সুর, প্রেম ও দ্রোহের ভেতর দিয়ে নজরুলকে পাঠ

আনোয়ার ইসলাম
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৩৮আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫৪

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সাধারণত বিদ্রোহী কবি হিসেবেই বেশি চিনি। তার কবিতার বিদ্রোহ, সাম্যের বাণী এবং শোষণের বিরুদ্ধে উচ্চারণ আমাদের সাহিত্যচর্চায় বহুবার আলোচিত হয়েছে। কিন্তু নজরুলের সৃষ্টিশীলতার আরেকটি বিশাল জগৎ হলো তার সংগীত। এই জগতের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য এত বেশি যে নজরুলকে শুধু কবি হিসেবে দেখলে তার সৃষ্টিশীলতার একটি বড় অংশ অদেখাই থেকে যায়। প্রেম, দ্রোহ, দেশপ্রেম, ধর্ম, সমাজ ও মানবতার নানা অনুভব তার গানের বাণী ও সুরে প্রকাশ পেয়েছে। সেই সংগীতের ভেতরের চিত্রকল্প ও ভাবনার জগৎকে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস দেখা যায় ড. সম্পা দাসের গবেষণাগ্রন্থ ‘নজরুলের গানের চিত্রকল্প: প্রেম, দ্রোহ ও সমাজভাবনা’-তে। গ্রন্থটির মূল লক্ষ্য নজরুলের গানকে শুধু গান হিসেবে না দেখে তার ভেতরের চিত্রকল্প, ভাবনা, সুর, সমাজচেতনা ও মানবিক দর্শনকে বোঝা।

গ্রন্থটির শুরুতেই নজরুলের সংগীতজীবনের ব্যাপ্তির কথা সামনে আসে। তার সৃষ্টিশীল জীবনের সময়কাল ছিল মাত্র বাইশ বছর। এর মধ্যে তেরো বছর তিনি সংগীত সৃষ্টিতে গভীরভাবে নিয়োজিত ছিলেন। এই সময়ে তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা করেন। এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক গান সৃষ্টি করাই যেখানে বিস্ময়কর ব্যাপার, সেখানে তার চেয়েও বড়ো বিস্ময় তার গানের বিষয় ও সুরের বৈচিত্র্য। 

এই গ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘চিত্রকল্প’ ধারণাকে কেন্দ্র করে নজরুলের গানকে দেখা। সাধারণভাবে চিত্রকল্প বলতে আমরা কবিতা বা সাহিত্যের দৃশ্যমান ভাবনাকে বুঝি। কিন্তু সংগীতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। এখানে শুধু বাণী নয়, সুর, তাল, লয় ও ছন্দও চিত্রকল্প তৈরিতে ভূমিকা রাখে। একটি গান শ্রোতার মনে কোনো দৃশ্য, অনুভূতি বা কল্পনার জগৎ তৈরি করলে সেটি শুধু বিনোদনের বিষয় থাকে না। তা মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। গ্রন্থকার এই জায়গাটিই অনুসন্ধান করেছেন। নজরুলের গানের বাণী ও সুর কীভাবে শ্রোতার মনের মধ্যে একটি দৃশ্য বা অনুভূতির জন্ম দেয়, তারই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বইটিতে।

গ্রন্থটি পাঁচটি অধ্যায়ে সাজানো। প্রথম অধ্যায়ে নজরুলের গানের বিষয়বৈচিত্র্য, আঙ্গিকবৈচিত্র্য ও শ্রেণীকরণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নজরুলের প্রায় চার হাজার গানকে একটি বইয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই লেখক বিষয় ও সুরের ভিত্তিতে গানগুলোকে ভাগ করেছেন এবং প্রতিটি বিভাগ থেকে কিছু গান নমুনা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি, দেশাত্মবোধ, জাগরণ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, জাতীয় উন্নতি, আন্তর্জাতিক সংগ্রাম, হাস্যরসসহ নানা বিষয় এতে এসেছে। একইভাবে রাগাশ্রিত, লোকসুরাশ্রিত, বাউল, কীর্তন ও বিদেশি সুরের গানও আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

এই শ্রেণীকরণ সাধারণ পাঠকের কাছে হয়তো প্রথমে কিছুটা গবেষণামূলক মনে হতে পারে। কিন্তু নজরুলের সংগীতের বিশাল জগৎ বুঝতে এটি প্রয়োজনীয়। কারণ তার গান শুধু সংখ্যায় বেশি নয়, ধারাতেও বিস্তৃত। তিনি একদিকে ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, গজল, দাদরা ও ভজনের মতো সংগীতধারাকে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে লোকসংগীত ও বিদেশি সুর থেকেও উপাদান নিয়েছেন। ফলে তার সংগীত এক ধরনের সাংস্কৃতিক মিলনভূমিতে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে নজরুলের প্রেমের গান। প্রেমের কবি ও সুরের কবি হিসেবে নজরুলের পরিচয় এখানে নতুন মাত্রা পায়। তার প্রেমের গানে মিলন ও বিরহের পাশাপাশি শরীরী আকাঙ্ক্ষা, সৌন্দর্য, অনুরাগ এবং কল্পনার নানা রূপ প্রকাশ পেয়েছে। ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল’ কিংবা ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল’-এর মতো গানে শব্দের সঙ্গে দৃশ্যের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। পাঠক গানগুলো পড়তে পড়তেই যেন একটা দৃশ্য দেখতে পান।

প্রেমের গানে গজলের ব্যবহার নিয়েও গ্রন্থে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলা গানে গজলকে জনপ্রিয় ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে নজরুলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর’ কিংবা ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’-এর মতো গানে প্রেমের অনুভূতি শুধু কথায় প্রকাশ পায়নি। সুরও সেই অনুভূতিকে বহন করেছে। এখানেই নজরুলের সংগীতের বিশেষত্ব। তিনি শব্দকে সুরের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়েছেন যে গানটি আলাদা একটি নান্দনিক জগৎ তৈরি করেছে।

তৃতীয় অধ্যায় বইটির আরেকটি শক্তিশালী অংশ। এখানে নজরুলের স্বদেশচেতনা, গণসংগীত, রণসংগীত ও জাগরণী গানের চিত্রকল্প বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নজরুলের দেশপ্রেম কোনো আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ কিংবা ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’-এর মতো গান মানুষের ভেতরে সাহস ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। 

এই জায়গায় নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। তিনি মানুষকে প্রতিবাদ করতে আহ্বান করেছেন। তার গান তরুণদের জাগিয়েছে। কারাগার, শিকল, রণক্ষেত্র, মুক্তি—এসব শব্দ ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে তিনি একটি সংগ্রামী মানসিকতা তৈরি করেছেন। গ্রন্থকার দেখিয়েছেন, এই গানগুলোর আবেদন শুধু নজরুলের সময়ের মধ্যে আটকে নেই। বর্তমান সময়ের আন্দোলন ও প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও এগুলো মানুষের ভাষা হয়ে উঠতে পারে।

চতুর্থ অধ্যায়ে এসেছে ধর্মীয় সংগীত ও হিন্দু-মুসলিম মিথের ব্যবহার। নজরুলের ধর্মভাবনা তার সামগ্রিক মানবতাবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত। তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের মিথ ও চরিত্রকে তার গানে ব্যবহার করেছেন। কখনো শিব, দুর্গা বা নটরাজের চিত্রকল্প এসেছে। আবার কখনো ফেরাউন, নমরুদ, ইব্রাহিম ও মুসার মতো ইসলামি মিথ ও চরিত্র এসেছে। এর মাধ্যমে তিনি অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে শুভশক্তির ধারণা তৈরি করেছেন।

পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে নজরুলের সমাজচেতনা। সমাজের দরিদ্র, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ছিল গভীর। নিজের জীবনেও তিনি অভাব ও সংগ্রাম দেখেছেন। লেটোর দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গভীর করেছে। তাই তার গান শুধু সমাজের ছবি আঁকে না। সমাজ পরিবর্তনের আহ্বানও জানায়।

গ্রন্থটির একটি বড়ো গুণ হলো, এটি নজরুলের গানকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে প্রেমের গান, বিদ্রোহের গান, ধর্মীয় গান ও সমাজের গান সবকিছুর মধ্যে একটি সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। এই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। নজরুলের কাছে প্রেম যেমন মানুষের অনুভূতি, তেমনি বিদ্রোহও মানুষের মুক্তির জন্য। ধর্মও মানুষের বিভাজনের জন্য নয়। সমাজচেতনাও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। ফলে বইটি পড়লে নজরুলের সংগীতজগতের একটি সামগ্রিক ছবি পাওয়া যায়।

তবে গ্রন্থটি পুরোপুরি সহজপাঠ্য নয়। বিষয়টি গবেষণাধর্মী হওয়ায় কিছু অংশ সাধারণ পাঠকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। চিত্রকল্প, সুর, রাগ, তাল ও সংগীতের বিভিন্ন ধরন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বইটি কখনো কখনো একাডেমিক হয়ে উঠেছে। তবে এই গবেষণামূলক চরিত্রই বইটির শক্তি। 

সব মিলিয়ে ‘নজরুলের গানের চিত্রকল্প: প্রেম, দ্রোহ ও সমাজভাবনা’ নজরুলের সংগীতকে নতুনভাবে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। বইটি মনে করিয়ে দেয়, নজরুল শুধু বিদ্রোহী কবি নন। তিনি প্রেমের কবি, সুরের সাধক, সমাজসচেতন শিল্পী এবং মানবমুক্তির কণ্ঠস্বর। তার প্রায় চার হাজার গানের ভেতর এখনও অনেক অজানা রত্ন লুকিয়ে আছে। এই গ্রন্থ সেই রত্নগুলোর কিছু আমাদের সামনে তুলে ধরে। তাই নজরুলের গান যারা ভালোবাসেন, তার সংগীত নিয়ে গবেষণা করতে চান কিংবা নজরুলকে কবিতার বাইরে আরও বিস্তৃতভাবে বুঝতে চান, তাদের জন্য বইটি গুরুত্বপূর্ণ। 

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হত্যা মামলায় সাবেক এমপি সাইফুলসহ ১৩ জনকে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ
হত্যা মামলায় সাবেক এমপি সাইফুলসহ ১৩ জনকে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ
‘মান্নাত’-এর অন্দরমহলে বদলের ছোঁয়া, পেছনে যুক্ত হচ্ছে নতুন তলা
‘মান্নাত’-এর অন্দরমহলে বদলের ছোঁয়া, পেছনে যুক্ত হচ্ছে নতুন তলা
বাংলাদেশ-ব্রাজিল ম্যাচ হলে ফুটবলে কতটুকু উন্নতি হবে, প্রশ্ন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর
বাংলাদেশ-ব্রাজিল ম্যাচ হলে ফুটবলে কতটুকু উন্নতি হবে, প্রশ্ন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর
কেউ বলেনি আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, ভুয়া খবর: জোন্স  
কেউ বলেনি আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, ভুয়া খবর: জোন্স  
সর্বাধিক পঠিত
শেখ হাসিনার আত্মীয় বলায় যা বললেন আন্দালিভ রহমান পার্থ
শেখ হাসিনার আত্মীয় বলায় যা বললেন আন্দালিভ রহমান পার্থ
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকবেন ৩ মন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকবেন ৩ মন্ত্রী
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ