বিস্ময়মুগ্ধতা ও ডুবসাঁতার

Send
মোস্তাক আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:০০, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৮, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদ-এর ৫০তম জন্মদিন আগামীকাল শনিবার। তার লেখালেখির সূচনা কৈশোরেই, বাংলা ও ইরেজি ভাষায়। ‘চল্লিশ কদম’ উপন্যাসিকা প্রথম প্রকাশিত হয় আমেরিকার মিনেসোটা রিভিউ-এ, ২০০০ সালে। গল্পগ্রন্থ ‘গুড নাইট মি. কিসিঞ্জার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ বাংলাদেশে প্রকাশ করে ইউপিএল, ২০১২ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্রে দ্যা আননেম্ড প্রেস, ২০১৪ সালে। উপন্যাস ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন মাই হ্যান্ডস’ প্রকাশ করেছে ভিনটেজ/র‌্যানডম হাউজ, ২০১৩ সালে। তার সবগুলো বই কাগজ প্রকাশন থেকে বাংলায় অনূদিত হয়েছে।

কাজী আনিস আহমেদের জন্ম এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা ঢাকাতেই, সেন্ট জোসেফ ও নটরডেম কলেজে। উচ্চতর শিক্ষা আমেরিকায়-ব্রাউন, ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে যথাক্রমে সাহিত্যে ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও ডক্টরেট। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা ট্রিবিউন-বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক।

কাজী আনিস আহমেদের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে কবি শামীম রেজার সম্পাদনায় বাতিঘর  প্রকাশ করছে একটি মূল্যায়ন-গ্রন্থ ‘অধরা বিশ্বের প্রতিভূ’। উক্ত সংকলন থেকে লেখাটি প্রকাশ করা হলো। 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে যখন জানতে শুরু করি, তখন অনেক স্তরগত ভাবনা-পরম্পরার মধ্যে একটা বিষয়ে বেশ বিস্ময় জন্মাত যে, চেনা ভূগোলের সীমাকে তিনি কী অনায়াসে অতিক্রম করে যাচ্ছেন! এই অতিক্রমের আবহে তনি ইতিহাসকে ব্যবহার করেছেন। ‘গুডনাইট মি. কিসিঞ্জার ও অন্যান্য গল্প’ পড়তে পড়তে বারবার সেই পুরোনো অনুভূতির অনুরণন তৈরি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। অথচ গল্পের ভূগোল তো চেনা সীমানার বাইরে খুব একটা বেরোয়নি! বাংলাদেশ-আরও স্পষ্ট করে বললে, ঢাকার জীবনই মূলত এ গল্পগ্রন্থের প্রায় প্রতিটি গল্পের উপজীব্য। তাহলে এ রকম মনে হওয়ার মানে কী! আসলে, গল্পের প্রেক্ষাপট রাজধানী শহর হলেও ভাবনায় আছে বিশ্বায়ন। আছে আন্তর্জাতিক স্বর। আলবদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি। কাজী আনিস আহমেদের শিকড় বাংলাদেশ ঠিকই, কিন্তু তাঁর জীবন দেখার অভিজ্ঞতা বিশ্বজনীন। অভিজ্ঞতা বাস্তবিক ও কোনোরকম গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

যেকোনো ধরনের রেনেসাঁর একটা বড় বিশেষত্ব হলো মুক্ত ভাবনার প্রকাশ। রেনেসাঁ সব সময় খুব বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে আসে এমনটা মনে হয় না। ব্যক্তি মানুষ ছোট ছোট পদক্ষেপেও রেনেসাঁ নিয়ে আসেন। নিজে বিবর্তিত হন, বিবর্তনের আলো ছড়ান চারপাশে। এ ক্ষেত্রে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে বহু দেশ ঘোরা, বহু রকমের মানুষের সাথে মেশা অনুঘটকের কাজ করে। ‘চামেলি’ থেকে ‘আমার শত্রুরা’ পর্যন্ত পড়তে পড়তে এই কথাগুলোই ঘুরেফিরে মনের মধ্যে উঁকি দেয়। আনিস রেনেসাঁর সমর্থক, রেনেসাঁর বাহক। বঙ্কিমচন্দ্রের অনুষঙ্গ তাই বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আনিস ভাবনার ভূগোলকে ভাঙছেন। এই গল্পগ্রন্থ পাঠ তাই বিশ্বের সাহিত্যধারার সঙ্গে পাঠককে সংযোগে বাঁধে। মূল ইংরেজি লেখাগুলো হোক কিংবা বাংলায় অনুবাদই হোক, ‘গুডনাইট মি. কিসিঞ্জার ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থটি একই অনুভূতিতে জারিত করে।

সাধারণভাবে যাঁরা করপোরেট তাঁদের সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ ততটা নিবিড় নয়। কখনো কখনো একটা দেখনদারির ব্যাপার কাজ করে। কাজী আনিস আহমেদ সেখানে ব্যতিক্রমেরও ব্যতিক্রম। কোনটি তাঁর আসল পরিচয়! তিনি সফলতম ব্যবসায়ী! তিনি ছোটগল্পকার! ঔপন্যাসিক! ইংরেজি সাহিত্য পত্রিকা ‘বেঙ্গল লাইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা! ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা! ইংরেজি দৈনিক ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ ও বাংলা ওয়েব পোর্টাল ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর প্রকাশক! অত্যন্ত সুবক্তা! এত সবের সমন্বয় মানুষটিকে বহুমাত্রিক রঙে রঙিন করে তুলেছে। গল্পগুলোতে আছে সেসবের ছাপ। গল্পগুলো তাই ভীষণ বিশ্বাসযোগ্য। বানানো নয়, নির্মাণ। সমস্ত ‘ভার্চ্যুয়াল’ বলেছে ভেঙে ফেলো-ভেঙে ফেলো যা কিছু বানানো-বানানো, কেননা সে জন্মায়নি! নীল সাগরের জলে উথাল-পাথাল ঢেউ। পদ্ম দুলে চলেছে তবু নির্ভয়। যতই জড়াও তাকে বিষ-আলিঙ্গনে। জলে ধুয়ে যায় অকারণ সঞ্চয়।

বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আনিস তাই গুরুত্বপূর্ণ সত্তা। গল্পপাঠের ক্রম-অভিজ্ঞতায় তা ধীরে ধীরে আরও উন্মোচিত হয়। সেগুলোর উপস্থাপনার যে স্থিতধী কৌশল তা পাঠককে সচেতন করে, উদ্বুদ্ধ করে, জায়মান ভাবনায় দ্বা›িদ্বক করে। ডুবসাঁতারে পাঠক খোঁজ পায় শিল্পের স্বাভাবিক বিশুদ্ধির পবিত্রতা।

 

চামেলি : ক্রান্তিকাল ও স্থায়ী ব্যথার ক্ষত

১৯৭০-এর হেমন্তে শুরু হয় গল্প। গালিবের সঙ্গে দেখা হয় চামেলির। বয়ঃসন্ধির প্রেম। বোঝা, না-বোঝার মধ্য দিয়ে সম্পর্ক গড়ায়। গালিবের ফুটবল, খেলনা গাড়ি, ঘুড়ি, স্ট্যাম্প সংগ্রহ, মুদ্রা সংগ্রহ-মনোরাজ্যের সকল ব্যস্ততা ১২ বছরের জীবনে এককেন্দ্রিক বাঁক নেয়। তার ভেতরে নারীর শরীর নিয়ে আগ্রহ জন্মাতে থাকে। একটু একটু করে সম্পর্ক এগোয়। পরিচয়, বন্ধুত্ব, ঘনিষ্ঠতা। চামেলির বাড়ির দারোয়ান গালিবকে দেয় আপডেট খবর। তার ঘটকালিতে গালিব অনেক আশ্বস্ত বোধ করে।

গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ে গালিবের মনস্তত্ত্ব। বয়ঃসন্ধির নানা দোষ-গুণ, বিড়ি খাওয়া, ফুটবল খেলতে না যাওয়ার কারণে বন্ধু হারানো, বন্ধু টাবুর সরাসরি কটাক্ষ, গল্পকার মুনশিয়ানায় নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। এবং এসব গল্পে এসেছে স্বাভাবিকভাবেই। কোথাও আরোপিত মনে হয় না। মেদহীন নিটোল বর্ণনায় টান টান গল্প এগোয়।

সম্পর্ক যখন জমে ওঠে, গালিব বাবার কাছ থেকে এক অপ্রত্যাশিত সন্ধ্যায় জানতে পারে কিছু অপছন্দ, ন-পছন্দের কথা। জানতে পারে মেয়েটির পারিবারিক পরিচয়। এর আগে গালিব ভেবেও দেখেনি চামেলির পাঞ্জাবি পরিচয় কোনো সমস্যা হতে পারে। ভেবে দেখেনি, ’৭০-এর ‘এই সময়’ এ রকম মারাত্মক হতে পারে। বয়ঃসন্ধির যে খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, তা ফুটে ওঠে গালিবের ভাবনায়, ‘কেন সে এত দিনে বুঝতে পারল না যে তার বাবাটা এমন বুনো কিছু? এই লোকটার সাথে তার কী মিল আছে যে সে তার বাবা? এ তো পুরোই একটা ভিনগ্রহের প্রাণী!’ পাঠক এ ক্ষেত্রে নিজেকেই খুঁজে পাবে। আত্ম-অধিকারবোধ, যৌন-মনস্তত্ত্ব কোথাও একাকার হয়ে যায়। ফ্রয়েডীয় ভাবনা ভর করে।

খুব চেনা বদল ঘটে। প্রতিবাদী হয় ব্যক্তিসত্তা। গালিবও। গালিব ভাবে, চামেলিকে সে বলবে যে তাদের আরও বেশি সাবধানী ও সুচতুর হতে হবে। কিন্তু ক্রান্তিকালের বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে গালিবের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না, তাদের চেয়েও সুচতুর, রাজনীতি আর কিছু মানুষ। এক রাতে বদলে যায় সমস্ত ইতিহাস। মর্টারের গোলা, ট্যাংকের ঘর্ঘর শব্দে ঘুম ভেঙে যায় গালিবের। পরদিন মালি এসে অনেক অনেক লাশের খবর দেয়-বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার লাশ, নিউমার্কেট এলাকার লাশ, রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ। গালিবেরা এমন পরিস্থিতিতে পালিয়ে যায় প্রথমে এক মফস্বল শহরে, তারপরে গ্রামে। ধ্বংসযজ্ঞের কাহিনি শুনতে শুনতে বর্ষাকালের শেষ দিকে আসে বিজয়ের খবর। গালিব এত দিনে বুঝতে শিখেছে রাজনীতি আর ইতিহাসের কথা। এত অল্প বয়সেও সে বুঝতে বাধ্য হয়েছে। তার কল্পনাজগৎ যে রং মেখে উড়তে চাইছিল পাখির মতো সুখে, তা কখন যে গোঁত্তা খেয়ে লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে! চামেলির সঙ্গে চাড়া পাথর খেলার দিনগুলো রূপক হয়ে ওঠে। চাড়া বা পাথরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে স্বপ্নেরাও কোথায় যেন ডুবে যায়। গল্পকার লেখেন—

নয় মাস পর যুদ্ধ শেষ হলো। তারা ফিরে এলো তাদের বাসায়। গলির ওপারের নীল বাড়িটা তখন ফাঁকা। যুদ্ধের আগের জীবনটা এখন তার কাছে রূপকথা বা জিন-পরির গল্পের মতো মনে হয়। চামেলি নামটি একটি কল্পজগতের চরিত্র বলে মনে হয়। কিন্তু সে টের পায়, সেই চলে যাওয়া কল্পপরিটি তার বুকের মধ্যে রেখে গেছে একটি স্থায়ী অমোচনীয় ব্যথার ক্ষত।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘শুধু কেরানি’ গল্পের শুরুতে ছিল নীড় বাঁধার কথা আর শেষে ছিল নীড় ভাঙার রূপক। ‘চামেলি’তেও আছে সে রকমই ইঙ্গিত-ইশারা। বুকের ভেতর বৃষ্টি জমা জল। জলের ভেতর অতীত খেলা করে। অতীত মানে অনেক জন্ম আগে এমনি কোনো বৃষ্টিভেজা দিনে। ঘাস-জন্মে অন্য রকম স্বাদ। আজকে হঠাৎ পাগল করে তোলে। গালিব-চামেলির নামে যে লিরিক্যাল ব্যঞ্জনা আছে, তা ক্রমে বিরহের গান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, ছড়াতে থাকে...

 

পরীক্ষা দিয়ে কবি হওয়া : আত্ম-আবিষ্কার ও যাপনের টানাপোড়েন

এ গল্প বাহরাম আর জামশেদের। দুই ভাইয়ের। জামশেদ জেদি, সাহসী, স্বেচ্ছাচারী। বাহরাম গেঁয়োধরনের ভীতু। দুই চরিত্রের বড় হয়ে ওঠা, বিবর্তনের নানা মজার গল্প শুনিয়েছেন গল্পকার। নেতৃত্ব দেয়ার, নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেয়ার নানা কথা গল্পের ভাঁজে ভাঁজে উঠে এসেছে। মানুষের ইচ্ছে বা শখ কিংবা আকাক্সক্ষা কখন কীভাবে কোনদিকে বাঁক নেবে কে জানে! কবি হওয়ার অনেক সম্ভাবনা ছিল বাহরামের মধ্যে। অথচ কবি হতে চাইল জামশেদ। এই বৈপরীত্য প্রকাশের নির্মাণে গল্পকারের সৃজনপ্রক্রিয়া বেশ নিরীক্ষণের দাবি রাখে।

এমন একটা অদ্ভুত বিষয় আনিস কীভাবে ভাবলেন, তা আশ্চর্য লাগে। আমরা যখন বিষয়ের অপ্রতুলতার কথা বলি, তখন আনিসের ‘গুডনাইট মি. কিসিঞ্জার ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থটি পাঠকের হাতে তুলে দেয়া যেতে পারে। আপাত তুচ্ছ বিষয় শিল্পগুণে কীভাবে ছোটগল্প হয়ে উঠতে পারে, তা আনিস একাধিক গল্পে দেখিয়েছেন। কবিতা লেখার ক্ষেত্রে একটা সৎ আবেগ কীভাবে প্রচলিত সবকিছুকে নস্যাৎ করতে চায়, তারই গল্প ‘পরীক্ষা দিয়ে কবি হওয়া’। পাশাপাশি সাবধানীরা চিরকাল যেভাবে বাঁধ বাঁধতে চেয়েছেন, এখানেও তার ব্যতিক্রম নন। একদিকে কবি হওয়ার তীব্র বাসনা আর একদিকে জীবিকা এবং এ ক্ষেত্রে পরিবারের অবস্থান অত্যন্ত সুচারুভাবে বর্ণিত।

প্রচলিত ধারণা, প্রচলিত যাপন-এসবের সঙ্গে মৌলবাদের প্রগাঢ় সংযোগ। এর সঙ্গেই সহবাস করে আমাদের বোহেমিয়ান মন, ধ্যানধারণা, নির্ভেজাল আবেগ। মৌলবাদ একটু একটু করে সেখানে জায়গা ছেড়ে দেয়, দিতে বাধ্য হয়। মাওলানা চরিত্র গল্পে তাই যেমন স্থান পায়, তেমনি গল্পে আসে হায়দার চাচা চরিত্রও। মাওলানার চর্চাকে অস্বীকার করা যাবে না-তিনি ওমর খৈয়াম, সাদি, হাফিজ, রুমি, সোহরাওয়ার্দী থেকে শেলিতেও যাতায়াত করেন, কিন্তু সে যাতায়াতে একটা ক্লান্তির আবেশ আছে, পরিকল্পিত অপমানের প্রয়াস আছে-হায়দার চাচা সেখানে মুক্ত বাতায়ন, তিনি তখন ইবনুল আরাবির প্রবন্ধ, গাব্রিয়েল মিস্ত্রালের কবিতা, অস্ট্রেলিয়ান প্রাণী শ্লথ কিংবা ইরানি সাফাভি বংশের শাহি রীতিনীতি। বাহরাম, জামশেদের চর্চায় উঠে আসে জীবনানন্দ, মালার্মে, এলিয়ট। ক্রমে প্রকট হয় প্রচলিত গেঁড়ে বসা ধারণার সঙ্গে বাঁধ ভাঙতে চাওয়ার দ্ব›দ্ব। কবিতার পরীক্ষা নেয়ার পর মাওলানার পিঠটা পেছনে ঠেস দেয়া ও কাফন-জাতীয় আলখাল্লাটির পাশটা গুছিয়ে কোলে নেয়ার মধ্যে কেমন একটা মৌলবাদের আপাত জিতে যাওয়ার শরীরী ভাষা প্রচ্ছন্ন থাকে।

‘মুরুব্বি পরিষদ’-এ ঠিক হয়, জামশেদকে আর্মিতে যোগদান করতে হবে এবং ফারসি কবিতার পাঠ নিতে হবে। এই সিদ্ধান্তের পর জামশেদের কাছে কোনো সান্ত্বনাবাক্যই আর যথেষ্ট মনে হয় না। নজরুল বা বদ্রিলার যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা তার কাছে কোনো মানসিক শান্তি নিয়ে আসে না। যুদ্ধ চলতে থাকে তার নিজের মধ্যে। আসন্ন জীবনের, আসন্ন ভবিষ্যতের। সকল দীনতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসা আজ। কঠোর সংকল্প ভাঁজের ব্যাকরণ জানতে চায় না। নির্ভেজাল কাটাছেঁড়া অলীক বসন্তের সমাগম। প্রত্যাশার অঙ্গুলিহেলনে হাঁ-মুখ প্রতীক্ষায়। সব সমঝোতা, নকল মুখের সরি দিন গোনে। আদলের চেনা ঘুম গাঢ় হয়, আরও সুনিবিড় সমুদ্রমন্থন শেষে হিসাব-নিকাশের কারবার। দীনতা বাড়ায়, অতল ছোঁয় রাত্রির আকাশ। অবরুদ্ধশ্বাস দীর্ঘতার সূত্র আনে, ক্ষণের যাপনযাত্রা। আপন যা কিছু সঞ্চয়, কেলাসিত, জমাটবাধা প্রস্তর-ডুবে যায়, ঘর্ষণে ঘর্ষণে বজ্রপাত। চোরাপথ, ধু ধু মাঠ কেবল, কেবলই আর্তি জানায়।

ছোটগল্প শেষ হয়। তবু ব্যঞ্জনা শেষ হয় না। অন্যান্য দিনের মতো আরও একটা সকাল আসে, ব্যস্ততা শুরু হয়। জামশেদ একইভাবে তাকিয়েই থাকল। পাঠক ও জামশেদ মিলেমিশে যায়। জামশেদের চোখ হয়ে ওঠে পাঠকের চোখ। পাঠক সে চোখের শূন্যতায় মিশে যায়, মিশতে থাকে...

 

আয়েশাকে হারিয়ে : ট্র্যাজেডি ও স্মৃতিকাতরতা

মানুষ স্মৃতিতে ভর করে বাঁচে। এ কথা নতুন নয়, কিন্তু প্রতিজন মানুষের স্মৃতির ভরকেন্দ্র আলাদা রকমের। কখনো সে স্মৃতি এতটাই প্রভাব ফেলে যে জীবনের গতিপথটাই বদলে যায়। স্মৃতির অনুষঙ্গে যে নিয়তির মারপ্যাঁচ থাকে, তা আমাদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করে। ‘আয়েশাকে হারিয়ে’ গল্পের কথক ‘আমি’। ‘আমি’ এখানে স্মার্ট, আবেগ-সংযত, ভেতরে ভেতরে বুভুক্ষু প্রেমিক। সারাটা জীবন সে জ্বালিয়ে রাখে এক অসম্পূর্ণ প্রেমের পোড়া পোড়া সলতে। সলতে জ্বলে, ধোঁয়া হয়, পোড়া গন্ধে ভরে যায় মননের মধু।

ছোট ছোট দুঃখ-ব্যথা নিয়ে মানুষ বাঁচে। সাত বছর বয়সে একটি শীতের বিকেল হারিয়ে ফেলে দুঃখ কী, এটা বুঝেছিল গল্পের কথক। প্রথম প্রেম সাধারণভাবে সার্থক হয় না এটাই প্রায় স্বাভাবিক। আয়েশার সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণতায় না পৌঁছানোর মধ্যে কোনো নতুনত্ব নেই। নতুনত্ব, সম্পর্ক সম্পূর্ণতায় না পৌঁছাতে পারার কারণের মধ্যে নিহিত। যে কারণ নিয়তিতাড়িত, আকস্মিক, দুঃস্বপ্নের মতো। মানুষের বিরহের স্মৃতিই তো অন্তহীন আনন্দের। কিন্তু সে বিরহের স্মৃতির মধ্যে অপ্রত্যাশিত মৃত্যু জড়িয়ে গেলে বিরহ হয়ে ওঠে যন্ত্রণার নামান্তর। শেলি তখন ভর করেন না, ভর করে অতৃপ্তির অতি-অনুভব।

আয়েশার মানসিকতার সঙ্গে গল্পকথকের অনেকটাই অমিল। তবু মেশার সহজ অবকাশে দুজনের একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্ক গড়ায় শরীরে। প্রথম যৌনতা, নারী শরীরের প্রতি মোহ-বেসিক ইনস্টিংক্ট কথককে পাগল করে। বারবার মিলনের আকাক্সক্ষা তাকে পেয়ে বসে। আয়েশারও ছিল সমান সম্মতি। যদিও কথক এই সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়ে ছিলই। চরম নিয়তি মাঝখানে এসে উপস্থিত না হলে ঘটনাপরম্পরা, সম্পর্কে সম্পূর্ণতা নিয়ে আসত এ কথা হলফ করে বলা যায় না। সে বিচ্ছেদ হয়তো হতো মধুময়!

আয়েশার ছোট ভাই নুমায়ের ঘুড়ি ওড়ায় ছাদে। পাহারার ফাঁকে ফাঁকে আয়েশা-কথকের সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে-শরীরে। এ রকম একদিন শরীরী ঘনিষ্ঠতার সময়ে অতর্কিতে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায় নুমায়ের। মারা যায়। নুমায়েরের মাথা কোলে নিয়ে আয়েশা শেষ কথা বলেছিল, ‘কাউকে বলব না যে তুমিও ছাদে ছিলে।’ বহু বহু দিন পরেও কথকের কাছে অস্পষ্ট, ওই কথার অর্থ কী? আর কোনো কথা বলার সুযোগ হলো না, সুযোগ এলো না। আয়েশা নির্ধারিত সময়ের আগেই লন্ডন চলে যায়। কথক জানায়—

এরপর থেকে আয়েশাকে আমি আমার স্মৃতিতে দেখি এবং প্রতিনিয়তই দেখি স্বপ্নে। আমি ওর হাসি দেখি, আমাকে দেয়া ওর উপহারগুলো দেখি। এই সবই দেখি এক অলঙ্ঘ্য সাগরের এপারে বসে, যেখান থেকে ওপারে আয়েশার কাছে আমি কোনো দিন পৌঁছাতে পারব না।

আয়েশার কাছে কোনো দিন পৌঁছোতে পারবে না কথক এ কথা জানলেও—‘তোমার অভিসারে যাব অগমপারে’। আমাদের স্বপ্নকে কে রুখবে! তোমার সঙ্গে তেপান্তরের মাঠ পেরোনোর নেই মানা। মাঠ পেরোলেই বনের ভেতর ঘুমন্ত সেই স্বপ্নপুরী। গ্রহণলাগা মধ্যরাতে দুজন মিলে জাগতে পারি। কাল ছিল রাত ক্লান্তিহীন-অসীম গভীরতা। আজ ভুল সব দুঃখ নদী-বুকভরা শূন্যতা। মন যেখানে খুশি উড়ুক না যে যার। ভালোবাসারও সীমা টানা দরকার। ভালোবাসা বদলায় বলে, এই দুঃসহ বেঁচে থাকা। ভালোবাসা বলায় বলে, এই রামধনু রং মাখা। মোহ থেকে আজ অনন্ত মুক্তি আলোয়। ভালোবাসা সত্যিই এখন তোমাকে ছোঁয়। ‘আয়েশাকে হারিয়ে’ গল্পটি তাই আমাদের মধ্যে জিইয়ে রাখা। অনির্বাণ প্রেমসত্তার প্রতীক হয়ে ওঠে। বৃথা আশা, আশা তবু অনির্বাণ। ‘বোধের উচ্চতম বিন্দু’ ও ‘একটি দুঃখ’ এই শব্দগুলো দিয়ে কথক একটা গল্প দাঁড় করায়, যে গল্প চলমান ও অন্তহীন। চলতে থাকে, চলতেই থাকে...

 

তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের দিন : উদ্দেশ্যহীন যাপন ও অচেনা আমিত্ব

জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় ‘মরিবার’ সাধ হলো যার তার তো সব ছিল। স্ত্রী, সন্তান, প্রেম, আশা-সব। কেন সে মৃত্যুর পথ বেছে নিল। ‘কোন্ ভূত?’ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়-আমাদের? কোন অতৃপ্তি জেগে থাকে রাত্রিদিন : কিসে তার নিরসন! ‘জানি-তবু জানি/নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;/অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-/আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে;।’ আমজাদ যেন ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সেই মানুষটি। তার কোনো ডিপ্রেশন ছিল না। বাদল অন্তত তাই-ই জানায়। বাসের তলায় ঝাঁপ দেয়ার স্পষ্ট কারণ কেউ জানে না। এমন অনেক ঘটনা ঘটে, ভাবুক মানুষের মেধাবী হৃদয়ের অযুত মন্থনেও যার অতল রহস্যের থই মেলে না।

আমজাদ এক নীরব জীবন যাপন করত। তার আত্মহত্যার রহস্য বোঝা বেশ দুষ্কর। অথচ সে-ই গল্পকথকের জন্য রেখে যাচ্ছে একটি মুখবন্ধ খাম। ওপরে গল্পকথকের ডাকনাম লেখা। তার মানে আত্মহত্যা ছিল পরিকল্পিত! ধীরে ধীরে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়! আমজাদকে খুব সফলও বলা যাবে না, আবার ব্যর্থও বলা যাবে না। অথবা গল্পকথক বা তার বন্ধুদের আমজাদ সম্পর্কে পুরোটা জানাও ছিল না। ফলে তার আত্মহত্যা রহস্যময় হয়ে ওঠে। একজনকে পুরোটা জানা আদৌ কি সম্ভব! আমরা নিজেরা নিজেদের কতটাই-বা চিনি!

গল্পটিতে আছে একটি জটিল দার্শনিক বুনন। মানুষ কেন বাঁচে? কেন স্বেচ্ছায় মরে? এমন কি কিছু আছে এই মাটির পৃথিবীতে, বস্তুত যা পেলে মানুষ বলবে, তার আর কিছু পাওয়ার নেই? তা কি শেষ বিচারে মৃত্যুই? সব মানুষকে নিয়ে কি কোনো সাধারণ নিয়মতন্ত্র গড়া যায়? মানুষের কি কোনো ব্যাকরণ আছে? চরিত্রের! ভাবনার! সুখ-দুঃখের সংজ্ঞা কি খুব বেশি মাত্রায় ব্যক্তিগত! এত এত প্রশ্ন নিয়েই গল্পটির দার্শনিক নিহিতার্থ গঠিত।

মানুষের আত্মসংকটের পরিচয় ও পরিণতি এ গল্পে বিধৃত হয়েছে। বিভিন্ন প্রভাবে তা পরিস্ফুট। আমজাদের সত্তা-অন্তর্গত বোধ বা বোধি সংক্রমণগত প্রভাব তার কথা বলে। আমজাদের খাম খুলে কথক ডায়েরির মতো দশ-বারোটি লেখা পড়ে একই অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হয়। মুদ্রাসভ্যতা বা ধনতান্ত্রিক পাশা খেলার প্রভাব, যুদ্ধ দ্বারা সৃষ্ট কৃত্রিম সভ্যতার প্রভাব, ছদ্মবেশ ধারণকারী মৃগয়া সভ্যতার প্রভাব, কালপ্রবাহচালিত অনতিক্রমণীয় মৃত্যুর প্রভাব-এসব থেকেই হয়তো মুক্তির পথ খুঁজছিল আমজাদ। আমজাদেরা এমনটাই খোঁজে। কথক ক্রমে হয়ে ওঠে আমজাদের ক্লোন-সত্তা।

অনুভূতিশীল মানুষ জানে, অর্থাভাবের চেয়েও বড় কোনো কোনো অভাব মানুষ কখনো কখনো বহন করে। সংসারের তথাকথিত শান্ত ছায়া থেকে যা তাকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যায় বহু বহু দূরে। মেরিলিন মনরো আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যা করেন মায়াকোভস্কি। ভার্জিনিয়া উলফ্, সিলভিয়া প্লাথ, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও অব্যক্ত যন্ত্রণা একই পথে নিয়ে যায়। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার মতো ‘তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের দিন’ গল্পটি এক অবোধ্য-অজানা দর্শনকে মেলে ধরে। গড়পড়তা জীবনযাপনের বহুচর্চিত আদলটাকে পাল্টে দেয়, অস্বীকার করে সাধারণ চেনা-জানা ছকটাকে।

ছকে বাঁধা জীবনে অভ্যস্ত কথক আমজাদের লেখার প্রভাবে তাই অকারণে ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে গাড়ি চালাতে থাকে শহরের যে দিকটায় ভিড় কম সেদিকে। শুধু ‘তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের দিন’-এর সন্ধানে। অক্টোবরের মৃদু বাতাসে চুল উড়িয়ে সে অনেকক্ষণ গাড়ি চালায়। মাঝে মাঝেই এখন ফিরতে রাত হয়। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। কথক জানায়-

দরজা থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম, নীল ডিমলাইটের নিচে দুটি মানুষের মতো শরীর গভীর ঘুমে। শ্বাস নিচ্ছে আর শরীরটাও একটু উঠছে নামছে। আমি জানতাম, এরা আমার ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু তারপরও, সব ভালোবাসা সত্ত্বেও, ঐ মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, এদের কি আমি চিনি?

কথকের আসন্ন পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা মুশকিল। আমজাদের আবেশে ‘আট বছর আগের একদিন’-এর মতো কিছু একটা ঘটা অসম্ভব নয়। রোজ ঘুমোবার আগে ধ্যানে বসা-মনকে বলা, কপালের মাঝখানে আয়। তোকে আজ শূন্যতা শেখাব। রোজ বলা-রোজই। কপালজুড়ে শুধু যন্ত্রণা। কপালজুড়ে টুকরো ছবি। বন্ধ চোখেও তাকানো যায় না সেদিকে। ক্ষোভে-লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। রোজ ঘুমোবার আগে ভীষণ ভয় পাওয়া। ধনুক মেরুদণ্ডের সঙ্গে অচেনা রাত্রিযাপন। হেঁট মাথা ক্রমে আরও হেঁট হয়। রোজ তবু ধ্যানে বসা। আত্মপীড়নের শীৎকারে চেতনায় ঘোর লাগে। বিন্দু কুঁকড়ে ওঠে যন্ত্রণায়, আবিষ্কারে। গল্পের কথকও তো বন্ধুর মতোই লিখে রাখছে তার দিনলিপি-শুধু প্রকাশটা আলাদা। কেউ লিখেছে ডায়েরির ঢঙে, কেউ বলছে গল্পের ছলে। অনুভূতির অনুলিপি প্রতিলিপি এভাবেই বেড়ে চলে, বাড়তেই থাকে...

 

গুডনাইট মি. কিসিঞ্জার : আত্মমর্যাদার লড়াই ও শিকড়ের টান

‘গুডনাইট মি. কিসিঞ্জার’ গল্পটির কথক জেমস ডি-কস্তা। হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে তার দেখা হয় আমেরিকার ‘দ্য সলস্টিস’ রেস্টুরেন্টে। আলাপের প্রথম দিনই কিসিঞ্জার জেমসকে, বাংলাদেশকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন, অপমান করেন। বিষয়টি জেমস মেনে নিতে পারে না। ভেতরে ভেতরে তার প্রতিবাদী সত্তা ফুলে ওঠে। গল্পে ফ্ল্যাশব্যাকে অনেক ছোট ছোট ঘটনাপরম্পরা উঠে আসে। তাতে ব্যক্তি জেমসের অজানা তথ্য থাকে, থাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাস।

আমেরিকার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানে জেমস রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী। একটা স্বাভাবিক বিশুদ্ধির প্রবণতা ছিল জেমস চরিত্রের মধ্যে। দেশে কলেজে ইংরেজি পড়ানোর সময় বাথরুম নোংরা বা করিডর অপরিষ্কার থাকলে সে কর্মচারীদের মারাত্মক বকাঝকা করত। তার মনের ভেতরে ছিল সেই সব শিক্ষকদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, যাঁরা আখড়া গড়ে ছাত্রদের ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী হতে প্রশিক্ষণ দিতেন। তার বিষয়ে একটি ছাত্র তাই ফেল করলে কোনো হুমকিতেই সে ভীত হয়ে ছাত্রটিকে পাস করায় না। এই ঘটনা ক্রমে তিল থেকে তাল হয়। তারই অনিবার্য ফলে দেশত্যাগ। রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে তার কোনো সমস্যা হয়নি কারণ, সে খ্রিষ্টান, বাংলাদেশ দিন দিন মৌলবাদী হয়ে যাচ্ছে আর অতীতে তার নিজের সেক্যুলার কাজের ইতিহাস আছে। এসব তো তার নিজের উপলব্ধি, নিজস্ব-যাপনের ঘটনাপরম্পরা। কিন্তু অন্য কেউ সেসব নিয়ে প্রশ্ন তুললে রক্ত যে ছলকে ওঠে। ভোঁতা ছুরিকেও ব্রহ্মাস্ত্র মনে হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কথকের বয়স ছিল নয়। পাকসেনারা তার বাবাকে তারই সামনে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। এই যন্ত্রণার স্মৃতি ভোলার নয়। সেক্যুলার রাজনৈতিক দলে সে নাম লেখায়। ভাবনায় ছিল, একদিন অপরাধীরা শাস্তি পাবেই। কিন্তু পর্যায়ক্রমে দেখা যায়, ঘাতক আর রাজাকারেরাই দেশের মন্ত্রী। রাজনীতি, দেশ, স্বপ্ন, ন্যায়বিচার-এসব নিয়ে জেমসের মধ্যে অনেক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিদেশে দই বছর ভালোই কাটে। আবার সব ওলট-পালট হতে শুরু করে কিসিঞ্জারের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। জেমস অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে জীবনকে দেখেছে, দেখেছে অনেক ভাঙনে, কষ্টাতুর অর্জনে। আদপে দেশকে সে অসম্ভব ভালোবাসে। দেশের শত সমস্যা থাকতে পারে, তবু সে দেশ নিজের। নস্টালজিক ভাবনায় ভর করে ঢাকাতে ফ্ল্যাট নিতে দেশে টাকা পাঠায়। আমেরিকার শত সুযোগ উপেক্ষা করতে চায়। দেশের সমস্ত খারাপের পেছনে কিসিঞ্জারের মতো লোকেরাই দায়ী, এ ধারণা তার বদ্ধমূল। জেমস জানায়-

অনেক শিক্ষিত ব্যক্তির মতো আমিও মনে করি, আমার দেশের ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য হেনরি কিসিঞ্জার অনেকখানি দায়ী। তিনি ঠিক এই গণহত্যার আদেশ দেননি। তবে তিনি তার মক্কেল পাকিস্তানকে এ ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেননি। এবং আমরা জানি, পাকিস্তানের ওপর তখন তাদের অনেক প্রভাব।

মায়া দানবীর সাইরেন বেজে চলে আজও। নাবিকেরা নৌকা ভাসায় ভুল স্রোতে। হোমারের অডিসাসও হেরে যায়। নীল মৃত্যুর আলাপনে। কিছু কথা হয়নি তো শেষ। তীর খোঁজে কেউ একজন। অডিসাসও হতে পারে। চিলি থেকে কম্বোডিয়া পর্যন্ত অজস্র মানুষের অনেক বৈধ ক্ষোভ আছে কিসিঞ্জারের মতো মানুষের প্রতি। একটা যোগ্য জবাবের সংগত প্রতিহিংসা দানা বাঁধতে থাকে জেমসের মধ্যে। জেমস যেন সেই অডিসাস! একদিন রাতে রেস্টুরেন্টে সে সুযোগ আসে। কথার বাণে কিসিঞ্জারকে ধরাশায়ী করে জেমস। বেঁটে নুয়ে পড়া কিসিঞ্জারকে শেষ বিদায় জানায়। দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে ‘গুড নাইট মি. কিসিঞ্জার’ শব্দগুচ্ছে। ডানার শিকড় জন্মায়, জন্মাতে থাকে...

 

ফেরার বছর : সম্পর্কের নতুন রসায়ন ও অধিকারবোধ

দেশ-কাল পেরোতে ফেরাটা বেশির ভাগ সময়েই কঠিন হয়ে পড়ে। আগের অধিকারে পৌঁছাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেক স্বপ্ন নিয়ে শৈশবের শহরে ফেরে আন্দালিব খান। গল্পের কথক। দেশে ফেরার ছয় মাস পর একটি হুমকি চিঠি পায় সে। তিন দিনের মধ্যে ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। না হয় মাথার খুলি উড়ে যাবে। নতুন শহরের নতুন আইন। আসল আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমাজবিরোধীরা নিজেদের স্বার্থে অনিয়মকেই নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। বড় শহরের অন্দরে এ রকম ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক তখন, যখন নিজেরই চেনা শহর এভাবে বদলে যায়। আন্দালিব খান সেই বদলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অসহায় বোধ করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বন্ধু শামীমের শরণাপন্ন হয়। সেই সুবাদে স্কুলবন্ধু বাদশাহর সঙ্গে নতুন করে আলাপ।

হঠাৎ বড় হতে থাকা শহরে বাদশাহরা অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রক। ‘বাদশাহ’ নাম রূপক-সাংকেতিকতায় না বলা বহু কথার ধারক হয়। সে মুশকিল আসান হয়ে উদয় হয়। আন্দালিব খান বন্ধুতার অন্য ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়। বিস্ময়, শিহরণে, নিরিবিলি আজ্ঞায় দুজনের সম্পর্ক গাঢ় হয়। শামীমের সাবধানবাণী আন্দালিবের কানে পৌঁছালেও মননে পৌঁছায় না। এভাবে কেটে যায় আরও ছয় মাস। বাদশাহর আসল রূপ এবার প্রকাশ্যে অসে। আন্দালিবের কাছে সে এক কোটি টাকা ধার চায়। আসন্ন সংকট টের পায় আন্দালিব। আস্তে আস্তে তার কাছে স্পষ্ট হয়, আগের চিঠির মর্মার্থ। বাদশাহই যে আসল নাটের গুরু, তা সে বুঝতে পারে। পরিকল্পিত ছকে আটকে যেতে বাধ্য হয় সে। পাঁচ লাখ টাকা আর লাথি ঘুষির মোক্ষম অস্ত্র গিলে ফেলার পর সে অধিকার ফিরে পাওয়ার পথে অনেকখানি এগোয়। কথকের ভাষ্য অনুযায়ী-

ঢাকা এখন এত বড় যে সম্পর্ক-অসম্পর্কের সকল ঘটনাই এখানে খুব তাড়াতাড়ি মিলিয়ে যায় বলেই হয়তো বাদশহ আর এটাকে টেনে লম্বা করেনি। এখন আমরা শুধু লেনদেনটা সেরেই এগিয়ে চলি, পেছনকে টানি না।

অভিজ্ঞতা মানুষকে প্রাজ্ঞ করে, কৌশলী করে। ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙন, সামাজিক জীবনের ঠোকর আন্দালিবের চারিত্রিক বিবর্তনের ভিতকে পোক্ত করে। সম্পর্কের জারণ-বিজারণ আজ তার কাছে বেশ বোধগম্য। এভাবে মেশাটা বড় বেমানান। অন্ধকার জানে, কতটা জ্যোৎস্না-সীমা। জায়মান স্বপ্ন সব, পিছলে যায় দিগ্বিদিক। উষ্ণতা খোলস বদলায়, অসুস্থ চালাঘর। মুখর নীরবতা ভাঙে ঢেউ, আলস্য অনাবিল। ক্ষোভ চেনে রাত্রির সঙ্গম, অতলের সূচিমুখ। সম্পর্ক রং ছড়ায়, রং আর মায়াজাল। প্রতিধ্বনি থিতোয় কখনো। কখনো সে উজাগর। এভাবে মেশাটা বড্ড বেমানান। জ্যোৎস্না ঠিকই জানে, কতটা তার সীমা।

সামাজিক বিচ্যুতিকে লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন মূল্যবোধের ক্ষয়, বন্ধুতার অবনমন। শহর যখন বড় হয়, তখন যে ব্যাধি পুঁজ-ক্লেদ তৈরি করে তার মধ্যেও চলে অস্তিত্বের লড়াই। আন্দালিব নিউ হরাইজন টাওয়ার্সের অ্যাপার্টমেন্টে উঠে আসে। মা ও সে। মেয়ের সঙ্গে প্রায়ই কথা হয়। মায়ের মাহ-জোংও ঠিকঠাক চলছে। আপাত শান্ত জীবন। সামনে পেছনে মেপে মেপে পা ফেলে আন্দালিব। সে এখন টিকে থাকার সব ক‚টনীতি ছুঁতে পারে। এভাবেই সে নিজের দেশের হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠার চেষ্টা করে অনবরত...

 

রামকমলের উপহার : একটি অসম্পূর্ণ ম্যানুয়াল ও ধারাবাহিকতা

রামকমল একটা রহস্যময়তার নাম। রামকমল একটা অনুঘটক। দোষে-গুণে মিলিয়ে সে একটা ইডিওলজি। সাহিত্য এসবের উৎসবিন্দু। সাহিত্যই তার অবলম্বন। পৃথিবীর অলিখিত সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাসটির গ্রন্থকার হওয়ার দাবিদার সে। নয় মাস সে নিখোঁজ। স্মৃতির ডানায় ভর করে গল্প এগোয়। নেই অথচ আছে, রামকমল নিয়ে এ রকম একটা অনুভূতিতে গল্প বিস্তার পায়। রামকমল ভৌগোলিক সীমা ভাঙার আন্তর্জাতিক রীতিকে প্রাধান্য দিতে চায়। সাহিত্য নিয়ে তার মত স্পষ্ট। মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু তার ভাবনাকে নস্যাৎ করা যায় না। ত্রিশের কিছু কবিতা, ওয়ালীউল্লাহ্ ও জহিরের কিছু লেখা ছাড়া বাংলা সাহিত্য দৈন্য বলে তার মনে হয়। সে ঘৃণা করে আঞ্চলিক অহং, নীতিকথা, আবেগ। সে যে উপন্যাস লিখবে সেই উপন্যাসটাকে আর ঢাকা শহরটাকে এক করে ফেলতে চায়।

শোনা যায় অনেক কথা। কমিউনের ওপর বিরক্ত হওয়ার আগে সে গান্ধীগ্রামে প্রশিক্ষণ নেয়। সেখানকার অনেক ঘটনা ও প্রসঙ্গের প্রতি তার বক্র ইঙ্গিত আছে। বেশ কিছু বছর তার কেটেছে পূর্ব ইউরোপের কিছু সরঞ্জামের পরিবেশক হিসেবে। একটি স্বল্পায়ু বামপন্থী দলের হয়ে হাভানা ও হো চি মিন সিটিতে সে ভ্রমণ করে। এ রকম সব কথা। গল্পের শুরুতে রামকমল চরিত্র সম্পর্কে পাঠকের যে বিদ্রূপাত্মক ধারণা জন্মায়, গল্প যত এগোয় বোঝা যায়, কথক ব্যাপারটাতে বেশ সিরিয়াস। ফলে অবজ্ঞা ক্রমে বিশ্বাসে বদলায়। কথকের প্রশ্নহীন আনুগত্য সে বিশ্বাসকে আরও গভীরতর করে।

উপন্যাস নির্মাণের প্রকল্প এগোয়। নিয়মিত আলোচনার আসর বসে। বাহার, জয়দীপ, শামসু-এ রকম অনেকেই এসে জোটে সে আড্ডায়। ক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী উপন্যাসের কাজের সঙ্গে তারা যুক্ত হয়। তথ্য জোগাড় হয়, কাটাছেঁড়া চলে, রেফারেন্স-ক্রস রেফারেন্স, স্থান, দোষত্রুটি, ঐতিহাসিক পূর্ববর্তিতা নানা বিষয় নিয়ে তর্ক চলে। রোজ রোজ নতুন নতুন ভাবনার জন্ম হয়। রামকমল সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, যে প্রতিদিন স্বপ্ন ফেরি করে আগামীর-যা অভাবিত নতুন অর্থের জগৎ তৈরি করবে। এক বিশ্বকোষ নির্মাণের অংশ হয়ে ওঠে আড্ডার প্রত্যেক সদস্য।

সময়হীন বোধে, ইতিহাসহীন মন্ময়তায় মুক্তি খোঁজা যে নিজেকে ফাঁকি দেয়ার নামান্তর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রামকমল এই বোধ সঞ্চার করে দিতে চায়।

বিশ্বজাগতিক অনাদ্যন্ত কালপ্রবাহের মধ্যে আমাদের অবস্থান ভঙ্গুর ভারাতুর ভীতিময়। আবার একইসঙ্গে রঞ্জিত রহস্যাতুর রতিময়। তার ধারক সেই প্রবাহ হলো বিশ্বকাল। এই কালপ্রবাহে অবগাহন করেই রামকমল তার ইতিহাস-চেতনা নির্মাণ করেছে। আমরা এই প্রজন্ম, আমরা এই সমকাল। আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে গভীর নীলাভ লোভ-লাভ-লিপ্সা। বাইরের পৃথিবীটা যেন উন্মাদের পাঠক্রম, বিবর্ণ, মেকি। ভালোবাসাহীন এমন পৃথিবী সে অবলোকন করে। তার কার্যকলাপ তাই স্বাভাবিক দৃষ্টিতে অগোছালো, বেমানান, অপ্রত্যাশিত মনে হয়। কিন্তু এসবের আড়ালে এক দীর্ঘ প্রভাব কাজ করে চলে নিরন্তর। তার অনুপস্থিতিতেও তার অসম্পূর্ণ ম্যানুয়াল সকলেই তার মতো করে সম্পূর্ণ করতে চায়, বহন করতে চায়, তুলে দিতে চায় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। কথক স্বীকারোক্তিতে জানায়—

আমাদের প্রত্যেককেই আমাদের সেই ম্যানুয়ালটি চর্চার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজতে হয়েছে। জয়দীপ সরাসরি ম্যানুয়ালটিই বাঁচানোর চেষ্টা করল। সে আরও অনেক পৃষ্ঠা লিখল। একটি নতুন অধ্যায়ই লিখে ফেলল। জনশ্রæতি আছে, আমাদের কিছু বিচ্ছিন্ন গ্রুপ তাদের নিজ নিজ ভার্সনের ম্যানুয়াল বের করেছে।

রামকমল যেন প্রয়োজনীয় কাজ সেরে বিদায় নিয়েছে। সে এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। অচেনা ভাঁজে ভাঁজে জড়াই প্রতিদিন। ভেঙে যায় রূপকথা; স্মৃতিমুকুটের যা কিছু সজ্জা। ছুঁয়ে থাকি কালরাত্রি-প্রগাঢ় অমাবস্যা। উদাস করে যে বাউল, বাউলের একতারা। তার কাছে শিখে নেয়া রাত্রিযাপন। যাপনের রং-বদল-যাপনের ষোলোকলা। অন্ধ বাউল হেঁটে যায় নীরব অভিসারে। বাউলি গেরুয়া খুলে যায়-খুলে যায় সব প্রতিরোধ। বিস্মিত মাঠ, খোলা জলছবি, চেয়ে থাকে ঘুমের ভেতর। হেঁটে যায় একাকী বাউল-আদিম মানব। বোঝা যায়, উপন্যাসটি কখনো সম্পূর্ণ হবে না। উপন্যাস লেখাটা তার আদৌ উদ্দেশ্য ছিল কি! তার যা উদ্দেশ্য ছিল তাতে সে সফল। সে বেঁচে আছে তার ম্যানুয়ালের মধ্যে। শুধু বইয়ের পৃষ্ঠারূপে নয়, পথনির্দেশক হিসেবে। বেঁচে আছে প্রাণস্পন্দনসম্পন্ন এক ডকুমেন্ট হিসেবে। অক্ষর বা বর্ণ ছাড়াও যে বেঁচে থাকা যায়, তা সে অলক্ষ্যে থেকেই প্রকাশ করছে। এভাবে রামকমল এক থেকে বহু হয়, হতেই থাকে...

 

এলিফ্যান্ট রোড : আকস্মিক ঘটনাপরম্পরা ও দর্শনগত জারণ

‘এলিফ্যান্ট রোড’ গল্পের বিষয় আপাত তুচ্ছ। অনিন্দ্য এ গল্পের প্রধান চরিত্র। তার মনস্তত্ত্ব গল্পের পরতে পরতে প্রকাশ পেয়েছে একান্ত ব্যক্তিগত উপলব্ধির সূক্ষ্ম সতেজতা বেয়ে। মানুষ যে কখন কী করে, কেনই-বা করে! কখন যে কী ঘটে যায়! অনিন্দ্যর বোঝা, না-বোঝার মধ্য দিয়ে একটা গল্প গড়ে ওঠে। কোনো কোনো ঘটনা আমাদের কুরে কুরে খায়। আবার কোনো আলোকিত ভোরে তা থেকে মুক্তিও মেলে। বিষয়টি অনেক সময়েই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু তার প্রভাবকে অস্বীকারও করা যায় না। এ রকম একটা বিষয় নিয়ে গল্পকে শিল্পগত সাফল্যে পৌঁছে দেয়া সহজ কথা নয়। আনিস সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন দক্ষতার স্বতঃস্ফ‚র্ত সাহচর্যে।

দীর্ঘ বারো বছরের চাকরি থেকে বরখাস্ত হয় অনিন্দ্য। ব্যাংকের হিসাবের সঙ্গে দপ্তরের বিবরণীর গুরুতর অমিলের কারণে এই চাকরি যাওয়া সে মেনে নিতে পারে না। মানসিক টানাপোড়েনের এ রকম চরম মুহূর্তে এলিফ্যান্ট রোডে জনতার তাড়া খাওয়া এক ছেলেকে পা বাড়িয়ে সে ফেলে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই জনতার রোষে ছেলেটির অবস্থা সঙিন হয়ে পড়ে। হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে। অনিন্দ্যর মন এতে অপরাধী হয়। সে ছেলেটির সঙ্গে দেখা করে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে একটা সখ্য গড়ে তোলে। অপেক্ষায় থাকে সুযোগের। ক্ষমা চাইবে বলে। এমনকি তার দোকানে কাজ দেয়ার কথাও সে ভেবে রাখে। কিন্তু ভাবনার সঙ্গে বাস্তব সব সময় মেলে না। ছেলেটি তার আসল পরিচয় ও ঘটনা-বৃত্তান্ত জানতে পেরে উত্তেজিত হয়ে পড়ে ও অকথ্য গালিগালাজে তাকে বিদ্ধ করে। এবং হাতের নাগালে পেলে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। অনিন্দ্য তবু এক মানসিক শান্তিতে পৌঁছায়। কনফেস করার আনন্দ তাকে আরও কনফেসে উদ্বুদ্ধ করে। স্ত্রীকে এখন সে অনায়াসে বলতে পারে তার চাকরি হারানোর কথা। এত দিন উদ্বেগ আর স্নায়বিক চাপে রাতে ঘুমাতে পারত না। আজও ঘুম ভেঙে যায়, তবে এই ঘুম ভাঙা অন্য দিনের মতো নয়।—

চতুর্দিকে অ্যাপার্টমেন্টে ঘেরা সেই ছোট্ট বাগানটার দিকে চোখ রাখল। সে জানে, এই হঠাৎ পাওয়া ধ্যানের স্থানটুকুও হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু এখন অন্তত জায়গাটুকু তার এবং একান্তই তার। অপরিচিত রূপের পেয়ারাগাছটি জ্যোৎস্নার আলোতে এক বৃদ্ধের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে, তাকে সঙ্গ দিচ্ছে এবং এই মুহূর্তে অনিন্দ্যর মনে হলো এটুকুই যথেষ্ট।

ছোট ছোট দুঃখ-কথা নিয়েই তো আমাদের যাপন। হেলানো মিনার থেকে সাদা পালক ওড়ে। পালক ওড়ান গ্যালিলিও। পালক ভাসতে থাকে, ভেসে যায়-ভেসে যায়। গ্যালিলিও পালক খোঁজেন-জন্ম-জন্মান্তর পেরোয়। কার মুখাপেক্ষী সে বাতাস, কোন দিকে তার সঞ্চার! পালক কি আদৌ মাটি ছোঁয়! আকাশ চিরে উল্কারা ঝরে। ভারী বাতাসে ঘর্ষণ অনিবার্য। ঘাসফুল তার সতেজতার দাবি রাখে। পালক তাকে ছোঁবে অনাহত। এভাবেও চলে আত্ম-অন্বেষণ। আসলে, মানুষের জীবনে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যার কোনো সংগত কারণ থাকে না। জীবন তাতে প্রভাবিত হয়। জীবন খাত বদলাতে পারে। দর্শনগত প্রজ্ঞায় বিবর্তিত হতে পারে। সম্পর্কের রসায়নগুলো নতুন সমীকরণে ভিজতে পারে। অনিন্দ্যর উপলব্ধি পাঠককেও ভেজায়, ভেজাতে থাকে...

 

আমার শত্রুরা : ক্ষণস্থায়ী যাপন ও শূন্যতা

কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। অথচ মানুষ সম্পদ আঁকড়ে বেঁচে থাকে। আনিসের সময়-চেতনা, বাস্তব অভিজ্ঞতা, সামাজিক-অর্থনৈতিক ধ্যানধারণা এই গল্পে উঠে এসেছে আধুনিক চিন্তার আলোয়। পৃথিবীতে আত্মকেন্দ্রিকতা সত্য নয়, তা চিরস্থায়ী হতে পারে না। কিন্তু মানুষ উন্মত্ত হয় স্ফীতির আস্ফালনে। যুগের ক্রান্তিকালের দুর্যোগময় আঁধারে একদিন হয়তো স্বার্থকে ছুড়ে ফেলা হবে। একের স্পর্ধাকে পৃথিবী কখনো দীর্ঘকাল স্থান দেয় না। মানবসভ্যতার ইতিহাসে তার ধ্বংস বা পতন অনিবার্য। আবহমান কাল ধরে বিশ্ববিধাতার এটিই অমোঘ নিদের্শ। উবার নগরীর ধ্বংস-ইতিহাস সে কথাই বলে।

শাহবাজ সাহেব তার সম্পত্তি রক্ষা করার মতো যোগ্য উত্তরসূরি রেখে যেতে পারছে না। ছেলে ইমতিয়াজ, মেয়ে সোনিয়া বিশাল সাম্রাজ্য ঘাড়ে নেয়ার মতো যথার্থ নয়। অনেক কথা শাহবাজের মনের ভেতর উদয় হয়। উদয় হয় সান্ত¡নাবাক্যের মতো। দর্শনও বটে! পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট ও দার্শনিক মার্কাস অরিয়েলাস রেখে যান অযোগ্য কমোডাসকে। এক চাষা সৈনিকের নেতৃত্বে আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থ মিঙ সম্রাট নগরীর বাইরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সুনামিতে ভেসে যায় প্রাচীন তামিল নগরী পুম্পুহার। বিদেশি আক্রমণকারীরা মরক্কোর প্রাচীন নগরী সিজিলমাসার সব পিলার ভেঙে ফেলে। ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায় গ্রিক নগরী হেলিক। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর গল্প কে না জানে, অহেতুক এ নির্মাণ, ঘোড়ার ক্ষুরের মতো চলে যায় সময়। কুটি করে ইতিহাস, মর্মরে মর্মরে অট্টহাসি; সব জেনেও বৃহৎ পৃথিবীজুড়ে হায়ার বিস্তার। সমাধিতে সমাধিতে আজ পদচ্ছাপ, জুতোর শ্লেষ। অহং মাড়ায় সময়ের জাদুকর নিশ্চিত কটাক্ষে। টাবুড়ি চরকায় নতুন নতুন নকশা আঁকে। চিল ঠিকই বসে থাকে তার সোজাসুজি ডালে। শাহবাজ সব বুঝেও ঢাকা শহরে সবচেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণ করে। সম্ভাব্য প্রতিযোগীর থেকে জেতার কৌশল আস্তিনে গুটিয়ে রাখে।

মানুষের থাকে সীমাহীন লোভ, শক্তি, মদমত্ততা প্রকাশের ব্যাকুলতা। মানুষের এই খিদে ক্রমবর্ধমান। ক্রমবর্ধমান তার চাহিদা। মানুষের স্বার্থ যত পরিতৃপ্ত হয় ততই বেড়ে চলে তার লোভ। সারা পৃথিবীব্যাপী ব্যাপ্ত হয় সেই লোভ। সমস্ত বিশ্বকে কুক্ষিগত করার সীমাহীন লালসায় এই শ্রেণির মানুষ মত্ত হয়ে ওঠে। সম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী নীতি এভাবেই ক্রমে অগ্রসর হয়। আগ্রাসনের গর্জনে মুখরিত হয় আকাশ, বাতাস, বিশ্ব ধরাতল। শাহবাজ তাদেরই প্রতিনিধি। স্বার্থের সাম্পানে ভেসে যায় সামাজিক সম্পর্ক। ডুবো পাহাড়ের দিকেই ছুটে চলে সে নৌকা। অন্ধ স্বার্থপরতা আঘাত পায় লোভের পাহাড়ে। কৃত্রিম মোহ-তরণী ক্রমে ধ্বংসের দিকে এগোয়। এ কথা সত্যি জেনেও শাহবাজ নির্মাণ করতে চায় প্রতিযোগিতাহীন আধিপত্য যেকোনো মূল্যেই। খোন্দকার তার বিপ্রতীপে তাই সব সময়ই অবস্থান করে।

চারদিকে আনিস টের পান সাম্রাজ্যবাদী লোভের অশুভ ছায়াপাত। তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে তাই সচেতন শব্দদল। তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও একবার উন্মোচিত হয় পাঠকের দরবারে। পুঁজি বৃদ্ধির দুর্দমনীয় নেশায় নেশাগ্রস্ত মানুষেরা তাঁর সমালোচনার লক্ষ্য হয়। পুঁজি কাড়াকাড়ির লড়াইয়ে পাঠক অশুভ শক্তিকে চিনে নেন। নগ্ন এই স্বার্থপরতার প্রবৃত্তিকে শাহবাজ যেন একটা সময় হৃদয়ঙ্গম করে। তাঁর মনে হয়, ভুল ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে অহংকারী সভ্যতা। ধ্বংসের পথ তাতে আদপে প্রশস্ত হয়। এক অন্য সত্য দর্শনে সে ডুব দেয়—

অথচ সেই উবার আজ হাজার হাজার বছরের ওপার থেকে তার সঙ্গে কথা বলছে। ঢাকা শহরে পরের দিনের আলো ফোটা পর্যন্ত তিনি পড়তে থাকলেন সেই উবারের গল্প। সেই হারানো কাহিনি শাহবাজ সাহেব ও তার নিঃসঙ্গ নির্জীব তলিয়ে যেতে থাকা চেষ্টাগুলোকে যেন আবার বাঁধতে শুরু করল সমগ্র মানবতার অপরিমেয় ইচ্ছার সঙ্গে।

গল্পের শেষে শাহবাজ এক শূন্যতার উপলব্ধিতে পৌঁছায়। সে শূন্যতার এক খেয়ালি রং আছে। রঙের ভেতরে ডুবসাঁতার। সাঁতারে সাঁতারে শূন্যতার আর এক সিঁড়ি। ওপারে ছায়াঘুম। এপারে মৃত্যুঘুম খেলা করে। চু-কিত-কিত... চু-কিত-কিত... ফাঁকা একা ঘুরে ঘুরে ফেরা। ধূসর বাউল মন-মনেতে একতারা। শূন্যতার সত্যিই এক হেঁয়ালি রং আছে। রঙের ভেতরে ডুবসাঁতার। সাঁতারে সাঁতারে আর এক রামধনু পথ। সিঁড়িহীন শূন্যতা ও অন্য কথন।

 

ছোটগল্প তাৎক্ষণিক তীব্র আবেদন সৃষ্টির মাধ্যমে গভীর গভীরতর অনুভূতিবোধের জন্ম দেয়। সূক্ষ্ম জীবনবোধের শিল্পরূপ আর ভাবের তীক্ষ্ণতার সাহিত্যরূপই তো ছোটগল্প। এই মাধ্যম সজীব-প্রাণবন্ত, সর্বাধুনিক, গতিশীল ও প্রার্থিত। আনিসের গল্প পড়তে পড়তে এই ভাবনাগুলোরই অনুরণন চলতে থাকে। মনে হয়, সীমাহীন সুতোয় বেঁধেছ অতঃপর। কত বিমর্ষ মুহূর্তে জড়িয়েছ কথা। কত কিছু লিখে ভুলে গেছ তবু। সম্পর্ক বেড়া ভাঙে, স্মৃতি-রসায়ন।

নয়টি গল্প একনিশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়। কোনো কোনো গল্প নভেলেটের ছায়াকে ধারণ করলেও আদপে ‘গুডনাইট মি. কিসিঞ্জার ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থটি ছোটগল্পেরই আকর। এর প্রতিটি গল্প একটিমাত্র এপিসোড বা অভিজ্ঞতার সাহিত্যরূপ। জীবনের কোনো এক সন্ধিক্ষণ থেকে বিদ্যুচ্চমকের মতো তার যাত্রারম্ভ। ছেঁড়া পাতা জড়ো হয় ঘরের কোণে। অবিরাম ছবি ভাসে, ছবি আনমনে। বোধ ও বোধির ঘরে আসা-যাওয়া ফাঁকে। যন্ত্রণা রূপ পায় চেনা অভিমানে।

গঠনশৃঙ্খলায় গল্পগুলো সুস্পষ্ট। অভিপ্রেত ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ফসল। মহামুহূর্ত নির্মাণে আনিস দক্ষ। সে কারণে গল্পগুলো পড়তে গেলে নির্ভেজাল টান টান একটা উত্তেজনা কাজ করে। কোথাও পাঠক একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হন না। ঘটনা ও চরিত্রের রূপায়ণে একটি বিশেষ তুঙ্গ চূড়ায় যে ব্যঞ্জনা প্রত্যাশিত, তা আনিসের গল্পে বর্তমান। সীমাহীন সুতা তাকে বেঁধে রাখে অতঃপর। তাঁর ছোটগল্পের অনিবার্য গতি সংযত, ঘনসংবদ্ধ ও একমুখী। একধরনের নাটকীয়তা আছে তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্পে, যা পাঠককে হঠাৎ ঝাঁকুনি দেয়। ভাষার সুসংহত, সংযত, সংকেতময় ও সচেতন ব্যবহারে সে ঝাঁকুনি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠিত। আনিসের ব্যক্তিগত দর্শনচেতনা, স্বপ্ন-অভিপ্রায়ের বীজ লুকিয়ে আছে এই গ্রন্থে। কখনো কখনো দু-একটা আঁচড়ে তা চরমকে ছুঁয়েছে। এসব তো গেল কেজো কথা, প্রচলিত ভাবনার আলোয় আনিসকে একঝলকে বুঝে নেয়া। কিন্তু আনিসের গল্পের আসল ম্যাজিক অন্যত্র।

আলোচনার শুরুতে চেনা ভূগোলের মধ্যে বিস্তৃতির অনুষঙ্গের কথা বলেছিলাম। গল্পগুলো আন্তর্জাতিক সত্তায় নিজেকে মিশিয়েছে উপস্থাপনার মুনশিয়ানায়। ইংরেজি গল্পের সেই অনায়াস সিদ্ধি, মুহম্মদ মুহসিনের অনুবাদের ঘটকালিতে এতটুকু টাল খায়নি। অনেক সময়েই গল্পগুলোর বিষয় আপাত তুচ্ছ। আনিস সেখানে ম্যাজিশিয়ানের মতো না থাকা অস্তিত্বকে অবলীলায় নির্মাণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে মনে হয়, গল্পকারের এ এক সহজাত ক্ষমতা, যা তাঁর গল্পনির্মাণকে নিরবচ্ছিন্ন করতে পারবে। কিছু গল্পের মধ্যে লুকিয়ে আছে নভেলেট বা উপন্যাসের বীজ। এ বীজ থেকে মহিরুহের জন্ম অসম্ভব নয়। চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চরিত্রের মনস্তত্তে¡র স্তরকে সকলে ছুঁতে পারেন না। আনিস পারেন। এ ছাড়া গল্পের অন্দরে ডুব দিলে লেখকের ব্যক্তিগত পড়াশোনার পরিধি বেশ টের পাওয়া যায়। সেখানে তিনি ঈর্ষণীয়। দেশের বা বিদেশের প্রেক্ষাপট বাস্তবোচিতমাত্রায় আনিস যথার্থই তুলে ধরেছেন। এত কিছুর পরও ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, আনিস যদি এই গল্পগুলো ইংরেজিতে না লিখে সরাসরি বাংলায় লিখতেন, তবে কেমন হতো সে গল্পের স্বাদ। আনিসের স্বপ্নের ভাষা তো বাংলাই। সুমুদ্রিত, প্রায় নির্ভুল প্রুফের এই বই বাংলা সাহিত্যে সুবাতাসের বার্তাবাহক, এ কথা আলাদা করে বলার কোনো মানে নেই। ব্যক্তিগত পাঠই শেষ সিদ্ধান্ত নেবে। শুধু এটুকু বলার, পাঠকের ঠকার কোনো ভয় নেই।

চারদিকে অবরুদ্ধ বাতাস, মৃত যৌনতার জোনাকি মরীচিকা। শীতল শ্যাওলা-জন্ম। ঘর খোঁজে প্রবেশের পথ। পথ বলে চিহ্ন রেখে কী লাভ! নিয়মের হাতুড়ি গর্জায়, রোমান্টিকতা ভেঙে চুরচুর। বারোজ লেখেন ‘কাটআপ মেথড’, জলজ কোলাজ। দিশাহীন, আলোহীন তবু এ জোনাকিযাপন। আনিস সেই জোনাকিযাপনের দোসর।

আরও পড়ুন :

জীবন লিখতে লিখতে | জহর সেনমজুমদার 

ক্ষমতার পঠন : ইতিহাস আর উপন্যাসের বোঝাপড়া | সুমন রহমান

স্বপ্ন নেই, আশাভঙ্গও নেই | সেবন্তী ঘোষ 

বি-উপনিবেশায়নের জ্বালামুখ | হামীম কামরুল হক 

দোটানার বৃত্ত | আফসানা বেগম 




//জেডএস//

লাইভ

টপ
X