X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
পথে নেমে পথ খোঁজা

কায়েস আহমেদের হাত ধরে প্রিয় লেখকদের আস্তানায় ।। পর্ব—৫

মঞ্জু সরকার
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৫৩আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:০১

অগ্রজ লেখক বন্ধুদের কথা ভাবতে গেলে প্রথমে কায়েস আহমেদের কথা মনে আসে। বয়সে তিনি আমার চেয়ে বছর সাতেকের বড় ছিলেন। আমি তাকে কায়েস ভাই ডেকেছি, তিনি বরাবর নাম ধরে আপনি সম্বোধন করতেন। অল্প সময়ে আন্তরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল আমাদের। তারচেয়েও বড় কথা কায়েসের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সম্পর্কটা টিকেও ছিল এবং মৃত্যুর পরও স্মৃতিতে যা অম্লান।

গ্রন্থকেন্দ্রে চাকরিতে ঢুকে প্রথম কয়েক বছর যেসব সুবিধাবাদী ও ধান্ধাবাজ লেখক-বুদ্ধিজীবীদের দেখেছি, কায়েস তাদের মতো প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিষ্ঠানের মদদপ্রার্থী ছিলেন না বলেই হয়তো-বা অফিসে দেখা হয়নি। চিনতামও না। লিটল ম্যাগাজিনে নামটি দেখা ছাড়াও ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় তার ছোট উপন্যাস ‘নির্বাসিত একজন’ পড়ে ভালো লাগে। এরপর লেখককে আবিষ্কার করেছি কারো সাহায্য ছাড়াই। প্রথম দেখা হয়েছিল গুলিস্তানের ভারতীয় তথ্যকেন্দ্রের লাইব্রেরিতে। স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছর গুলিস্তান হলের কাছে রাস্তাসংলগ্ন দোতলায় ছিল ভারতীয় তথ্যকেন্দ্রের লাইব্রেরি। বইপত্র নেওয়া যেত না, কিন্তু বসে যতক্ষণ খুশি পড়া যেত। আমি অফিসের ফাঁকে কখনো-বা অফিস ফাঁকি দিয়েও সেখানে যেতাম নিয়মিত। সাপ্তাহিক দেশ, অমৃত ইত্যাদি পত্রপত্রিকা আর মূল্যবান বই পড়তাম। এ লাইব্রেরিতেই প্রথম দেখেছি কায়েস আহমেদকে। খদ্দের পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত হালকাপাতলা চোহারার মানুষটিকে দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। নির্বাসিত একজন নায়কের সঙ্গে কী মিল খুঁজে পেয়েছিলাম জানি না, মনে হয়েছিল এই লোকটাই লেখক কায়েস আহমেদ হবেন। ধারণার সত্যতা যাচাই করার জন্য নিজেই তার সঙ্গে যেছে আলাপ করি। আমার অনুমান সঠিক হওয়ার আনন্দে এবং সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ করার আগ্রহেও তাকে চা-সিগারেট খাওয়াতে চাই।

লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে কায়েস গুলিস্তানের পেছনের দিকে ঐতিহ্যবাহী রেক্স নামের রেস্টুরেন্টে নিয়ে যান আমাকে। এ রেস্টুরেন্টের কাবাব-পরোটা বিখ্যাত। পুরোনো ঢাকার বিউটি বোর্ডিং যেমন, এই রেস্টুরেন্টও পাকিস্তান আমল থেকে বিখ্যাত কবি-লেখক অনেকে আড্ডা দিতেন। এখনো আসেন। কায়েসের কাছেই জানতে পারি এসব তথ্য। তিনিও আসেন এবং তাকেও চেনেন অনেকে। বুড়োভাই নামক আধাবুড়ো এক ব্যক্তি ও বিপ্লব দাশ নামক এক হাস্যোজ্জ্বল তরুণ এক টেবিলে বসে চায়ের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। কায়েসের ঘনিষ্ঠ মনে হলো। আমি অচেনা লোকজনের সামনে সহজ হতে পারি না। হইচই আড্ডার বদলে নিভৃত আলাপচারিতা পছন্দ। ফলে আলাদা টেবিলে বসে ক্রমে দুজনের চেনাজানা গভীর হতে থাকে।

কায়েস আহমেদ লেখক শওকত আলী এবং আখতারুজ্জাম ইলিয়াস জগন্নাথ কলেজে তার শিক্ষক ছিলেন। উভয় শিক্ষকের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুসুলভ ঘনিষ্ঠতা। তাদেরকে স্যার ডাকতেও শুনিনি কখনো। উভয়ের বাসায় যেতেন নিয়মিত। সেই সুবাদে শওকত আলীর অনুজ শিল্পী আব্দুর রউফ সরকারকেও চিনতেন খোকন ডাক নামেই। কায়সুল ভাইকেও চিনতেন। আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর গ্রন্থকেন্দ্রে ঘনঘন আসার রাস্তাটা আরো প্রশস্ত হয়ে গেল। আসতে শুরু করলেন এবং এলে আমার টেবিলেই বসতেন। একান্ত আড্ডা হতো আমার সঙ্গে।

গেন্ডারিয়ায় একা থাকেন। স্বাধীনভাবে লেখাপড়া ও আড্ডা দেওয়া ছাড়া বাঁধাধরা কোনো চাকরি নেই। কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার হাই স্কুলের শিক্ষকতা চাকরিটা হয়নি তখনো। তবে রোজগারের জন্য পার্টটাইম শিক্ষকতা বা টুকটাক কিছু করতেন সম্ভবত। আমি ততদিনে বিয়ে করে ঘরসংসার ফেঁদে বসেছি। একদিন খিলগাঁয়ের বাসাতেও নিয়ে গিয়েছি তাকে। আমার স্ত্রী তাকে রংপুরের আঞ্চলিক রান্নায় আপ্যায়িত করেছেন। ওই সময়ে সমসাময়িক কোনো লেখক-বন্ধু ছিল না আমার। ফলে মন খুলে সব বিষয়ে নিজের অজ্ঞতা-বিজ্ঞতা স্বপ্ন-সীমাবদ্ধতা অকপটে জানতে দিতাম তাকে। তিনিও কাউকে না বলার শর্তে নিজের অনেক কথা বলতেন। এভাবে বয়সের ব্যবধান ঘুচিয়ে কায়েস আহমেদ আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ও প্রিয় অভিভাবকও হয়ে উঠেছিলেন।

ওই সময়ে অতি বাম ও আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী রাজনীতির কিছু কর্মীর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বন্ধু বা আত্মীয় ছদ্মবেশে অফিসেও আসতেন তারা। আমার ওপর মার্কসবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের প্রভাব রাজনৈতিক কথাবার্তা, কখনো-বা তর্ক থেকেও আন্দাজ করতেন কায়েস। অতিশয় আবেগপ্রবণ স্বভাব বলে পাছে ভুল রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে নিজের সর্বনাশ করি, এ ভয় থেকে আমাকে নিবৃত করে শুধু লেখালিখির চেষ্টাতে ব্যস্ত থাকার কথা বলতেন। লেখাকে আইডিয়া বা শ্রেণিসংগ্রামের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে নিজের লেখালেখির ক্ষতি করেছেন, ‘আজকাল পরশুর গল্প’ তার প্রমাণ। আমি ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ ছাড়াও কিছু গল্পের সাফল্যের দৃষ্টান্ত দিতাম। ওই সময়ে মহাশ্বেতা দেবী আমার খুব প্রিয় লেখক হয়ে উঠেছিলেন। কায়েস মহাশ্বেতার লেখাকে আইডিয়ার বাহন, রক্তমাংসের ব্যক্তি মানুষের উপস্থিতি কম- এসব বলতেন। তার এ ধরনের মতের সঙ্গে সহজে একমত হতাম না ওই সময়ে। লেখকের উদ্দেশ্য ও আদর্শবাদিতা বড় করে দেখতাম। তর্কে না পেরে একদিনের আড্ডায় ‘ধুর! আপনার শিল্পের গোয়া মারি’ বলে অসহিষ্ণুতা দেখিয়েছিলাম। আমার লাগামছাড়া কথাবার্তায় তিনি বেজার হতেন ঠিক, কিন্তু সম্পর্ক ছেদ করেননি।

লেখকমহলে কায়েস আহমেদের জানাশোনা ও অভিজ্ঞতা আমার চেয়েও বেশি ছিল। জগন্নাথ কলেজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেও ভর্তি হয়েছিলেন। আবুল হাসনাত, মফিদুল হক, সেলিম আল দীন ছাড়াও সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের অনেকেই সহপাঠী কিংবা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে পরিচিত ছিলেন। গ্রন্থকেন্দ্রে আমার কাছে নিয়মিত এসে যেসব লেখক বুদ্ধিজীবীদের দেখতেন, তাদের অনেকের সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তার মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে অনেককে এড়িয়ে চলারও চেষ্টা করেছি। আবার অগ্রজ ও সমসাময়িক অনেকের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল কায়েসের মাধ্যমেই। উভয়ের প্রিয় লেখক ও প্রিয় মানুষ সম্পর্কিত ধারণায় অমিলের বদলে মিলই ছিল বেশি।

কায়েস আহমেদের গেন্ডারিয়ার ঘরেই আখতারুজ্জাম ইলিয়াসকে চাক্ষুস করি প্রথম। পুরোনা ঢাকার সঙ্গে ইলিয়াসের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। গেন্ডারিয়ায় আড্ডা দিতে গিয়ে কায়েস আহমেদের ঘরেও সস্ত্রীক এসেছিলেন। তখন তার একটাই গল্পগ্রন্থ বেরিয়েছে- ‘অন্যঘরে অন্যস্বর’। পড়ে তাকে খুব বেশি বামপন্থি বা প্রতিবাদী লেখক হিসেবে শনাক্ত করতে পারিনি। বড় লেখকও মনে হয়নি। অন্যদিকে আমার লেখক-পরিচয় তো তখনো কেবল নিজেরই স্বপ্নজগতে সীমিত। উল্লেখযোগ্য কোনো গল্প নামিদামি পত্রিকায় বেরয়নি। গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মী হিসেবে কায়েস ভাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমি অফিসের নতুন কিছু গ্রন্থোন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা বলে অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম তাকে। বাঁকা হাসিতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেই আমন্ত্রণ। এরপরও কায়েস আহমদই প্রথম টেনে নিয়ে যান তার কেএমদাস লেনের ভাড়া-বাড়িতে। একদিন, তারপরে আরো একদিন, তারপর আরো কয়েক দিন এবং এভাবে যে কত অসংখ্য দিন ইলিয়াস ভাইয়ের বাসায় গিয়েছি! প্রথম দিকে অনিবার্য সঙ্গী ছিলেন কায়েস, পরে আরো অনেকের সঙ্গে এবং লেখক শিবিরের আশ্রয়েও ইলিয়াস ভাইয়ের বাঁকা হাসির সম্পর্কটা প্রাণখোলা আড্ডা ও অট্টহাসিতে এতটাই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল যে, ইলিয়াস প্রসঙ্গে ভিন্ন একটি নিবন্ধে সেসব স্মৃতির বিস্তার ঘটাতে হবে। এ লেখাটায় কায়েসকে নিয়ে সীমিত থাকা যাক।

ইলিয়াস ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার জন্য কেএমদাস লেনে ঢুকলেই, হাটখোলায় বাম দিকে শওকত আলীর নিজস্ব চারতলা বাড়ি। আগে শওকত ভাইয়ের বাড়িতেই ভাড়া থাকতেন ইলিয়াস ভাইও। কায়েসের সঙ্গে শওকত ভাইয়ের বাসাতেও ঢুঁ মেরেছি অনেকদিন। তবে আমাদের দুজনেরই প্রধান আকর্ষণ ছিল ইলিয়াস ভাইয়ের বাসার আড্ডা। আর তুলনামূলকভাবে ইলিয়াস ভাইয়ের সঙ্গে কায়েসের সম্পর্কটাও ছিল অধিকতর বন্ধুসুলভ। কায়েসের বিয়েতে ইলিয়াস ছিলেন অভিভাবকের ভূমিকায়। বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে প্রথম তার বাসাতেই উঠেছিলেন কায়েস।

সংসারজীবনে বাঁধা পড়ার আগে গেন্ডারিয়ারই তার ঘনিষ্ঠজন বলায়েত হোসেন নীলুকে নিয়ে অফিসে কয়েকবার এসেছিলেন। আমার চেয়েও কমবয়সী নীলু, কিশোরই বলা যায়। উভয়ের মধ্যে তুমি সম্বোধন ও বন্ধুসুলভ নিবিড় সম্পর্কের নেপথ্যে যে নীলুর বোনও জড়িয়ে আছে, অনেকদিন বুঝতে দেননি কায়েস। দুজনের একান্ত আড্ডায় আমি নিজের জীবনের প্রেম, এমনকি পেশাদার নারীসংসর্গের অভিজ্ঞতাও অকপটে তার কাছে বলতাম। কিন্তু কায়েস এসব ব্যাপারে নিজের বিষয়ে কিছু বলতেন না। চাপা-স্বভাব কায়েস অবশেষে নীলুর বোনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তটি আমার সঙ্গে শেয়ার করলে তার সমস্ত দ্বিধাভয় উড়িয়ে দিতে খুব উৎসাহ দিয়েছিলাম তাকে। অভিজ্ঞতা থেকে জানি, বিয়ের মতো ফলদায়ক বন্ধন লেখকদের অনিশ্চিত উড়ুউড়ু জীবনে অতীব উপকারি জিনিস। আর পাত্রী যেমনই হোক, ভালোবাসা পেলে পশুপ্রাণী বশ হয়, আর একটা মানুষ হবে না? ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮৩ সালে, মাসটি মনে নেই।

বিয়ের পরও কায়েসের সঙ্গে সম্পর্কটা আগের মতো ঘনিষ্ঠ থাকে। গ্রন্থকেন্দ্র তখন পুরানা পল্টন থেকে গুলিস্তানের নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছে। কায়েস গেন্ডারিয়ার বাসা থেকে কাকরাইলের স্কুলে যান। যাওয়ার সময় বা ফেরার পথে ঢুঁ মারেন অফিসে। কোনোদিন-বা আমি অফিস থেকে বেরিয়ে তার স্কুলের টিচার্স কমনরুমের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করি। স্কুল ছুটির সময় কতো অভিভাবক গেটে ভিড় করেন তাদের সন্তানদের জন্য। আর আমি বহুদিন অপেক্ষা করেছি কায়েসের জন্য। আড্ডা দেওয়ার জন্য হাঁটতে হাঁটতে দুজন চলে গেছি সন্ধানী অফিসে সুশান্ত মজুমদারের কাছে কিংবা মফিদুল ভাইয়ের অফিসে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি হিসেবে বর্তমানে যেমন, তেমনি জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী তথা সাহিত্য প্রকাশ-এর কর্ণধার একজন বুদ্ধিজীবী লেখক হিসেবে মফিদুল হক বহু লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীর আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন। গ্রন্থকেন্দ্রের চাকরিজীবনের শুরু থকে মফিদুল ভাইয়ের সঙ্গে পাঠক ও হবু-লেখক হিসেবে সম্পর্কটা এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে যে, আপন অগ্রজতুল্য অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন আমার। ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে অনেকে বই পড়িয়েছেন আমাকে। মার্কেসের বেশ কয়েকটি বই উপহারও দিয়েছিলেন। বয়সে কিছু বড় হওয়ায় কায়েসকে তিনি ভাই ডাকতেন এবং বেশ পছন্দ করতেন। মফিদুল ভাইয়ের অফিসে প্রথম সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, হায়াৎ মামুদ, ওয়াহিদুল হক, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, আবুল হাসনাত এবং আরো যে কতো প্রবীণ ও নবীন লেখক-সংস্কৃতিকর্মীদের দেখেছি। চুপচাপ বসে থেকে তাদের দেখা ও শোনা ছাড়া আমার তো বলার কিছু ছিল না। তবে তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরে কায়েস আহমেদের সঙ্গে একান্ত আড্ডায় আমরা উভয়ে একমত হয়েছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

পল্টনে বায়তুল মোকরামে তাসমিন জুয়েলার্সে বসতেন আমাদের উভয়েরই প্রিয় লেখক ও প্রিয় মানুষ মাহমুদুল হক ওরফে বটু ভাই। সন্ধ্যাবেলা তার দোকানে ঢুঁ মারলে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে দোকান বন্ধ হওয়ার সময় পর্যন্ত। কোনো সাহিত্যসভায় বক্তা বা আলোচকের ভূমিকায় দেখিনি তাকে। কিন্তু একান্ত আড্ডা ও আলাপচারিতায় তিনি একাই একশ ছিলেন। কায়েস ও আমি ফুটপাতে দাঁড়িয়েও তার সঙ্গ ও কথাবার্তা উপভোগ করেছি অনেক রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাসমিন জুয়েলার্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও একা বটু ভাইয়ের সঙ্গ পাওয়ার লোভে তার এলিফেন্ট রোডের বাসায় গেছি কয়েকবার। তিনি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার মীজান ভাইকে নিয়ে গ্রন্থকেন্দ্রে আমার অফিসেও গিয়েছিলেন একদিন। মীজান ভাইয়ের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল তার।

১৯৯০ সালে নিজবাড়িতে সস্ত্রীক লেখক পাগলার কাছে শহরতলির গ্রামে বাড়ি করার পর ঢাকার সব ধরনের সান্ধ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কমে গিয়েছিল আমার। এ সময় কায়েস আহমেদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎও কম হয়েছে। স্কুল ছুটির পর সন্ধ্যা পর্যন্ত সন্ধানী অফিসে সুশান্ত মজুমদারের কাছে প্রায় যেতেন। আমার অফিসেও শিশুপুত্র অনীককে নিয়ে এসেছিলেন দু-একদিন। স্ত্রীর মানসিক সমস্যা ছিল বলে পুত্রের জন্য অনেকটা মায়ের ভূমিকাও পালন করতে হতো তাকে। আর আর্থিক টানাপড়েন তো ছিল সারা জীবনের সঙ্গী। ভালো স্কুলে শিক্ষকতা করার পরও অন্য শিক্ষকদের মতো সচ্ছল মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েদের টিউশন বা কোচিং পড়িয়ে বাড়তি রোজগারের চেষ্টা করেননি। লেখক হিসেবেও স্বীকৃতি বা সুযোগ-সুবিধা আদায়ের কোনোরকম ধান্ধাবাজি দেখিনি তার মধ্যে। ঠেকে গেলে আমাদের মতো অভাজন বন্ধুদের কাছে টুকটাক ধার চাইতেন কখনো-বা। সব মিলিয়ে ঘরে বাইরে সংকট এতটাই বৈরী হয়ে ওঠে যে, কায়েসের মতো সচেতন ও সহিষ্ণু মানুষও আর সহ্য করতে পারেননি। ১৯৯২ সালে, মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে আত্মহননের পথ বেছে নেবেন তিনি, এখনো ভাবলে অবিশ্বাস্য মনে হয়।

ঘটনার পরদিন অফিসে গিয়ে সকালে মফিদুল ভাইয়ের ফোনে জানতে পারি খবরটা। লাশ তখন মিডফোর্ড হাসপাতালে লাশকাটা ঘরে। মফিদুল ভাইসহ বাঁকরুদ্ধ হয়ে ছুটে যাই হাসপাতালে। এরপর জুড়াইন কবরস্তানে উপস্থিত থেকে তাকে শেষ বিদায় জানিয়েছি। কিন্তু এভাবে কি একজন সৎ ও আপসহীন লেখককে বিদায় জানানো যায়? লাশকাটা ঘরের কাছে গিয়েও তার তার শেষ গল্পের বই ‘লাশকাটা ঘর’ ঘিরেও নানা টাটকা স্মৃতি হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে। নিজের সামান্য লেখক-জীবনে কায়েসের শূন্যতা অন্য আর কারো দ্বারা পূরণ হয়নি বলেই হয়তো এখনো নানা অছিলায় জীবন্ত হয়ে ওঠে কতো যে স্মৃতি, এ লেখাটা লেখার সময়ে হচ্ছে যেমন।

কায়েস আহমেদ সমগ্র খুব বেশি লেখেননি তিনি। লেখক হিসেবে বিরলপ্রজ ও খুঁতখুঁতে ছিলেন। ‘অন্ধ তীরন্দাজ’, ‘লাশকাটা ঘর’ নামে দুটি গল্পগ্রন্থ। আর ‘নির্বাসিত একজন’ ও ‘দিনযাপন’ নামে দুটি ছোট উপন্যাস। প্রতিটি লেখার মধ্যে প্রস্তুতি ও পরিচর্যার মধ্যে ত্রুটি ছিল না, সময় নিয়ে লিখতেন। লেখা পত্রিকায় প্রকাশের পর ও বই হওয়ার পর নিকট বন্ধুদের পড়ানো ও পাঠপ্রতিক্রিয়া নেওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। ‘অন্ধ তীরন্দাজ’ গল্পগ্রন্থটি নিয়ে গ্রন্থকেন্দ্রের ‘বই’ পত্রিকায় একটি ভালো আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। আহমদ রফিককে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলাম। বেশ খুশি হয়েছিলেন কায়েস। আর মৃত্যুর বছর কয়েক আগে লেখক শিবিরের সাহিত্য পুরস্কারটি পান গ্রন্থকেন্দ্রের একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। ওই সময়ে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জাম ইলিয়াস এবং আমিও বেশ সক্রিয় ছিলাম লেখক শিবির সংগঠনে। সংগঠনের নেপথ্যে ছিলেন আমাদের সকলেরই শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব বদরুদ্দীন উমর, আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে করিৎকর্মা তরুণ আনু মুহম্মদ। ইলিয়াস ভাইয়ের প্রস্তাব ও উদ্যোগে কায়েসকে সাহিত্য পুরস্কারটি দেওয়া হয়। বন্ধু শিল্পী সমর মজুমদার একটা চমৎকার শিল্পকর্ম দিয়েছিলেন পুরস্কার-স্মারক হিসেবে। অনুষ্ঠানটি ঘরোয়া হলেও অতিথিদের মধ্যে খান সারওয়ার মুরশিদ, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, মফিদুল হক, আনু মুহম্মদসহ অনেক বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।

এই অনুষ্ঠানটি ছাড়াও কায়েসকে ঘিরে ব্যক্তিগত আনন্দের স্মৃতিও অনেক। মনে পড়ে, একদিন তাকে নিয়ে আমার পুরনো বন্ধু স্বপন চৌধুরীর মিরপুরের কাছে তুরাগ নদীর পাড়ে দ্বীপগ্রামের বাড়িতে গিয়ে সারাদিন কাটিয়ে এসেছিলাম। ইউনিভার্সিটি প্রেস-এর বাংলা বই প্রকাশের উদ্যোক্তা সম্পাদক ও ‘নিরন্তর’ পত্রিকা সম্পাদক নাঈম হাসনসহ কায়েসের গেন্ডারিয়ার বাসায় চালানো এক ব্যর্থ অভিযানের স্মৃতি। সেই ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে পরে কায়েসের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য একাডেমির অতিথি হিসেবে দুজনই গিয়েছিলাম তাদের এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে। কুমিল্লার বন্ধু শান্তনু কায়সারও উপস্থিত ছিলেন। বক্তৃতাবাজির চেয়ে জয়দুল হকের আতিথেয়তা ও তিতাস নদী দেখা স্মৃতির উজ্জ্বল অংশ হয়ে উঠেছিল দুজনেরই।

কায়েসের আকস্মিক মৃত্যুর পরও লেখক শিবির কর্তৃক একটি শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হায়াৎ মামুদ, শাহরিয়ার কবিরসহ আরো অনেকেই অংশ নিয়েছিলেন। সেই আনুষ্ঠানিক শোকসভার পর কায়েস তার লেখায় এবং স্বজন-বন্ধুদের স্মৃতিতে আর কতদিন জীবন্ত থাকবেন জানি না। এই লেখাটি লেখার আগে নীলুর মাধ্যমে জানতে পেরেছি, তার ভাগ্নে তথা কায়েস আহমেদের পুত্র অনীক এখন ওয়ান ব্যাংকে চাকরি করে, ভালো আছে সে। কায়েসসংক্রান্ত শোক-শূন্যতার মাঝে নিঃসন্দেহে অনীক এখন বড় সান্ত্বনা। চলবে

বিখ্যাত লেখক-বুদ্ধিজীবীদের চেনাজানার সুযোগ ।। পর্ব—৪

/জেডএস/
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ৩ আগস্ট
সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ৩ আগস্ট
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী