X
সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪
৯ বৈশাখ ১৪৩১

রুদ্র ‘ভৈরব’

হাসান আজিজুল হক
৩১ আগস্ট ২০২৩, ০১:০০আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৩, ০২:০২

লেখক-অলেখক নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের কাছে অন্তত একটি উপন্যাস আছে। গোটা জীবনযাপনের তন্তুতে তন্তুতে জড়ানো এই উপন্যাস প্রত্যেকের বেলায় আলাদা আর তার উপাদান শুকনো ঘটনা বা স্রেফ অভিজ্ঞতা নয়। অভিজ্ঞতা অস্তিত্বে মেশানো এক রকম রসায়নও বটে, সেটা মানুষের সব রকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া-আনন্দ-যন্ত্রণা-সুখবোধ-কষ্ট সুতোর মতো জড়ানো। এই উপন্যাস প্রায় কেউই লেখে না, কখনো কখনো কিছু ব্যক্ত হয় হয়তো মুখের কথায় আর অতি সামান্য কিছু মানুষ নিজের নিজের উপন্যাসটিকে রচনা করে থাকেন।

এ হিসেবে সব উপন্যাসই কোনো না কোনো দিক থেকে আত্মজৈবনিক। আর লেখেন বিরল কিছু মানুষ, যাঁরা কিছুতেই তাঁদের জীবন-অভিজ্ঞতার ভার বইতে পারেন না। একেবারে সম্পূর্ণটা খালাস করে দিতে চান। হয়তো সারা জীবনে একবারই। হয়তো তাতেই তাঁর ভারমুক্তি ঘটে। যাঁরা লেখক হয়ে যান, অনেক সময় তাঁদের লেখা হয়ে যায় বিস্তর। তাঁরা লেখায় মেশাতে থাকেন কল্পনা, মায়া, ভালোবাসা, নিষ্ঠুরতা, ক্রূরতা—সবই। সেখানে বোধ, উপলব্ধি, বহুস্তরা অনুভব—সবই থাকে। খাঁটি সোনায় গয়না হয় না, তাতে খাদ মেশাতে হয়। উপন্যাসশিল্পও তা-ই। অভিজ্ঞতা আর অস্তিত্বে অনেক খোঁড়াখুঁড়ির দায়িত্ব এসে পড়ে। খাদ না মিশিয়ে উপায় থাকে না।

সম্প্রতি এ রকম একটি দলছুট বিশালকায় উপন্যাস হাতে এসেছে। এর লেখক কাজী শাহেদ আহমেদ, অপরিচিত মানুষ তিনি মোটেই নন; বরং ঠিক তার উল্টো। সুপ্রতিষ্ঠিত, সুপরিচিত, সার্থককর্মা এবং বহুকর্মা এক পুরুষ। তবে তিনি ঠিক লেখক হিসেবে পরিচিত এ কথা বলা যায় না, যদিও এর মধ্যে তাঁর আরো দু-চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে সেসব বই আমি পড়িনি। এখন পড়তে পাওয়া গেল তাঁর একটি প্রায় পাঁচ শ পৃষ্ঠার উপন্যাস ‘ভৈরব’। নিরেট অভিজ্ঞতাই বটে, যদিও কিছু খাদ মেশাতেই হয়েছে একটা কঠিন সরল মেরুদণ্ড তৈরির খাতিরে। কিন্তু সে কাজ সোনারুর নয়, সে কাজ একজন দৃঢ়হস্ত কর্মকারের, যাকে নিরেট লোহাকে হাপর টেনে পুড়িয়ে গনগনে লাল করতে হয় লোহার হাতুড়ি দিয়েই পিটিয়ে। তারপর পানিতে ডুবিয়ে আবার গনগনে লাল করে হাতুড়ির ঘায়ে ঘায়ে নির্দিষ্ট কোনো একটা আকার দিতে হয়—লাঙলের ফাল, রামদা, কাটারি-বঁটি ইত্যাদি তৈরি করতে। ‘ভৈরব’ এ রকম লোহা পিটিয়ে আকার দেওয়া উপন্যাস। তাতে শিল্প ঊনো হলো না দুনো হলো, তার তোয়াক্কা লেখক রাখেননি।

ভৈরব আমার কাছে বড়োই অন্তরঙ্গ-কথন দাঁড়িয়েছে। তার কারণ, যে অঞ্চল এই উপন্যাসের পটভূমি, তার সঙ্গে আমার নিবিড় পরিচয় বহুকাল থেকে। যশোর শহর তো হাতের তালুর মতো পরিচিত। নড়াইলও তা-ই। ষাটের দশকের প্রায় শুরু থেকেই বারবার সেখানে গিয়েছি। ওই নড়াইলের পথে যশোর থেকে মাইল সাতেক দূরেই ভৈরবদের গ্রাম মুন্সিপাড়া। ভৈরবের কর্মক্ষেত্র রূপদিয়া, সিঙ্গিয়া নওয়াপাড়া ফুলতলা থেকে শুরু করে বেনাপোল পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে স্বজনদের মায়া ছেড়ে আমাদের পরিবার ১৯৬১ সাল থেকে ফুলতলায় বাস করতে শুরু করে। গত অর্ধশতকের বেশি কাল ফুলতলা আমাদের পৈতৃক বাড়ি। তাহলে ভৈরব-কাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনুভব করব না কেন?

এই লেখার শুরুতে লিখেছি উপন্যাস কোনো-না-কোনোভাবে আত্মজৈবনিক। কিন্তু ভৈরব উপন্যাস এমনভাবে লেখা যে সেটা আত্মজীবনী তো নয়ই; বরং একজন ভৈরবের জীবনী। লেখকই সেই জীবনী লিখেছেন। কেন্দ্রে আছে ভৈরব। একেবারে তরুণ ভৈরব, উপন্যাসের গোড়ার দিকে যতক্ষণ সে নেই, সেই অংশটা পড়া শেষ করে এগোলেই বোঝা যায়, সেটা আসলে ভৈরবকেই মঞ্চে উপস্থিত করার ভূমিকা। তারপর ভৈরব নামের এই সরল বৃক্ষটি মহীরুহের মতো বেড়ে উঠতে থাকে। তার কাণ্ডটি বিশাল। তারপর তাতে দেখা দিতে থাকে দৃঢ় সবল শাখা-প্রশাখা আর ঘন পত্রপল্লব। শেষ পর্যন্ত আকাশছোঁয়া উচ্চতায় সে উঠে যায় আর যখন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই মহাবৃক্ষের পতন ঘটে, সে যেন ভূমিতে বিরাট ধস নামিয়ে এক মহাবৃক্ষেরই পতন!

লেখক অশেষ যত্ন আর মুন্সিয়ানার সঙ্গে এই চরিত্রটির সৃষ্টি করেছেন আর সমান যত্নে নির্মাণ করেছেন তার জন্য উপযুক্ত একজন সঙ্গিনী। শিউলি তার নাম। মহাভারতের ভীমের মতো মনে হয় ভৈরবকে আর শিউলিকে মনে হয় দ্রৌপদী। তবে দ্রৌপদীর মতো পঞ্চস্বামীভোগ্যা নয়, একমাত্র ভৈরবেরই অনন্যমনা কামিনী।

কল্পকথার মতো বিস্তার এই উপন্যাসের। এর ব্যাপ্তি বিশ শতকের শুরু থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত—প্রায় বাহাত্তর-চুয়াত্তর বছর। এই দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস দিতে গেলে পাঁচ শ পৃষ্ঠার ভৈরবের মতো আরো অন্তত পাঁচটা ভৈরব লিখতে হতো। সে পথে কোনো ঔপন্যাসিক যান না, যাওয়া ঠিকও না। কারণ ‘সম্পূর্ণতা’ শব্দটা অভিধানেই থাকে, কখনোই বাস্তবে নয়। সমাজে ও ইতিহাসে মানুষের কখনোই সম্পূর্ণতা থাকে না, কেউ তা আশাও করে না। লেখককে কাজেই অনবরত উল্লম্ফন করতে হয়েছে। সোজা কথায়, ‘কোলাজ’ করেই এই ছবির সম্পূর্ণটা। প্রায় অঙ্কনশিল্পীর মতোই কাজ। বৃষস্কন্ধ, শালপ্রাংশুভুজ ভৈরব যে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল, সে এখন লুপ্ত। একালের মানুষদের কাছে ওই সময়টাকে বোধে আনাই কঠিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন ভৈরবের বয়স চৌদ্দ বছর। এই যুদ্ধ প্রায় ধ্বংস করে ফেলে পুরনো পৃথিবী; কিন্তু ভারতবর্ষে তার ধাক্কাটা ছিল পরোক্ষ। বাংলাদেশের একটা ছোট শহর আর নিভৃত গ্রাম মুন্সিপাড়ায় তার ঢেউ আর কতটাই বা আসবে? ভৈরব যেখানে বড় হয়েছে, সেখানে পুরনো ব্যবস্থা যে একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল তা কিন্তু নয়।

শিউলির বাবা (মামা!) কলকাতা থেকে তাঁর জমিদারিতে ফিরে এসে এমন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধ অনুশাসনের মুখে এসে পড়লেন, যা এমনকি এখনকার এই ধর্ম-রাজনীতি প্র-পীড়িত বাংলাদেশেও সম্ভব নয়। জমিদারি ছেড়ে রাতের অন্ধকারে ভয়ংকর প্লাবনের মধ্যে সপরিবারে পালিয়ে যশোরে আসতে বাধ্য হলেন তিনি। মাত্র ছয় শ টাকা দিয়ে একটি বিরাট বাড়ি কিনে সেখানে বাস করতে শুরু করলেন। সঙ্গে তাঁর পুত্র জামাই আর কন্যাসম ভাগ্নি শিউলি। গল্প এখান থেকেই শুরু। তবে এভাবে পুরো গল্প বলা যাবে না, বড়জোর গল্পের কঙ্কাল-সংস্থান নিয়ে কিছু বলা চলে। জীবন্ত মানুষের গল্প শুনতে গেলে ‘ভৈরব’ উপন্যাসটিকেই পড়ে ফেলতে হবে, বিকল্প কিছু নেই। তরুণ বয়সে না পৌঁছানো পর্যন্ত ভৈরবের বড় হওয়ার মধ্যে তেমন বিশেষত্ব কিছু নেই। বংশগৌরব ছিল বটে, পাড়াগাঁয়ের হিসেবে তার পরিবার যথেষ্ট ভূসম্পত্তির মালিক। ভৈরবের বাবা ছিলেন ফরেস্ট অফিসার, চাকরি ছেড়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং যশোর শহরে একটি বাড়ি নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। গাঁয়ের মুন্সিবাড়িটা শত্রুরা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

এখান থেকে ভৈরবের উত্থান। সে কেমন উত্থান? মা গর্ভাবস্থায় ভৈরব নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছেলের নাম ভৈরব রাখবেন ঠিক করেছিলেন। ভৈরব ভাগ্যবান, প্রমত্ত ভৈরবের পাড়ে তার জন্ম। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স পর্যন্ত সে ভরা ভৈরবও দেখেছে। এখন নওয়াপাড়া পর্যন্ত আসার পরেই সেই ভৈরবের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সিঙিয়া পর্যন্ত বছর দশ-পনেরো আগেও তার ক্ষীণ কয়েকটি ধারা দেখেছি—তারপর আর নেই। অথচ সেই সময়ে ভৈরব রূপদিয়া নওয়াপাড়া ফুলতলা পর্যন্ত বিরাট এলাকা শাসন করে। শাসন করে তার নতুন নতুন ব্যবসা-কারবারের এলাকাটাকে বিস্তৃত করে। অর্থ তার বড় সহায় হয়। সে শাসন করতে থাকে ভালোবাসা দিয়ে। সহজ বুদ্ধিতে, সহজ চালে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লাঞ্ছিত-নির্যাতিতকে পুনর্জীবিত করে। তার বিশাল হৃদয়ে সবার জায়গা হয়ে যায়।

মনে হয়, ভৈরব একটা সারকথা বুঝেছিল—তা হলো, অর্থই সামর্থ্য আনে, কর্মস্পৃহা সৃষ্টি করে, মানুষের দয়ামায়া, সহানুভূতি, ন্যায়বিচারকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। তবে তার চরিত্র যেটুকু আমি ধরতে পারি, তাতে উল্টোটা—অর্থাৎ অর্থ-সামর্থ্যও সৃষ্টি করতে পারে, মানুষকে চাপা দিয়ে ধ্বংস করে দিতেও পারে এমন ভাবনা তার মনে কখনো জায়গা পেয়েছিল কি না। মনে হয় না। তার মানবিক বৃত্তিগুলোই পুষ্টি পেয়েছিল—অশুভের ছায়ার মধ্যে সে কখনো পড়েনি। ভৈরব পড়তে যে এত ভালো লাগে, তার কারণ এমন বই পড়লেই ইচ্ছাপূরণের সাধ মেটে—শুভ প্রবৃত্তিগুলো সাময়িক স্ফূর্তিলাভ করে।

চমৎকার একটি প্রেম উপাখ্যান উপন্যাসের শুরুর দিকেই। এক দুর্দান্ত পুরুষের অপ্রতিরোধ্য মানসিক ভালোবাসা। ছয় ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা বিশাল বক্ষ এক পুরুষ ভৈরব। ভয়-সঙ্কোচশূন্য। রক্তের কলোলে সাড়া দেওয়া এক তরুণ হৃদয়ের কুহকি টানে যে তরুণীকে সে চাইছে, তাকে বাধা দেবে কে? ভৈরব শিউলিকে যেভাবে বিয়ে করে, সে যেন অর্জুনের সুভদ্রা হরণের মতো। সুভদ্রার যেমন আপত্তি ছিল না তাকে সবলে গ্রহণের বিরুদ্ধে, শিউলিরও তা-ই। তার দুর্বল প্রতিরোধ ভেঙে যেতে সময় লাগে না। উপন্যাসের দিক থেকে দেখতে গেলে, ভবিষ্যতে ভৈরব সারা জীবনে যে বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাতে এ রকম একজন সঙ্গিনীর একান্তই প্রয়োজন ছিল।

আমরা এই উপন্যাসের লেখককে চিনি। তাঁর নিজের জীবনের বৃহৎ ও সফল কর্মোদ্যমের প্রক্ষেপ ঘটেছে বলে মনে হয় ভৈরবের চরিত্রে। ভৈরব স্কুলের শেষ পরীক্ষাটা ইচ্ছা করেই দেয়নি (পরে দৃঢ়সংকল্প নিয়ে সে সহজেই গ্র্যাজুয়েট হয়ে যায়), দেওয়ার দরকার মনে করেনি। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে উঠেছে তার অসাধারণ মেধাবলে অথচ মেধা ও বুদ্ধি তার চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য নয়—অকর্মণ্য বুদ্ধিজীবীদের মতো সে বুদ্ধির ফাটা-ডিমে তা দেয়নি, অলস চিন্তায় নিজের কর্মকাণ্ডকে ভারাক্রান্ত  করেনি। যে মেধা ও বোধের সে অধিকারী, বাস্তবে প্রয়োগ ছাড়া তাদের কোনো চর্চাই সে কোনো দিন করেনি। বুদ্ধি ও বোধে সে যতটা ক্ষিপ্র, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষিপ্র ওই দুটির নির্দেশ কাজে ঘটিয়ে ফেলতে।

উপন্যাসের ঘটনাকালটাকে লেখক যে এক শতাব্দী পিছিয়ে নিয়ে গেছেন, তাতে তাঁর কিছু বাড়তি সুবিধা হয়েছে। ভূমিকেন্দ্রিক, জমিকেন্দ্রিক, ফসলকেন্দ্রিক যে এলাকায় যে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলে, তাতে সময়কে পিছিয়ে নিয়ে যেতেই হয়। মানুষের হাতই সেখানে মূল সম্বল। এই বর্তমানের খোল-নলচে বদলে যাওয়া পৃথিবীতে বাংলাদেশে ঠিক এ রকম কর্মকাণ্ড আর সম্ভব নয়।

আমরা গত শতকের সত্তর দশকের শুরুর আগ পর্যন্ত ভৈরবের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উগ্রতা লক্ষ করি। তার কারণও সময়। তরুণ বয়সের শুরুতে ইংরেজ তাড়ানোর সংকল্পটা তার ও তার অনুসারী বন্ধুদের মধ্যে অবশ্য বেশ দেখা যায়। মনে হয় আলীপুর বোমা মামলা, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন, অনুশীলন দলের কার্যক্রম, ক্ষুদিরামের ফাঁসি ইত্যাদির একটা পরোক্ষ প্রভাব এখানে ছিল। ভৈরব নিজেও দলবল সংগ্রহ করে, সহ-অধিনায়ক খোকনকে খুঁজে নেয়, রীতিমতো একটা আখড়া গড়ে তোলে আর মুন্সিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, সেখানে আখড়াটাকে একটা পূর্ণাঙ্গ আশ্রম হিসেবে গড়ে তোলে। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তারা মোটেই জড়ায় না। তারপর ভৈরব তার সঙ্গীসাথিদের নিয়ে যে কাজ শুরু করে, তাকে শুধুই জনহিতকর সামাজিক কর্তব্যকর্ম বলাটা ঠিক হবে না। তার চেয়ে অনেক বেশি। যেখানেই সামাজিক অন্যায়-অবিচার, পারিবারিক অত্যাচার, নারী নির্যাতন সেখানেই ভৈরব। তার কাজ সরাসরি, হাতে-কলমে। তার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ। সহজাতসূক্ষ্ণ, সহৃদয় বিবেচনা। সহানুভূতি, দয়া-মমতা, আবেগ তার মধ্যে দৃষ্টিগোচর নয়। বরং সরাসরি কর্মে অনূদিত, তাৎক্ষণিক প্রতিকারে সন্দেহাতীতভাবে স্ব-প্রকাশিত। বিত্তবৈভব তার দিন দিন বাড়ে। প্রতিপত্তি কোনো সীমানা মানতে চায় না। অন্যায়ের প্রতিকারে সে প্রশাসনিক আইনশৃঙ্খলার ধার ধারে না। একটা আশ্চর্য ভাবমূর্তি তৈরি হয় তার গোটা এলাকায়। সমাজের সব সিঁড়িতে সে নিঃসঙ্কোচে পা ফেলতে পারে। দ্বিধাহীনতাই তার চরিত্রের মূল শক্তি। তার এসব কর্মকাণ্ডের বিবরণেই উপন্যাসটি ভরা। তাতে যেন কখনো কখনো রূপকথার আদল চলে আসে। একেক সময় মনে হয়, সে ওই সময়ের রবিনহুড—মুন্সিপাড়ার আখড়া তার শেরউড অরণ্যের আস্তানা। দাম্পত্যজীবনে কে স্ত্রীর ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, পরিবার-পরিজনকে কে খেতে দিচ্ছে না, কার বাড়িতে অন্ন নেই, শিশুরা অনাহারে আছে, কোন স্বামী স্ত্রীকে রোজগারে বাধ্য করার জন্য বেশ্যাপাড়ায় পাঠিয়েছে, কোন নারী দারিদ্র্যের জ্বালায় শেষ পর্যন্ত দেহোপজীবিনী হতে বাধ্য হয়েছে, কোথায় দাম্পত্য জীবনে লাম্পট্য ঢুকে পড়েছে কিংবা কোথায় কোন সংসারে বিবাহিত নারী প্রচণ্ড ইন্দ্রিয়াসক্তির জন্য স্বামীর জ্ঞাতসারেই যথেচ্ছ পুরুষ সংসর্গ করছে—সব মুশকিলের আসান ভৈরব। স্থানীয় প্রশাসনও তার সব নিষ্পত্তির পরিশোষক।

বাস্তব-অবাস্তব মেশানো ভৈরব চরিত্র। বজ্রের মতো কঠোর, আবার বাংলাদেশের নরম ভেজা মাটির মতো কোমল রসালো। শিউলি-ভৈরব প্রেমকাণ্ড এই উপন্যাসে খুবই মায়ার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়, আহা, যদি এমন হতো, তা যে হবার নয়, হতে পারে না, এই শক্ত কঠিন কথাটা মন থেকে তখনকার মতো বিদায় দিতে ইচ্ছে হয়। বেশি মিষ্টি খেলে যেমন মুখটা মেরে আসে, গা কেমন করে মাঝেমধ্যে—সার্থককর্মা এই পুরুষের কর্মবিবরণে সে রকমটাও মনে হয়। তখন হয়তো বা কাঁচা মরিচ বা নিমপাতা বাটা খেতে ইচ্ছা করে। এত বিঘ্নহীন সফলতা কি বাস্তব? নাকি অনেকটাই সাফল্য-বুভুক্ষু মানুষের জন্য অভিলাষপূরণ?

তবে এই দীর্ঘ আখ্যানের রচয়িতা কাজী শাহেদ আহমেদ তাঁর আখ্যানে একটা ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ অধ্যায়ও লিখেছেন। এক বিশাল পুরুষ ও তাঁর পরিবারের সমূহ পতন। উপন্যাসের এই শেষাংশে আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ৪৮৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসে এই পর্ব জায়গা নিয়েছে মাত্র ৫০ পৃষ্ঠার মতো। ভৈরব, তাঁর জামাই আকবর, চিরসাথি খোকন। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তারা তাতে যোগ দেয়। তখন তার বয়স একাত্তর। এক হাতে ভর দিয়ে ক্রমাগত ডন কষে সে তার শারীরিক সক্ষমতা প্রমাণ করে। তারপর সে শরণার্থী শিবির থেকে কলকাতা গিয়ে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে। তার নিঃসঙ্কোচে সত্য উচ্চারণে তিনি সন্তুষ্ট হন। ভৈরব বিশেষ একটা কাজ নিয়ে মুন্সিপাড়া ফিরে আসে। সে বাড়িতে ফিরে আসার ঠিক আগেই ঘটে যায় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে শত হাজার ঘটনার মতোই এক মর্মন্তুদ ঘটনা। পাকিস্তান আর্মি সঙ্গে নিয়ে রাজাকারের দল মুন্সিবাড়ি ঢুকে ভৈরবের কন্যা ইতি, দৌহিত্রী রত্নকে টেনে নিয়ে গিয়ে বারবার ধর্ষণ করে মেরে ফেলে, তাদের মৃতদেহের ওপর ধর্ষণ চালায়, তারপর বেয়নেট দিয়ে তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। ভৈরবের স্ত্রী শিউলির এক রকম চোখের সামনেই এ ঘটনা ঘটে। এরপর আর দেরি হয় না, শিউলি, তার ছেলে প্রতিবন্ধী আমিন আর দৌহিত্র রহমকে নিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকে গেলে আগুন লাগিয়ে ওই ঘরসহ পুরো বাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।

উপন্যাস শেষ হতে আর সময় লাগে না। ভৈরব তার বাড়িতে ঢোকে। পরিচিত এবং এককালের ভৈরবের অনুগৃহীত রাজাকার নেতা মালেক তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। সমস্তটা শুনে ভৈরব একটুও দেরি করে না, হাতের কাছের কুড়ালটা নিয়ে সে একটি মাত্র আঘাতে মালেকের মাথা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে বলে, যা পাকিস্তান দু-ভাগ করে দিলাম। তার পরেই সে হাতে এক গ্লাস পানি নিয়ে একটি আমগাছের মগডালে উঠে যায়, পানির গ্লাস উঁচু করে বলে, রোজা রেখেছিলাম, এই রোজা ভাঙলাম! এই বলে মুখে গ্লাস তুলতে গিয়ে সে ভারসাম্য হারিয়ে হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে আর সঙ্গে সঙ্গেই তার শেষ নিঃশ্বাসও পড়ে। সে গতপ্রাণ হয়েই মাটিতে পড়েছিল, না পড়ার পরেই মারা গিয়েছিল তা বলা কঠিন। বড় নাটকীয় এই ঘটনা, বড় আকস্মিক। মনে হয়, বড্ড সংক্ষিপ্তির জন্য পাঠক এই সমাপ্তিতে প্রস্তুত হওয়ার সময় পায় না। যা-ই হোক, এই পৃষ্ঠা কয়টি পড়তে গিয়ে আমি বড় কষ্ট পেয়েছি। বড় স্পর্শকাতর জায়গায় কঠিন ঘষা লেগেছে।

‘ভৈরব’ উপন্যাস প্রচলিত রীতিনীতি কিছু মানেনি। ভাষা প্রসাধনহীন আটপৌরে। রীতি অনুসরণ করুক আর না করুক, আরেকটু পরিচর্যার প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
স্মরণসভায় বক্তারাস্রোতের বিপরীতে নির্ভয়ে কাজ করে গেছেন কাজী শাহেদ আহমেদ
কাজী শাহেদ আহমেদের স্মরণসভা শুক্রবার
স্মরণসভায় বক্তারা‘নিষ্ঠা ও প্রেরণার বাতিঘর কাজী শাহেদ আহমেদ’
সর্বশেষ খবর
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে অটোরিকশাচালককে হত্যা: দুজনের মৃত্যুদণ্ড
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে অটোরিকশাচালককে হত্যা: দুজনের মৃত্যুদণ্ড
সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরাক থেকে রকেট নিক্ষেপ
সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরাক থেকে রকেট নিক্ষেপ
টিভিতে আজকের খেলা (২২ এপ্রিল, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (২২ এপ্রিল, ২০২৪)
তীব্র গরমে ঝরছে আমের গুটি, উৎপাদন নিয়ে চাষিদের শঙ্কা
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানতীব্র গরমে ঝরছে আমের গুটি, উৎপাদন নিয়ে চাষিদের শঙ্কা
সর্বাধিক পঠিত
দারুল ইহসানের বৈধ সনদধারীদের এমপিওতে বাধা নেই
দারুল ইহসানের বৈধ সনদধারীদের এমপিওতে বাধা নেই
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস
ইউরোপে মানবপাচারের নতুন রুট নেপাল
ইউরোপে মানবপাচারের নতুন রুট নেপাল
১২ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে: থাকবে কতদিন?
১২ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে: থাকবে কতদিন?
যশোরে তীব্র গরমে গলে যাচ্ছে সড়কের বিটুমিন
যশোরে তীব্র গরমে গলে যাচ্ছে সড়কের বিটুমিন