কানাডার গল্পহেয়ারবল | মার্গারেট অ্যাটউড

Send
অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর
প্রকাশিত : ০৯:৫৫, জুলাই ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৫৮, জুলাই ২৮, ২০২০

বর্তমান কানাডার প্রধানতম কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউড একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সাহিত্য সমালোচক, প্রাবন্ধিক, উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী। এ পর্যন্ত তার আঠারোটি কাব্যগ্রন্থ, আঠারোটি উপন্যাস, নয়টি ছোটগল্পের সংকলন, দুইটি গ্রাফিক উপন্যাসসহ বিভিন্ন শাখায় একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অ্যাটউড দুইবার দ্য বুকার প্রাইজ (২০০০ ও ২০১৯ সাল), আর্থার সি. ক্লার্ক পুরস্কার, গভর্নর জেনারেল্‌স পুরস্কার, ফ্রানৎস কাফকা পুরস্কার-সহ অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন।

অ্যাটউডের উপন্যাস ও কবিতায় যেসব বিষয়বস্তু উঠে এসেছে তার মধ্যে ভাষার ক্ষমতা, লিঙ্গ ও পরিচয়, ধর্ম ও পুরাণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্ষমতার রাজনীতি অন্যতম।নভেম্বরের তেরো তারিখ। তারিখটা অশুভ। অন্যদিকে নভেম্বর মৃত্যুর মাস। ওইদিন ক্যাট টরোন্টো জেনারেল হাসপাতালে গেল একটা অপারেশনের জন্য। অপারেশনটা ছিল ডিম্বাশয়ের পুঁজকোষের। বেশ বড় হয়ে গিয়েছিল কোষটা। চিকিৎসক জানালেন, অনেক নারীরই হয় এরকম কোষ। কেন হয়, কারণটা কেউ জানে না। জিনিসটা মারাত্বক পর্যায়ে চলে গেছে কি-না, কিংবা ইতোমধ্যে সেটার মধ্যে মৃত্যুর বীজগুটি তৈরি হয়ে গেছে কি-না, জানার কোনো উপায় ছিল না, প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত জানার উপায় ছিল না। ক্যাটকে তিনি ‘প্রবেশ করা’র কথাটা বললেন; যেভাবে বললেন, তাতে ক্যাটের মনে পড়ল টিভিতে প্রামাণ্য অনুষ্ঠানে যুদ্ধ-ফেরত বয়স্ক মানুষদের কথা। তাঁরা কথা বলার সময় এরকম শব্দ ব্যবহার করেন। শত্রু-ভূখণ্ডে আক্রমণ প্রসঙ্গে তাঁরাও ‘প্রবেশ করা’ কথাদুটো এভাবেই ব্যবহার করেন। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে, একই রকম দাঁত কটমট করে নির্মম আনন্দ প্রকাশের ভঙ্গি চিকিৎসকের চেহারায়ও দেখতে পেল ক্যাট। পার্থক্য শুধু, ইনি প্রবেশ করবেন ক্যাটের শরীরের ভেতর, কোনো শত্রু-ভূখণ্ডে নয়। ক্যাটও দাঁতে দাঁত চেপে চেতনানাশক প্রয়োগের মুহূর্তের জন্য সময় গণনা করতে লাগল। ক্যাটের ভয় হচ্ছিল ঠিকই, তবে কৌতূহলও জাগছিল মনে। অনেক বিষয়েই তার কৌতূহল। ক্যাট চিকিৎসককে বলে-কয়ে রাজী করাল, জিনিসটা যা-ই হোক না কেন তিনি যেন ফেলে না দেন, রেখে দেন তার জন্য। জিনিসটা দেখতে কেমন তার দেখার খুব ইচ্ছে। নিজের শরীর সম্পর্কে জানার কৌতূহল তার প্রবল। কৌতূহল মেটনোর জন্য যা-ই করার দরকার হোক, কিংবা শরীর থেকে যেটাই বের করার দরকার হোক, তাতে সে রাজী। অবশ্য মাথা-পাগল ডানিয়া একটা ম্যাগাজিনটা মেলে ধরে বলল, তার শরীরে বেড়ে ওঠা জিনিসটা তার শরীরের ভেতর থেকে তাকে একটা বার্তা দিচ্ছে, তার কাঁপন থামানোর জন্য বালিশের নিচে একটা নীলকান্তমণি নিয়ে ঘুমানো উচিত। তখন ক্যাট তাকে জিনিসটা রেখে দিতে বলল।

    দেখা গেল, অস্বাভাবিক কোষটা একটা ঝুঁকিহীন টিউমার। ঝুঁকিহীন কথাটা শুনতে ক্যাটের ভালোই লাগল যেন জিনিসটার একটা আত্মা আছে, জিনিসটা তাকে শুভকামনা জানাচ্ছে। ডাক্তার বললেন, এটা আকারে আঙুর ফলের মতো বড়। ক্যাট বলল, নারকেলের মতো বড়। অন্যদের থাকে আঙুরের সমান। ক্যাটের মনে হলো, নারকেল বলাই শ্রেয়; কারণ শুনে শক্ত একটা বস্তুর ধারণা তৈরি হয় মনে। মনে হয়, ছোবড়ার মতো এটার গায়ে চুল জড়ানো আছে।

     টিউমারটার চুলের মতো তন্তুগুলো লাল। লম্বা তন্তুগুলো ভেতরের দিকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ভেজা পশমি বলের মতো হয়ে গেছে, কিংবা বাথরুমের সিঙ্কে আটকে থাকা চপচপে তলানি তুলে আনার পর যেমন দেখা যায় তেমনটা দেখতে। জিনিসটার ভেতর ক্ষুদে হাড় কিংবা হাড়ের টুকরোও দেখা গেল। পাখির হাড়ের মতো, গাড়ির চাকায় পিষ্ট চড়–ইয়ের ভাঙা হাড়ের মতো। হাত-পায়ের নখ এবং আঙুলের মতো অঙ্গও আছে। পূর্ণাঙ্গ আকার পাওয়া পাঁচটা দাঁতও আছে।

     ক্যাট ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল, জিনিসটা কি অতিমাত্রায় অস্বাভাবিক কিছু?

     ডাক্তার একটু হাসলেন। তিনি ভেতরে প্রবেশ করেছেন এবং অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে এসেছেন বলে আগের মতো দাঁত কড়মড় করে দৃঢ়তা প্রকাশ করলেন না।

     অস্বাভাবিক? না, অস্বাভাবিক নয়। আমরা বরং বলতে পারি, অনেকেরই এমনটা হয়। কথাগুলো খুব যত্ন নিয়ে বললেন তিনি যেন মাকে তার নবজাতকের কোনো অস্বাভাবিক দুর্ঘটনার খবর জানাচ্ছেন। ডাক্তারের কথা শুনে ক্যাট খানিক হতাশ হলো। ঘটনাটার মধ্যে নতুনত্ব থাকলেই বরং শুনতে ভালো লাগত তার।

     ক্যাট এক বোতল ফরমালডিহাইড চাইল। কেটে ফেলা টিউমারটা বোতলের মধ্যে রেখে দিল সে। টিউমারটা তার নিজের, ঝুঁকিহীন। তাহলে তো ফেলে দেওয়া উচিত হবে না। ক্যাট জিনিসটা বাসায় নিয়ে এসে দেয়ালের তাকের ওপর রেখে দিল। টিউমারটার নাম দিল হেয়ারবল। খড়কুটো ঠেসে ভরা মরা ভালুকের মাথা, কিংবা এভাবে রাখা বাড়ির কোনো মৃত পোষা প্রাণি অথবা তাকের ওপরে রাখা এ রকম বিরাট কিছুর চেহারা থেকে টিউমারটার চেহারা খুব ভিন্ন নয়। কিংবা বলা যায়, ক্যাট ওই রকম কিছুই ভাবছে আর কী! যেমনই দেখা যাক না কেন, জিনিসটার উপস্থিতিটা টের পাওয়া যাচ্ছে, সেটাই বড় কথা।

    জের টিউমারটা এভাবে রাখা পছন্দ করে না। নতুন এবং অদ্ভুত জিনিসের প্রতি তার আপাত টান থাকা সত্ত্বেও সে আসলে খুঁতখুঁতে। ক্যাটের অপারেশনের পর প্রথমবার যখন আসে জের সে ক্যাটকে জিনিসটা ফেলে দিতে বলে। তার আসাটা অবশ্য লুকিয়ে চুপি চুপি আসার মতো। টিউমারাটকে সে অসহ্য বলে। ক্যাট সঙ্গে সঙ্গে সাফ সাফ জানিয়ে দেয়, তাকের ওপর বোতলে সে জেরের দেওয়া ফুল না রেখে বরং টিউমারটাই রেখে দেবে। টিউমারের আগে ফুলগুলোই পচে যাবে। তাকের উপর সাজিয়ে রাখার বস্তু হিসেবে টিউমারটা ফুলের চেয়ে অনেক ভালো জিনিস। জের অভিযোগের সুরে বলে, সবকিছু চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটা জেদী প্রবণতা আছে ক্যাটের: সবকিছু একদম দেয়ালে পিঠ ঠেকানোর মতো অবস্থায় নিয়ে যায়। তার এই অর্বাচীন জেদটা আসলে কোনোভাবেই উপস্থিত বুদ্ধির বিকল্প হতে পারে না। সে বলে, ক্যাট খুব শিঘ্রই সীমার বাইরে চলে যাবে। মানে বোঝাতে চায়, ক্যাটের এমন সীমা পেরিয়ে যাওয়াটা তার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না।

     ক্যাট বলে, সে জন্যই তুমি আমাকে ভাড়া করেছ, তাই না? কারণ আমি সীমা ছাড়িয়ে চলে যেতে পারি। জের এখন আছে একটা বিশ্লেষণী মানসিকতার মধ্যে। তবে সে ক্যাটের কথার উত্তরে বেশি কিছু বলে না, শুধু জানায়, ম্যাগাজিনে ক্যাটের কাজের ওপরই তার এইসব মানসিক প্রবণতা দেখতে পায়। ক্যাটের এইসব চামড়ার মতো মোটা পোশাক, অদ্ভুত এবং নির্যাতিতের মতো পোজ—এসব তাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, জের নিজে এবং অন্যরা আর তাকে অনুসরণ করতে পারবে না মনে হয়। ক্যাট কি তার কথা বুঝতে পারছে? তার কথাটা কি নিতে পারছে ক্যাট? এ রকম কথা আগেও বলা হয়েছে। ক্যাট খানিক মাথা ঝাঁকায়, কিছু বলে না। সে জানে, জের কী বোঝাতে চাচ্ছে: বিজ্ঞাপনদাতাদের তরফ থেকে নালিশ জানানো হয়েছে। অতিমাত্রায় উদ্ভট, অতিরিক্ত জটিল। কঠিন ইত্যাদি।

     ক্যাট বলে, আমার ক্ষতস্থানটা দেখতে চাও?

     আমাকে হাসিও না। নিষেধ করলে হয়তো জোর করে বের করেই ফেলবে, সে আমি জানি। রক্ত দেখতে হবে এমন কিছু, স্ত্রীরোগ সম্পর্কিত কিছু দেখলেই তার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। দুবছর আগে তার স্ত্রীর বাচ্চা হওয়ার সময় সে ডেলিভারি রুমে ভয়ে বমি করে ফেলেছিল প্রায়। ঘটনাটা সে ক্যাটকে বেশ গর্বের সঙ্গেই জানিয়েছে এক সময়। ক্যাটের ইচ্ছে করে, চল্লিশের দশকের সাদা-কালো সিনেমায় যেমন দেখা যায় তেমন করে মুখের একপাশে একটা সিগারেট গুঁজে একটা পোজ দিতে। ইচ্ছে করে, জেরের মুখে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। তাদের মধ্যে যুক্তিতর্ক চলাকালে আগে ক্যাটের উদ্ধত ভাব জেরকে উত্তেজিত করে ফেলত। সে ক্যাটের বাহুর ওপরের দিকটা খপ করে জোরে ধরে ফেলত, প্রবল শক্তিতে চুমু দিতে থাকত। ক্যাটকে জেরের চুমু দেওয়ার মধ্যে একটা বিশেষ লক্ষণ হলো, সে এমনভাবে চুমু দেয় যেন অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে তার চুমু দেওয়া, দুজনের সম্মিলিত চেহারাটা খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। নতুনতম চকচকে এবং শক্ত কিছু পরা অবস্থায় চুমু খাওয়ার সময় তার রক্তবর্ণ ঠোঁটে এবং ছোট করে ছাঁটা চুলের মাথায় তাকে এমন উন্মাদ মনে হয়। মনে হয় সে উরুসন্ধি আঁকড়ে থাকা স্কার্ট এবং স্কিন-টাইট লেগিংসপরা কোনো মহিলাকে কিংবা কোনো মেয়েকে চুমু খাচ্ছে। তার এ রকমই ভালো লাগে। চুমু দেওয়ার মুহূর্তে সে আয়নায় দেখতে চায়।

    তবে এবার আর সে উত্তেজিত হয় না। ক্যাটও তাকে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার লোভ দেখাতে পারে না। কারণ এখনও সে শারীরিকভাবে প্রস্তুত নয়। ক্ষত জায়গাটা সেরে ওঠেনি। একটা পানীয় চুমুক দেওয়া শুরু করে জের। তবে শেষ করে না। হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার মতো করে ক্যাটের হাতটা ধরে। মেষের লোম দিয়ে তৈরি পোশাকের ভেতর থেকে বের হয়ে থাকা কাঁধে বার দু’এক চাচাসুলভ হালকা সহানুভূতির ছোঁয়া দেয়। এরপর বেশ দ্রুতই বের হয়ে যায়।

     ক্যাট বলে, বিদায়, জেরাল্ড। তার উচ্চারণের ভেতর খানিক উপহাস প্রকাশ পায়। কথাদুটোর মধ্য দিয়ে ক্য্যাট জেরাল্ডকে বাতিল করে দেয়, অস্বীকার করে দেয়, যেন জেরাল্ডের বুক থেকে একটা মেডেল খুলে নেওয়া হলো। একটা সতর্কতা জানানো হলো। 

     ক্যাটের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হওয়ার সময় তার নাম ছিল জেরাল্ড। ক্যাটই তাকে জেরি এবং পরে জের নাম দেয়। ফ্লেয়ার এবং ডেয়ার শব্দ’র সঙ্গে ছন্দের মিল তৈরি করার জন্য এভাবে তার নাম ছোট করে ফেলে ক্যাট। ক্যাটই তাকে মানিব্যাগের মতো মুখওয়ালা চুষণী টাই পরতে বাধ্য করেছে, ঢিলা ধরনের ইতালীয় কোট কেনার কথা বলেছে, চুল ঠিকমতো কাটতে বাধ্য করেছে, কোন ধরনের জুতা পরতে হবে তাও বলেছে। জেরাল্ডের বর্তমান রুচির অনেকটাই ক্যাটের তৈরি। খাবার, পানীয়, বিনোদনের ড্রাগস, নারীদের অন্তর্বাস—এ সবকিছুই এক সময় ক্যাটের মতামতের ওপর নির্ভর করেছে। তার নতুন অধ্যায়ের পরিচয়টা ক্যাটেরই তৈরি। তার কাটছাঁট করা নামটার শেষে র ধ্বনির ওপর জোর দিয়েছে ক্যাটই।

     ক্যাটের নিজের নামও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এসেছে। ছোটবেলায় তার রোমান্টিক নামটা ছিল ক্যাথরিন। রহস্যময় চোখের খুঁতখুঁতে মা তাকে যে সব পোশাক পরাতেন, সেগুলো দেখতে এলোমেলো হয়ে থাকা বালিশের খোলের মতো মনে হতো। হাইস্কুলে উঠে নামের অনাবশ্যক ঝালর কাটছাঁট করে তার গোলাকার মুখের টগবগে চেহারার সঙ্গে মিল রেখে হয়ে গেছে ক্যাথি। নামের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে সদ্যো-ধোয়া চুল এবং ঈষর্ণীয় সুন্দর দাঁত। চেহারায় এমন একটা ভাব এসেছে যেন সে অন্যদের আনন্দ দিতে উদগ্রীব, কিন্তু স্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপনের চেয়ে বেশি আকষর্ণীয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সে হয়ে গেল ক্যাথ। স্পষ্টবাদী এবং নির্যাতন বিরোধী টেক-ব্যাক-দ্য-নাইট জিন্স, ডোরাকাটা শার্ট এবং রাজমিস্ত্রিদের দাগটানা চুড়া-উঁচু হ্যাট পরা অবস্থায় খারাপ দেখাত না ক্যাটকে। ইংল্যান্ডে উড়াল দেওয়ার সময় নামটা আরো ছোট হয়ে গেল, ক্যাট। ক্যাট নামটা উচ্চারণের মধ্যে আছে মিতব্যয়িতা। শুনলে রাস্তার বিড়ালের একটা চিত্রকল্প চলে আসে মনে। নামটা নখের মতো চোঁখাও বটে। বেশ খানিক অস্বাভাবিক এ নামটা। ইংল্যান্ডে অন্যদের নজর কাড়ার জন্য চোখে পড়ার মতো কিছু করতে হয়, বিশেষ করে যারা বাইরে থেকে আসে তাদের বেলায় এ রকম করার দরকার হয়ে থাকে। এ রকম পরিচয়ের মধ্যে নিরাপদে থেকে আশির দশকজুড়ে সে র‌্যাম্বোগিরি করেছে।

     এখনও তার মনে হয়, তার নামের কারণেই তাকে সাক্ষাৎকারে ডাকা হয় এবং চাকরিটাও পেয়ে যায়। একটা নিরীক্ষাধর্মী ম্যাগাজিনে চাকরি পায় সে। এ রকম ম্যাগাজিন সাধারণত সাদা-কালো সমতল মসৃণ উপাদানের উপর ছাপা হতো এক সময়। এ সব ম্যাগাজিনে সাধারণত নাক পর্যন্ত চুল ছড়িয়ে রাখা নারীদের খোলামেলা ক্লোজআপ ছবি শোভা পেত। তাদের একটা নাসারন্ধ্র আরেকটার চেয়ে বেশি উঁচু; ম্যাগাজিনটাকে বলা হতো ‘রেজার্স এজ’। ম্যাগাজিনে আরও থাকত শিল্প হিসেবে দেখা চুলের কেতা, কতিপয় আসল চিত্রকলা, চলচ্চিত্র সম্পর্কিত আলোচনা, খানিকটা স্টারডাস্ট, পোশাক সম্পর্কিত পরিকল্পনার আলমারি এবং পরিকল্পনার মধ্যে থাকা পোশাক, অধিভৌতিক শোলডার-প্যাড—এ সবই। ক্যাট তার কাজ ভালোই বুঝেছিল, একদম হাতে কলমে। কী করলে সফল হওয়া যাবে, শিখে নিয়েছে সে। লেআউট থেকে ডিজাইন, তারপর সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং শেষে কাজের সামগ্রিক বিষয় নিজের আয়ত্বের মধ্যে আনার মাধ্যমে সে উপরে ওঠার সব কায়দা কৌশল রপ্ত করেছে এবং সামনের দিকে এগিয়েছে। সবকিছু যে খুব সহজ ছিল তা নয়, তবে যা যা শিখেছে সেগুলোর গুরুত্ব আছে। সে সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। সামগ্রিক চেহারাটা সৃষ্টি করেছে নিজের ক্ষমতায়। কিছুদিন পর সে সোহোর রাস্তায় হেঁটে কিংবা প্রথম প্রদর্শনীর সময় লবিতে দাঁড়িয়ে নিজের সৃষ্টিকর্মের মূর্ত হয়ে ওঠা দেখেছে, এখানে ওখানে কোনো বিশেষ পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানোর সময় নিজের খণ্ডিত ইমেজগুলোকে এক করে দেখেছে এবং নিজের উষ্ণ হয়ে ওঠা ইচ্ছে-শক্তির প্রকাশকে জলধারার মতো ছড়িয়ে পড়তে দেখেছে। তখন তার অবস্থা স্বয়ং ঈশ্বরের মতো, শুধু ঈশ্বরকেই নিজের নির্ধারিত পথ ছেড়ে এদিক ওদিক বিচরণ করতে হয়নি।

     ততদিনে তার মুখের গোলগাল আদলটা আর নেই। শুধু দাঁতগুলো আগের মতোই রয়ে যায়। উত্তর আমেরিকার দন্তচিকিৎসা সম্পর্কে বলার মতো কিছু ছিল বটে। চুলের অনেকটা চেঁছে ফেলে সে। নিজের মারাত্বক চাহনির ওপরও ঘষামাজার চেষ্টা চালায়, দূরবর্তী বা বিচ্ছিন্ন কর্তৃত্ব প্রকাশী ঘাড়ের কোনো কোনো ভঙ্গিমার অবস্থাও সুন্দরতম করে ফেলে সে। সে বুঝে গিয়েছিল, এমন কিছু করতে হবে যাতে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে, তারা যা জানে না তাও সে জানে। তাদের মনের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে হবে, তারাও এ রকম কিছু জানতে পারে, তারাও এ রকম দক্ষতা, ক্ষমতা এবং যৌনাবেদন সম্পর্কে জানতে পারে। তাহলে তাদের মধ্যে ঈর্ষাও জাগিয়ে দেওয়া যাবে। তবে এজন্য তাদের সামান্য কিছু খরচ করতে হবে—শুধু ম্যাগাজিনের খরচটা। অবশ্য তারা কোনোদিনই যেটা জানতে পারবে না সেটা হলো, এ সব কলাকৌশল রপ্ত করার পেছনে অবদান রয়েছে ক্যামেরার। জমাট আলো, জমাট সময়। ঠিক দৃষ্টকোণটা পেয়ে গেলে যে কোনো মহিলাকেই তার তুলনায় কুৎসিত প্রমাণ করে দিতে পারে ক্যাট। যে কোনো পুরুষকেও পারে। আবার যে কোনো নারী কিংবা পুরুষকে সে সুন্দর চেহারা কিংবা কমপক্ষে আকষর্ণীয় চেহারা দিতে পারে। সবটাই আলোকচিত্র এবং প্রতিমা তৈরির কৌশল। এ কৌশল পুরোই দেখার দৃষ্টি বা বেছে নেওয়ার দৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এটা কখনও টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া যায় না। সর্পচর্মের পেছনে নিজের সামান্য আয়ের যতটাই উড়িয়ে দেওয়া হোক না কেন, কৌশলটা টাকায় কেনা যায় না।

     এত উঁচু মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ‘রেজার্স এজ’ ক্যাটকে খুব কম টাকাই দিত। সে নিজে যে সব জিনিস এই ম্যাগাজিনে এত চমৎকার করে উপস্থাপন করত সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল তার নিজের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। লন্ডনের সামগ্রিক বিশ্রী অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় তার কাছে বিরক্তিকর হতে শুরু করে। সাহিত্যের আসরগুলোতে বেশি পরিমাণে কানাপে খাওয়ার ওপরও বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে সে, কারণ তাকে মুদিদ্রব্য কেনার জন্য সামান্য কিছু হলেও বাঁচাতে হয়, লাল এবং মেরুন রঙের কার্পেটিং করা মেঝের পানাশালাগুলোর বদ্ধ জায়গায় সিগারেটের আটকে থাকা ধোঁয়াও তাকে ক্লান্ত করে ফেলে; শীতের সময় ঠান্ডায় জমাট হওয়া পাইপ ফেটে যাওয়ার বিষয়টিও দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয় ক্যাট। ম্যাগাজিনগুলোতে ক্লারিসা মেলিসা পেনিলোপদের দেখানো হয় শীতের সময় রাতের বেলা ঠান্ডায় তারা কতটা পুরোপুরি, সম্পূর্ণরূপে এবং আক্ষরিক অর্থেই জমে যাচ্ছে এবং অন্য সময় তারা কতটা পুরোপুরি, সম্পূর্ণরূপে এবং আক্ষরিক অর্থেই ঠান্ডা থেকে মুক্ত। কিন্তু ক্যাটের মনে হয়, ঠান্ডা সব সময়ই আছে; পাইপ সব সময়ই ফেটে যাচ্ছে। তবে কেউই সঠিক পাইপ বসানোর কথাটা ভাবছে না, যেগুলো সামনের বারে আর ফাটবে না। ইংরেজদের আরো সব ঐতিহ্যের মতো পাইপ ফেটে যাওয়াও একটা ঐতিহ্য। 

     যেমন বলা যায় ইংরেজ পুরুষ সম্পর্কে : মিষ্ট স্বরবর্ণের উচ্চারণ এবং চটুল শব্দবাহুল্যের যাদুতে কোনো নারীর নিকার্জ খুলে ফেলতে পারে। কিন্তু খোলা হয়ে গেলেই সে আতঙ্কে ডুবে যাবে এবং দৌড়ে পালাবে। কিংবা না পালালেও ক্রমাগত প্যানপ্যান করবে। ইংরেজরা ঘ্যানঘ্যান করাকেই বলে প্যানপ্যান করা। আসলে এটাই ভালো। ক্যাঁচক্যাঁচ করা দরজার কব্জার মতো। ইংরেজ ঐতিহ্য অনুযায়ী কোনো নারীর কাছে কোনো ইংরেজ পুরুষের এ রকম প্যানপ্যানানি নাকি নারীর জন্য প্রশংসা পাওয়ার সামিল। এ রকম প্যানপ্যানারি মাধ্যমে ইংরেজ পুরুষ বুঝিয়ে থাকে, তার সামনের নারীকে সে বিশ্বাস করছে, তার আসল সত্তা চিনে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে নারীকে। মানে তার ভেতরের সত্তা, মানে এই প্যানপ্যানানির উৎস যে সত্তা, সেটাকে। ইংরেজ পুরুষরা নারীদেরকে গোপনে এভাবেই দেখে থাকে, মানে নারীরা হলো পুরুষদের প্যানপ্যানানি জমা রাখার গোপন পাত্র। ক্যাট পুরুষের এ রকম প্যানপ্যানানি মজা হিসেবে নিয়েছে; কিন্তু সত্যি সত্যি পছন্দ করেনি।

     ইংরেজ নারীদের চেয়ে একটা বড় সুবিধাও পেয়েছে ক্যাট : সে কোনো বিশেষ শ্রেণিভুক্ত হয়নি। কোনো শ্রেণির পরিচয়বাহী নয় সে। সব শ্রেণি এড়িয়ে একদম নিজের মতো চলেছে সে। তার নিজের ব্যক্তিগত শ্রেণিটাই তার পরিচয়। সে সব ধরনের ইংরেজ পুরুষের আশপাশে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়াতে পেরেছে; কারণ সে বুঝতে পেরেছে, শ্রেণি শনাক্ত করার কোনো মানদণ্ড নিয়ে কেউ তাকে মেপে দেখছে না; তারা পেছনের পকেটে শ্বাসাঘাত শনাক্ত করার যে যন্ত্র নিয়ে ঘোরে সেটা দিযে তার উচ্চারণভঙ্গি মেপে দেখার চেষ্টাও কেউ করছে না। ইংরেজদের পাতি-হামবড়া ভাব এবং মনের গভীরে অন্যদের প্রতি অশুভ ইচ্ছা তাদের অন্তরের সমৃদ্ধি যোগায়—নিজেকে তাদের সে রকম কোনো মানসিকতার অধীন মনে করেনি ক্যাট। তবে তার স্বাধীনতার উল্টো পিঠ হলো, সে ইউরোপীয়দের বাইরের মানুষ, একজন উপনিবেশি— বেশ নতুন, বেশখানিক প্রাণবন্ত, অনেকখানি অনামী এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে কোনো পরিণতির কথাই ভাবতে হয়নি ইউরোপীয়দের। দেয়ালের ফুটোর মতো তার কাছে সব গোপনকথা অবলীলায় বলা গেছে এবং শেষমেষ তাকে ত্যাগ করার সময় তাদের মনে কোনো অপরাধবোধ জাগেনি।

     অবশ্য ক্যাট বেশি মাত্রায় স্মার্ট থাকার চেষ্টাই করেছে। ইংরেজ পুরুষরা খুব প্রতিযোগিতাপরায়ণ। তারা সব সময় জিততে চায়। তাদের এ রকম মানসিকতায় ক্যাট বেশ কয়েকবার আহতবোধ করেছে। দু’বার তাকে গর্ভপাত করতে হয়েছে; কারণ সংশ্লিষ্ট পুরুষকে বিকল্প পথে আনার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাকে জোর দিয়ে বলতেই হয়েছে, সে কোনোভাবেই সন্তান চায় না; বাচ্চা ইঁদুর পোষার জন্য ধেড়ে ইঁদুর কিনতে হবে, মানে শিশু সন্তান পালনের জন্য বড় কাউকে পাশে দরকার হবে। ক্যাটের মনে হয়, তার জীবনটা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে; তার অ্যাড্রেনালিন কমে যাচ্ছে। শিঘ্রই তার বয়স ত্রিশ হয়ে যাবে। সামনে একই অবস্থার পুনরাবৃত্তিই দেখতে পায় ক্যাট।

     এ রকম সময়েই তার জীবনে আসে জেরাল্ড। ক্যাটের চেহারা সম্পর্কে জেরাল্ড বলে বসল, তুমি তো দেখতে চরম। তার কাছ থেকে এ রকম একটা মন্তব্য স্বাভাবিকই মনে করে ক্যাট। অবশ্য ক্যাট জানত, চরম কথাটা সেই পঞ্চাশের দশকের চুলের কদমছাঁট স্টাইলের সঙ্গে কবেই পুরনো হয়ে গেছে। সে সময় জেরাল্ডের সমতল ধাতব এবং নাকি সুরের কণ্ঠটার জন্যই তার কাছ থেকে এমন মন্তব্য শুনতে অস্বাভাবিক লাগেনি ক্যাটের। কণ্ঠের মধ্যে কোনোরকম নাটকীয়তা নেই, বরং গ্রেট লেকের ছোঁয়া নিয়ে র ধ্বনির ওপরে জোর দেওয়া হয়েছে চরম কথাটায়। জেরাল্ডের কণ্ঠে উচ্চারিত এই শব্দটা ক্যাটের নিজের এলাকার লোকদের কথা বলার ভঙ্গির মতোই নিরেট এবং স্বাভাবিকই শোনায়। তখন হঠাৎ করেই ক্যাটের মনে হয়, সে তো এখানে নির্বাসিত।

     জেরাল্ড মনে হয় শত্রুপক্ষের তথ্য কিংবা প্রতিভাসন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, নতুন কাউকে সংগ্রহ করার তালে ছিল। ততদিনে ক্যাট সম্পর্কে সে অনেক কিছু শুনেছে, তার কাজ দেখেছে, তাকে খুঁজেছে পর্যন্ত। সে জানায়, টরন্টোতে একটা বড় কম্পানি একটা ফ্যাশন ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে যাচ্ছে। উঁচু মানের হবে, কাভারেজ থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। তবে কানাডিয়ান ফ্যাশনের উপাদানও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আর যে সব আইটেমের কথা উল্লেখ থাকবে সেগুলো যে সব স্টোরে পাওয়া যাবে সেগুলোরও তালিকা দেওয়া থাকবে। কোনো কোনো আমেরিকান ম্যাগাজিনের লোকেরা যেমন মনে করে থাকে গুচি শুধু নিউইয়র্ক কিংবা লস এঞ্জেলেসে পাওয়া যায়; এ প্রসঙ্গে নতুন ম্যাগাজিনটার কর্ণধাররা ধারণা করছেন, তাদের সামনে প্রতিযোগিতা থাকবে। আরে, সময় বদলে গেছে না! গুচি এখন এডমন্টনে পাওয়া যায়। খুঁজলে তুমি উইনিপেগেও পাবে।

     ক্যাট অনেক দিন বাইরে থেকেছে। এখন তাহলে কানাডার নিজস্ব ফ্যাশনও চালু হয়ে গেছে! ইংরেজি সরস বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্যে হয়তো বলা হবে, কানাডিয়ান ফ্যাশন হলো আপাত স্ববিরোধী একটা বিষয়। সেদিকে না গিয়ে ক্যাট তার সায়ানাইড-গ্রিন কোভেন্ট গার্ডেন বুটিক লাইটার দিয়ে একটা সিগারেটে আগুন ধরাল যেমনটা ‘রেজার্স এজ’র মে সংখ্যায় কাভারেজ দেওয়া হয়েছে। সিগারেট জ্বালিয়ে ক্যাট সরাসরি জেরাল্ডের চোখের দিকে তাকাল।

     কণ্ঠে যথেষ্ট ভারসাম্য বজায় রেখে ক্যাট বলল, লন্ডনের অনেক কিছু বাদ দিতে হবে। কথাগুলো বলেই সে সি-মি-হেয়ার মেফেয়ার রেস্তোরাঁর চারদিকে দৃষ্টি ফেলল; ওখানেই তারা দুপুরের খাবার খাচ্ছিল, খাওয়া তখন প্রায় শেষের দিকে। ওই রেস্তোরাটা বেছে নিয়েছিল ক্যাট নিজেই। কারণ সে জানত, বিলটা দেবে জেরাল্ড। নইলে সে নিজে কখনও খাবারের জন্য এত টাকা খরচ করার পক্ষপাতি ছিল না। সে বলল, আমি খাবো কোথায়?

     জেরাল্ড তাকে ভরসা দিয়ে বলল, টরন্টো তো এখন কানাডার রেস্তোরা-শহর। সে নিজে ক্যাটের গাইড হতে পারলে খুশিই হবে। ওখানে সুপরিসর চায়নাটাউন আছে, বিশ্বমানের ইতালিটাউন আছে। এই বলে জেরাল্ড একটু থামল। একটু দম ফেলে বলল, আমি আসলে তোমার নাম সম্পর্কে আরেকটু পরিষ্কার জানতে চাচ্ছি: ক্যাট মানে কি ক্রেজির ভেতরকার ক্যাট? জেরাল্ড মনে করল, তার কথার মধ্যে খানিক ইঙ্গিত পাঠানো গেছে।

     ক্যাট আগেও এ রকম শুনেছে। ক্যাট বলল, না। আমার নামের ক্যাট হলো কিটক্যাটের ক্যাট। কিটক্যাট একটা চকলেট বার, মুখে দিলেই গলে যায়। কথাগুলো বলার সঙ্গে জেরাল্ডের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সে মুখের একটা প্যাঁচ খেলানো ভঙ্গিমা দেখাল।

     জেরাল্ড বেশ উত্তেজনার ধাঁধায় পড়ে গেল। অবশ্য নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আবার জানাল, ক্যাটকে তারা চায়, ক্যাটকে তাদের দরকার, ক্যাটকে তাদের পছন্দ। আপেক্ষিকভাবে বললে, তার মধ্যে নতুনত্ব আছে, সতেজতা আছে, আবার তার অভিজ্ঞতাও আছে। সব মিলিয়ে তার সার্বিক যোগ্যতার জন্য তারা বড় অঙ্কের টাকা অফার করতে রাজী। তবে টাকা ছাড়াও অন্যান্য পারিতোষিকও আছে। তাদের ফ্যাশনের প্রাথমিক ধারণার মধ্যে প্রাধান্য দেওয়া হবে ক্যাটকে, তার নিজের সৃষ্টিশীল প্রভাব বজায় থাকবে সবার ওপরে, তার নিজের স্বাধীনতারও অবাধ বিস্তার থাকবে। জেরাল্ড টাকার একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাট শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থায় পড়ে যাচ্ছিল প্রায়, সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল। এখন নিজের বাসনার সঙ্গে প্রতারণা করার চেয়ে বেশি কিছু তার রপ্ত করা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। 

     সুতরাং ক্যাট ফিরতি যাত্রা শুরু করল। তিন মাসের সাংস্কৃতিক অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করল, বিশ্বমানের ইতালিটাউন এবং চায়নাটাউনের কত কিছুর স্বাদ নিতে লাগল। প্রথম সুযোগেই জেরাল্ডকে তার জুনিয়র ভাইস-প্রেসিডেনসিয়াল অফিসেই পটিয়ে ফেলল। এ রকম একটা জায়গায় জেরাল্ড এই প্রথম পটে গেল কিংবা বলা যায় জীবনে প্রথম কারো সঙ্গে এভাবে এতটা ঘনিষ্ঠ হলো। ঘণ্টাখানেক লাগলেও বিপদটা তাকে উন্মত্ত করে ফেলল। দুঃসাহসের বিষয়টিই ছিল পরিকল্পনার মধ্যে। জেরাল্ডের বউয়ের বাগদানের সময় তোলা রূপালি ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার একদম সামনে সুপরিচিত কাঁচুলি পরা ক্যাট বোর্ডলুম কার্পেটের ওপরে হাঁটু মুড়ে যখন জেরাল্ডের পোশাক খুলে দিচ্ছে তখন জেরাল্ড ক্যাটের দেহভঙ্গির মিল দেখতে পায় রবিবারের ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর পাতায় দেখা নারীদের অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপনের দৃশ্যমান চিত্রকল্পের সঙ্গে। জেরাল্ডের ডেস্কের ওপরে সেট করা একটা অসম্ভব বলপয়েন্ট কলমের অসম্ভব উপস্থিতির পূর্ণতা দিচ্ছে তার বউয়ের বাঁধানো ছবিটা। জেরাল্ডের শরীর মন এতটাই টানটান হয়ে উঠেছে যে, বাধ্য হয়ে আঙুল থেকে বিয়ের আংটিটা খুলে সযত্নে ছাইদানীতে রাখে। পরের দিন জেরাল্ড ক্যাটের জন্য এক বক্স ডেভিড উড ফুড শপের চকলেট ট্রাফলস নিয়ে আসে। নিজেদের গুণাগুণ সম্পর্কে ক্যাট যেন চিন্তিত না হয়, সে লক্ষ্যে জেরাল্ড জানায়, তাদের জুটি সবার চেয়ে সুন্দর। জেরাল্ডের ইঙ্গিত ক্যাটের কাছে মামুলি মনে হয়, অবশ্য এক ধরনের মিষ্ট-শান্তও মনে হয়। মামুলিত্ব, শান্ততা এবং ক্যাটকে খুশি করার তাড়না—এগুলোর সমষ্টিই হলো জেরাল্ড।

     জেরাল্ডের মতো মানুষকে লন্ডনে পেলে তাকে নিয়ে মাথা ঘামানোর গরজই দেখাত না ক্যাট। তার মধ্যে কোনো মজা নেই, তার মধ্যে অভিজ্ঞতার কিছু নেই, তার মধ্যে কোনো বাচনিক আকর্ষণ নেই। তবে তার মধ্যে ব্যাকুলতা আছে, তাকে সহজে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সে আসলে এক টুকরো সাদা কাগজ। বয়সে সে ক্যাটের চেয়ে আট বছরের বড় হলেও ক্যাটের মনে হয়, সে ছোট। নিজের দুষ্ট কাজকর্মের মধ্যে খুঁজে পায় গোপন বালসুলভ আনন্দ। জেরাল্ড ক্যাটের প্রতি প্রচণ্ড কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছে। বিছানায় সাধারণত যতটা বলা যায়, কিংবা বলার দরকার হয় তার চেয়ে বেশি বেশি ঘনঘন বলেছে সে, জানো, আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না, আমাদের মাঝে এসব হচ্ছে। জেরাল্ডের বউয়ের সামনাসামনি বহুবার হয়েছে ক্যাট, এখনও হচ্ছে। কম্পানির অনেক বিরক্তিকর মিটিংয়ে দেখা হয়েছে তার সঙ্গে। জেরাল্ডের বউয়ের কাছ থেকে তার সম্পর্কে যা যা শুনেছে তাতে তার কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বুঝেছে। মহিলার নাম চেরিল, স্বভাবে বেশ বাতিকগ্রস্ত এবং অস্থির। তার চুল দেখে ক্যাটের মনে হয়েছে, সে এখনও বড় বড় রোলার এবং এমবাম-ইউর-হেয়ারডু স্প্রে ব্যবহার করে। তার মনটা লরা অ্যাশলের রুম-বাই-রুম ওয়ালপেপারের মতো : সোজা সারিতে সাজিয়ে রাখা প্যাস্টেল-কুঁড়ির মতো ক্ষুদ্র এবং আবৃত। জেরাল্ডের সঙ্গে মিলনের সময় মহিলা হয়তো রাবারের দস্তানা পরে এবং কাজ শেষে একটা তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়; এটাও তার বিশৃঙ্খল বাড়ির কাজের অন্যতম। ক্যাটের দিকে তার তাকানোর ভঙ্গিতে মনে হয়েছে, সে ক্যাটের গায়ে বায়ু ডিওডোরাইজার ছিটিয়ে দেবে। প্রতিষেধক হিসেবে ক্যাট চেরিলের বাথরুমের চিত্র কল্পনা করেছে: নিশ্চয় তার বাথরুমের তোয়ালের ওপরে পদ্মফুলের নকশা করা আছে, তার টয়লেট সিটের ওপরে আছে ঝাঁপসা কাভার।

     ম্যাগাজিনটার যাত্রাও চমক তৈরির মাধ্যমে শুরু হয়। দু’হাতে দেদারসে ওড়ানোর মতো টাকা পেয়েছে, রং নিয়ে কাজ করার মধ্যে মজার চ্যালেঞ্জও পেয়েছে ক্যাট; কিন্তু জেরাল্ড যে স্বাধীনতার প্রতিজ্ঞা করেছিল সেটা পুরোপুরি পায় না ক্যাট। কম্পানির পরিচালকদের বোর্ডের সঙ্গে তাকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। তারা সবাই পুরুষ, সবাই হিসাবরক্ষণ কর্মকতা, নিজেদের মধ্যেও তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিচয় নেই, সবাই অতিমাত্রায় সতর্ক এবং পাথরের মতো প্রচণ্ড রকমের ধীর। 

নিজের মতামত জানাতে ক্যাট বলে, ব্যাপারটা খুব সরল সোজা। আপনারা মানুষকে চমকে দেবেন? কেমন করে? তাদের যেমন হওয়া উচিত কিন্ত হয়নি তেমন একটা ইমেজ হাজির করতে হবে তাদের সামনে। তাদের বর্তমান অবস্থাটা তাদের কাছে বিরক্তিকর এবং নিরানন্দের বলে তুলে ধরতে হবে। আপনারা কাজ করছেন বাস্তবতা এবং ধারণার মাঝের শূন্যস্থান নিয়ে। সেজন্যই নতুন কিছু দিয়ে তাদের চমকে দিতে হবে। যেটা তারা আগে দেখেনি। তাদের যে অবস্থাটা সম্পর্কে তারা আগে জানত না। সবচেয়ে বেশি বিকোয় অনিশ্চয়তা।

     অন্যদিকে পরিচালকদের মতামত হলো, পাঠকদের আগে থেকে যা যা আছে সেগুলোই তুলে ধরতে হবে এই ম্যাগাজিনে। আরও বেশি পশমের ফ্যাশনের খোঁজ, আরো বেশি জাঁকালো চামড়াজাত এবং কাশ্মিরী ফ্যাশন পণ্যের খবর দিতে হবে পাঠকদের। আরও আরও প্রতিষ্ঠিত নাম আনতে হবে তাদের ম্যাগাজিনে। উন্নত আকারে উপস্থাপনের কিংবা কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়ার ধারণাই তাদের নেই। পাঠক-রুচি নিয়ে কোনো রকম খেলার প্রবৃত্তিই তাদের নেই; নতুন কোনো বিষয় পরীক্ষামূলকভাবে পাঠকের ওপর চাপানোর মতো সাহস তাদের নেই।

     পরিচালকদের পুরুষ হরমোনের ওপর আকর্ষণ তৈরি করার লক্ষ্যে ক্যাট বলল, ফ্যাশন তো শিকার ধরার মতো। অবশ্য ক্যাটের সন্দেহ হয়, এদের ওই জিনিস আদৌ আছে কি-না। সে আরও বলতে থাকে, ফ্যাশন তো খেলা, ফ্যাশনের মধ্যে থাকে তীব্রতা; ফ্যাশন শিকার ধরার তালে ওঁৎ পেতে থাকে। ফ্যাশন হলো রক্ত এবং নাড়িভুঁড়ি। ফ্যাশনের মধ্যে থাকে যৌন সুঁড়সুড়ি।

কিন্তু তাদের কাছে ফ্যাশন হলো উন্নত রুচির বিষয়। তাদের চাওয়া হলো ড্রেস-ফর-সাকসেস। অন্যদিকে ক্যাটের পছন্দ হলো অল্প দূর থেকে মারার মতো স্ক্যাটারগান।

     সবকিছু দেখা যায়, আপসের দিকে চলে যাচ্ছে। ক্যাট মনে করে, ম্যাগজিনটার নাম হবে ‘অল দ্য রেইজ’। কিন্তু ‘রেইজ’ কথাটার মধ্যে ক্ষোভের আগুন দেখতে পেয়ে পরিচালকদের বোর্ড যায় নিভে। তাদের মতে এ রকম নাম অতিমাত্রায় নারীবাদী। ক্যাট যুক্তি দেখায়, এ নামের মধ্যে চল্লিশের দশকের ছোঁয়া আছে। আপনারা জনেন না, চল্লিশের দশকের অনেক কিছু আবার ফিরে এসেছে? না, তারা এমন কিছু শোনেননি। তারা মাগাজিনর নাম রাখতে চান ‘অর’, স্বর্নের ফরাসি রূপ। ফ্যাশন ম্যাগাজিনের মূল্যবোধের দিক থেকে নামটা হবে সহজে চোখে পড়ার মতো। তবে ক্যাট যেমন বলেছে তেমন কুৎসিত হবে না। এটা ওটা বলতে বলতে কাটছাঁট করতে করতে তারা থিতু হয় ‘ফেলিস’ নামটাতে। এ নামটাতে উভয় পক্ষেরই কিছু কিছু গুণ বজায় থাকবে। অস্পষ্ট হলেও খানিক ফরাসি ঘেঁষা নামটা। নামটার অর্থ হলো ‘সুখি’; মানে ‘রেইজ’ নামটার চেয়ে অনেক নরম, নমনীয় এবং এ নামের মধ্যে অতটা তর্জন-গর্জন নেই। অবশ্য অন্যরা যে এ সূক্ষ্ম বিষয়টা ধরতে পারবে তেমনটা আশা করাও যায় না। কারণ ক্যাট যেমন ভেবেছে তাতে এ নামের মধ্যে বিড়ালজাতীয় প্রাণির মতো করে সাজানো ফুলের তোড়ার চিত্রকল্প আসে এবং সেটা ফিতাসদৃশ চিত্রকল্পটাকে নস্যাৎ করে দেয়। হট-পিঙ্ক লিপস্টিক-স্ক্রল ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা তার আছে। সে অভিজ্ঞতা থেকে ক্যাট বুঝতে পেরেছে, সেটা তার জন্য কিছুটা সহায়ক। সেটা চালিয়ে নেওয়ার মতো হলেও সেটাই তার প্রথম পছন্দ ছিল, তা নয়।

     পরিচালকদের সঙ্গে তার এ রকম লড়াই চলতেই লাগল: ডিজাইনে কোনো রকম নতুনত্ব আনতে গেলে, ক্যাট নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে গেলে কিংবা নিরাপদ কোনো পাঁক তৈরি করতে গেলে লড়াই বেধে যেতে লাগল। একবার বেশ বড়সড়ো হৈচৈ বেধে গেল খানিকটা টেনে তোলা নারীদের অন্তর্বাস ছড়িয়ে রাখা নিয়ে এবং মেঝের ওপরে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাচের সুগন্ধি বোতল নিয়ে। মোজাপরা নব্য ধনীর দুটো পা নিয়ে আরেকবার আরো জোরের কোলাহল হলো। আরেকটা ভিন্ন রঙের মোজা দিয়ে চেয়ারের পায়ের সঙ্গে বাধা ছিল একটা পা। আরেকটা ঘাড়ের সঙ্গে চামড়ার তৈরি তিন শ’ ডলারের দস্তানা কেন বেখপ্পাভাবে লাগিয়ে রাখা হয়েছে তা বুঝতে পারেননি তারা।

     ক্যাটের আরও পাঁচ বছর কাটল এ রকম লড়াইয়ের মধ্যেই।

     জেরাল্ড চলে যাওয়ার পর ক্যাট রুমের ভেতর পায়চারি করতে থাকে। অনেকক্ষণ চলে তার পায়চারি। তার অপারেশনের জায়গার সেলাইয়ে টান ধরছে। মাইক্রোওয়েভে থেকে যাওয়া খাবার দিয়ে ডিনার করার কথাটা আর ভাবছে না সে। ক্যাট ভেবে পাচ্ছে না, এই দূষিত দ্বীপ-সমুদ্রের পাশের এই ফ্ল্যাটের নগরীতে কেন এসেছে। জেরাল্ডের কারণে এসেছিল নাকি? হাস্যকর প্রশ্ন, তবে একদমই অবান্তর নয়। জেরাল্ডের প্রতি তার অধৈর্য বেড়েই যাচ্ছে, তবু কি তার জন্যই ক্যাট এখানে রয়ে গেছে? জেরাল্ড আর পুরোপুরি পাওয়ার মতো নয়। দুজনই একে অন্যকে খুব বেশি জেনে ফেলেছে বলে এখন তারা সংক্ষিপ্ত চলার পথ ধরেছে। একসঙ্গে লুকোচুরির মধ্যে ইন্দ্রিয়সুখে কাটানো পুরো বিকেল এখন সঙ্কুচিত হয়ে গেছে কাজের সময় আর ডিনারের সময়ের মাঝের মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। ক্যাট এখন আর বুঝতে পরে না, সে জেরাল্ডের কাছ থেকে কী চায়। নিজেকে বোঝায় সে, তার মূল্য আগের চেয়ে কমেনি। তার এখন জেরাল্ডের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু কেন যেন সে অন্য পুরুষের খোঁজ করে না। দু’একবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কাজে লাগেনি চেষ্টা। গে ডিজাইনারদের কারো কারো সঙ্গে দুএকবার ডিনারে কিংবা সিনেমায় গেছে। লোকজনের মুখের রটনা তার ভালোই লাগে। 

     হতে পারে, সে লন্ডন শহরকে মিস করছে; এই দেশে, এই নগরে, এই রুমে নিজেকে বন্দি মনে হয়। তার রুম দিয়েই শুরু করতে পারত, একটা নতুন জানালা খুলে দিতে পারত। এখানে বড্ড দম বন্ধ মনে হয়। হেয়ারবলের বোতল থেকে ফরমালডিহাইডের একটা চাপা স্বর ভেসে আসে। অপারেশনের সময় উপহার হিসেবে পাওয়া ফুলগুলোর বেশিরভাগই নেতিয়ে পড়েছে। শুধু আজকে পাওয়া জেরাল্ডের ফুলগুলো তাজা আছে। আচ্ছা, তাহলে জেরাল্ড তাকে হাপাতালে থাকতে ফুল পাঠায়নি কেন! সে কি ভুলে গিয়েছিল? নাকি এটা কোনো বার্তা পাঠানোর মতো কাজ করেছে সে?

     ক্যাট বলে, হেয়ারবল, তুই কথা বলতে পারলে ভালো হতো। এখানের এই তুর্কি মোরগের খামারের পরাজিতদের সাথে কথা বলার চেয়ে তোর সাথে কথা বলা অনেক বুদ্ধিদীপ্ত হতো।

     আলোর নিচে হেয়ারবলের বাচ্চা দাঁত চকচক করে। দেখে মনে হয়, হেয়ারবল সত্যিই কথা বলতে চায়।

     ক্যাট কপালে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, তার গায়ে তাপ আছে কি-না। তার পেছনে কীসের যেন অশুভ উপস্থিতি টের পায় সে। ম্যাগাজিনের লোকদের কাছ থেকে তেমন একটা ফোন কল পায়নি গত কয়েকদিন। তারা নিজেদের মতো আবোল তাবোল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তাকে ছাড়াই। বিষয়টা তার ভালো মনে হয় না। ক্ষমতায় থাকা রাণীর ছুটিতে যাওয়া উচত নয়, কিংবা অপরেশনও করানো উচিত নয়। এ রকম দায়িত্বে থাকা মানুষের মাথায় সব সময় অস্বস্তি থাকে। এসব বোঝার মতো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে ক্যাটের, অনেক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অভিজ্ঞতা তার আছে, এসব ইঙ্গিত বুঝতে পারে সে। বিশ্বাসঘাতকতার পদধ্বনি দূর থেকে শুনে বুঝে ফেলার মতো অ্যানটেনা আছে তার।

     পরদিন সকালে বেশ জোর করেই উঠে পড়ে, মিনি মেশিন থেকে এসপ্রেসো পান করে, আক্রমণাত্বক চেহারার বর্ম-ধূসর টাচ-মি-ইফ-ইউ-ডেয়ার সুয়েড আউটফিট পরে নিয়ে কোনো রকমে টলতে টলতে অফিসে পৌঁছে যায়। অবশ্য আগামী সপ্তাহের আগে তার অফিসে আসার কথা নয়। বিস্ময়কর উপস্থিতি। করিডোরময় ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়ে। সবার সামনে দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় তাকে নকল হাসিতে স্বাগত জানায় তারা। তার মিনিমালিস্ট ডেস্কে বসে নিয়ে মেইল চেক করে। ব্যথায় মাথা টনটন করছে। সেলাইয়ের জায়গাটাতেও ব্যথা করছে। তার আসার খবর পেয়েছে জের। সে যতটা সম্ভব দ্রুত দেখা করতে চায় ক্যাটের সঙ্গে। তবে নিশ্চয় তার সঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য নয়। তার নতুন সাজানো হোয়াইট-অন-হোয়াইট অফিসরুমে ক্যাটের সঙ্গে দেখা করে জের। এখানকার আঠরো শতকের ডেস্ক এক সময় তারা দুজন এক সঙ্গে পছন্দ করে এনেছিল, ভিক্টরীয় ইন্কস্ট্যান্ড, মেরুন লেদারের হাত, মুক্তোয় মোড়ানো কব্জি, রুমালের মতো করে পেঁচিয়ে রাখা হারমিসের স্কার্ফ, তার নিচে মডেলের ফুটন্ত আনন্দদায়ক মুখ—ক্যাটের পছন্দের এ রকম আরও বেশ কিছু জিনিস দেখতে পায় এই রুমে। গলা-খোলা লিক-মাই-নেক সিল্কের শাট এবং ইট-ইউর-হার্ট-আউট ঢিলা করে বোনা ইতালীয় সিল্ক-অ্যান্ড-উল সোয়েটারে জের নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়েছে। বাহ্ কী চমৎকার নিরাশক্তি! চোখের ভ্রূতে কী দারুণ ভাষা! অর্থলোভী মানুষ হয়ে শিল্পের পেছনে ছোটা মানুষ সে। এখন সে টাকাপয়সা পেয়েছে। নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। শরীরের শিল্পের সন্ধান পেয়েছে সে। ক্যাট তার সেই শিল্প। ক্যাট তার কাজটা ভালোই করেছে। শেষ পর্যন্ত জের যৌনাবেদনময়।

     জের ল্যাকোয়ারের মতো মসৃণ। মসৃণ কণ্ঠে সে ক্যাটকে বলে, আগামী সপ্তাহের আগে তোমাকে বিষয়টা জানাতে চাচ্ছি না। কিন্তু এ কথা বলার মাধ্যমে সে খবরটা জানিয়ে দিল ক্যাটকে। সিদ্ধান্তটা নিয়েছে পরিচালনা পরিষদ। তারা মনে করেছেন, ক্যাট বড় অদ্ভুত স্বভাবের, সে বেশি অগ্রসর। স্বাভাবিক চেষ্টা করার পরও জের ক্যাটের জন্য কিছুই করতে পারেনি।

     স্বাভাবিক প্রতারণা। দানব তার সৃষ্টিকর্তা পাগলা বিজ্ঞানীর ওপরই চড়াও হয়েছে। ক্যাট চিৎকার করে বলতে চায়, আমিই তোমাকে জীবন দিয়েছিলাম।

     তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়, ভালো করে দাঁড়াতে পারছে না। জের তাকে চেয়ারে বসার কথা বললেও সে দাঁড়িয়েই থাকে। এতদিন জেরাল্ডের মধ্যে যা দেখতে চেয়েছে, কিন্তু দেখতে পায়নি আজ তা-ই দেখতে পাচ্ছে ক্যাট। জেরাল্ড হলো ফ্যাশনহীন পরিবর্তনহীন মারাত্বক রকমের কিপ্টে লোক। এই লোকটা জের নয়, ক্যাট নিজের ইমেজ দিয়ে যে লোকটাকে বানিয়েছে এ সে নয়। ক্যাটের সঙ্গে জড়ানোর আগেকার লোকটা এই। এই জেরাল্ডের পরিবার আছে, সন্তান আছে, তার বউয়ের রূপালি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি লটকানো আছে তার ডেস্কের ওপরে। ক্যাটও ওইরকম একটা ফ্রেমে থাকতে চায়, তারও সন্তান পাওয়ার ইচ্ছে। কিন্তু তার কাছ থেকে এসব ইচ্ছের অধিকার হরণ করা হয়েছে।

     তাহলে আমার জায়গায় কাকে পেলে? কার সেই বিরাট সৌভাগ্য? ক্যাটের প্রচণ্ড সিগারেট-তেষ্টা পাচ্ছে। কিন্তু হাত বাড়ালে তার হাতের কাঁপন দেখে ফেলতে পারে জেরাল্ড।

বিনয় প্রকাশের চেষ্টা করে জেরাল্ড বলে, আসলে তোমার জায়গাতে আমি নিজেই এসেছি।

পুরোপুরি অর্থহীন একটা কাজ হয়েছে। একটা ফোন বুক পর্যন্ত সম্পাদনা করার ক্ষমতা নেই তার। ক্যাট ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করে, তুমি? এ রকম অবস্থায় যে হেসে ওঠা যায় না, সে বোধটুকু আছে ক্যাটের।

     জেরাল্ড বলে, অনেক বিষয়েই আমি শুধু টাকা পয়সার দিকটাতে আটকে থাকতে চাইনি, সৃষ্টিশীল জগতে আসতে চেয়েছি। আশা করি, তুমি বুঝতে পারবে। কারণ নিজে কিছুতেই এ রকম হতে পারো না। আমি জানি, তুমি এমন কাউকে চাও যে তোমার ভিত্তির ওপর নির্ভর করে বেড়ে উঠবে।

     বেকুবের বাচ্চা বেকুব! তার ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে ক্যাট। তাকে পেতে ইচ্ছে করে ক্যাটের। এই ইচ্ছেটার জন্য নিজের ওপর ঘৃণা চলে আসে। তবু সে অসহায়।

     রুমটা দুলতে থকে। গমের মতো রঙের কার্পেট পার হয়ে আস্তে আস্তে ক্যাটের দিকে এগোয় জেরাল্ড। ক্যাটের ধূসর রঙের সোয়েড কাপড়পরা বাহু চেপে ধরে, আমি তোমার জন্য ভালো রেফারেন্স লিখে দেবো। এ নিয়ে মোটেও চিন্তা করো না। অবশ্য এখনো দুজনে দেখা-সাক্ষাৎ চালিয়ে যেতে পারি। আমাদের এক সাথে কাটানো বিকেলগুলো খুব মনে পড়বে।

     ক্যাট বলে, অবশ্যই মনে পড়বে। জেরাল্ড খুব জোরালো আবেদনের চুমু দেয় ক্যাটকে। কিংবা বলা যায়, তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে চুমুটা তেমনই মনে হতে পারে। ক্যাট আপত্তি করে না, যাচ্ছে-তাই অবস্থায় শেষ হতে দেয় মাত্র।

    ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। চালক তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে। সে ছেড়ে দেয়। তার অত বেশি শক্তি নেই, কিছু বলবে। মেইলবক্সে একটা ছাপা দাওয়াতপত্র দেখতে পায়: জের এবং চেরিল আগামীকাল সন্ধ্যায় একটা ড্রিঙ্কস পার্টি দিচ্ছে। পাঁচ দিন আগের পোস্টমার্ক দেখতে পায় ক্যাট। চেরিল সর্বশেষ খবরাখবর জানে না।

     ক্যাট পোশাক খুলে ফেলে হালকা গোসল করে নেয়। আশপাশে পান করার মতো কিছু নেই। নাকে টানা কিংবা ধূমপানের মতোও নেই কিছু। কী রকম বেখেয়ালি ঘটনা! সে নিজের সঙ্গেই আটকে আছে। আরও কত কাজ আছে না! আরও কত মানুষ আছে। তাদের কথা ভাবা যেতে পারে। কিংবা প্রচলিত তত্ত্ব সে রকমই। তবু মনে হচ্ছে, তার ভেতর থেকে কী যেন ছিড়ে নেওয়া হয়েছে। তার জীবনে এমনটা ঘটল কী করে? যখন বিরূপ সমালোচনা এসেছে সে সবলে ছুরি চালিয়ে প্রতিহত করেছে। আসন্ন আঘাতের আগমন সময় থাকতেই টের পেয়েছে এবং তার দিকে ধেয়ে আসা অস্ত্র প্রতিহত করে দিয়েছে। হয়তো তার ধার কমে গেছে এখন।

     বাথরুমের আয়নার ভেতর তাকিয়ে থাকে ক্যাট। বাষ্পভরা কাচের ভেতর নিজের মুখটার মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। এ মুখটা আশির দশকের, মুখোশপরা একটা মুখ, ব্যবহারিক ফল এবং মূল্য সিদ্ধির ইমেজ লেগে আছে এই মুখে। দুর্বলদেরকে দেয়ালের দিকে ঠেলে দিয়ে যা পাও দুহাতে নিয়ে নাও। কিন্তু এখন চলছে নব্বইয়ের দশক। সে কি এত তাড়াতাড়ি স্টাইলের বাইরে ছিটকে পড়ে গেল? সবে পয়ত্রিশ বছর চলছে তার। তার পরের দশকের মানুষেরা যা ভাবছে, তার দিশা কি সে এখনই হারিয়ে ফেলেছে? সে রকম হলে তো বিপদেরই কথা। সময় যত গড়াবে তার সঙ্গে তাল মিলানোর জন্য ক্যাটকে ক্রমেই দ্রুততর গতিতে দৌড়তে হবে। কীসের জন্য? জীবনের একটা অংশ তার হতে পারত, কিন্তু সেটা একটা শূন্যস্থানে পড়ে গেছে। পেছনে ফিরে আর পাওয়া যাবে না সেটা। সেটা আসলে এখন আর কিছুই নয়। হৃত অধ্যায় থেকে কী-ই বা উদ্ধার করা যাবে! কী-ই বা নতুন করে করা যাবে কিংবা আদৌ করা যাবে?

     স্পঞ্জবাথ সেরে বাথটাব থেকে উঠে আসার সময় ক্যাট পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নেয়। শরীরে জ্বর চলে এসেছে, সন্দেহ নেই। ভেতরে কী যেন চুইয়ে পড়ছে কিংবা কিছু একটা পচে যাচ্ছে। টপটপ করে পড়া ট্যাপের জলের মতো শব্দ শুনতে পাচ্ছে ক্যাট। তরল গড়িয়ে পড়া ঘা, বেশি চলাচলের কারণে ঘা হয়েছে, তাও হতে পারে। কোনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে এন্টিবায়োটিকস নিতে হবে। কিন্তু সে বসার ঘরে টলতে টলতে খানিক পায়চারি করে, তাক থেকে হেয়ারবলের বোতলটা নামিয়ে এনে কফি টেবিলে রাখে। দু’পা আড়াঅড়ি করে বসে কান পেতে শোনার চেষ্টা করে: মৌমাছির পাখার শব্দের মতো ভনভন শব্দ শুনতে পায়।

     ডাক্তারকে ক্যাট জিজ্ঞেস করেছিল, টিউমারটার গড়ন আসলে বাচ্চা হিসেবেই শুরু হয়েছিল কি না, একটা প্রাণবন্ত ডিম্ব ভুল জায়গায় চলে এসেছে কি না। ডাক্তার বলেছিলেন, না। কেউ কেউ মনে করতেন, জন্মের সময় কিংবা তার আগে থেকে এ রকম টিউমার বীজ আকারে থাকতে পারে। পরবর্তীতে যার গর্ভে পাওয়া যায় এটা তারই যমজ ভাইবোন হয়ে থাকতে পারে। এ টিউমার আসলে কী তা অজানাই থেকে যায়। এ রকম টিউমারের অনেক রকমের টিস্যু থাকে। অবশ্য এসব টিস্যুর কোনো গঠন থাকে না।

     তবু টিউমারটার সামনে বসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ক্যাট এটাকে শিশু হিসেবেই দেখার চেষ্টা করে। মোটের ওপর সিনিসটা তো তার শরীরের ভেতর থেকেই বের হয়েছে। এটা তার শরীরেরই অংশ। জেরাল্ড এবং তার শিশু, থমকে যাওয়া শিশু, তাকে স্বাভাবিকভাবে জন্মাতে দেওয়া হয়নি। তার এই অস্বাভাবিক শিশু যেন প্রতিশোধ নিতে এসেছে।

     ক্যাট বলে ওঠে, হেয়ারবল, তুই এত কুৎসিত। শুধু মা ছাড়া আর কেউ তোকে ভালোবাসতে পারে না। হেয়ারবলের জন্য ক্যাটের খারাপ লাগে। মনে হয়, সে হেরে গেছে, বঞ্চিত হয়েছে। কপোল বেয়ে অশ্রু নামে। শব্দ করে কান্না করা সে পারে না। আর ইদানীং তো আরও পারে না।

     হেয়ারবল তার সঙ্গে কথা বলে, নিঃশব্দে। হেয়ারবলটার বাস্তবতার একটা গঠন আছে, এটা কোনো ইমেজ ধারণ করে না। নিজের সম্পর্কে যে সব কথা ক্যাট কখনও শুনতে চায়নি সেসব কথাই তাকে বলে হেয়ারবল। নিজের সম্পর্কে নতুন জ্ঞান পায় সে: নেতিবাচক, মূল্যবান এবং প্রয়োজনীয় এই জ্ঞান। হেয়ারবল ক্যাটকে কষ্ট দিচ্ছে।

     এবার সে মাথা ঝাঁকায়। নিজেকে বলে, মেঝেয় বসে হেয়ারবলের সাথে কথা বলছো?  এ কী করছ তুমি? তুমি তো অসুস্থ। একটা টাইলেনল খেয়ে শুয়ে পড়ো।

     পরের দিন একটু ভালো লাগে, হালকা লাগে। লেআউট থেকে ডানিয়া ফোন করে। সহানুভূতি জানানোর জন্য ঘুঘু পাখির মতো কুকু শব্দ করে। ডানিয়া জানায়, সে লাঞ্চের সময় ক্যাটের বাসায় আসতে চায় তার দেহনিঃসৃত আভা দেখার জন্য। ক্যাট তাকে নিরুৎসাহিত করে বলে ডানিয়া অভিমান করে বলে, ক্যাটের অতীত জীবনের পাপের কারণেই তার চাকরিটা গেছে। ক্যাট তাকে এসব কথা থামাতে বলে। আরো বলে, সবকিছুর কৈফিয়ত দেওয়ার মতো যথেষ্ট পাপের কাজ করেছে সে।

     ডানিয়া বলে, তোমার ভেতরে এত ঘৃণা পুষে রেখেছ কেন? তার কথার মধ্যে কোনো প্রাসঙ্গিক যুক্তি খুঁজে পায় না ক্যাট। ডানিয়া যেন বিমূঢ় হয়ে জিজ্ঞেস করছে এসব।

     ডানিয়ার প্রশ্নের জবাবে ক্যাট সোজাসাপ্টা বলে, আমি জানি না।

     ডানিয়া ফোন রেখে দেওয়ার পর ক্যাট মেঝেতে পায়চারি করতে থাকে। ভেতরে ভেতরে ভাঙতে থাকে ক্যাট, ব্রয়লারে গরম চর্বির মতো গলতে থাকে। তার মনে এখন চেরিলের প্রসঙ্গটা চলছে। তার আরামদায়ক বাড়িটাতে চেরিল নিশ্চয় পার্টির আয়োজন করতে করতে ব্যস্ত হয়ে চলাফেরা করছে। উদ্দেশ্যহীনভাবে নাড়াচাড়া করছে তার চুল, অতিরিক্ত বোঝাই কোনো ফুলদানী ঠিকমতো কোথাও রাখছে, ক্যাটারারদের সঙ্গে এটাওটা নিয়ে হালকা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। জেরাল্ড বাড়িতে প্রবেশ করে তাকে হালকা চুমু দিচ্ছে—দাম্পত্য সুখের একটা ছবি। জেরাল্ডের বিবেকও চমৎকার ধোয়া তুলসী। ডাইনি মরে গেছে; তার জয় হয়েছে। তার সংক্ষিপ্ত চেষ্টা শেষ। তাতেই সফল হয়েছে সে। এখন জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানোর জন্য প্রস্তুত জেরাল্ড। ট্যাক্সি নিয়ে ক্যাট ডেভিড উড ফুডে যায় এবং দু’ডজন চকলেট ট্রাফল কেনে। বড় একটা বাক্সে ভরে চকলেটগুলো, তারপর ওই বাক্সটা আবার দোকানের লোগো লাগানো একটা বড় ব্যাগে ভরে নেয়। তারপর বাড়ি ফিরে বোতল থেকে হেয়ারবল বের করে আনে। রান্নাঘরের একটা ছাঁকনিতে পরিষ্কার করে নেয় হেয়ারবলটা। এরপর পেপার টাওয়েল দিয়ে জড়িয়ে হালকাটা চাপে আরও শুকাতে থাকে। হেয়ারবলের উপরে কোকোয়ার গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়। ওপরে বাদামী রঙের পেস্টের মতো একটা স্তর তৈরি হয়ে যায়। এখনও হেয়ারবল থেকে ফরমালডিহাইডের গন্ধ পাচ্ছে। সুতরাং সে প্রথমে সারান র‌্যাপ দিয়ে মুড়িয়ে দেয়, তারপর টিনফয়েল দিয়ে এবং শেষে গোলাপী রঙের টিস্যু পোপার দিয়ে মুড়িয়ে ধূসর রঙের গিঁট দিয়ে বেঁধে নেয় হেয়ারবলটা। জিনিসটা সে ডেভিড উডের বাক্সের মধ্যে স্থাপন করে; বাক্সের তলায় ছড়ানো টুকরো টুকরো টিস্যু, চারপাশে গা ঘেঁষে ফেলা থাকে ট্রাফলগুলো। তারপর বাক্সটা বন্ধ করে টেপ দিয়ে বেঁধে ফেলে বড় ব্যাগটার মধ্যে রাখে। উপরে বোঝাই করে দেয় কয়েক টুকরো গোলাপী কাগজ। এই হলো তার উপহার। মূল্যবান এবং বিপজ্জনক। এটাই তার বার্তাবাহক; তবে বার্তাটা এই উপহারের নিজের। যে যা জানতে চাইবে তাকে সঠিক বার্তাটাই জানিয়ে দিবে এই উপহার। সবচেয়ে ভালো হবে প্রথমে জেরাল্ড পেলে। মোটের ওপর এটা তো তারও সন্তান। উপরে একটা কার্ডে ক্যাট লিখে দেয়, দুঃখিত, জেরাল্ড। তোমার সঙ্গে থাকতে পারলাম না। এই হলো সবটুকু ক্ষোভ।

ভালোবাসা নিও, কে।

     সন্ধ্যা নেমে আসছে। পার্টি এতক্ষণে জমে উঠেছে, বুঝতে পেরে ক্যাট একটা ডেলিভারি ট্যাক্সি ডাকে। এ রকম দামী ব্যাগে ভয়ানক কিছু থাকতে পারে তেমন আশঙ্কাই করবে না চেরিল। সবার সামনেই সে এটা খুলবে। প্রত্যেকে দেখতে পাবে। নেমে আসবে দুর্দশা। প্রশ্ন উঠবে সবার মনে। গোপন ফাঁস হয়ে যাবে। বেদনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে। তারপর সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

     ক্যাট ভালো নেই। তার হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। শূন্যতা আরেকবার দুলে উঠছে। তবে জানালার বাইরে তুষার পড়ছে। ছোটবেলায় দেখা নরম, ভেজা ভেজা, বাতাসহীন তুষারের মতো। কোট পরে নিয়ে ক্যাট বাইরে যায়, বেকুবের মতো। এই সামনের মোড় পর্যন্ত হেঁটে যেতে চায় সে। কিন্তু মোড়ে পৌঁছে যাওয়ার পরও এগিয়ে যেতে থাকে। ছোট আঙুলের ছোঁয়ার মতো করে তুষার গলে পড়ে তার কপোলে। ভয়ানক একটা কাজ করে ফেলেছে সে। তবে মনে কোনো অপরাধ-বোধ নেই। হালকা লাগছে, শান্তি লাগছে, মনে হচ্ছে, ভেতরটা ভরে আছে দানের মহানুভবে। এই বোধের আপাতত কোনো নাম নেই। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ