জয় গোস্বামীর সাক্ষাৎকার

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শামীম রেজা
প্রকাশিত : ১১:৪৯, জুলাই ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৬, জুলাই ৩১, ২০২০

কবি শামীম রেজা গত ৩ মে কবি জয় গোস্বামীর সঙ্গে ফেসবুক লাইভে তার লেখক জীবন-সহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সেই আলাপের অংশবিশেষ প্রকাশ করা হলো।শামীম রেজা : শুভ সন্ধ্যা, বন্ধুদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আজকে কথোপকথনে বন্ধুদের সামনে উপস্থিত আছেন, এমন একজন মহান কবি, যিনি বাংলা কবিতার প্রথম সেইজন যিনি একাধারে ধ্রুপদী বা মূল ধারার লেখক-পাঠকদের মন জয় করছেন। অপরদিকে জনপ্রিয় ধারার সাধারণ পাঠকদেরও সমান প্রিয় তিনি। এমন একজন মহান কবি জয় গোস্বামী। আপনাকে এই মহামারীর সময়ে সময় দেওয়ার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

জয় গোস্বামী : আপনাদের নমস্কার এবং শুভেচ্ছা, আমার খুব ভালো লাগছে শামীম আপনার সঙ্গে কথা বলতে পেরে।

 

শামীম রেজা : জ্বী ধন্যবাদ। কবি জয় গোস্বামী কলকাতায় ১৯৫৪ সালের ১০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের প্রথম ভাগ কেটেছে রানাঘাটে। সাহিত্য আকাদেমি ও দুইবার আনন্দ পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন কবিতা ও কাব্য-উপন্যাস লিখে। তিনি মনে করেন, কবিতার জগৎ স্বপ্নের জগৎ নয়। কবিতা কবির বিশাল আত্মজীবনী, এক একটি কবিতা এক একটি আত্মজীবনীর পৃষ্ঠা। অনিচ্ছায় গৃহবন্দি পৃথিবীর অসুস্থ-অস্থির সময়ে প্রিয় কবি কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন?

জয় গোস্বামী : আপনি আমার সম্পর্কে যেসব বিশেষণ প্রয়োগ করলেন সেগুলো ঠিক যোগ্য নয়। আপনাদের ভালোবাসাই আমাকে এই ধরনের বিশেষণে ভূষিত করলো। আমি এখন সময় কাটাচ্ছি প্রধানত বই পড়ে আর আমার পরিচিতদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে, ফোনে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে কিন্তু আমি এই সময়ে কিছু লিখতে পারিনি। আমি অনেক দুঃসময় দেখেছি, যেমন জরুরি অবস্থা দেখেছি, নকশাল আন্দোলনের অবস্থা দেখেছি, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ দেখেছি, যখন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানের আক্রমণ ঘটলো তখন দলে দলে বহু উদ্বাস্তুর চলে আসা দেখেছি, তাদের দুর্দশা দেখেছি, এই কিছুদিন আগে নন্দীগ্রাম-কাণ্ড দেখেছি কিন্তু এরকম অভূতপূর্ব অবস্থা আমি আগে কখনো দেখিনি। যখন শত্রু কে দেখা যাচ্ছে না, তার ভয়ে আমাদের গৃহবন্দি থাকতে থাকতে হচ্ছে। বাইরের কোনো মানুষ আমাদের বাড়ি আসতে পারছেন না কিংবা আমরাও বেরিয়ে যেতে পারছি না।

 

শামীম রেজা : হ্যাঁ, এইটা ১০০ বছর আগে, স্প্যানিশ ফ্লু-এর সময় ঘটেছিল। আবার আপনি তো আমার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, আপনি বলছেন যেমন, এ এক দুর্বিষহ কারাবন্দি অবস্থা, কিন্তু শত্রুকে আমরা দেখতে পাই না। এই যে লিখতে না পারার এই যন্ত্রণা এই বোধ...তো এখন কী পড়ছেন, বলছিলেন যে বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন বা নিজেকে বইয়ের মধ্যে রাখতে পারছেন...

জয় গোস্বামী : বই কিছু কিছু পড়ছি। যেমন একটা নতুন বই পড়তে শুরু করেছি, সেই বইটার নাম হলো On the Shoulder of Giants, (2002) সেটাতে বলা হচ্ছে যে পাঁচজন বিজ্ঞানীর কথা : কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার, আইজ্যাক নিউটন আর আইনস্টাইন। মানে সেই বইটি বলতে চাচ্ছে, যে সেই পাঁচজন দৈত্যের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এখনকার অ্যাস্ট্রো-ফিজিক্স, অ্যাস্ট্রোলজি অনেকদূর দেখতে পাচ্ছে। মানে আমরা যদি কোনো দৈত্যাকার ব্যক্তির কাঁধের উপর উঠে দাঁড়াই তাহলে তো আমরা অনেকটা উঁচু থেকে দেখতে পাই, অনেক দূর দেখতে পাই। এই বইটা সেই কথাই বলতে চাইছে। এ বইটি যিনি লিখেছেন তিনিও একজন দৈত্য সদৃশ্য মানুষ, তার নাম স্টিফেন হকিং। তবে এই বই পড়ার জন্য যে বিদ্যে-বুদ্ধির দরকার তা তো আমার নেই, সেজন্য আমি আমার বিজ্ঞানী বন্ধুদের ফোন করছি ফোন করে তাদের কাছে যে জায়গাটা বুঝতে পারছি না, সেটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছি, এই-ই...

 

শামীম রেজা : আচ্ছা। একটু প্রশ্ন-উত্তর পর্বের মধ্যে যেতে চাই। সেটা, আপনার লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠা নিয়ে। আপনার যখন প্রথম বই কৃষ্ণনগরের বঙ্গ রত্ন মেশিন প্রেসে ছাপা হয়েছিল ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ এবং সহযোগিতা করেছিলেন আপনার এক বন্ধু সুবোধ সরকার, ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে, ১৪৫ টাকা লেগেছিল ছাপতে।

জয় গোস্বামী : হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

 

শামীম রেজা : টাকাটা আপনার নিজের ছিল নাকি প্রকাশক দিয়েছিলেন?

জয় গোস্বামী : টাকাটা আমার মা দিয়েছিলেন…

 

শামীম রেজা : অনেক কৃতজ্ঞতা এবং শ্রদ্ধা জানাচ্ছি মাকে...

জয় গোস্বামী : হ্যাঁ, টাকাটা আমার মা-ই দিয়েছিলেন...

 

শামীম রেজা : আটটি কবিতা এবং বারো পাতার বই। আপনার জীবনের প্রথম কবিতার বইটি কিনেছিলেন সুধীর চৌধুরী, এই নিয়ে আপনার অনুভূতি—সেদিনের আপনি আর আজকের আপনি...রানাঘাট পর্বের স্মৃতি, বিশেষ করে রাজনৈতিক বাবা স্বদেশী আন্দোলনের সেই লড়াকু সৈনিক বাবার স্মৃতি থেকে এই প্রথম বইয়ের ছাপা পর্যন্ত, যদি একটু বলেন...

জয় গোস্বামী : রানাঘাটের স্মৃতি আমার আজীবন মনে থাকবে, মনে থাকে, আমার লেখায় ঘুরে ফিরে আসে। কারণ রানাঘাট আমি, গানে যেমন 'সা', 'সা' থেকে গান শুরু হয় এবং ফিরে ফিরে 'সা' দরকার হয় গানে, তেমনি রানাঘাট ও আমার জীবন 'সা' এর মতো। ঘুরে ঘুরে রানাঘাট, রানাঘাটে গিয়ে জীবন কাটানো আমার মনে পড়ে।

 

শামীম রেজা : আচ্ছা। আমি পরবর্তী প্রশ্ন চলে যাচ্ছি। বাংলা ভাষার প্রধান কবিতার মধ্যে জীবনানন্দকে দেখি একই সময় একদিকে লিখছেন 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' অন্যদিকে 'রূপসী বাংলা'। এই পর্বের পরে দেখছি 'বনলতা সেন' এবং পরবর্তী সময়ে দেখি যে 'মহাপৃথিবী' এবং 'বেলা অবেলা কালবেলা' লিখছেন, মানে চারটা পর্বেই তাকে বিভাজন করতে পারছি। আর আপনাকে বিশেষ করে 'আলেয়ার হৃদ(১৯৮১), 'উন্মাদের পাঠক্রম(১৯৮৬)', 'ভুতুম ভগবান(১৯৮৮)' এর পরপরই পর্ববদল। 'ঘুমিয়েছো, ঝাউপাতা?(১৯৮৯)', 'পাগলী, তোমার সঙ্গে(১৯৯৪)'—চির রোমান্টিক কবিতায় পৌঁছে যান। প্রথম পর্বে দারিদ্র আর অসুস্থতার সঙ্গে অনিশ্চিত জীবনের লড়াই। দ্বিতীয় পর্বে কর্পোরেট চাকরির অস্থিতিশীলতা। তৃতীয় এবং চতুর্থ পর্ব নিয়ে আমি পরে আসছি। এমন করে যদি বলি যে বলাটা কি ঠিক হচ্ছে(?) এই স্থিতিশীলতা মানে প্রেম পর্বের সময়ে এই রোমান্টিকতার সময়ে নিয়ে যাচ্ছি (?)...এই পর্বে বিভাজনকে আপনি কীভাবে নেবেন?

জয় গোস্বামী : আমার জীবনে যখন যা ঘটেছে, তখন তা আমি আমার কবিতার মধ্যে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। আমি যে চেষ্টা করেছি সেটা বলবো না, সেটা খানিক আপনা-আপনি হয়ে গেছে। আর আমার জীবনে যা ঘটেছে, আমি যে শুধু সেই কথাটি লিখেছি, তা নয়; আমার আত্মজীবনীর অংশের মধ্যে আছে আমার বন্ধু-বান্ধবদের জীবন, আমার প্রতিবেশীর জীবন, আমার পড়শীর জীবন, আমার দেশের জীবন এই সবই আমার নিজের জীবনের অন্তর্গত হয়ে থেকেছে। তা এই ভাবেই এসব থেকে কবিতা এসেছে আর-কি। যখন জীবনে নারী এসেছে তখন প্রেমের কবিতাও এসেছে এবং যখন নারী চলে গেছে তখন সে চলে যাওয়ার যে বেদনা তাই নিয়েও কবিতা এসেছে। তারপরও অনেক সময় অন্যের জীবনে ঘটতে দেখেছি প্রেমের ঘটনা এবং সেই ঘটনাকে যখন রূপান্তরিত হতে দেখেছি তখন তা থেকে লেখা এসেছে, লেখাগুলো খানিকটা আপনা-আপনি এসেছে বলা যায়।

 

শামীম রেজা : নারী প্রসঙ্গ একটু তোলা থাক। এই পর্বে আমার একটা কথা মনে পড়ছে আপনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা, আপনার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। প্রথমবার আপনার সাক্ষাৎকার পড়ি বাংলাদেশের 'মুক্তকণ্ঠ' পত্রিকার খোলা জানালায় ২০০১ সালে। যখন কলকাতায় যাই তখন কবি-বন্ধু বিভাস রায়চৌধুরী আপনার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন, দৈনিক আজকের কাগজের ‘সুবর্ণরেখা’ পাতাটি আমি সম্পাদনা করতাম, আপনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছিলেন এবং এক ধরনের শ্লেষ বা অন্যরকমভাবে বলেছিলেন যে, আপনি প্রশ্ন করে উত্তর লিখে নিন। আমরা তো তখন থেকেই আপনার ভক্ত তবুও আমার অভিমান হয়েছিল। এই সম্পর্কে বাংলাদেশের দর্শকদেরকে একটু বলুন, কারণ ওই পত্রিকার সাক্ষাৎকারটি সম্পর্কে আপনি আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, যে ওই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া এবং সাক্ষাৎকারটির পরবর্তী সময়ে, আরেকটি আপনার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক চিঠি আসে, ওই সাক্ষাৎকারটি খুব সুন্দরভাবে আপনার অনেক ছবি দিয়ে ছাপা হয়েছিল। বিশ্বাস যোগ্যতার ক্ষেত্রে এখানে একই রকমভাবে আমি দেখেছি, আমি এত বছর যাবৎ শঙ্খদার বাড়িতে যাই, আমরা দুই তিন ঘণ্টা আবার সারাদিনও কাটাচ্ছি, তো শঙ্খ ঘোষ খুব বেশি কথা বলেন না, এখানে দেখি খুব বড় বড় বই হয়ে যাচ্ছে তার সাক্ষাৎকারে। হ্যাঁ, উনি বরিশালের মানুষ আমাকে খুব প্রীতি করেন ভালোবাসেন কিন্তু এই যে সাহিত্যের এই না-জানা জায়গাগুলো, যে আপনি বলছেন না, অথচ আমি সাক্ষাৎকার ছেপে দিচ্ছি, আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কের কারণে। ওই সাক্ষাৎকারটা সম্পর্কে একটু জানতে চাই।

জয় গোস্বামী : প্রথমত বলি, আপনি প্রথমবার যখন আমার বাড়ি গিয়েছিলেন সেই ঘটনাটি আমার মনে নেই, আমার স্মরণে নেই; সে আজ থেকে হয়তো কুড়ি-বাইশ বছর আগেকার কথা হবে, আমার স্মরণে নেই। কিন্তু যে ব্যবহার আমি করেছিলাম বলে আপনি বলছেন, সেই ব্যবহারের জন্য আমি এখন দুঃখ প্রকাশ করছি।

 

শামীম রেজা : না না,  আমিও দুঃখ প্রকাশ করছি।

জয় গোস্বামী : আমার মনে হয় না যে, এই কাজ করে এই ব্যবহার করে আমি ঠিক কাজ করেছিলাম। আর মানুষ হিসেবে এই কুড়ি বছরে আমি একেবারেই বদলে গিয়েছি, আমি একদম আলাদা রকমের একজন মানুষ হয়ে গিয়েছি। আমার দিন যত পাল্টেছে, বয়স যত বেড়েছে ততো আমি মানুষ হিসেবে পাল্টে গিয়েছি, বদলে গিয়েছি। তার চিহ্ন হয়তো আমার কবিতার মধ্যেও ধরা থাকতে পারে। সুতরাং সে দিক দিয়ে বলতে গেলে আমার ব্যবহারটা উচিত-ব্যবহার হয়নি। আর শঙ্খ ঘোষের ক্ষেত্রে বলবো, কলকাতায় 'দেশ পাবলিশিং' থেকে শঙ্খ ঘোষের একটি বই বেরিয়েছে, যে বইটি বেশ কয়েক বছর আগেই বেরিয়েছে; বইটির নাম 'কথার পিঠে কথা'। সেই বইটি মোটামুটি মোটা বই। সেই বইটিতে শঙ্খ ঘোষের দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকার একত্রে একত্রিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার একত্রিত করা হয়েছে সেই বইতে অর্থাৎ শঙ্খ ঘোষ অনেক সাক্ষাৎকার যে দিয়েছেন, এমন একটা প্রমাণ বইয়ের মধ্যে গ্রন্থিত হয়ে আছে।

 

শামীম রেজা : জ্বী, জ্বী বইটা আছে আমার কাছে। আমাদের ওই সাক্ষাৎকারটা সম্পর্কে আপনার মনে পড়ে কিছু?

জয় গোস্বামী : আমার কিছু মনে পড়ে না, জানেন তো; আমি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছি। এখন সম্পূর্ণ বিস্মরণে চলে গেছে ওই দিনটির কথা। আমার মনে পড়ে, আপনাকে আমি প্রথম দেখেছি, আপনি আমার বাড়িতে এসে দেখা করছেন, এবং আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি, এটাই আমার প্রথমে মনে পড়ে।

 

শামীম রেজা : আপনার একটা সাক্ষাৎকার ছেপেছিল আপনার এক বন্ধু; বিশাল সাক্ষাৎকার, তারপর ওই সাক্ষাৎকারের বিপক্ষে অনেক লেখা ছাপা হয়েছিল। সেটা সম্পর্কে বলছিলাম...

জয় গোস্বামী : ও..ও ও, সেই সাক্ষাৎকার কবে বেরিয়েছিল সে আমার মনে নেই। কোথায় বেরিয়ে ছিল যেন...

 

শামীম রেজা : 'খোলা জানালায়'...আচ্ছা ঠিক আছে।

জয় গোস্বামী : কোথায় বেরিয়ে ছিল তাও আমার ঠিক মনে নেই...

 

শামীম রেজা : আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে(হেসে)! ওইটা আমাদের বাংলাদেশের একটা সাক্ষাৎকার ছিল, আপনার অনেক ছবি-টবি দিয়ে ছাপা ছিল। তো ওইটা...

জয় গোস্বামী : মানুষ যখন লেখে, কবিতা লেখে, গল্প লেখে বা উপন্যাস লেখে তখন তার পক্ষে-বিপক্ষে নানা রকম মত আসবেই। এটা মেনে নিতেই হবে; এটা জানতেই হবে যে, আমি যখন কিছু লিখছি তখন আমার বিপক্ষে বা আমার লেখার ত্রুটি নিশ্চয়ই কারো চোখে পড়বে এবং আমার লেখার যে ভুল বা আমার লেখার যে অন্যায্যতা তা নিশ্চয়ই কারুর (কারো) না কারুর (কারো) চোখে পড়বেই এবং তিনি সেটা বলবেন। এটা মেনে নিতেই হবে, এটা মেনে নিয়েই লেখার চেষ্টা করতে হবে। এটাই আমার ধারণা।

 

শামীম রেজা : হ্যাঁ সেটাই

জয় গোস্বামী : কারণ আমি যা লিখবো তাইই যে সম্পূর্ণ নির্ভুল হবে, ত্রুটিমুক্ত হবে এমন আত্মবিশ্বাস আমার নেই। আমি যা লিখব তার মধ্যে কিছু ত্রুটি থাকবেই এবং সেই ত্রুটি যদি কেউ দেখিয়ে দেন, তাহলে তিনি আমার বিপক্ষে বললেন কিন্তু বিপক্ষে বললেও তিনি একদিক দিয়ে আমার উপকারই করলেন। কারণ উপকারটা করলেন এই কারণে যে, তিনি আমাকে দেখিয়ে দিলেন আমার কোন জায়গায় খামতি আছে, কোথায় ক্ষতি আছে; আমার ক্ষতির দিকটা তিনি দেখিয়ে দিলেন। ফলে তিনিও আমার উপকারীই করলেন। আমি এইভাবে জিনিসটা দেখি এখন।

 

শামীম রেজা : আপনি তো ব্যাপারটা খুব পজিটিভলি দেখেছেন কিন্তু আপনি যে কথাটি বলেনইনি, ধরুন যে সাক্ষাৎকার দেননি, সেটা যদি আমি ছেপে দেই, সেটাও আপনি মেনে নিচ্ছেন?

জয় গোস্বামী : না তা মেনে নেব না।

 

শামীম রেজা :  (হাসি) সেটা নিয়েই কথা হচ্ছিল!আচ্ছা, আমরা সেই একটু আগের প্রেম পর্বের কথায় যে, 'ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়' আপনি বলেছিলেন, উদ্দীপ্ত যৌবনের কথা—ভালো কবিতা যৌবনে হয়—আপনি মধ্য-যৌবনে ক্ষমতার সঙ্গে ছিলেন, বিশেষ করে বাংলা ভাষার অন্যতম কাগজ ‘দেশ’ পত্রিকার কবিতা সম্পাদনা করতেন। যৌবন ও ক্ষমতা দুটি ছাড়ার পরের লেখা অর্থাৎ এখনকার লেখালেখি সম্পর্কে যদি একটু বলেন; আবার এই পর্বে পাঠক সংযোগ রক্ষা করতে গিয়ে, আমাদের বন্ধুরা বা আমরাও যে প্রেমের কবিতা রচনাই এক ধরনের নিয়তি হয়ে যায়, বিস্তারিত বলবেন এই সম্পর্কে—

জয় গোস্বামী : ওটা পাঠক সংযোগ রক্ষা করতে গিয়ে হয়নি। ওটা আমার জীবনের মধ্যে ঘটেছে, আমার এই জীবনে একাধিক নারীর আগমন ঘটেছে। আমার যে একটি নারীর সঙ্গে জীবনে বন্ধুত্ব হয়েছে তা নয়, আমার জীবনে একাধিক নারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে, অনেকেই এসেছেন এবং চলে গেছেন। 'আমারে যে ডাক দেবে এ জীবনে তারে বারংবার ফিরেছি ডাকিয়া'। ...সেই আর-কি! তা 'সে নারী বিচিত্র বেশে মৃদু হেসে খুলিয়াছে দ্বার'... সেই আর-কি! তো এই ঘটনা সবার জীবনে যেমন সত্য, আমার জীবনেও তেমন সত্য হয়েছে।

 

শামীম রেজা : এমন কোনো প্রেমের ক্ষত’র কথা মনে পড়ে, যা এখনও প্রতিনিয়ত আপনাকে যন্ত্রণা দেয়?

জয় গোস্বামী : এগুলো কবিতার মধ্যে চলে এসেছে; গল্প-উপন্যাসের মধ্যে চলে এসেছে।

 

শামীম রেজা : তৃতীয় পর্বে, যে কবিতা, যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আপনার কবিতায় পাই, যেমন এর আগে আমরা বলছি, হয়তো মূলধারা ধ্রুপদী ধারা, সেই সৎকার-গাথা মানে ‘উন্মাদের পাঠক্রমে’ কাব্যগ্রন্থে সেই মায়াবী পাঠটি পরাবাস্তব তারপরে ম্যাজিক্যাল চিত্রকল্প, সেগুলো নেই, এমনকি 'ঘুমিয়েছো, ঝাউপাতা?' কাব্যগ্রন্থে ওই যে কুমারের দুই বুকে ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি এগুলো নেই। এখানে সরাসরি শাসকের প্রতি কাব্যগ্রন্থ, আমরা দেখতে পাই যে লাস্ট কবিতায়—

'যখনই প্রেমের কথা লিখব বলে কলম খুলছি,

নিহতের দেহ এসে, আমার খাতায় শুয়ে পড়ে,

খাতার প্রান্তর তাকে মাঝখান দিয়ে কেটে খাল বয়ে যায়,

জোছনায় দাঁড়িয়ে থাকে লাশ গুম করার সাইকেল-ভ্যান,

জোছনায় দাঁড়িয়ে থাকে মাথায় চাদর মোড়া ভ্যানের চালক...'

সরাসরি এই কবিতায় শিল্পগুণ কি নষ্ট হয়েছে?

জয় গোস্বামী : আসলে, আমি যেটা আপনাকে বললাম, আমার জীবনে আমি যা ঘটতে দেখেছি, সে জীবন যে আমার ব্যক্তিগত জীবন অর্থাৎ আমার স্ত্রী-কন্যা আমার ঘরটুকু এই নিয়ে আমার ব্যক্তিগত জীবন, তা নয়। আমার ব্যক্তিগত জীবন এর মধ্যে আমার দেশের জীবন আছে, আমার সমকালের জীবনও আছে, আমার বন্ধুদের জীবনও আছে। ২০০৭ সালে, নন্দীগ্রাম বলে গ্রামে পুলিশ গুলি চালায় এবং সেই তৎকালীন যে শাসক দল ছিলেন, সেই শাসক দলের ক্যাডাররা চটি পায়ে অর্থাৎ পুলিশের বুট ছাড়া পুলিশের পোশাক পরে নেমে গিয়ে গুলি চালান এবং ধর্ষণ করেন। এই ঘটনায় সারা পশ্চিমবঙ্গ খুব ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, আমি তখন এই শাসকের প্রতি এই বইটি রচনা করেছিলাম।

 

শামীম রেজা : আপনি এক জায়গায় বর্ণনা করেছিলেন, আপনি কীভাবে ব্রাত্য বসুর সঙ্গে গিয়ে দেখেছেন মানুষের সেই আহাজারি—

জয় গোস্বামী : ব্রাত্য বসু ছিলেন, অপর্ণা সেন ছিলেন, অর্পিতা ঘোষ ছিলেন, অনেকেই ছিলেন, শুহাপ্রসন্ন ছিলেন, যোগেন চৌধুরী ছিলেন; এরা সকলেই ছিলেন, আমরা গিয়েছিলাম নেতাইতে। আমরা নন্দীগ্রামে গিয়েছি আর গিয়ে দেখেছি যে ওই গণহত্যা, নেতাই গ্রামে যে গণহত্যা হলো যার উপরে আমি 'হার্মাদ শিবির' বলে আমার বই লিখলাম। সেই নেতাই গ্রামে যে গণহত্যা হলো, কংসাবতী নদীর তীরে রয়েছে পরপর সাতটা চিতা শোয়ানো, রয়েছে পোড়া পোড়া কালো কালো তার ছাই, দেখা যাচ্ছে নদীর এপার থেকে। তা আমরা গিয়ে দেখলাম যে, দেওয়ালে গুলির দাগ। 'সরস্বতী ঘোড়াই' বলে একজন মহিলার মাথায় গুলি লেগেছিল, সেই গুলি ছিটকে গিয়ে যখন দেওয়ালে লাগে তখন সেই মাথার লম্বা চুল, সেই চুল গিয়ে দেওয়ালের সঙ্গে আটকে ছিল। আমি দেখেছি সেই চুল হাওয়ায় উড়ছে আর তার পাশে একটা ফড়িং ঘুরে বেড়াচ্ছে। এইটা দেখে এসে এবং যখন শুভাপ্রসন্ন বা এরা বলছেন, গ্রামবাসীদের যে আপনারা বলুন আপনাদের উপর কী ঘটেছে, তখন এক বিধবা মহিলা তার ন্যাড়ামাথা ছেলের হাত ধরে বলছে যে, তুই কিছু বলবি না, আমরা কিছু বলবো না, আমার স্বামী ছিল, আমার বড় ছেলে ছিল; আমার স্বামী গেছে আমার বড় ছেলেও গেছে সেদিনকার গুলি চালনায়। এখন শুধু এই এক ছেলেই আছে, এখন যদি আমরা মুখ খুলি বা কোন কথা বলি তাহলে এও থাকবে না। আমি একে হারাতে পারবো না। এই জিনিস দেখে আমি যখন ফিরে আসছি, তখন আমার মাথায় ঝড়ের মতো কবিতার লাইন আসছে। ট্রাকে করে ফিরে আসছি যখন তখন মাথায় ঝড়ের মতো কবিতার লাইন আসতে থাকে। আপনাকে একটা কথা বলা দরকার, আমি কবিতায় মাঝে মধ্যে বিরতি স্বীকার করেছি। কখনো কখনো আমি লিখিনি। যেমন এই ঘটনাটা ঘটবার আগে নেতাই গ্রামের হত্যাকাণ্ড, এই গণহত্যার আগে তিন বছর—আমার ৫৩ বছর বয়স থেকে আমার ৫৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি কোনো কবিতা লিখিনি। আসলে ঠিক ঠিক বলতে গেলে দু’বছর এগার মাস আমি কোনো কবিতা লিখিনি। আমি অপেক্ষা করেছিলাম যে কবিতা আসবে, কবিতা না এলে আমি লিখতে পারি না। নিজে যে চেষ্টা করে লিখবো সেটা আমি পারি না, কবিতা আসবে! তা আমি সেই সময়টা গোঁসাইবাগান লিখছিলাম, ফলে আমি কবিতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছিলাম। আমি যে কবিতা নিজে লিখছি না বলে কবিতার সঙ্গে যোগ নেই আমার তা নয়; আমি অন্যদের কবিতার সঙ্গে যোগ রাখছিলাম। অন্যদের কবিতা পড়ছিলাম এবং অন্যদের কবিতা সম্পর্কে লিখছিলাম। মাঝে মাঝে আমি বিরতি স্বীকার করেছি আমার কবিতা রচনায়।

শ্রুতিলিখন : আবদুর রহমান



//জেডএস//

লাইভ

টপ