বিস্মৃত কঙ্কাবতী

Send
শুভ্র শাহেদ
প্রকাশিত : ০৭:৩০, জুলাই ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৩০, জুলাই ২২, ২০২০

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ২২ জুলাই, ১৮৪৭। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ব্যঙ্গকৌতুক রসের স্রষ্টা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও তিনি ফারসি, ওড়িয়া ইত্যাদি কয়েকটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তার রচিত বইগুলির মধ্যে কঙ্কাবতী, ভূত ও মানুষ, ফোকলা দিগম্বর, ডমরুচরিত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস—উপন্যাস বললে বিদগ্ধজনেরা তেড়ে আসতে পারেন—‘কঙ্কাবতী’ প্রকাশিত হয় ১৮৯২ সালে, তখন তিনি পরিণত মানুষ, ৪৫ বছর বয়স; সে সময় উপন্যাসটি পাঠকমহলে একটি ঢেউ সৃষ্টি করে উদ্ভট রসের। মানুষের কল্পনার সীমা কতখানি হতে পারে, বা উদ্ভটত্ব নির্বিকারভাবে কতক্ষণ লেখা যায় সেটাই হয়ে ওঠে প্রশ্ন। ত্রৈলোক্যনাথ যাতে আশ্চর্যভাবে সফল হয়েছেন। তবে ত্রৈলোক্যনাথ যে উদ্ভট গল্প বয়ান করেছেন তা বাঙালি সমাজে অপ্রচলিত নয়, বরং বাংলা গল্পের রীতিও তাই। যে কারণে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৭)’ এখনো কিশোর পাঠকের মনে প্রবল আলোড়ন তৈরি করে। তবে ‘কঙ্কাবতী’ কেন দিন দিন বিস্মৃত উপন্যাস হতে চলেছে তা বলা মুশকিল। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের যাদুবাস্তবতা আমরা সহজে নিতে পারলেও ‘কঙ্কাবতী’র ক্ষেত্রে যুক্তির অনুসন্ধান করতে বসি। বাঙালি পাঠকের গল্প শোনার অভিজ্ঞতা শুরু হয় কল্পকাহিনি নিয়ে, কিন্তু পরিণত বয়সে এসে সেই রসে আর স্নাত হওয়ার বোধ হয়ত থাকে না, নাকি থাকে? নাইজেরিয়ার লেখক আমোস টুটুওয়ালা’র ‘তাড়িখোর’ (The Palm Wine Drinkard 1952) তো উদ্ভটত্বের শিরোমণি—যে কাহিনির বীজতলাও ছিলো লোককানিতে—তা মেনে নিতে পেরেছি, ‘কঙ্কাবতী’র ভাগ্য কেন সুপ্রসন্ন হলো না!

‘কঙ্কাবতী’ প্রকাশিত হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ অনেক প্রশংসা করেছেন, বলেছেন : ‘এই উপন্যাসটি মোটের উপর যে আমাদের বিশেষ ভাল লাগিয়াছে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। লেখক অতি সহজে সরল ভাষায় আমাদের কৌতুক এবং করুণা উদ্রেক করিয়াছেন এবং বিনা আড়ম্বরে আপনার কল্পনাশক্তির পরিচয় দিয়াছেন। গল্পটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে প্রকৃত ঘটনা এবং দ্বিতীয় ভাগে অসম্ভব অমূলক অদ্ভুত রসের কথা। এইরূপ অদ্ভুত রূপকথা ভাল করিয়া লেখা বিশেষ ক্ষমতার কাজ। অসম্ভবের রাজ্যে যেখানে কোনো বাঁধা নিয়ম কোনো চিহ্নিত রাজপথ নাই, সেখানে স্বেচ্ছাবিহারিণী কল্পনাকে একটি নিগূঢ় নিয়মপথে পরিচালনা করিতে গুণপনা চাই। কারণ রচনার বিষয় বাহ্যতঃ যতই অসঙ্গত ও অদ্ভুত হউক না কেন, রসের অবতারণা করিতে হইলে তাহাকে সাহিত্যের নিয়মবন্ধনে বাঁধিতে হইবে। রূপকথার ঠিক স্বরূপটি, তাহার বাল্য-সারল্য, তাহার অসন্দিগ্ধ বিশ্বস্ত ভাবটুকু লেখক যে রক্ষা করিতে পারিয়াছেন, ইহা তাঁহার পক্ষে অল্প প্রশংসার বিষয় নহে।’

রবীন্দ্রনাথের ‘কঙ্কাবতী’ পাঠ করার সময় ‘অ্যালিস ইন দি ওয়ান্ডারল্যান্ড নামক একটি ইংরাজী গ্রন্থ মনে পড়ে; ‘সেও এইরূপ অসম্ভব, অবাস্তব, কৌতুকজনক বালিকার স্বপ্ন। কিন্তু তাহাতে বাস্তবের সহিত অবাস্তবের এরূপ নিকট সংঘর্ষ নাই।’ বলে মন্তব্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথের শেষ বাক্যটির মধ্যে ‘কঙ্কাবতী’র উপন্যাস হয়ে ওঠার গুণাবলি আছে। অর্থাৎ বাস্তবের সঙ্গে অবাস্তবের সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষই আমাদের এখন নির্ণয় করে দেখাতে হবে।

উপন্যাসটি কুসুমঘাটী নামক একটি গ্রামের জনজীবন নিয়ে গড়ে উঠেছে। এখানকার অধিবাসী রামতনু রায়, লোকে যাকে তনু রায় বলেন, যিনি সুবিধাবাদী ব্রাহ্মণ। নিজের দুইটি মেয়ে দুই বৃদ্ধের কাছে বিয়ে দিয়েছেন টাকার লোভে, এবং এই কাজকে তিনি শাস্ত্রসম্মত মনে করেন। যথারীতি দুই মেয়ে বিধবা হয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছে বলে যিনি ক্ষুব্ধ। আরেক ছেলে পিতার অনুগামী। ছোট মেয়ে কঙ্কাবতী। যে আজন্ম রূপেগুণে অতুলনীয়। তাদেরই প্রতিবেশি ব্রাহ্মণ শিবচন্দ্র মুখোপাধ্যায় শিক্ষিত। কলকাতা থাকেন। তার পরিচয় লেখক এভাবে দিয়েছেন, ‘পরদুঃখে তিনি কাতর হইয়া পড়িতেন ও যথাসাধ্য পরের দুঃখ মোচন করিতেন। অনেক লোককে অন্ন দিতেন ও অনেকগুলি ছেলের তিনি লেখা-পড়ার খরচ দিতেন। এরূপ লোকের হাতে পয়সা থাকে না।’ শিবচন্দ্রের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী শিশু সন্তান খেতুকে নিয়ে গাঁয়ে থাকেন অনাহারে অর্ধাহারে। আদর্শ সন্তান বলতে যা বোঝায় খেতু তা-ই। তাদের দুঃখে অনেকে পিছটান দিলেও রামহরি সাহায্যার্থে এগিয়ে এসে খেতুকে কলকাতা নিয়ে যান লেখাপড়া করানোর জন্য। খেতু যথারীতি ভালো ছাত্র। জলখাবারের পয়সা বাঁচায়।

নিঃসঙ্গ খেতুর মাকে সঙ্গ দিতে আসেন কঙ্কাবতীর মা। মাঝে মাঝে মেয়েকে তার কাছে রেখেও যান। তিনি আদর যত্ন করেন লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটিকে।

কুসুমঘাটীর আরেক জন নিরঞ্জন কবিরত্ন। যিনি শাস্ত্রজ্ঞ। বাড়িতে ছাত্র রেখে অন্নদান করেন। বিষয় সম্পত্তির প্রতি আগ্রহ নেই। জমিদার জনার্দ্দন চৌধুরী তার পঞ্চাশ বিঘা জমির পাঁচ বিঘা কেড়ে নেবার মতলব করেন। নিরঞ্জন জমিদারের সামনে নিজের জমির দলিল তামাক খাবার পাত্রে পুড়িয়ে বলেন, ‘কেবল পাঁচ বিঘা কেন? আজ হইতে আমার সমুদায় ব্রহ্মোত্তর ভূমি আপনার। যিনি জীব দিয়াছেন, নিরঞ্জনকে তিনি আহার দেবেন।’ নিরঞ্জন দারিদ্র্যের অকুল পাথার মেনে নেন। তার ছাত্ররা তার আশ্রয় ছেড়ে যায়। নিরঞ্জনের সঙ্গে তনু রায়ের বিরোধ শাস্ত্র নিয়েই। তিনি তনু রায়ের সুবিধাবাদী শাস্ত্রজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে শত্রু হয়েছেন।

খেতু ছুটিতে বাড়ি এসে শিশু কঙ্কাবতীকে স্নেহ করে। তার জন্য বইপত্র নিয়ে আসে। লেখাপড়া শেখায় ইত্যাদি। তাদের মধ্যে ভাব-ভালোবাসা গড়ে ওঠে। যাতে খেতুর মা ও কঙ্কাবতীর মায়ের প্রশ্রয় রয়েছে। কিন্তু তনু রায় বৃদ্ধ জমিদার জনার্দ্দন চৌধুরীর কাছে কঙ্কাবতীকে বিয়ে দিতে চান টাকার লোভে। বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক হয়।

এরই মধ্যে খেতুকে কলকাতায় সাহেবদের মতো ‘বরফ’ খাওয়ার অভিযোগে একঘরে করে রাখেন জমিদার। জমিদারের সঙ্গে একজোট হয় ঠ্যাঙারে (খুনী) দলের লোক, ঘাঁড়েশ্বর (মদ্যপ) সহ অন্যান্যরা।

বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ায় এবং খেতুকে হারানোর শোকে কঙ্কাবতীর শরীরে অসহ্য দাহ তৈরি হয়। সে নৌকায় করে নদীর মাঝখানে গিয়ে ডুব দেয় শরীর জুড়াতে। তাকে পেয়ে নদীর মাছ, কাকড়া, কাছিম অর্থাৎ জলচর প্রাণিরা রাণি বানায়। বিশাল এক মতিমহল তার প্রাসাদ। রাণির রাজকীয় পোশাক বানাতে কাকড়া কঙ্কাবতীকে নিয়ে যায় দর্জির কাছে, পেছনে কচ্ছপের পিছে টাকার বস্তা। এই শুরু হলো কঙ্কাবতীর যাদুবাস্তব ভ্রমণ। যেই ভ্রমণের মধ্যে আমরা দেখি বাঘের সঙ্গে কঙ্কাবতীর বিয়ে হয়। যেই বাঘ আবার তারই খেতু, পাহাড়ের নিচে এক আশ্চর্য প্রসাদে যে থাকে। বাইরে বের হলে বাঘ হয়ে যায়। সেই প্রাসাদে স্বামীর সঙ্গে কঙ্কাবতী বসবাস করে। খেতুর মৃত্যু হয়। এরপর শুরু হয় তাকে বাঁচাতে নানান টানাপোড়েন ও ব্যাং, মশা, হাতি, খোক্কস, চাঁদ, নক্ষত্র, ভূতিনী সহ নানা প্রকার চরিত্র্যের বিচিত্র কর্মকাণ্ড। কঙ্কাবতী আকাশে গিয়ে চাঁদের মূল থেকে এক তোলা মূল পর্যন্ত কেটে আনে। উদ্ভটত্বের বর্ণনায় মানুষের কল্পনার সীমাও যেন ছাড়িয়ে যায়। আরব্য রজনীর মতো একেকটি গল্পের মধ্যে বহু গল্প লুকিয়ে থাকে।    

যে রূঢ় বাস্তবের মধ্য দিয়ে উপন্যাস চলতে শুরু করে তা উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসের সমাজ বাস্তবতারই চালচ্চিত্র। কিন্তু ত্রৈলোক্যনাথের বিশিষ্টতা এখানেই যে তিনি বাস্তবের সীমা ছাড়িয়ে যাদুবাস্ত বা একটি ফ্যান্টাসীর জগতের মধ্যে পাঠককে নিয়ে যান। ওই সময়ের আর সব উপন্যাসের যে পরিণতি হয় ‘কঙ্কাবতী’তে তাই হয়েছে, তবে তা উদ্ভটত্ব অতিক্রম করেই। যে কারণে ‘কঙ্কাবতী’কে সহজ কথায় রূপকথা বলা যায় না। ‘কঙ্কাবতী’ ভবিষ্যতে বাংলা উপন্যাসকে নতুন করে দিশা দিতেও পারে।   

আবদুশ শাকুর আক্ষেপ করেছেলেন, ‘ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় বাংলা ভাষার এই অমর গল্পকার তাঁর মহাপ্রয়াণের শতবর্ষ পার না হতেই আজ মৃতপ্রায়, বিস্মৃত তো তিনি অনেককাল থেকেই। অমর লেখকের এই অকালমৃত্যু কিন্তু লেখকের দোষে নয়। তাহলে কার দোষে? অধ্যাপকের? অধ্যাপিতের? প্রকাশকের? পাঠকের? যার দোষেই হোক, দোষটা দূর করতে হবে। কারণ, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪৭-১৯১৯) অবিস্মরণীয় কৃতি চিরস্থায়ী হয়ে আছে কঙ্কাবতী উপন্যাসে, ভূত ও মানুষের বিচিত্র আখ্যানে মুক্তা-মালার সূচনায় এবং ডমরু-চরিত-এর অনবদ্য গল্পমালায়। রূপকথা এদের মধ্যে রূপক হয়ে দেখা দিয়েছে। চরিত্রগুলো এক-একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কৌতুক রূপ নিয়েছে সমসাময়িক জাতীয় জীবনাচরণের তির্যক সমালোচনার।’

আবদুশ শাকুর তার লেখায় স্পষ্ট করেননি কেন ত্রৈলোক্যনাথ অপঠিত থাকছেন। তবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ‘পূর্বগামী লেখকদের সম্পর্কে আমাদের এক ধরনের উদাসীনতা’কে দায়ী করেছেন। তবে এখন সময় এসেছে নতুন করে অনুসন্ধানের, যখন নতুন যুগের পাঠক আমোস টুটুওয়ালা, মার্কেস বা নাগিব মাহফুজের লেখার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।

//জেডএস//

লাইভ

টপ