সৃষ্টিশীলতা ও আনুষঙ্গিক ভাবনা

Send
বিপাশা বিনতে হক
প্রকাশিত : ১১:০০, অক্টোবর ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৪, অক্টোবর ৩০, ২০২০

 

প্রসঙ্গ : সৃষ্টিশীলতা

শুরু থেকেই শুরু করি—নীল নদের উৎস খোঁজ করে পাওয়া গেলো শূন্য উদ্যানে দু'ফোঁটা কাদাপানি। ব্যাস, এটুকুই। বিন্দুবৎ এই শুরুটা ধরে নীল নদ চিরকাল যা, আজো তা। সৃষ্টিশীলতার উপমা হতে পারে নীল নদ উৎস থেকে মোহনায় পৌঁছনো পর্যন্ত। আবারো বলা যেতে পারে শীতে প্রকৃতির কুঁকড়ে যাওয়া রূপের কথা, যা বিকর্ষক ও নির্জীব। তাহলে শীতঘুমের ভান ধরে প্রকৃতি কি কেবলি স্থবির ছিল? বোধ হয় না। তাই যদি হতো তবে বসন্তে এত রঙবাহার এলো কীভাবে? বসন্ত যদি হয় সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ, শীত তবে সৃষ্টশীলতার সূতিকাগার।

বলে নিচ্ছি, সৃষ্টিশীলতার বিষয়টি অঙ্ক মিলিয়ে দেয়ার মতো না, একে বলতে ও বুঝতে হয় রূপকে, উপমায়। মনের কোন অবস্থাটা সৃষ্টিশীল? এটা কি কেবল মানস-নির্ভর নাকি জীবনজাত অভিজ্ঞতা? নাকি এ দুটোর সংমিশ্রণ? কী এর মাল-মসল্লা? হতে পারে যে এখানে একটি সৃষ্টিশীল মন প্রয়োজন।ধরে নিলাম, নির্দিষ্ট এই মনটির গভীর বোধ রয়েছে। মনের আয়নায় যা কিছু ফুটে উঠছে, তাকে ঘিরে যেখানে যা হচ্ছে, (তা যতই অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন), তা থেকে বাছাই করা জিনিস তার ঝুলিতে টুকে রাখছে। এ নিয়ে হয়তো পরে সে চিন্তা ভাবনা করবে, সময় এলে। সেই, ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো '…স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অব পাওয়ারফুল ইমোশনস, …রেকালেক্টেড ইন ট্রাংকুইলিটি' ঘটছে তার। সেই মনটি জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাত নিজের ভেতর ধারণ করছে এমনভাবে যে তা তার মানসপটে নিরন্তর বিক্রিয়া করছে। এসবের জগাখিচুড়ি পাকিয়ে তার মধ্যে ধীরে ধীরে একটা অস্থিরতার সৃষ্টি হচ্ছে।

এতসব অস্থিরতার গূঢ় আভাস পাওয়া যায় জীবনানন্দের ‘যেই সব শেয়ালেরা’ (অগ্রন্থিত) কবিতায়। কবি বলছেন, ‘আমার নিরভিসন্ধি কেঁপে ওঠে স্নায়ুর আঁধারে’; আঁধার কেন? অবচেতনে সঞ্চিত দীর্ঘদিনের বিস্মৃতি স্নায়ুর আঁধারই তো হয়ে যায়! যে স্নায়ু আমাদের শরীর পরিচালনা করে; সচল রাখে দেহঘড়ি সে বিদ্যুৎবাহী, তাকে বলা চলে শুক্লপক্ষের স্নায়ু—অভিসন্ধিতে সে জারিত হয়। আর কৃষ্ণপক্ষের স্নায়ু? অবচেতনে, নিশ্চেতনে, নির্জ্ঞানে তিলে তিলে জমা পড়া স্মৃতির ফসিল সে। নিরভিসন্ধিতে সেই স্নায়ুর আঁধার কেঁপে ওঠে। এ যেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন নিজের সঙ্গে নিজের দেখা মেলে। জ্বলে ওঠে লাইট! শুরু হয় ক্যামেরা! অ্যাকশন!

আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাই; সংকটময় যেসব পরিস্থিতি সৃষ্টিশীল মানুষটি পার করছে, তা তাকে বিচলিত করছে, সে যতভাবে পারে সেগুলো মোকাবিলা করছে, অন্তঃস্থলে ধারণ করছে; হতে পারে এসব তাকে অস্থির করছে না। বরং, তাকে অস্থির করছে তার সৃষ্টিশীল মন—তার স্নায়ুর আঁধারে কেঁপে ওঠা নিরভিসন্ধি। মনের সচেতন স্তরে সে এখনো জানে না অবচেতনের এই অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ কীভাবে হতে পারে। তার সচেতন ও অবচেতনের মাঝে এখনো একটা দূরত্ব রয়েছে। এই দেউড়ি পেরোনোর আগে এভাবে চলছে কিছুকাল। মনের এই হইবারনেশনের সময়কালটাকে ধরে নেয়া যায় প্রকৃতির শীতকাল হিসেবে। এমনও হতে পারে, সে বেমালুম বেখবর তার ভেতরে এত যে আজগুবি ঘটনা ঘটে চলেছে—মোটের ওপর, কীসের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

অন্তর্জালে ঘরে যাওয়া এত কিছুর প্লট টুইস্ট আসতে পারে এভাবে— দূরে কোথাও সানাই বেজে উঠলো, অমনি হুড়মুড় করে বাঁধভাঙা জলের তরঙ্গ জেগে উঠলো, কোথাও যেন অন্তঃসলিলাটা চালু হয়ে গেলো! সে ভাবলো আরে! এখনই বুঝি এই তন্দ্রাঘোর কাটার সময়! তার সেই অস্থিরতা তখন তুঙ্গে —হাত-মন নিশপিশ করছে কিছু একটা করতে-কিছু একটা সৃষ্টি করতে! হ্যাঁ! কথাটা এমনি যে তার সৃষ্টিশীল সত্তা আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। এমনও হতে পারে, বহিরাঙ্গে সে ভাবছে তার জীবন, জীবনদর্শন, জানাশোনার গণ্ডি এতই সীমিত যে তা বলার মতো না—অন্তরালে সে কিছু বলতে চায়—অজান্তেই তার হাত চলে যাচ্ছে টেবিলে—কাগজ কলম কালির দোয়াতে ভর করে সে ঢুকে পড়ছে রূপকের অত্যাশ্চর্য জগতে—যা বলছে যা করছে তা নিজেই একটা মাইক্রোকসম তৈরী করছে—তাকেই একটা অল্টারনেটিভ রিয়্যালিটি দিচ্ছে। এই অল্টারনেটিভ রিয়ালিটির হাত ধরে সে খুঁজে ফিরছে রিয়্যালিটি। এখন সে জাগতিক জীবনকে দুইটা ডাইমেনশন দিচ্ছে; একটা রিয়্যালিটি  আরেকখানি তার বিপরীত—অল্টারনেটিভ রিয়্যালিটি। জাগতিক মানে প্রাত্যহিক জীবনে সে থোড়-বড়ি- খাড়া কিন্তু অল্টারনেটিভ রিয়্যালিটিতে সে হয়ে দাঁড়াচ্ছে খাড়া-বড়ি-থোড়। এই দুই অবস্থার সম্মিলনও করছে সে।

আবারো রূপকের জগতে ঢুকে বলছি, সৃষ্টিশীলতা এক ধরণের ধাঁধা মেলানোর মতো। কোন টুকরোর সাথে কোন টুকরো জুড়তে হবে, চেষ্টা তদবির করে তা খুঁজে বের করতে হয়। সৃষ্টিশীল মন এই খোঁজাখুঁজির ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে গন্তব্যে পৌঁছনোর চেষ্টায় ব্যস্ত—অনেকটা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে জেল পালানোর চেষ্টার মতো! অন্য কথায়, পথ ও পথিকের মেটাফোরে বলা যায় এটা একটা পথ, এর গন্তব্য তুষারে মোড়া পর্বতশৃঙ্গ হলেও হতে পারে।সেখানে পৌঁছনোটা মুখ্য নয়, সৃষ্টিশীল মন পথ নিয়েই মহাব্যস্ত। এই পথে সে কখনো হতাশ, কখনো উচ্ছ্বসিত, কখনো দম নিচ্ছে গাছের ছায়ায়, কখনো পানির অভাবে তার ছাতি ফেটে চৌচির। এসবের মধ্যে তার চোখ একই সঙ্গে স্থির ও ব্যপ্ত। অন্তর কখনো নির্মোহ ও নির্বিকার, কখনো আষ্টে-পৃষ্ঠে আমিত্বে ঠাঁসা! বাঁধাধরা সময়কে বালুঘড়িতে ধারণ করেও হয়তোবা এভাবে সে পেরিয়ে যায় কালের সীমানা—আশা এই, মিললেও মিলতে পারে আরাধ্য পরশপাথর।

সৃষ্টিশীল মনের দুটি চরিত্র পাওয়া যায়: সে একাধারে কথক ও সম্মোহক। যে মাধ্যমে তার সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ হবে, তা যে কোন কিছু হতে পারে! এমন না যে, কবিতা লিখতে হবে তাকে, বা জাদুকরী ছোটগল্প। একটা করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে ধাঁচের তাগিদ তার ভেতরে বল্কাতে থাকে, থাকে কালোত্তীর্ণ কিছু করে যাবার খায়েশ। এই তাগিদকে কিছু আগে বলা তুষারে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গের সাথে তুলনা করা যায়—সেটা যদিও একটা গন্তব্য, সেখানে পৌঁছনোর তাগিদে সে তার তাবৎ জীবন হাতের মুঠোয় বাজি রেখে লড়ে যাচ্ছে। তার তাগিদ তাকে সম্মোহিত, আচ্ছন্ন করে রেখেছে, আর সে অনন্যোপায় হয়ে অন্যদের বলছে তার সম্মোহনের কথা, তাতে অন্যরাও সম্মোহিত হচ্ছে আর অজান্তেই ফেঁসে যাচ্ছে কথকের সৃষ্টি করা এই অল্টারনেটিভ রিয়ালিটির বুবি ট্র্যাপে ভরা খাস জমিনে।

তাহলে এখানে কথক কে? ঘটনার সোজাসাপ্টা বিবরণ নাকি তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য? আমরা দু'টাই চাই। 'পারসোনা' মেটাফোরে বলা যায় প্রতিটি কাজের একটা চরিত্র তথা পার্সোনালিটি রয়েছে, যেন চরিত্রগুলো নিজেরা ঠিক করে দেয় তার বর্ণনা/ম্যানিফেস্টেশন কেমন হবে। অন্য কথায়, চরিত্রেরা নিজ তাগিদে কথককে দিয়ে বলিয়ে/করিয়ে নেয় ওরা কী চায়, কী বললে/করলে ওরা খুশি হবে। কাজের মাঝে বুঁদ হয়ে থাকা কথক টেরও পায় না যে তার তৈরী পাত্র-মিত্রেরা এখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা ঘটনার প্লট সাজাচ্ছে, কে কী হবে সেই কুশীলব বাতলে দিচ্ছে। কোন চরিত্রটা রাউন্ড হবে আর কারা ফ্ল্যাট থাকবে সেসব ওরা জানে। মোদ্দাকথা ওরা ওদের মনমতো সব ঘটিয়ে নিচ্ছে কথককে দিয়ে। এরা এও ঠিক করছে এর ন্যারেটিভটা কেমন হবে। কেউ ভাবে কথক হবেওবা একজন আউটসাইডার, যার কাছে জাত-বেজাতের ইনসাইডার ইনফরমেশন রয়েছে। কথক আউটসাইডার হোন কি ইনারমোস্ট বিয়িং হোন, তিনিই তার পাওয়ারহাউস, তার নিরভিসন্ধিতে জমা রয়েছে বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন বছরের মহাজাগতিক স্মৃতি; এগুলোরই খুচরা আভাস সোনালী ধুলোর স্তরে জমে ওঠে তার সৃষ্টির পরতে পরতে। মানবীয় সীমাবদ্ধতার ছকে যাপিত জীবনে স্বয়ং কথকও পারঙ্গমতার প্রতিভূ হয়তো না; তার কাজ কেবল ধারণ করা, আর ছাপিয়ে যাওয়া।

পরিশেষে, যদি শুরুর কথায় ফিরে যাই, সৃষ্টিশীলতার আদিতে আমরা নীল নদকে দেখতে পাবো। উৎসের সন্ধানে এর দু'ফোটা কাদাগোলা জল ছাড়া কিছু নেই—না এ কোন হ্রদে জন্ম নিয়েছে, না উত্তুঙ্গ গিরিগৃহ হতে বরফ গলে ঝর্ণাধারায় নেমে এসে শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে গিয়ে মোহনায় মিলেছে। এরকম আনঅর্থডক্সভাবে শুরু করেও সনাতনী নদীর সব ক্রাইটেরিয়া পরিপূর্ণ করে শেষ অবধি সে পুষ্ট করেছে সভ্যতা। সঞ্জীবিত করেছে মরু। মানবের যাবতীয় সৃষ্টিশীলতা হয়তো ঘুরে বেড়াচ্ছে অভিসন্ধিমূলক ‘আমি’টিকে নিরভিসন্ধি ‘আমি’র কাছে পৌঁছে দেওয়া। সৃষ্টিশীলতা যেন মনের এই নিরবিচ্ছিন্ন মায়াবাস্তব অবস্থা; নিজে নিজেই এমনি একটা প্যারাডক্স সে।

প্রেম-ভাবনা

আমার মনে সচারচর আদিখ্যেতা আসে না প্রেম-ভাবনা এলে। প্রেমের প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে গেলেই, আমি আমার পারসোনা থেকে বের হয়ে অসমোসিস হয়ে গিয়েছি। আমি কখনো এই দ্রবণের দ্রাবক, কখনো দ্রাব্য, কখনো তলানি হিসেবে পেয়েছি নিজেকে। যা বলছি তা বলতে চাইনি, আবার চেয়েছিও। প্রেম বিষয়টি তার বিমূর্ততায় হয়ে পড়েছে একটা ম্যাগনেটিক ফিল্ড—যতটা টানে, ততটাই দূরে ঠেলে দেয়।

প্রেমের প্রসঙ্গ আমাকে অস্তিত্বসংকটে ফেলে দিয়েছে। যেন প্রেমের হাত ধরে আমি স্লিপওয়াকিং করে আমার থেকে বের হয়ে গলে গলে ঢুকে পড়ছি তোমার ভেতরে। তোমার ভেতরে ঢুকে গিয়ে আমি কিন্তু তুমি হয়ে যাচ্ছি না, তোমার মনের সেই অংশটা হয়ে যাচ্ছি যেটা দিয়ে তুমি আমাকে দেখছো, আমার কথা ভাবছো, হয়তো আমাকেই ভালোবাসছো। এই ভালোবাসাটা একক কোনো ধ্রুব অবস্থা নয়, এর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে দ্বৈতসত্তা রয়েছে। এ বাইনারি স্বভাবে আমি কখনো আবেগতাড়িত, কখনো সন্দিহান, কখনো কী বলছি—কী বলছি না তার সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণাই নেই—মোটের ওপর কখনোই নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরছি না। যেমন, কখনো এমন হয়, আমি তোমার বন্দনা করার মাঝেই রেশনাল, প্রাকটিক্যাল হয়ে যাচ্ছি। আবার সেই প্রাকটিক্যাল দুনিয়ার কড়াকড়ি হিসেবের মধ্যে আবারো ফিরে আসছি মূল বিন্দুতে যেখান থেকে তোমার বন্দনা শুরু করেছিলাম, সেখানে; তোমাকে নিয়ে অলীক বুদ্বুদে চড়ে শূন্যে রওনা দিচ্ছি।

কখনো এমন হচ্ছে যে প্রগলভতার মাঝে হঠাৎ মুখচোরা হয়ে যাচ্ছি—ভীরু, সতর্ক পায়ে তোমার পিছে এসে দাঁড়াচ্ছি, যেন তোমাকে ছুঁতে আমার সংকোচ হচ্ছে। শুরুটা কখনো আবার উল্টা, একদম কাপুরুষতায় ভরা, আস্তে আস্তে সাহস তৈরী করছি নিজের ভেতর, যেমন 'ইলিয়াড' এর যুদ্ধে যাবার আগে আয়োজন করে যুদ্ধাস্ত্র গায়ে চাপানোর দৃশ্য—একে একে নিজেকে এটা-সেটায় সাজাচ্ছি। মনের এই অবস্থায় তোমার কাছে যাওয়াটা কেবলি আয়োজনসর্বস্ব, নিজেকে সাজিয়ে গুজিয়ে উপস্থাপন করাটা যেন মুখ্য, এটা যেন নীলবসনা রাধিকার কুঞ্জবনে কানুর কাছে অভিসার! কখনো এমন হচ্ছে যে তুমি আমার অবসেশন—আমার মাঝে তুমি ভর করছ। আমি ভয় পাচ্ছি—তুমিও টের পাচ্ছ আমার ভয়, আমাকে সাহস জোগাতে গিয়ে তুমি আমার ভয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছ। ভরা জোছনায় আমি দেখছি অমাবস্যা! যেন 'এ পৃথিবী একবার পায় তারে পায়নাকো আর' (জীবনানন্দ দাশ)।

এমনও হয় আমি তোমার ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল হয়ে যাচ্ছি, পারফেকশনিস্ট ভাব পেয়ে বসছে আমাকে, আমি তোমার মাঝে সেই আদর্শজন খুঁজছি যেটা তোমার মাঝে আছে আবার নেই। আমি তুমি যা না, সেগুলোকে মেনে নিচ্ছি আবার নিচ্ছি না। উল্টোটাও হচ্ছে, আমি যা না, তাই হয়ে যাচ্ছি! বইয়ে পড়া কোনো একটা চরিত্র হয়ে গিয়ে অন্য কোনো বইয়ে পড়া পছন্দের কোনো একটা চরিত্রের আদল তোমার মাঝে দেখতে চাইছি। কখনো আমি কম্প্রোমাইস করছি, আর সেটাকে গ্লোরিফাই করছি; কখনো তোমাকে বাধ্য করছি কম্প্রোমাইস করতে। আমি ডিমান্ডিং হয়ে যাচ্ছি, তোমার মধ্যে সেই সব 'আদর্শ' ট্রেইট নেই কেন তা খুঁড়তে গিয়ে মাথা ঠুকছি ক্ষুব্ধ আক্রোশে, এর উল্টোটাও হচ্ছে, তুমি ডিমান্ডিং হয়ে যাচ্ছ। আমি চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ছি, পরক্ষণে কোমরে গামছা বেঁধে তুমি যা আর যা না, তা মেনে নেবার প্রচণ্ড তাড়নায় ছুটে যাচ্ছি তোমার ঘাট বরাবর। তোমার ফ্যান্টাসি, তোমার শিভ্যালরি, তোমার কাওয়ার্ডিস, তোমার মিডিওক্রিটি, তোমার মধ্যে যে কোড হিরো থাকে, তাকে আমার অল্টারইগো হিসেবে পোর্ট্রে করছি।

কখনো এমন হচ্ছে না যে আমি নারী হয়ে তোমার কাছে যাচ্ছি, আমি তোমার সমান একজন মানুষ হয়ে তোমাকে ভালোবাসছি। তোমার পুরুষ অস্তিত্বকে নয়, তোমার মানুষ অস্তিত্বকে একজন মানুষ হিসেবে ভালোবাসছি। সাদামাটা জীবনে আমি প্রেম আর ভালোবাসার মধ্যে একটা পার্থক্য টেনে দিচ্ছি। ভাবছি যে প্রেম হয় বইপত্রে। সেটা করতে খাটুনি আছে। স্বাভাবিক অবস্থায় পুরোপুরি সেটা করে ওঠা যায় না। সেটার বেশিরভাগ কাজ-কারবার মনের মধ্যে, আর কাগজপত্রের মাঝে সীমাবদ্ধ। যেমন ধরো গল্পের চরিত্রদের প্রেম হয়। আমাদের হয় ভালোবাসা—মধ্যবিত্ত ধরণের ভালোবাসা। বাড়াবাড়ি নেই, নির্মেদ, ছিমছাম, মিনিমালিস্টিক। এতে চাওয়া-পাওয়াগুলো আয়ত্তের মধ্যে থাকছে, বোঝা যাচ্ছে কী হচ্ছে, কী হচ্ছে না। বিস্তর বই না পড়লেও চলছে, গুগল করলেই দরকারি অনুভূতির একটি মানানসই ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। পাড়ার দোকানে গেলে পকেটখরচের পয়সা দিয়ে একটা কার্ড, গানের সিডি কেনা যাচ্ছে। রিকশায় চড়ে বেড়ানো যাচ্ছে, টঙের দোকানে চা-পুরি-সিঙ্গারা খাওয়া যাচ্ছে। দুমদাম অভিমানে মন পোড়ানো যাচ্ছে, টেক্সটের পর টেক্সট করে সেসব মিটমাট করে ফেলা যাচ্ছে।

বিমূঢ় রক্তের উত্তেজনায় পাখি যেভাবে পাখিনীকে পায়, এভাবেও বুঝি তোমাকে পাওয়া যায়:

'শুধু অন্ধকারে বাবলাফুলের গন্ধ যখন পাই

কিংবা কখনও-কখনও গভীর রাতে ঘাস মাড়িয়ে

তারার আলোয় সেই ব্যথিত ঘাসের শব্দ যখন শুনি

রক্তের বিমূঢ় উত্তেজনায়

তখন তোমাকে আমি পাখির কাছে পাখিনীর মত পাই।' (জীবনানন্দ দাশ)

কখনো আমার আত্মিক পৃথিবীর বিপরীতে বাণিজ্যিক পৃথিবী তুমি। এই বাণিজ্যিক পৃথিবীর শ্লেষ, কাঠিন্য, ঘৃণা কুঁকড়ে দেয় আত্মিক পৃথিবীকে। এ কি কোনো সমাপতন—যে তুমি একই সাথে মরমী, বিধুর, ও নির্জন?   

গবেষণার চাঁচাছোলা ভাষায় বলা যায়—প্রেম যদি একটা ভ্যারিয়েবল হয়, আর তোমার জীবনের অন্যান্য অবস্থা কনস্ট্যান্ট থাকে, তাহলে, প্রেম এমনই এক অনুঘটক তোমার জীবনের অন্য সব তথাকথিত কনস্ট্যান্ট অবস্থায় কেরোসিন ঢেলে দেবে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে কচি পাতা, সরস ভূমি। তোমার হাইপোথিসিস ভুল প্রতিপন্ন হয়ে যাবে যদি তুমি ধরে নাও তুমি প্রেমে পড়বে আর এটা তোমাকে আমূলে পাল্টে দেবে না! প্রেম এতটাই স্টাটিস্টিক্যালি সিগনিফিকেন্ট যে তুলনামূলক বিচারে এর সঙ্গে অন্যান্য ভ্যারিয়েবল নাড়াচাড়া করলেও তা হয়তো ধোপে টিকবে না। কার্যকারণ সম্পর্কের বাগধারা ভেঙে, ক্লান্ত জীবনে চৌকাঠ মাড়িয়ে শিল্পের শুদ্ধ আগুনে জারিত হবার এই মন্ময়তায় কেন যেন তোমার সঙ্গে দেখা মিলে ঘোরানো সিঁড়ির বাঁকে! যুক্তিবিজ্ঞানে পড়েছিলাম লজিকের ফ্যালাসি, 'এর পরে ঘটেছে, সুতরাং এর জন্যই ঘটেছে'—তাই হবে, তাই হবে!

প্রেম-ভালোবাসার ক্লাসিকাল আর উত্তরাধুনিক এই দুইটা ফর্মুলায় তোমাকে খুঁজে ফিরছি। যেমন মধ্যযুগীয় নাইটদের হোলি গ্রেইল কোয়েস্ট এর আধুনিক ভার্সন এটা। জঙ্গের ময়দানে, যজ্ঞের আহুতিতে, টঙের দোকানে, উপাসনালয়ে, দেশি চাইনিস রেস্টুরেন্টের ডিমলাইটের আলোতে দেখছি তোমাকে। তোমাকে পাবার মানত করে দরগায় দরগায় শিরনি দেয়া, মোমবাতি দেয়া, এগুলো করছি। আমার তোমাকে ভালোবাসতে হয় নিজের সবচেয়ে ভালো জামাটা পরে, খুব নরম করে, যেন তুমি চাইনিস পোর্সিলিনের পুতুল—প্রেশাস, রেয়ার। কখনো এমন হচ্ছে যে আমি বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছি, ডেসপেরেট হয়ে ভাবছি—নাহ! আর কত। তখন ভাবছি যে তোমাকে পাওয়া না পাওয়ায় তেমন ফারাক পড়ে না। মন থেকে তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অন্য কোনো কাজ খুব মন দিয়ে করতে শুরু করছি, কিন্তু ভণ্ডুল হয়ে যাচ্ছে সব। মনে মনে যোগী হয়ে হিমালয়ে চলে যাচ্ছি, বেনামা ব্রহ্মচারী হয়ে আশ্রমবাসী হয়ে যাচ্ছি বা বাউল হয়ে নদীর পারে একতারা বাজাচ্ছি।

এমন অবস্থায় প্রেমের সাথে বিরহ ভাবনা অযাচিতে চলে আসছে। আমি প্রেম বাদ দিয়ে বিরহ নিয়ে পড়ে থাকছি। সান্ত্বনা দিচ্ছি নিজেকে। ফ্রয়েড পড়ছি। 'মেঘদূত' পড়ছি। 'কশ্চিত্ কান্তাবিরহগুরুণা স্বাধিকারাত্প্রমত্তঃ/ শাপেনাস্তঙ্গমিতমহিমা বর্ষভোগ্যেণ ভর্তুঃ' অর্থাৎ, 'বধূ-প্রেমমধুমত্ত যক্ষ হেলা করি নিজ কাজে, /কুবেরের শাপে বর্ষ যাপে সে নির্বাসনের মাঝে।', (অনুবাদে নরেন্দ্র মিত্র)। তবে তো কুবেরের শাপেই 'ওয়েইস্ট ল্যান্ড' পড়ছি, এর মাঝে নিজেকে চর্বিত চর্বন প্রুফরক (লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফরক) হিসেবে দেখছি। মালার্মে, বদলেয়ার, রিলকে পড়ে ফ্রাগমেন্টেড হয়ে যাচ্ছি, নিজেকে স্যাচুরেট করছি, ডাইলুট করে ফেলছি। কাফকা, কাম্যুর মতো এক্সিস্টেনশিয়াল আইডেন্টিটি ক্রাইসিস জেঁকে ধরছে আমাকে। পরক্ষণে হাফিজ, মীর ত্বকী মীরে ধ্যান দিচ্ছি। সুফী দর্শনে বুঁদ হয়ে মাওলানা রুমির আধ্যাত্মিক মতাদর্শকে মানবীয় ভাবনার তুঙ্গ বিবেচনা করছি। মধ্যে মধ্যে রাধারমণ, হাসন রাজা, লালন ভাবনায় ভাটি দেশের কমলার উজানে ভাসার দিন গুনছি। জীবনানন্দে ডুব দিয়েই ভেসে উঠছি রবীন্দ্রনাথের গানে। দুমদাম মান্টো চলে আসছে:

'কি ভাই,

তুমি কালো বাজারের

দামও রাখলে,

অথচ এমন রদ্দির

পেট্রোলই দিলে

যে একটা দোকান পর্যন্ত

জ্বালানো গেল না...!' (ডাবল্ ক্রস, মান্টো)

বস্তুত আমার যে অংশটা তুমি, সেই অংশটা শূন্যতায় ভরে যাওয়ায় আমি কোনো একটা অবলম্বন খুঁজছি, কিন্তু খুঁজছি আসলে তোমাকেই। অন্য কিছু না, কেবল তুমিই মানানসই সেখানে। তোমার সাবস্টিটিউট অন্য অনেক কিছু খুঁজেটুজে জোরবার হয়ে যাচ্ছি। দেবদাস হতে গিয়েও হচ্ছি না, আমার মেটামরফোসিস হতে গিয়েও হচ্ছে না। আমি এভারেস্ট শৃঙ্গ ছুঁতে পারছি না, অক্সিজেনের অভাব আমাকে কাবু করে ফেলছে, আমি মরছি না, অমরও হচ্ছি না। আগাতে পারছি না, পিছানোর পথ বন্ধ। আমার ক্লস্ট্রোফোবিয়া হচ্ছে। হ্যাঁ, আমার প্রেম ভাবনা ক্লস্ট্রোফোবিক।

সাহিত্যের 'আমি'

সাহিত্যের এই 'আমি'টি আদতে কে বা কী—যথেষ্ট চিন্তার খোরাক রয়েছে এই ভাবনায়। বলা যায় 'আমি' একটি বাইনারি সত্তা—বিমূর্ত বিভূতি। একদিকে সে ম্যালা কিছু; বিপরীতে অযুত-নিযুত কেউ না, কিছু না'র প্রকাশ বা অপ্রকাশ। 'সৃষ্টিশীলতায়' আলোচনা করেছিলাম জীবনানন্দের তুরুপের তাস মেটাফোর 'আমার নিরভিসন্ধি কেঁপে ওঠে স্নায়ুর আঁধারে'—তবে কি 'আমি' সেই নিরভিসন্ধির সতত রূপ? সাহিত্যের 'আমি' কে বা কি বলতে যেয়ে গদ্যের ফরম্যাটে থাকা আমার জন্য বেশ কঠিন। 

আমি

এখানে বক্তা কে? হাটের দিনের পাইকার? ভিস্তিওয়ালা?

আড়ৎদার ধুতির খুঁটে চোখের বাষ্প মুছে অস্ফুটে বলে —

‘এসব কথা আমি বলিনি, মোটেও বলিনি!’ কে শোনে কার কথা!

নকশী ফোঁড়ে গাঁথা এ এক ফাঁকা ময়দান—

এখানে সুতার অরণ্যে যে নকশা বোনা হয়,

তাতে সুঁইয়ের কথাকলি গাঁটছাড়া বাঁধে না।

বোবা ফেরিওয়ালার কথা যদি জানতে, তবে ঘেমে নেয়ে উঠবে

তোমার জামায় থিতু হওয়া হলুদের দাগ।

 

আমরা কোথায় আছি?

উত্তরাধুনিকতায়? তাম্রযুগে? দর্শন বলে এখানে কি কিছু নেই?

এখানে চাষাড়ে স্বপ্নেরা লুটিয়ে পড়ছে;

সাথে করে লুটোয় খুশবু ছড়ানো কালিজিরা ধানের ক্ষীর।

বিনির্মিত কথাগুলো এখানে চক্রাকারে ঘুরে ঝলসে যাচ্ছে—

আমি উত্তরায়ণ চেয়ে চিঠি লিখি— 

ওরা চোখ ধাঁধানো আলো ছুঁড়ে দেয়;

আমার কমজোর ছায়ারা সমাহিত হয় ভেজা ঘাসে।

 

শমনের খসখসে আওয়াজে বৌদ্ধস্তূপ থেকে নেমে দেখি,

ত্যাছড়া সত্যেরা একে একে ধর্মযুদ্ধে নেমে পড়েছে!

দামামা বাজছে প্রাচীন প্রাচ্যে—

গোলাবারুদের অনুভূতি থাক কিনা থাক,

তাকে ফাটতে হচ্ছে সিকি-আধুলির-আধসত্যের ধুম্রপুচ্ছ হয়ে।

আমি ক্ষত্রিয় নই—মারসিনারি পদাতিক নই,

কারবালার বুকে কুরু—পাণ্ডবের রণহুঙ্কার তবে কেন শুনি?     

আমিও কি যুদ্ধে আছি? তবে এত ঘুম আসে কোত্থেকে?

 

আমি সুররিয়্যাল ছবিতে খুঁজছি ছোটখাটো কোনো বালিশ। 

বালিশের খোঁজে মহল্লায় মহল্লায় তল্লাশি করি —

এই বোহেমিয়ানকে না কেউ বসতে দেয়,

না কেউ এগিয়ে দেয় অমায়িক কোনো বালিশ।  

মৌসুমী বাতাসে ফিরিয়ে দিয়ে ওরা যেন আমাকে ধন্য করেছে,

ফিরিয়ে দেয়াটাই যেন ওদের কাজ!

 

আমি এত দলিত—অনায়াসে গলে বেরিয়ে যাই ভাষার খোলস।

দর্পণে কার মুখ? কার চোখে শিহরণ?

উপশম খুঁজে ফেরা পা-জোড়া বড্ডো ক্লান্ত ঠেকে!

মায়াবাস্তবে উড়তে থাকা আমার পতঙ্গেরা মুখ লুকোয়

সমান্তরাল লাইনের পটভূমিকায়। 

চোখ বাঁধা ষাঁড়ের শানানো খুরের নালে আমি মথিত,

আমি অনেকখানি জীবন্মৃত।

 

পরিশেষে বলতে পারি 'আমি' নামের একটা জীবন্মৃত সত্তা লেখকের মানসপটে টুং-টাং একতারা বাজায়। প্ল্যানচেটের অশরীরী হয়ে বিনির্মিত নিরাকারে সে ছিল, আছে, থাকবে।সে মাঠের বাউন্ডারিতে আছে, নো ম্যান্স ল্যান্ডেও আছে। সে সেই জল,

'জলের থেকে ছিঁড়ে গিয়েও জল

জোড়া লাগে আবার যেমন অতল জলে এসে।'

(অপ্রকাশিত কবিতা, জীবনানন্দ দাশ)। 'আমি' কার্যকরণময় কোনও মূর্ত ধারণা নয়। 'আমি' হলো কালের তিন রূপের স্থানাঙ্ক! স্নায়ুর আঁধারে কেঁপে ওঠা নিরভিসন্ধি।

//জেডএস//

লাইভ

টপ