পরিমল ভট্টাচার্যের 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' উপন্যাসটি পড়ার পর একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এরই মধ্যে পারভেজ হোসেনের 'সুবর্ণপুরাণ' পড়া হলো। একই সময়ে এরকম দুটি উপন্যাস পাঠের মধ্যে কোনো কাকতাল আছে কি না বুঝতে পারছি না। তবে দুই উপন্যাসের বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গির সাদৃশ্য এবং সমান সময়ে আমার পাঠাভিজ্ঞতার কুহক হয়তো কোথাও আছে। পারভেজ হোসেন আমার প্রিয় গল্পকার, এটি তার প্রথম উপন্যাস হওয়ায় আমার আগ্রহটা একটু বেশি ছিল। কারণ হাতেগোনা কয়েকজনের উপন্যাস ছাড়া বাংলাদেশে দেশে যেসব উপন্যাস লেখা হয়েছে তাতে আমার অভিজ্ঞতা ভালো নয়। আমি সবসময়েই ভেবেছি আখ্যানরীতি ও আখ্যাানত্ব নিয়ে উপন্যাস শিল্পমাধ্যমটি বিশ্বসাহিত্যে যে-পর্যায়ে পৌঁছেছে, সে তুলনায় আমাদের উপন্যাসসাহিত্য আমার মন খারাপ করে দেয়। তবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ ঔপন্যাসিকরা বাংলাদেশের উপন্যাসের যে-ভিতটি তৈরি করেছেন তা আশা জাগানিয়া। তাই সাহিত্যের মূল স্রোতের কোনো লেখক যখন নতুন সৃষ্টিকর্ম নিয়ে হাজির হন তখন তা পাঠের জন্য মন উসখুস করতে থাকে। পারভেজ হোসেন বাংলাদেশে পাতে নেওয়ার মতো একজন লেখক।
উপন্যাসটির ফ্ল্যাপ লিখেছেন সেলিম মোরশেদ। তার গল্পও আমি গুরুত্ব দিয়ে পড়ি। তিনি শুরু করেছেন এই বলে যে, ‘এ এমনই এক আখ্যান, ইতঃপূর্বে যা কেউ লেখেননি।’ মন্তব্যটি আকর্ষণীয়, শেষের দিকে মন্তব্যটাও এমন যে ‘এ আখ্যান যতটা ভালো লাগার, এই ভূখণ্ডের জন্য ততটাই শ্রদ্ধার’। সুতরাং বইটি আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি মনে করি উপন্যাস একধরনের জাতীয় সাহিত্য, আর তাতে যদি জাতীয় চরিত্র ও মননের প্রতিফলন না ঘটে; ভূখণ্ড ও ভূখণ্ডের মানুষের বাস্তব ও স্বপ্ন মূর্ত না হয় তাহলে তা প্রতিনিধিত্বশীল হতে পারে না। ফরাসি, রুশ, আফ্রিকা ও লাতিন উপন্যাসের ধারা মনে রাখলে কথাটির সারবত্তা বোঝা যেতে পারে। যদিও উপন্যাসের নানা রকমফের রয়েছে, নানা বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখিত হতে পারে। সে অন্য কথা।
শুরুর আগে ঔপন্যাসিক একটা টিকা দিয়েছেন। বোঝা গেল উপন্যাসের আখ্যানের বীজ একটি ঐতিহাসিক দিনপঞ্জি ও একটি কাব্য। ষোলো শতকে ঢাকায় যে-পর্তুগিজ বসতি গড়ে ওঠে, তার অবশেষ ঢাকার হলি রোজারিও চার্চ। সংস্কারকালে পাওয়া যায় ফ্রান্সিস রাফায়েল নামক এক পর্তুগিজ নাবিকের দিনপঞ্জিটি এবং পর্তুগিজ কবি লুস ডি ক্যামেসের মহাকাব্য ওস লুসাদাস। পরে তা সংরক্ষিত হয় পর্তুগালের ওপোর্তুর জাদুঘরে। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত মালাক্কাবাসী ফ্রান্সিস রাফায়েল একজন পর্যটক ছিলেন। চার শ বছর আগে তিনি বাঙ্গালায় বেড়াতে এসেছিলেন, এবং থেকে গিয়েছিলেন বাঙ্গালার মানুষ, রূপ, রস ও সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে। যখন এসেছিলেন বয়সে ছিলেন তরুণ এবং মননে উপনিবেশবিরোধী সংবেদনশীল একজন মানুষ। সুবর্ণপুরাণের আকর মূলত দিনপঞ্জিটি কিংবা ওই দিনপঞ্জির লেখক ইতিহাসের মানুষটি। দিনপঞ্জির ঘটনার সঙ্গে ইতিহাসের ধারাক্রম মিলিয়ে উপন্যাসটির প্লট নির্মাণ করেছেন লেখক। সুতরাং রচনাটি উপন্যাস-লেখকের কল্পনা ও ইতিহাসের ভিত্তিতে রচিত আখ্যান; কিছুটা ঐতিহাসিক বাদবাকি তৎকালীন জীবন-সত্যের বয়ান। তাই এটি ইতিহাস নয়, সাহিত্য; কারণ এতে ইতিহাসের উপাদানকে ছাপিয়ে অতীতের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া মানুষের হৃদয়ের আকুতি-উপলব্ধি প্রধান হয়ে উঠেছে এবং মানবিক আবেদনের দিক থেকে সমকালকেও স্পর্শ করেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা কাহিনির বয়ান, গল্প ও চিন্তায় লেখকের উত্তর-ঔপনিবেশিক মনন ও আখ্যানরীতির প্রতিফলন ঘটেছে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে সুবর্ণপুরাণ কি ঐতিহাসিক উপন্যাস? আমার মতে, ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করলে উপন্যাসটির অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক তাৎপর্যের বড়ো অংশ অধরা থেকে যায়। কারণ বাঙ্গালার এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তকে কেন্দ্রে স্থাপন করে উপন্যাসটি রচিত, যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিস্তার ভারত মহাসাগরীয় ভূখণ্ডে নতুন মাত্রা লাভ করছে। অর্থাৎ কাহিনির সময় ষোলো শতকের শেষভাগ থেকে সতেরো শতকের সূচনাকাল। এই সময়কে কেন্দ্র করেই লেখক ভাটি বাংলা, সোনারগাঁ, পর্তুগিজ নাবিক এবং বহিরাগত পর্যটকের চোখে একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন।
উপন্যাসটি পাঠের পর আমার মনে হয়েছে যে, পারভেজের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে অনেক গল্প ছিল, অনেক কথা ছিল; ভারত ও বাঙ্গালা নিয়ে এতদিনে তার যে-একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে তা প্রকাশ করা তার জন্য দরকার হয়ে পড়েছিল। আর তিনি একটা উপলক্ষ্য খুঁজছিলেন; যে-কথাগুলো, যে-দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ছোটোগল্পে প্রকাশ করা যায় না; প্রবন্ধেও না এবং যেটা উপন্যাসের মাধ্যমই সম্ভব। তাই তার গল্পগুলো, কথাগুলো, চিন্তাগুলো নির্দিষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে আখ্যানরূপ দিলেন। আখ্যানে যুক্ত করলেন অনেক উপ-কাহিনি; প্লটের বিন্যাস করলেন এমনভাবে, যাতে বর্ণনারীতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি না করে। তাই আখ্যানের শুরুতে বোর্নিওর বন্দর থেকে যখন সুমাত্রার জাহাজ ছাড়ল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, পাঠকের যাত্রাও শুরু হয় এখান থেকে। আখ্যানের প্রকৃতি ও পরিণতি এই সমুদ্রযাত্রার মতো প্রতীকী বলেও মনে হলো।
পারভেজ হোসেন উপন্যাসের রীতি যেমন উত্তর-ঔপনিবেশিক, তার নিজের মননগঠনও তাই। আগেও তা বলেছি। তার মনন ও চিন্তায় দীর্ঘদিন ধরে যে-বয়ান তৈরি হয়েছে তার মূর্ত রূপ সুবর্ণপুরাণ। আমরা তো জানি, বয়ানের জন্য প্রয়োজন পড়ে সংলাপের; কারণ দ্বন্দ্বিক প্রক্রিয়ায় সংলাপ সত্যের আবিষ্কার করে। এমন সংলাপে তাই ঔপন্যাসিক ফ্রান্সিস রাফায়েলের আগেও জাহাজে বসিয়ে দিয়েছিলেন আরেকজন জানু পর্যটককে। তিনি জ্ঞানী, ভাবুক ও চিন্তাবিদ আবু ইবনে আল আসাদ, সাকিন তার মরক্কোর শহর ত্যানজিয়েরে; পর্যটক ইবনে বতুতার এক উত্তরসূরি। তারও গন্তব্য রাফায়েলের মতো ভাটি-বাঙ্গালার সোনারগাঁয়ে বা সুবর্ণনগরে, আগ্রহ সমান বিষয়ে। দুইজনকে এত লোকের ভিড়ে ঠাঁইও দিয়েছেন লেখক জাহাজের একটি কোঠায়। আগে থেকে শুরু হলেও রাফায়েল জাহাজের কোঠায়ও গুটি গুটি অক্ষরে দিনপঞ্জিটি লিখছিলেন। বাঙ্গালায় এসেও লিখবেন।
জাহাজ চলতে শুরু করেছে, আর এই ফাঁকে সুকৌশলে সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বুনন করে নেন কাহিনিতে ঔপন্যাসিক, যেমন মসলিন কাপড়ের সচেতন বুননের বর্ণনা দিয়েছেন তাঁতিদের। প্রাচীন গ্রামগুলোর দিগন্তবিস্তৃত সবুজ কার্পাসখেতের গল্প, মেঘনাদ-ব্রহ্মপুত্র-লাক্ষ্যার জলজড়ানো ভূগোল, বাহারি প্রসাদ; সুবর্ণনগরের জনমানুষ আর তাঁতিদের কথা। সাধারণ মানুষের বসতভিটা, পোশাক, জীবনচর্যা সহ বিশ্বখ্যাত মসলিনের শিল্পগাঁথা। কত শ্রম আর সাধনায় যে-মসলিন পৃথিবীর রাজা আর রাজন্যদের মন কাড়ে, সেই মসলিনতাঁতের শিল্পীদের বসন সম্পর্কে এমন তথ্য দেন লেখক যে পাঠকের পিলে চমকে যায়। এখানকার পুরুষের পোশাক ছিল নেংটি; অথবা কোমর থেকে হাঁটু অবধি একখানা কাপড় পরে খালি গায়ে থাকত পুরুষেরা। আর কাঁচুলি দিয়ে বুক বেঁধে কোমরের নিচে ঘাঘরা পরত মেয়েরা, না হয় পরত ভোগা তুলায় কাটা মোটা সুতার বারোহাতি বস্ত্র। তখনই বুঝতে অসুবিধা হয় না ঔপন্যাসিক আমাদের কোন গল্পটি বলতে চান কিংবা কেন তিনি চোখধাঁধানো একেকখানা আশ্চর্য বসনের বিপরীতে তুলে ধরেন গরিব, শীর্ণ ও অত্যাচারিত মানুষের প্রতিকৃতি? ঐশ্বর্যশালী বাঙ্গালার জনপ্রিয় ইতিহাসের ভিড়ে উঠে আসে সেই সত্য, যা ঔপন্যাসিকের দায় থেকেই নির্মিত: ‘শখ করে কোনো আমোদে-অনুষ্ঠানে উড়নি হিসেবে একটুকরো মসলিন গায়ে চাপবে বা মাথায় বাঁধবে সে সাধ্য এদের যেমন নেই, হুকুমও নেই।’
বলেছিলাম ঔপন্যাসিকের ইতিহাসকে দেখার একটা দৃষ্টিকোণ আছে, এবং এই দৃষ্টিকোণটা তার বক্তব্যে মুখ্য হয়ে উঠেছে। এখানে প্রসঙ্গ এসে যায় প্রাচ্যতত্ত্বের। প্রাচ্যবিদরা ভারতকে একটা বিশেষ চোখে দেখেন, বলা যায় এই দেখাটা ঔপনিবেশকের চোখে। এমনকি ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্বানুসারে আমরাও প্রাচ্যকে, নিজেদের প্রাচ্যবাদীদের চোখে দেখতে শিখেছি। এডওয়ার্ড সাঈদ সহ অপরাপর উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকেরা আমাদের সেই দৃষ্টিতে নয়া আলোকপাত করেন। তাই ঔপন্যাসিক নিজের ইতিহাসকে দেখেছেন সাঈদের ফেলা আলোকরেখায়। যাত্রার প্রথম রাতেই তাই, জাহাজের কোঠায় তৈরি হয় সংলাপ। ফ্রান্সিস রাফায়েল আর ইবনে আসাদের মধ্যে। ভারতে না এসেও রাফায়েল ভারত সম্পর্কে যে-ধারণা পোষণ করেন, ইবনে আসাদের কাছে তা দুঃখজনক সমনে হয়। ভারতসম্পর্কে রাফায়েলের ধারণা হচ্ছে এটি যোগসাধনা, তন্ত্রমন্ত্র আর অলৌকিক কর্মকাণ্ডের এক আশ্চর্য লীলাভূমি। আর এধরনের ধারণাকে খারিজ করে দেন ইবনে আসাদ, কারণ ভারতের পথে পথে তিনি হেঁটেছেন; মানুষকে দেখেছেন, মানুষের সঙ্গে মিশেছেন; তাদের সংস্কৃতিকে ঘনিষ্ঠভাবে জেনেছে দিনের পর দিন। ইবনে আসাদের মত হচ্ছে, ভারত হচ্ছে ভাব ও ভক্তির দেশ; ভারতের নিজের একটা বাস্তবতা আছে; সেই বাস্তবতা তৈরি করেছে ভারত-সত্য; ভারতের দর্শন হচ্ছে সবার ওপরে মানুষ সত্য। আর ইউরোপ সেটা জানে না, কিংবা জানলেও প্রকাশ করে না। এই না-জানা, কিংবা অস্বীকারেরও একটা ইতিহাস আছে, ইবনে আসাদ জানেন।
।
ইবনে আসাদ অবশ্য এটা অস্বীকার করেন না যে ভারতে তন্ত্র-মন্ত্র ইত্যাদি নেই। তার কথায় সেটা অবশ্যই আছে, আর তা একমাত্র সত্য নয়। তিনি মনে করেন, এমনকি এসবের উদ্ভবের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণও আছে। আসাদের ব্যাখ্যায় সমাজে দুই কারণে অলৌকিকতার গল্প জন্মায়। একটি হচ্ছে ক্ষমতাকে অটুট রাখতে, আর অপরটি ক্ষমতার নিষ্পেষণ থেকে আত্মরক্ষা করতে। এটাই ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিভঙ্গি; বলতে চান প্রাচ্যবিদ্যা ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের ওপর এমন গল্পের তত্ত্ব প্রচার করেছে। ভারত-ইতিহাসে সনাতন ধর্মের জন্ম, বৌদ্ধবাদের সূত্রপাত, ইসলামের আগমন সবই একটি সংঘাত ও সমন্বয়ের ভিতর দিয়ে হয়েছে। এসবে যুগের পর যুগ ধরে তৈরি হয়েছে কত তত্ত্বকথা ও গালগল্প। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুভারতে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আসাদের বক্তব্যটি প্রাসঙ্গিক। আসাদ বলছেন, ‘একটা প্রতিষ্ঠিত সমাজের উচ্চ-নীচের এই গোলমালে কত গল্পই-না তৈরি হয়ে থাকবে তখন। আবার ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন কৃষ্টির কাছে সমর্পিত না হয়ে নতুন পথেও তো চলতে থাকে সংস্কার, সেখানেও কেচ্ছা কি কিছু কম তৈয়ার হয়?’ এখানে বক্তব্যটি ভারতপ্রসঙ্গে আমাদের দেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। অতিপ্রাচীন কাল থেকে একটা শ্রেণি গাল-গল্পের ফাঁদে মানুষকে বুঁদ করে রাখছে, আরেকটি শ্রেণি পালটা গল্পকথা তৈরি করছে নিজেকে রক্ষা করতে।
যেহেতু সুবর্ণগ্রামের কথা আখ্যানের কেন্দ্রীয় বিষয়, বাঙ্গালার কথা; তাই এখানে ঔপন্যাসিক বাঙ্গালাকেই তুলে ধরেন। সময়টা মধ্যযুগের, তাই চৈতন্যদেব আসীন হন গল্পকথায়। চৈতন্যদেব শুরু থেকে ছিলেন প্রান্তিক মানুষের আশ্রয়, তার দর্শনও সর্বমানুষকে কেন্দ্র করে। অদোষদর্শিতার মন্ত্র নিয়ে ধনী-গরিব, জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সকলের মিলনের কথা বললেন তিনি। তার কথায়: সকলে মিলে ডাকো হরিনাম। ইবনে আসাদের বয়ানে ঔপন্যাসিকের কথা হচ্ছে ভাব-ভক্তিতে সমর্পিত এমন হরিসংকীর্তনের সঙ্গে খ্রিষ্টীয় গড বা মহাম্মদি খোদায় আত্মসমর্পণের পার্থক্য তো নেই। বরং অসাম্য বা সামাজিক শ্রেণিভেদের বিপরীতে ইসলামের মতো চৈতন্যবাদে লেখক দেখেছেন এক ধরনের প্রতিরোধ। সেই সহজ মানুষ চৈতন্যকে একটা শ্রেণি পরে অবতার বানিয়ে দিয়েছে, বৌদ্ধধর্মে দেবকল্পনা না থাকা সত্ত্বেও যেমন গৌতমকে দেবতা বানানো হয়, গৌতমভক্ত তাঁরাকে দেবী করে তোলা হয়। বানানো হয়ে এদের মূর্তি। সুতরাং বহু বাস্তবতায় তৈরি হওয়া দেবকল্পনা, তন্ত্র-মন্ত্রকে ইউরোপ বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না করে দেখিয়েছে ভারতীয়দের প্রধান পরিচয়/চরিত্র হিসেবে; যেন, এটাই ভারত।
জল, জঙ্গল আর জলাভূমির দেশ বাঙ্গালায় সাপের উপদ্রব বেশি ছিল এমনটা স্বাভাবিক। এমন বিপৎসংকুল পরিবেশে সর্পদেবীর কল্পনা খুব স্বাভাবিক, মনসা এক অনার্য দেবী। পরবর্তীকালে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে আর্য বা পৌরাণিক হিন্দুসমাজে গৃহীত হন। এটা যেমন এক বাস্তবতা, সমানভাবে শিবও প্রাক-বৈদিক বা অনার্য দেবতা; এবং শিবের পূজক বাঙ্গালার চাঁদ সওদাগর মনসার কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে চাননি। মনসার গীতে বাংলার চাঁদ আর তার পুত্রবধূর যে-সংগ্রাম দেখা যায় ঔপন্যাসিক একেও বাস্তব ও প্রতীকের সমন্বয়ে ইবনে আসাদের জবানিতে ব্যাখ্যা দেন। চাঁদের বিদ্রোহ আর বেহুলার নারীশক্তি এবং অপরাভবতাকে বাঙালির স্বভাব ও শৌর্য হিসেবে প্রতীকায়িত করেছেন লেখক। সুতরাং এসব কাহিনি বা গল্পকথা নিছক সাহিত্য বা ধর্ম নয়; বরং মৃত্তিকা-উদ্গত এদেশের মানুষের গোটা জীবনের লড়াইয়ের গল্পও। তাই ইবনে আসাদ যখন বলেন, ‘দূর থেকে, অজানা থেকে অনেকেই অনেক কিছু ভেবে নেয়। যতটুকু জেনেছি, উপলব্ধি করেছি তাতে ওই অচেনা জনপদের লোকশ্রুতি, তন্ত্রমন্ত্র, যোগসাধনা, অলৌকিকতাকে একরকমের বাস্তব বলেই তো মনে হয় আমার। এমন এক ধরনের বাস্তব যার স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো বাস্তবের চেহারা। অন্যায় আগ্রাসন, প্রভুত্ব এবং প্রতাপ থেকে বাঁচবার কী-ই বা আর উপায় আছে?’
আফ্রিকার ব্যাপারে ইউরোপীয়দের যে-বয়ান, সমান বয়ান এশীয়দের বেলায়ও ছিল। এমোস তুতুওলা কিংবা চিনুয়া আচেবে আফ্রিকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণকে প্রতিবিম্বিত করে রচিত সাহিত্য দিয়ে যেভাবে ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক কিংবা সাহিত্যতাত্ত্বিক আগ্রাসন বা বয়ানকে মোকাবিলা করতে চেয়েছেন, আমার মনে হয় এখানেও এসব অনুষঙ্গ এসেছে সমান বাস্তবতা ও চেতনায়। সুতরাং যে-তন্ত্রমন্ত্র, বিশ্বাস-আচারকে ইউরোপীয়রা ‘ডগমা’ আখ্যা দিয়ে নিম্নমানের সংস্কৃতির বয়ান চালু করেছিল তাকেই ঔপন্যাসিক চিহ্নিত করেছেন ভিন্ন বাস্তবতা এবং প্রতিরোধের অস্ত্র হিসেবে।
ইউরোপ শুধু প্রাচ্যতত্ত্বই প্রচার করেনি; বরং প্রাচ্যতত্ত্ব তৈরি করেছিল উপনিবেশায়ন, দখল, শোষণ করার জন্য; ক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্য। শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক কৌশল বা শক্তি দিয়ে উপনিবেশ টিকিয়ে রাখা যায় না; তারা জানত ক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্য দরকার হয় জ্ঞানতাত্ত্বিক কৌশল বা উনিবেশায়ন। সুবর্ণপুরাণ উপন্যাসে লেখকের একটা মোটিভও লক্ষ্য করি যে, কীভাবে একটি সভ্যতাকে উপনিবেশায়নের মাধ্যমে ইউরোপ পদানত করতে পেরেছিল তার আবিষ্কারা। ভারতে বা বাংলায় উপনিবেশবাদের পথিকৃৎ যে-পর্তুগিজরা, এই উপন্যাসের বিষয়ও করা হয়েছে পর্তুগিজ উপনিবেশায়নের সূত্র ধরে। লখিন্দরের লোহার বাসরে যে-সুতানালী সাপ ঢুকে সর্বনাশটা করেছিল চাঁদবংশের, ভারতে ভাস্কো দা গামার প্রবেশ এর সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় হতে পারে। পর্তুগিজদের পিছু কিছু পরবর্তীকালে আসে অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক; ওলন্দাজ, দিনেমার, ফরাসি ও ইংরেজরা। পর্তুগিজরা বণিকবৃত্তির নামে প্রবেশ করে দস্যুবৃত্তি, লুঠতরাজ, দাসব্যবসা, তষ্করবৃত্তি ও ধর্মব্যবসাকে স্থায়ী পেশায় রূপান্তরিত করে। নিজেদের ভাগ্যবদলের জন্য অন্য ইউরোপীয়দের মতো পর্তুগিজরা আস্ফালন, স্পর্ধা, প্রতারণা, ঔদ্ধত্য ও নিষ্ঠুরতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। কালিকটে ভাস্কো দা গামার দ্বিতীয় অভিযান এর বড়ো প্রমাণ।
সুতরাং বাণিজ্যপথ আবিষ্কার, বাণিজ্য, বাণিজ্যবিস্তার ও খ্রিষ্টধর্ম প্রচার বলে পর্তুগিজদের ভারতের ব্যাপারে যে-বয়ান ইবনে আসাদ তা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, বাণিজ্য হচ্ছে ওদের মুখোশ। ফ্রান্সিস রাফায়েল নিজের পরিবারের গল্প থেকেও স্বীকার করেছেন ভারতে প্রথম দিককার নৌ-সেনাপতি আলফোনসো ডি আলবুকার্ক, বাস্তবে যে-ছিল একজন বর্ণবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও নরঘাতক দস্যু; পর্তুগিজরা তাকে মার্স, মানে যুদ্ধদেবতা বলে অভিহিত করত। ভারতে খ্রিষ্টানদের পুড়িয়ে মারতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তার ধর্মযাজক দাদু আলবুকার্ককে ত্যাগ করেছিলেন। এই পর্তুগিজরাই বাংলার নিরীহ নারীপুরুষ জোরপূর্বক ধরে নিয়ে দাসব্যবসায় মেতে ওঠে; প্রথমে সাতগাঁও এবং পরে অন্যান্য অঞ্চলে ওদের ঘাঁটি বিস্তার করে। এই পর্তুগিজরাই বাংলার প্রতি বর্মার মগদের মদদ দেয়; সন্দ্বীপ পর্যন্ত ঘাঁটি, লবণব্যবসা, জাহাজ মেরামত কারখানা প্রভৃতি গড়ে তোলে। এবং এদের হাত ধরেই বাংলার সমৃদ্ধির পতন শুরু হয়।
নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা শুধু নয়, শুরু থেকে উপকূলীয়দের সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা ও পরিচয়বহনকারী ঐতিহ্য মুছে ফেলতে তৎপর ছিল পর্তুগিজ-উপনিবেশকরা। এটাই ইউরোপীয় উপনিবেশায়নের নীতি ছিল; হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, নিপীড়ন এবং নির্যাতন। ইবনে আমাদের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন ঔপন্যাসিক যে, ‘একেকটা জনপদ উৎখাত করে মানুষ পাঠিয়ে দিচ্ছে মাটির নীচে, খনির আঁধারে। পায়ে বেঁধে দিচ্ছে বেড়ি। গলায় পরাচ্ছে লোহার শিকল আর যিশুর নাম করে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে বাইবেল।’ উপনিবেশায়নের আদিপর্বে একই ঘটেছে সারা পৃথিবীতে; আর পর্তুগিজ হচ্ছে এসবের হোতা। বাঙ্গালার ভূমিসংলগ্ন মানুষ ভৌগোলিক অবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক উদারনৈতিকতার কালে এসব দস্যুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। কেন পারেনি, তারও কথা আছে উপন্যাসে।
বাংলার ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক উদারতার বয়ান সকলেই দেন। কিন্তু ঔপন্যাসিক এসবকে বিশিষ্ট করে তুলেছেন তার জাদুকরী বর্ণনায়। প্রকৃতি, নদনদী, পুকুর-দিঘি, মাঠঘাট প্রান্তর, পশুপাখি, খাদ্যশস্য, ঘরবাড়ি, অট্টালিকা-প্রসাদ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বাজার-হাট, কেনাবেচা, গঞ্জ-বন্দর, লোকালয় প্রভৃতিকে এমনভাবে হাজির করেছেন কাহিনির বৃত্তে যে তাতে বাঙ্গালা পৃথিবীর বুকে অনন্য স্থান হিসেবে গণ্য হয়। এর কারণ একটাই যে উপনিবেশপূর্ব বাঙ্গালাকে ইতিহাসের আয়নায় উপস্থাপন করা। এখানে লেখক একটা টেকনিক ব্যবহার করেন যে, নিজে এসব ঐশ্বর্যের বর্ণনা না করে বর্ণনা করিয়েছেন ইতিহাসের উপাদানের ভিত্তিতে, ইউরোপীয় পর্যটকের দিনপঞ্জির আলোকে, কখনো মরক্কোর জ্ঞানী পর্যটকের কথা। বর্ণার এর একদিকে আছে দালানকোঠা, চাকচিক্য, বাণিজ্য ও কৃষ্টির সমাবেশ; অন্যদিকে প্রকৃতির সঙ্গে সহজ-সরলভাবে, স্বচ্ছন্দে মিশে গিয়ে অতি দরিদ্রের মধ্যে মানুষের জীবনযাপন। এই দ্বান্দিক বাস্তবতা উপন্যাসের নানা জায়গায় নানাভাবে রয়েছে; কখনো স্পষ্ট, কখনো ইঙ্গিতে।
সোনারগাঁয়ের ‘বাগে-ই মুসা’র পোড়ামৃত্তিকার কারুকার্যমিশ্রিত শিল্পকর্ম দেখে রাফায়েল অভিভূত হয়েছিলেন। এসবকে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে ‘বিশুদ্ধ শিল্প’ বলে মন্তব্যও করেছিলেন। এর জবাবে ইবনে আসাদ ইউরোপীয় শিল্পমানসের বিপরীতে বঙ্গীয় শিল্পতত্ত্বের যে-পরিচয় দেন, তাও প্রাচ্যবাদের বিপরীত স্রোতে বর্ণিত। বক্তব্যটা এমন যে, ‘প্রাচ্যের এ মুল্লুকের সভ্যতার আত্মা হচ্ছে এর কোমলতা, এর শিষ্টতা। এই বিশেষ গুণটি কিন্তু সর্বদা অন্যের কথা ভাবে। এ হৃদয় বড়োই উদার। যুগ যুগ ধরে অকাতরে নিচ্ছে যেমন দিচ্ছেও তত। ফলে এর বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এতে দেশি-বিদেশি উপাদানের মিলন ঘটেছে প্রচুর। এক অঞ্চল থেকে এসে আর এক অঞ্চলের মধ্যে একাকার হওয়া আলো এসে জড়ো হচ্ছে এর প্রদীপে। সেই কোন যুগে হাজার বছরের স্থানীয় জনবসতির জীবনযাপনের মধ্যে এসে মিশেছিল আর্যদের সৌন্দর্য। পরে আরব পারসি আর তুর্কিরা যখন এখানে আসতে শুরু করল সঙ্গে করে আনতে লাগল তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। নৃত্যের এই যে ভঙ্গিমাগুলো দেখলেন এ হলো হিন্দুস্থানি আর্যধারা। আর এই যে চারপাশ জুড়ে নকশা এগুলো আরবীয় অথবা পারস্যের। ভারতবর্ষ জুড়েই এর যথেষ্ট প্রমাণ পাবেন আপনি। পৃথিবীর সর্বত্র পোড়ামাটির ব্যবহার সুপ্রাচীন হলেও এই যে দেখলেন এখানকার কুমোরদের এই কারিগরিটি, এটি কিন্তু খাঁটি বঙ্গাল।’ সারা ভারতবর্ষে শিল্পধর্মের এমন গুণকে দুই অপরিচিতের মিলন না বলে ইবনে আসাদ দীর্ঘ অদর্শনের পর দুই আত্মীয়ের মিলন বলে অভিহিত করেছেন। বস্তুত শুধু শিল্পগত নয়, বাঙালির মূল দর্শনও সমন্বয়বাদী।
আখানের একটা পর্যায়ে ইবনে আসাদ নিজের ভ্রমণ-ধর্ম অনুযায়ী চলে গেলেন, কিন্তু ফ্রান্সিস রাফায়েল রয়ে গেলেন বাঙ্গালায়। তখন বাঙ্গালার বিপর্যয় কাল, মোগল আক্রমণের মুখে। একদিকে পর্তুগিজ ও মগদের উৎপাত, অন্যদিকে স্বাধীনচেতা ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে কবজা করতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাপতির বাঙ্গালা আক্রমণ। শঙ্কিত সোনারগাঁয়ের অপরাপর মানুষের মতো রাফায়েলও যুক্ত হলেন প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙ্গালার একজন হয়ে। একসময় মাগল সেনাপতি ইসলাম খানের নেতৃত্বে সোনারগাঁর দাপট অস্তমিত হলো, ক্ষমতার কেন্দ্রে আবির্ভাব হলো ঢাক্কার। দিনপঞ্জিতে রাফায়েল লিখেছিলেন, ‘কোথাও ফিরব না আমি। না মালাক্কায়, না পর্তুগালে। বাঙ্গালার মানুষ আর এর জল হাওয়ার বিরাট হৃদয়ের ওপর থেকে যাব।’ অতীত বাংলার ঐশ্বর্য ও সংগ্রামের ইতিহাস নির্মাণ এই উপন্যাসের উপজীব্য হলেও পারভেজ হোসেন বাঙ্গালার হৃদয়ের ভিত্তিকেই মূলত প্রতিষ্ঠা করতে চয়েছেন, অন্য অর্থে প্রাচ্যবোধ বা প্রাচ্যের হৃদয়।
বাঙ্গালার ইতিহাসে সময়টি আবার এই অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ যে ইউরোপীয় শক্তি তখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও সামরিক উপস্থিতি বিস্তার করছে। আর ঔপনিবেশিক আধিপত্য তখনো রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপ নেয়নি এই অঞ্চলে, কিন্তু তার মানসিক, অর্থনৈতিক ও জ্ঞানগত প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। এই কারণেই সুবর্ণপুরাণকে ঔপনিবেশিকতার পূর্ব-ইতিহাসের সাহিত্যিক পুনর্গঠন হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। এই পুনর্গঠনের বড়ো তাৎপর্য হচ্ছে ঔপনিবেশিক প্রতিনিধিত্বের বিপরীত বিন্যাস। ঔপনিবেশিক বয়ানে যেখানে স্থানীয়রা ‘অপর’ বা নাই হয়ে যায়, এই উপন্যাসে তারা মুখ্য হয়ে উঠেছে। আবার লেখক ইতিহাসকে ফাঁপা গৌরবে পরিণত না করে ঐতিহাসিক ক্ষতকে জীবনের উপাদান করেছেন। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বয়ানে প্রবেশ করার ফলে প্রচলিত ইতিহাসের পরিবর্তে তা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, দ্রোহ, বেদনা, স্মৃতি ও প্রতিরোধ ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। সৃজনশীল সাহিত্য হিসেবে সুবর্ণপুরাণের বিষয়গত বড়ো গুণ সম্ভবত এটিই।
এপ্রসঙ্গে আখ্যানরীতিও গুরুত্বপূর্ণ যে, উপন্যাসের আখ্যানটি যেভাবে জাহাজযাত্রার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এবং যাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, যিনি কাহিনির কেন্দ্রে অবস্থিত; সমাপ্তও হয়েছে তার মাধ্যমে। দৃষ্টিকোণের নাটকীয় রূপও তৈরি হয়েছে ইবনে আসাদ ও ফ্রান্সিস রাফায়েলের বয়ানকাঠামোর মধ্য দিয়ে। আখ্যানে ইবনে আসাদ বলছেন, আর ফ্রান্সিস রাফায়েল তা শুনছেন। আখ্যানরীতির এটি একটি লক্ষণীয় বিষয়; কেননা, ঔপনিবেশিক বয়ানে শুধু ‘দেখে’, আর স্থানীয় ভূখণ্ড দেখার চোখে দৃশ্যমাত্র। এই উপন্যাসে রাফায়েল শুধু দেখেন না, তিনি শোনেনও; এই দ্বিবিধ পরিস্থিতি আলাদা তাৎপর্য তৈরি করে আখ্যানে। শুধু দেখা যেখানে পর্যবেক্ষকের ‘ক্ষমতা’ প্রতিষ্ঠা করে, সমান জিনিস সম্পর্কে শোনাতে পর্যবেক্ষক অপরের অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হয়। রাফায়েলের ‘আবিষ্কারক’ থেকে ক্রমে ‘শ্রোতা’ হয়ে ওঠার এমন রূপান্তর উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, ঔপনিবেশিক পরিচয় একরৈখিক নয় বলে ব্যক্তি, রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের পরিচয় বহন করলেও রাফায়েলের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটা উপন্যাসে দ্বান্দিক হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ঔপনিবেশিক ক্ষমতার অংশ না হলেও একজন ইউরোপীয় হিসেবে একই সঙ্গে তিনি বাস্তব/সত্যের শ্রোতা, যা সেই ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্ন করে। এখানে প্রাচ্যতত্ত্বের সরল বাইনারি অস্বীকার করেন ঔপন্যাসিক। ভাটিবাঙ্গালাকে তিনি প্রাচ্যতত্ত্বের রহস্যময় অঞ্চলের সক্রিয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূখণ্ড হিসেবে নির্মাণ করেছেন। তাই প্রাচ্য বা বাঙ্গালা দেখার বস্তু নয়; সে নিজেই দেখে। একক কর্তৃত্ববাদী বয়ানের বিপরীতে এমন উল্টাসাবুদ বয়ানই সুবর্ণপুরাণের উত্তর-ঔপনিবেশিক শক্তি। আমার মনে হয়েছে এই বয়ান ঔপন্যাসিকের মূল লক্ষ্য ছিল। আর এ জন্য আখ্যান বর্ণনায়ও তাকে বেছে নিয়ে হয় বহুস্তরীয় দৃষ্টিকোণ।
সুবর্ণপুরাণ উপন্যাসের শিল্পবিচার আমার উদ্দেশ্য নয়; পাঠপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশেষ উপলব্ধি ভাগ করা ছিল মূল উদ্দেশ্য। তা হলেও উপন্যাস নিয়ে আমাকে অনন্ত দুটি সমালোচনামূলক মন্তব্য করতেই হয় যে এতে পুনরুক্তি আছে; একই বিষয়ের বর্ণনা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। বিশেষ করে মসলিন ও মসলিনশিল্প প্রসঙ্গে। অন্যটি, উপন্যাসের গোটা পাঠ সুসম্পাদিত হলে ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হতো না।









