুষকে চমকে দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়ে আবার জীবিত করত ছেলেটাকে।

শিমুলগঞ্জের মেলায় মাজেদ শিকারি এক সাথে দুজন কুস্তিগিরের সাথে লড়েছিল। দুজনকেই হারিয়ে প্রথম পুরস্কার জিতে হাফিজকে কাঁধে তুলে দু’মাইল এক টানা হেঁটে বাড়িতে এসেছিল মাজেদ। মাজেদের শরীরের বাঁধন দেখে লোকে বলত—পাখির মাংস খেয়ে বাঘের শক্তি ওর গায়ে। দু’দুটি কুস্তিগিরকে একা হারিয়ে দিলো! মাজেদের এ পশুর শক্তিটাকে ওর স্ত্রীও ভয় করে খুব। পৃথিবীর কোনো কিছুই সে মানে না। ছেলেকে নিয়ে এ একই ভয় ছিল তার। তাই মাজদের কাছ থেকে ছেলেকে আড়াল করে রাখতে চাইত। কিন্তু হাফিজও ঠিক বাবার মতো হয়ে ওঠে কৈশোর থেকেই। যে দিন শিকারের জন্য পাখি না পেত, সেদিন বনের যে কোনো পশু শিকার করে বাড়ি ফিরত মাজেদ। কোনো দিন গভীর রাত ছাড়া ঘরে ফিরত না। সন্ধ্যার পর বনে-বাদাড়ে ঘুরতে পছন্দ করত। কিন্তু রাতে শিকার তো দূরের কথা—গাছের একটি পাতাও ছিঁড়ত না। মাজেদ বলত—মানুষ ছাড়া সৃষ্টি জগতের সব কিছুই রাতে আল্লাহর পায়ে সিজদায় পড়ে থাকে।

মাজেদ মারা গিয়েছিল হাফিজের চোখের সামনে! সেদিন ছিল বুধবার। ভরদুপুরে ছেলের হাত ধরে বনের মধ্যে মধুর চাক খুঁজতে বেরিয়েছে মাজেদ। গভীর বনে হাঁটছে, হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখনও বাবার হাত ধরে আছে হাফিজ। কিছুই বুঝতে পারেনি। নাক মুখে ফেনা দেখে চিৎকার করে ওঠে হাফিজ। শেষ পর্যন্ত দেখে পায়ের ‘কেনি-আঙুলে’ ছোট দুটো ফুটো। সেখানে সামান্য রক্ত। ছোট অচেনা একটি সাপ দেখেছিল বেত বনের দিকে চলে যেতে। সেদিন থেকে হাফিজের জীবনের ফিলোসফি বদলে যেতে থাকে। মানুষের জীবন তো কিছুই না! তার বাবা এত শক্তিশলি একজন মানুষ—অথচ চিকন ছোট একটি সাপের ছোবলে দুই মিনিটেই শেষ। মাজেদের গায়ের রঙ ছিল সাদা। মৃত্যুর কিছুক্ষণ পরই তার শরীর নীল হয়ে উঠেছিল। কয়েকজন ওঝা এসে সারাদিন চেষ্টা করল বিষ নামাতে, সবাই ব্যর্থ হলো। তারপর সন্ধ্যায় এলো সর্প—বিশারদ, সর্পভূগ ওস্তাদ কলিম। তার গলায় মাফলারের মতো সাপ জড়ানো থাকে সব সময়। এসেই যখন তাজা সাপ চিবিয়ে খেতে থাকে, তখন তার ঠোঁট ঢাকা লম্বা গোঁফ আর লাল চোখ দেখে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায় সবাই। মুসা (আ)-এর হাতের লাঠি মাটিতে রাখলেই অজাগর হয়ে যেত, আর কলিম ওস্তাদের হাতেই ছিল শুকনো জাত-সাপের লাঠি। গোটা রাত সে চেষ্টা করে কিছু করতে না পেরে সুবেহ সাদিকের সময় বলে—লাশ দাফন করো, এখনই পচন ধরবে।

তার দু’মাস পরেই হাফিজ শুনেছিল—কলিম ওস্তাদ মারা গেছে সাপের ছোবলে।

কৈশোর পার করে প্রথম যৌবনেই বাবার মতো সুপুরুষ হয়ে উঠেছিল হাফিজ। কিন্তু লোহার শলাকায় বিষ দিয়ে পাখি শিকার করে না। লোকে বলত—বোবা প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে হত্যার ফল পেয়েছে মাজেদ শিকারি।

ধীরে ধীরে বুকের ভেতর মালভূমি দেখার লোভ আরও তীব্র হতে থাকে হাফিজের। ঘরে মন বসে না। বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। অস্থির লাগে। কিন্তু মালভূমি সে কী করে যাবে? বাবাকে সে স্বপ্ন দেখে। বাবা বলে—ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ো। ঘরে বসে জীবন বোঝা যায় না। ছেলের কাছে মাজেদ স্বপ্নে আসে, তার হাতে একটি আগুন পাখি (ফিনিক্স)। সেই পাখি ধরার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে হাফিজ। কিন্তু হাত সরিয়ে নেয় মাজেদ। বলে—ঘর ছাড়, বাইরে আয়।

অস্থির হয়ে এক রাতে ঘর ছাড়ে হাফিজ। সেদিন ছিল ভয়ঙ্কর জোছনা রাত। শেষ রাতে মনে হয়েছিল—চাঁদ পৃথিবীর কাছে এসে আলো দিচ্ছে। মায়ের কাছে কিছুই বলে আসেনি হাফিজ। হাফিজের কোনো খোঁজ না পেয়ে দু’দিন পরে হাফিজের মা বুঝতে পেরেছিল। অদ্ভুত হেসে বলেছিলেন—তার গায়ে তার বাপের রক্ত। তাকে ঘরে আটকাইয়া রাখা যাবে না। আমি জানতাম, একদিন সে ঠিক হারাইয়া যাবে।

কর্ণফুলির পাড় ধরে চারদিন হেঁটে হাফিজ চলে এসেছিল পাহাড়ে। সেখানে ওর সাথে দেখা হলো একটি উপজাতি শিকারি দলের। ওদের জীবন ছিল আদিম মানুষের মতো। এ জিপসি দলের মেয়েরা বুক আর কোমরে কায়দা করে জড়িয়ে রাখে দু’টুকরো কাপড়। পশুর চামড়ার ব্যাগে পানি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পুরুষগুলোর কাঁধে থাকে শিকারির তীর ধনুক। ওরা ছিল উড়িষ্যার অধিবাসি। গোটা ভারতবর্ষ চষে বেড়ায়। হাফিজ জানতে পারে—এবার ওরা বান্দরবন পাহাড় থেকে যাবে পামির মালভূমিতে। জিপসি দলের সবচেয়ে বয়োজ্যৈষ্ঠ একজনের কাছে শোনা গেলো তার নিজের চোখে দেখা মালভূমির কথা। সে এক অন্য রকম জায়গায়, পাহাড়ের চূড়ায় সমতল ভূমি। মনে হয় পৃথিবীর বাইরের কোনো জায়গা! দেখার মতো। কারাকোরাম পর্বতের মধ্যে দিয়ে ছুটে গেছে রাস্তা। পামির পর্বতকে অতিক্রম করেছে সিল্ক রোড, প্রাচীন কালের বিশ্ব-বানিজ্যের সবচেয়ে বড় রাস্তা ছিল।

এ জিপসি দলের সাথে মিশে গিয়ে হাফিজ জানতে পারে—তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ। ঘরের চিন্তা নেই, খাবারের চিন্তা নেই। প্রকৃতি তাদের সব ব্যবস্থা করে রাখে। নগরের মানুষের মতো হিংসা নেই অকারণে। একটি পশু শিকার করে নিয়ে এসে আগুন জ্বালিয়ে সেটাকে সেকতে থাকে। আগুনের চারিপাশে গোল হয়ে বসে সবাই। পোড়া শেষ হলে—ধারালো চাকু দিয়ে কেঁটে খায় সবাই মিলে। কেউ মারা গেলে তাবুর আশেপাশে সমাধি করে আবার সামনে এগিয়ে চলে ওরা। যাবার আগে একটি পাথর জোগাড় করে গেঁথে রাখে মাথার কাছে। আর পাথরের গায়ে রঙ করে সংস্কৃতির চিহ্নের মতো অদ্ভুত এক রকম লেখা লিখে রাখে। 

জন্মগতভাবে জিপসিরা চতুর হয়। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে-ঘুরে নানান ভাষা আর সাংস্কৃতি শিখে যায়। ওদের একজনের কাছেই হাফিজ জেনেছিল মৃত মানুষের মাথার কাছের পাথরে লেখা থাকে—হে মাটির সন্তান, আজ তুমি মাটিতেই ফিরে গেলে।

দু’দিন ওদের শোক চলে। চলে স্মৃতি আর স্বপ্নের মাতম। হয়ত হাজার বছর পরেও কেউ একজন দেখবে এই কবর, পাথরের লেখা যারা বুঝতে পারবে না, ওরা কত কী বলতে চেষ্টা করবে। আর জিপসি গোত্রের কেউ হয়ত এ পথে এসে থমকে দাঁড়াবে, কাঁদবে ওদের পূর্বপুরুষদের সমাধি দেখে। বিলাপ করবে, শ্যাওলা-ধরা ভাঙ্গা কবরটাকে একটু মেরামত করে দেবে, বুকের কাছে দু’হাত জড়ো করে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনায় চোখ ভেজাবে। ওরা মাটিতে আছরে পড়ে পূর্বপুরুষের আত্মার মুক্তির জন্য কেঁদে উঠবে—আসমান ও জমিনের মালিকের উদ্দেশ্য।

একটি ব্যাপার দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ে হাফিজ। জিপসি দলের কেউ কেউ শব দেহটা দিনরাত অনুসরণ করে। ওরা বুঝতে চায়—মৃত্যুর ব্যাপারটা আসলেই কী? দেহ থেকে কিছু একটা বেরিয়ে যায়, কী বেরিয়ে যায়? তারপর থেকে দেহে পচন ধরতে থাকে! কেন?

ক্রমশ যেন রহস্য ঘেরা গুহায় হাঁটতে থাকে হাফিজ। প্রায় এক বছর ধরে ঘুরে-ঘুরে ওরা পৌঁছে গিয়েছিল পামির মালভূমিতে। কখনো গভীর বন, কখনো নদীর বা বিরান ভূমিতে তাবু ফেলেছিল ওরা। বনের পশু-পাখি, ফলমূল আর নদীর মাঝ শিকার করে জীবন ধারণ করেছে ওরা। পশুর জন্য ওরা ফাঁদ তৈরী করত কাঁচা বাঁশ আর চিকন বেত দিয়ে। গাছের ফল, পশু-পাখির পোড়া মাংস খেয়ে শরীর বেশ উর্বর হয়ে ওঠে হাফিজের। জিপসিদের শরীরের মতো রোগহীন লাগে নিজেকে। ওদের মধ্যে অবাধ যৌন মিলনের প্রবণতা খুব বেশি। আবার নির্দিষ্ট নারী পুরুষের মধ্যেও বারবার সঙ্গমের ঘটনা আছে। ওরা মনে করে—সঙ্গম দেহের প্রয়োজন মেটায়, ওটা মানুষের দরকার। অবাধ মেলামেশার কারণে সন্তানদের পরিচয় ঘটে—হাইডেলবার্গ বা নিয়েনডারথেল মানুষদের মতো মাতৃতান্ত্রিক। মায়ের পরিচয়ে সন্তানরা বড় হয়।

হাফিজ যখন পামির মালভূমিতে থাকতে শুরু করে, তখন ওর সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে একটি কির্গিজ মেয়ের সাথে। মেয়েটির নাম রূহেশরা। ওর সাথে শুধু হৃদয়ের সখ্যতাই নয়, দৈহিক সম্পর্কের বিশ্বাস জন্ম নিতে থাকে। ওরা দু’জন দু’জনকে ভালোবাসে নিজেদের শরীরের মতো। কিন্তু রূহেশরা মারা যায় কারাকোরাম পর্বতের কাছে, প্রচন্ড ঠান্ডায় শিকারের জন্য বের হয়েছিল একদিন। কারাকোরাম পর্বতে শিকার ধরার জন্য বলগা হরিণের পিছু নিয়েছিল, হঠাৎ তুষার ঝড় শুরু হয়। তুষারে কোথায় যেন মিলিয়ে গিয়েছিল—তারপর রূহেশরাকে আর পাওয়া যায়নি।

তখন রূহেশরার স্মৃতি কুয়াশার মতো আচ্ছাদন তৈরী করে হাফিজের চারিপাশে। একবার এক টুকরো হরিণের চামড়া হাফিজের হাতে দিয়েছিল রূহেশরা। চামড়ার টুকরোটি ছিল—প্যাপিরাসের মতো। কির্গিজ ভাষায় তাতে লেখা ছিল—প্রতিটি ভালোবাসা পৃথিবীর বুক জুড়ে থাকুক এমন এক বৃক্ষ হয়ে, যে বৃক্ষ সূর্যের আলো হয়ে ভালোবাসা ছড়াতে থাকুকু ততদিন—যতদিন না ঘৃণা দূর হয় পৃথিবী থেকে।

সে বছর গোটা শীত হাফিজের কেঁটেছিল জিপসি তাবুতে। মোটা কাপড়ের উপর পশুর শুকনো চামড়া দিয়ে তৈরী করা হত তাবুগুলো, যেন ঝড়-বাদল বা তুষারপাত শুরু হলে তাবুগুলো দুমড়ে যেতে না পারে। শীতের রাতগুলো ছিল যেমনি ভয়ানক, তেমনি রোমাঞ্চকর। পলকা বাতাসের সাথে তুষার মিশে ছিটকে পড়ত চামড়ার উপর, তাবুর উপরের চামড়াগুলোতে তখন অদ্ভুত এক সুর তৈরী হতো। যেন মরুভূমিতে কোনো বেদুইন সরল হাতে ছুয়ে দিচ্ছে উদের (উদ—আরবের এক রকম বাদ্যযন্ত্র) তার। আবার একটু ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেলেই মনে হতো—কোনো দানব আঘাত করছে তাবুর গায়ে। যেন দানবের ধারালো নখের আঘাতে তাবু ছিঁড়ে যাবে এখনই। 

কোনো কোনো সময় গোটা দিন সূর্য দেখা যেতে না। কারাকোরাম হাইওয়ে ধরে মালবাহি গাড়ি চলত পাঞ্জাব থেকে চীন। আর সিল্ক রোড পড়ে থাকত নিরবে। অথচ এক সময় এই সিল্ক রোড ধরেই গোটা পৃথিবীর বানিজ্য জমিয়ে তুলেছিল—অটোমান আর ইউরোপিয়ানরা।

আবার কোনো কোনো দিন সূর্য এসে দাঁড়াত বরফ জমা পামির পর্বতের শেষে। তখন গোটা মালভূমিকে মনে হত, বরফের দেশ—সাইবেরিয়া। পাহাড় আর চারণভূমিগুলো ঢেকে থাকত আকাশের মত সাদা বরফে। তাবুর উপর বরফের স্তূপ, উপত্যাকার ছোট বড় নদীগুলোর উপরের পানি জমে বরফ হয়ে যেত।

বরফের উপর প্রথম সূর্যের আলোকপর্দা জড়িয়ে থাকত প্রকৃতির এক অবিরল অলৌকিক সৌন্দর্য নিয়ে। যে সৌন্দর্য শুধু একমাত্র প্রতিপালকই দান করতে পারেন পৃথিবীকে। বেলা যখন বাড়তে থাকে, তখন পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের আলোকরশ্মি এতই তীব্র হয়ে উঠে, দূর থেকে দেখলে মনে হয়—মোটা কাচের উপর জমে আছে রাশি-রাশি সূর্যের কণা। তখন বিভিন্ন তাবু থেকে ছোট-ছোট শিশুরা পাহাড় চূড়ার সৌন্দর্যে দৃষ্টি রেখে চলে যায় ওদের ওস্তাদের তাবুতে। ওদের হাতে থাকত ঘোড়ার চামড়ার ব্যাগ, ব্যাগে থাকত কাঠের স্লেট আর কয়লার পেনসিল। মেষের পশম দিয়ে হাতে তৈরী পোষাকে শিশুদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা থাকত। শিশুদের শেখানো হত নীতি শিক্ষা আর ঈশ্বরের প্রার্থনা। ছোট হাতগুলো জড়ো করে বুকের কাছে রেখে ওরা এমনভাবে চোখ বন্ধ করে রাখত, যেন ঈশ্বরকে দেখতে পাচ্ছে ওরা। হঠাৎ তুষার ঝড়ে কোনো কোনো দিন ওস্তাদের তাবুতে আটকে পড়ত শিশুরা। তখন ওস্তাদ ওদের নানা রকম গল্প শোনাত আর খরগোশের স্যুপ খেতে দিত যেন ওরা শান্ত থাকে। 

শীত বিদায় নিতেই বরফ গলতে শুরু করে। বসন্ত আসে। নতুন বসন্তে রূহেশরা নতুন হয়ে ওঠেছিল। রূহেশরা বলেছিল—তোমার চোখে এত মায়া কেন! তার পর রূহেশরা হেসেছিল স্বর্গের মেয়েদের মতো। ওর হাসি পরাগের মত লেগেছিল হাফিজের বুকে। ওর চোখ ছিল—পামির উপত্যাকার শরতের নদীর মত শান্ত।

কির্গিজরা পামিরে বাস করে বহু বছর ধরে। কির্গিজ উপজাতি উজবিকেস্তান, চীন, রাশিয়া, তাজাকিস্তান, কাজাকিস্তান, তুর্কিতেও বসবাস করে। এখানে ওদের জীবন ধারণ খুবই কষ্টের। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। ওদের জীবন নির্ভর করে পালিত পশুগুলোর উপর। গাধা, ভেড়া, উট আর ছোট জাতের ঘোড়া ওদের বাহন।

কির্গিজদের সাথে একেবারেই মিশে গিয়েছিল হাফিজ। ভালো শিকার করতে জানত সে। আর রূহেশরার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবার পর হাফিজ নিজেকে কির্গিজদের একজন ভাবতে শুরু করে। তখন হাফিজের মনে হতো—গোটা পৃথিবীটাই মানুষের মাতৃভূমি। মানুষ পৃথিবীর সন্তান।

উড়িষ্যার যে জিপসি দলের সাথে হাফিজ এখানে এসেছিল, ওদের চেয়ে কির্গিজরাই এখন ওর আপন হয়ে উঠেছে। এর বড় কারণ রূহেশরা। হাফিজ ওকে ডাকত রূহ্ বলে। ওর চোখ ছিল বাদামি আর হৃদয় ছিল বরফের হ্রদ—শান্ত আর স্বচ্ছ। অথচ রূহ যখন আলিঙ্গন করত, তখন মনে হতো পৃথিবীতে এর চেয়ে মায়াবী উষ্ণতা আর নেই। ওর গায়ে সৌরভ আর কণ্ঠের স্নিগ্ধতা ছিল বসন্ত বাতাস। বুকের ভেতর ফুল ফোটা শব্দ বয়ে নিয়ে বেড়াত হাফিজ।

এক বছর পর রূহেশরার সাথে হাফিজের বিয়ে হয়। রূহ ছিল গোত্র প্রধানের মেয়ে, তাই হাফিজ হয়ে উঠেছিল কির্গিজদেরই অন্যতম একজন। এখানেই পাঁচ বছর কেঁটে যায় হাফিজের। উড়িষ্যার জিপসি দলটি চলে যায় পাঞ্জাবের দিকে। এ পঞ্চ নদীর দেশে তারা নদীর পাড় ধরে থাকবে কিছু কাল। ওদের জন্য হাফিজের মন খারাপ হয়ে থাকে। এক সময় মন খুশিতে ভরে ওঠে, যখন হাফিজ শোনে সে বাবা আর রূহ্ মা হবে।

একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয় রূহেশরা। মেয়েটির নাম রাখা হয়—দারিয়া। এ ক’বছর মনটা স্থির হয়েই ছিল হাফিজের। হঠাৎ একদিন হাফিজ স্বপ্ন দেখে—মা তাকে ডাকছেন। মা তার আঁচলে পাঁচ পয়সা বেঁধে রেখে হাসছেন। মা দাঁড়িয়ে আছে জলপাই গাছের নিচে। ডাল ভেঙে জলপাই ধরেছে। পাঁকা জলপাই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা। মায়ের মুখে আনন্দের হাসি, গায়ে নতুন কাপড়।

দেশে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে হাফিজের মন। রূহ্ তা টের পায়, নানাভাবে হাফিজকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে। মা হবার পর রূহেশরার রূপ আরও বেঁড়েছে। এতদিনে সে পূর্ণযৌবনা হয়ে উঠেছে। কিন্তু হাফিজের মন ঘরে থাকে না। শিকারের পিছু নিয়ে মালভূমির পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। রোদে পোড়া সিল্ক রোড ধরে অনেক দূর ঘোড়া ছুটিয়ে যায়। মাথায় পাগড়ি, পায়ে চামড়ার জুতো পায়ে হাফিজ যখন ঘোড়ার পিঠে চড়ে, তখন পামির রাজার মতো দেখায় হাফিজকে। হাফিজ যখন ঘোড়া নিয়ে বের হত তখন খুবই মন খারাপ করে থাকত রূহ্, হয়ত হারিয়ে যাবে।

যতদিন রূহ্ বেঁচে ছিল, ততদিন মালভূমিতেই ছিল হাফিজ। কিন্তু তুষার ঝড়ে যেদিন রূহেশরা হারিয়ে গেলো তার ক’মাস পরে কোনো এক শীতের রাতে মেয়েকে নিয়ে পথে নেমে এলো হাফিজ। সে রাতেও তুষার ঝড় ছিল। পামির মালভূমিতে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল বিষাদের। রূহেশরার সাথে পরিচয় হবার প্রথম দিকে তাবুগুলো মনে হত জান্নাত, পরে সেই তাবুই জাহান্নাম হয়ে উঠেছিল।

সকালে সবাই যখন জানতে পারে হাফিজ নেই, দারিয়াকে নিয়ে পালিয়েছে। দুদিন পর্যন্ত ঘোড়া নিয়ে ওরা চারদিকে খোঁজাখুজি করেছিল। কিন্তু কোথায়ও পাওয়া যায়নি হাফিজকে। কেউ কেউ বলেছিল—তুষার ঝড়ে পর্বতের উপত্যাকায় মিশে গেছে। যেমনি হারিয়ে গিয়েছিল রূহেশরা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ