‘দায়সারা’ শিল্প-উদ্যোগ

ধ্বংসের বিপরীতে সমষ্টিগত সৃষ্টির সংলাপ

শিবানী কর্মকার
০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৪৫ আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৪৫

সমকালীন শিল্পচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, শিল্প ধীরে ধীরে গ্যালারির নিয়ন্ত্রিত পরিসর থেকে বেরিয়ে এসে জনপরিসর, প্রকৃতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করছে। এই পরিবর্তন কেবল প্রদর্শনীর স্থান বদলের বিষয় নয়, বরং শিল্পের উদ্দেশ্য, ভাষা এবং দর্শকের ভূমিকাকেও পুনর্নির্ধারণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘দায়সারা’ একটি উল্লেখযোগ্য শিল্প-উদ্যোগ, যা শিল্পকে বস্তু হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে।

গত ১৫ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ধানমন্ডি লেক (সেক্টর–৩), সড়ক ১২/এ-এ অনুষ্ঠিত ‘ভালোবাসা নাকি ধ্বংস’ শীর্ষক উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে প্রায় ৫০ জন শিল্পীর অংশগ্রহণ এই উদ্যোগকে একটি সমষ্টিগত শিল্প-আন্দোলনের রূপ দিয়েছে।

ধ্বংসের বিপরীতে সমষ্টিগত সৃষ্টির সংলাপ উন্মুক্ত আকাশের নিচে, শহরের ব্যস্ত জনজীবনের মধ্যে শিল্পকে স্থাপন করার মধ্য দিয়ে এই প্রদর্শনী দর্শককে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, আমরা কি ভালোবাসা ও সহাবস্থানের পথ বেছে নেব, নাকি ধ্বংসের রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করব?

প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘ভালোবাসা নাকি ধ্বংস’ প্রথম দর্শনে একটি নৈতিক দ্বন্দ্বের মতো মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরও গভীর। এটি বর্তমান সময়ের পরিবেশগত সংকট, নগরায়ণের নির্মমতা, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে একটি অস্তিত্বগত প্রশ্ন উত্থাপন করে। ফলে এই প্রদর্শনী কেবল শিল্পকর্ম প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি দর্শককে নিজের সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থান নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, এটি ধ্বংসকে কেবল নথিবদ্ধ করে না, ধ্বংসের মধ্য থেকেই নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা খুঁজে বের করে। ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদর্শনীস্থল, ছড়িয়ে থাকা বর্জ্য, ভাঙাচোরা উপকরণ কিংবা প্রকৃতির পরিবর্তিত অবস্থা, এ সবকিছুই এখানে শিল্পচর্চার উপাদানে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়া প্রচলিত শিল্প-উৎপাদনের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শিল্প আর নিখুঁত, স্থায়ী বা সম্পূর্ণ কোনো বস্তু নয়। শিল্প একটি চলমান, পরিবর্তনশীল এবং পরিস্থিতিনির্ভর সৃজনপ্রক্রিয়া। ফলে শিল্পকর্মের চেয়ে শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতাই এখানে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ধ্বংসের বিপরীতে সমষ্টিগত সৃষ্টির সংলাপ ‘দায়সারা’র আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো দর্শকের ভূমিকার পুনর্বিন্যাস। এখানে দর্শক কেবল শিল্পকর্ম দেখার জন্য উপস্থিত নন। বলা যায়, তিনি এই শিল্প-অভিজ্ঞতার সক্রিয় অংশীদার। শিল্পীও আর একক প্রতিভার অধিকারী কোনো বিচ্ছিন্ন স্রষ্টা নন, তিনি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়ার সহযাত্রী। এই অংশগ্রহণমূলক কাঠামো শিল্পকে আরও গণতান্ত্রিক করে তোলে এবং সৃজনশীলতাকে একটি সম্মিলিত সামাজিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সমকালীন অংশগ্রহণমূলক শিল্পচর্চার আলোচনায় এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরিবেশ নিয়ে এর দৃষ্টিভঙ্গি। জলবায়ু পরিবর্তন বা বন উজাড়ের মতো বহুল আলোচিত বিষয়ের পাশাপাশি এই প্রদর্শনী ক্ষুদ্র পতঙ্গ ও অদৃশ্য জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্বকে সামনে নিয়ে আসে। সাধারণত পরিবেশ-আলোচনায় বৃহৎ প্রাণী, বন কিংবা নদীকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তুতন্ত্রের মৌলিক ভারসাম্য রক্ষায় পতঙ্গের ভূমিকা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। ‘দায়সারা’ সেই উপেক্ষিত বাস্তবতাকেই শিল্পের ভাষায় দৃশ্যমান করেছে। এর ফলে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং দর্শক উপলব্ধি করতে পারেন যে মানুষের ভবিষ্যৎ ক্ষুদ্রতম প্রাণীর অস্তিত্বের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

তবে সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রকল্পের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা জরুরি। অংশগ্রহণমূলক শিল্পচর্চায় প্রায়ই প্রতীকী অংশগ্রহণ বাস্তব সামাজিক পরিবর্তনের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনো প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকা বা শিল্পকর্মে সাময়িকভাবে অংশ নেওয়া সবসময় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়বোধ সৃষ্টি করে না। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়, ‘দায়সারা’ কি কেবল একটি সাময়িক সাংস্কৃতিক উৎসব, নাকি এটি জনপরিসর, পরিবেশ এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণ করতে সক্ষম হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে এই আন্দোলনের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রদর্শনীর উন্মুক্ত কাঠামো যেমন সাধারণ মানুষের জন্য শিল্পকে সহজলভ্য করেছে, তেমনি শিল্পের ব্যাখ্যা ও প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ধ্বংসের বিপরীতে সমষ্টিগত সৃষ্টির সংলাপ সব দর্শক সমকালীন শিল্পের ভাষা বা অংশগ্রহণমূলক শিল্পের ধারণার সঙ্গে পরিচিত না-ও হতে পারেন। তাই এমন উদ্যোগ যদি নিয়মিতভাবে শিল্প-আলোচনা, শিল্প উপস্থাপন, শিক্ষামূলক কার্যক্রম কিংবা কমিউনিটি সংলাপ প্রায়শই যুক্ত হয়, তবে এর সামাজিক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ‘দায়সারা’ আমাদের সময়ের একটি জরুরি শিল্প-প্রস্তাব। এটি শিল্পকে কেবল নান্দনিক অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক সংলাপ, পরিবেশগত সচেতনতা এবং সম্মিলিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভালোবাসা কোনো নিষ্ক্রিয় আবেগ নয়। ভালোবাসা ধ্বংসের বিরুদ্ধে একটি সক্রিয় নৈতিক, সামাজিক এবং নান্দনিক অবস্থান। সেই অর্থে ‘দায়সারা’ একটি প্রদর্শনী নয়, বরং সমষ্টিগত কল্পনা, প্রতিরোধ এবং পুনর্গঠনের একটি চলমান আন্দোলন, যা শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করার সাহসী প্রচেষ্টা হিসেবে সমকালীন বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
স্ক্যাম সেন্টার কী 
স্ক্যাম সেন্টার কী 
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: নজরুলের বাবা-মায়ের একটাই চাওয়া এখন
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: নজরুলের বাবা-মায়ের একটাই চাওয়া এখন
সাবেক স্ত্রীর বিরুদ্ধে হিরো আলমের মামলা, চাঁদা দাবির অভিযোগ
সাবেক স্ত্রীর বিরুদ্ধে হিরো আলমের মামলা, চাঁদা দাবির অভিযোগ
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: সৌদির কাছে রায়ের কপি চেয়েছে বাংলাদেশ
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: সৌদির কাছে রায়ের কপি চেয়েছে বাংলাদেশ
সর্বাধিক পঠিত
সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ বিক্রির জায়গা থাকবে না: চিফ হুইপ
আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ বিক্রির জায়গা থাকবে না: চিফ হুইপ