X
রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪
১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

ক্ষতচিহ্নিত হাড়মাংস অথবা নিছকই আত্মজনের কথা

গৌতম গুহ রায়
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২০:০৭আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪:৪৫

‘মুছে যায় পায়ের ছাপ, ঝুলন্ত পায়ের শব্দ রয়ে যায়’

এই গল্প আমার বাল্যকালের এক বন্ধুর গল্প, সময় বাংলা ১৩৮০, পৌষ মাস, অথবা এটা পৌষেরও গল্প, সর্বনাশেরও। তখন উদ্বাস্তু কলোনির ছেলে-ছোকরা বলে আমাদের চিহ্নিত করার কেউ ছিলো না, তবুও আমরা অপর।  আমাদের জলপাইগুড়ি শহরটার চারদিকে এমন গোটা চারেক  কলোনি তৈরি হয়েছিলো,  ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর তৈরি হওয়া উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কলোনি। কেন্দ্রে থাকা শহরটাও মূলত পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষজনেরই আবাস। ১৯৬৯ এর পহেলা জানুয়ারি জলপাইগুড়ির পুনঃগঠনের পর ‘নতুন জেলা’-এর প্রশাসনিক প্রয়োজনে এখানে এসেছিলেন অনেক মানুষ।  উকিল মোক্তার থেকে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কেরানি। এর ফলণিবুকের মধ্য দিয়ে প্রবহমান করলা নদীর দুইদিকে বাড়তে থাকা জলপাইগুড়ি শহরের একটা নব-জনবিন্যাস তৈরি হয়েছিলো। এর উত্তরদিকে রায়কত বাড়ি বা রাজবাড়ি, মধ্যে নবাববাড়ি ও তাদের দালানবাড়ির শাখা-প্রশাখা, দক্ষিণে কিংসাহেবের ঘাট থেকে রেসকোর্স– লাল ইটের ব্রিটিশ চিহ্নরাঙ্গা জলপাইগুড়ি, ইউরোপিয়ান ক্লাব। মঝে করলা নদী, নদীর পূর্বে  ইংরেজ নির্মিত লাল ইটের বাড়িগুলো ‘ব্রিটিশ আমল’-এর প্রশাসনিক কর্তাদের আবাস। এই নগর গঠনের ইতিহাসে পরে আসছি, আপাতত আমার বাল্যবন্ধুদের গল্প, সেই বাল্যকালের কথা, তারও আগে আমাদের ‘পৌষ পার্বণের’ কথা বলি।

শহর কেন্দ্রের ‘অভিজাত বৃত্ত’-এর বাইরে শহরের পশ্চিম দিকে আমাদের উদ্বাস্তু কলোনি, দেশবন্ধু নগর, দেশবন্ধু পাড়া, আরবিন্দ নগর প্রভৃতি। শহর কেন্দ্রের স্কুলের থেকে আমাদের প্রান্তের স্কুলগুলোরও আভিজাত্যের রঙ ছিলো অনেকটা ফিকে।  তখনও কেন্দ্রের স্কুল ও প্রান্তের স্কুলের পার্থক্য ছিলো স্কুল ইউনিফর্মে, আমাদের শহরের প্রাচীনতম স্কুল জিলা স্কুলের বা ফণীন্দ্রদেবের, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, সদর গার্লসের ইউনিফর্ম ছিলো সাদা জামা কালো প্যান্ট, সাদা জামা খাকি প্যান্ট, সাদা লাল অথবা সাদা নীল ফ্রক ও শাড়ি। উদ্বাস্তু এলাকার স্কুলের কোনো ইউনিফর্ম ছিলো না তখনও। এভাবেই যেকোনো নাগরিক শ্রেণীবিন্যাসের ভেতর একটা অদৃশ্য স্থানাঙ্ক রচিত হয়েই যায়, আমরা উদ্বাস্তু সন্তান, প্রাইমারিতে আমাদের কোনো স্কুল ব্যাগও ছিলো না, ক্লাস ঘরও ছিলো না। আমাদের টিফিন পিরিয়ডের জন্য কোনো টিফিন বক্স ছিলো না, আধঘণ্টার ‘টিফিন পিরিয়ড’ ছিলো উদ্দাম হুল্লোড়ের। এই সময় আশপাশের বাড়ির পেয়ারা বা কুল, ফলফলান্তির দিকে আমাদের নজর যেতো। আমাদের কলোনির প্রাথমিক স্কুলের বারান্দায় ছিলো আমাদের ক্লাস। পাকা বারান্দায় সিমেন্ট উঠে গিয়ে গর্ত গর্ত, অসমান সেই বারান্দায় বসার জন্য প্রত্যেকের নিজস্ব চটের আসন ছিলো। কলোনির ছেলেদের বন্ধুত্ব জমতো টিফিন পিরিয়ডে, ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার, বিকালে খেলার মাঠের, ডাংগুলি বা কাবাডি মাঠের ঝগড়াতে। আজ মারামারি তো কাল গালাগলি। শহরের পূর্ব প্রান্তের তিস্তা নদীর বাঁধ ঘেঁষে শহরের একমাত্র স্টেডিয়াম। ফুটবল খেলার টুর্নামেন্ট হতো, কলকাতার দল আসতো। দলবেঁধে হাঁটতে হাঁটতে সেই টাউন ক্লাব স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাওয়াটা  ছিলো নেশার ও মজার। এই যাওয়ার পথের মাঝেই মন নানা রকমের স্বপ্ন চাষ করতো। স্বপ্নের আদান-প্রদান হতো। এই বন্ধুত্বের মাঝেই ছিলো মারামারির সখ্য। আমার এমনই বন্ধুদের একজন ছিলো রঞ্জন। স্কুলের পাশের গলিতে ওদের বাসা, বাঁশের বেড়া ও টিনের চাল। বাবা চলে গেছেন নিরুদ্দেশে, ও তখন সদ্যজাত। একা মায়ের একমাত্র ছেলে, আর বুকে পিঠের দারিদ্র। ডানপিটে বলে অনেকেই তাকে সমঝে চলতো। ছোটোরা আড়ালে বলতো ‘গেছোদাদা’, আমগাছ থেকে কণ্টকসজ্জিত কুলগাছ– গাছে চড়াতেই দাদাগিরি তার। সময় এগিয়ে যায়, আমরা পঞ্চম শ্রেণী থেকে ‘ক্লাস সিক্স’-এ উঠলাম, প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিকে, এক এক করে ক্লাস সেভেন।

পৌষ মাস। শীতকাল। আমাদের কাছে এই সময়টার প্রধান আকর্ষণ ছিলো পিঠাপুলির। বন্ধুর গল্প তুলে রাখি, কিছুটা শীতের গল্প হোক, পিঠাপুলির গল্প হোক। আমাদের মা-ঠাকুরমার সেই অঘ্রান মাস থেকে পিঠে উৎসবের প্রস্তুতি শুরু। ছোটবেলায় দেখেছি সংক্রান্তির দিন নিষ্টা ভরে লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা হতো। চালের গুঁড়ো, নারকেল কোরা, পাটালি গুড়, গরম চাটুতে ছ্যাকছ্যাক শব্দে জেগে ওঠা লালসা। শীতের সন্ধ্যায় তখন পড়াশোনা লাটে, আমাদের তখনো ঠাকুমার কল্যাণে অটুট একান্নবর্তী পরিবারে সে এক উৎসবের ‘পৌষপার্বণ’।  আদি অকৃত্তিম কয়লার বা কাঠের উনুনে, আলোবাতাসহীন রান্নাঘরে মনের মাধুরী মিশিয়ে দেশ হারানো, ভিটাচ্যুত বাঙাল রমণী সৃষ্ট করতেন রকমারি স্বাদের পিঠাপুলি, আমাদের উদ্বাস্তু কলোনির বাতাসে সেই গন্ধ মাতাল হয়ে উঠতো। এই কর্মকাণ্ডের ক্যাপ্টেন ঠাকুমার দেশের বাড়ি ছিলো মানিকগঞ্জ, আমার মায়ের দেশের বাড়ি ছিলো ময়মনসিংহ। ঠাকুমা বলতেন– পিঠে খেতে হলে বাঙালের ঘরে যাও।

তখনো এই ‘পৌষপার্বণ’-এর অর্থ খুঁজতে যেতাম না, এটি আমাদের কাছে এক আনন্দ ধ্বনি ছিলো। পৌষপার্বণ মানেই আনন্দ উৎসব। পঞ্জিকা মতে যা ছিলো সূর্যের উত্তরায়ণ গতির প্রারম্ভ। সূর্য তার দক্ষিণায়ন থেকে উত্তরায়ণে প্রবেশকালে পৌষ সংক্রান্তির দিনে মকর রাশি আশ্রয় করে। এই জন্য পৌষ সংক্রান্তি ‘মকর সংক্রান্তি’ বা উত্তরায়ণ সংক্রান্তি নামেও পরিচিত। সনাতন ধর্মালম্বীরা এই দিনে অনেকে পিতৃপুরুষ এবং বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে তিল, খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া এবং নতুন ধানের পিঠে অর্ঘ নিবেদন করেন বলে একে তিলুয়া সংক্রান্তিও বলেন অনেকে। এই দিন ভোর থাকতে বাড়ির মহিলারা স্নান সেরে পূজা সেরে নিতেন, সকালে দেখতাম গোরুর গায়ে চালের গুঁড়োর সাদা চিহ্ন, চৌকাঠে তিলের খাজা ও ধান দূর্বা। মা বলতেন এই সময় গ্রামের বাড়িতে পৌষ বাউরি উৎসব হতো। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ লোকজীবনের উৎসব। এইদিন তুলশিতলা নিকোনো হতো, নিকানো জায়গায় পিটুলি গোলা দিয়ে গোলা আঁকা হতো। কৃষি সরঞ্জাম, লক্ষ্মীর পা আঁকা হতো। সন্ধ্যা বেলায় প্রতিটি গোলে রবিশস্য রাখা হতো। তাঁর গলায় ঝরে পড়তো হতাশার স্বর, সেই দেশ নাই- সেই লক্ষ্মীর পায়ের চিহ্নও নেই! বাইরে উত্তরে ঠান্ডা হাওয়া, দ্রুত নেমে আসা অন্ধকার, কয়দিন বাদেই ক্ষেত থেকে কেটে আনা হবে সোনালী রঙের ধান। নতুন ধানের চাল থেকে চালের গুঁড়ো। শুনেছি দেশের বাড়িতে ঠাকুমা নিজেই ঢেঁকিতে পাড় দিতেন। ছোটকাকু সেই গল্প আমাদের বলতেন। আজকের প্রজন্ম ভাবতেও পারবে না আমাদের মা-ঠাকুমারা কতটা শ্রম ব্যয় করতেন পিঠাপুলির জন্য। অসুস্থতায় মাকে আধপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিলো, কিন্তু আজন্ম দেখেছি মা অবসর পেলেই বই খুলে চোখ বোলাচ্ছেন। কথার মাঝে নানা উদাহরণ, উপমা টেনে আনতেন। পিঠা বানাতে বানাতে কথায় কথায় ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’-এর থেকে উদাহরণ টানলেন। আবছা মনে সেই কথাগুলো রয়ে গেছে আজো। এক পৌষসংক্রান্তির সন্ধ্যায় ঠাকুমার নেতৃত্বে পিঠার বানানো চলছে, মা আমাদের শোনাচ্ছে পিঠার গল্প । চওড়া সিঁথি ভরতি সিঁদুর পড়া আমাদের সেই মা, মাথা থেকে কোনোদিন খসে না যাওয়া ঘোমটা পড়া আমাদের সেই মা– চিরকালের আলো নিয়ে, মঙ্গলকাব্যের, মহাকালের গান নিয়ে আমাদের ভাইবোনদের পিঠা খাওয়াতেন। মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে পিঠের বর্ণনা তুলে আনতেন–

‘নানা জাতি পিঠা করে গন্ধে আমোদিত।
চন্দ্রপুলি করে কন্যা চন্দ্রের আকিরত।
চই চপারি পোয়া সুরস রসাল।
তা দিয়ে সাজাইল কন্যা সুবর্ণের থাল।
ক্ষীরপুলি করে কন্যা ক্ষীরেতে চরিয়া।’

শীতের সেই কনকনে ঠান্ডার মধ্যে উষ্ণতার ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা পিঠা-পুলি-পায়েসের সঙ্গে ‘মঙ্গলকাব্য’ হাতরে রস আহরণের লোভ মা-ই দিয়েছিলেন আমাকে। সেই রস আমাদের পিঠের গায়েও লেগেছিলো। বাঙালির খাওয়াদাওয়ার তথ্যভাণ্ডার ছিলো এই মঙ্গলকাব্য, মনসামঙ্গল । পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে বিজয়গুপ্ত মনাসমঙ্গলে পিঠার বর্ণনা দিয়েছিলেন–

‘মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস।
দুইতিন প্রকারের পিষ্টক পায়স।।
দুগ্ধে পিঠা ভালো মতো রান্ধে ততক্ষণ।
রন্ধন করিয়া হৈল হরষিত মন।।

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী দেবী অন্নদার পূজা উপলক্ষে ব্রাহ্মণ ভোজনের জন্য যা যা রান্না করেছেন তার মধ্যে ছিলো পিঠা ও পরামান্ন।

‘অম্বল রাঁধিয়া রামা আরম্ভিল পিঠা।।
বড়া হল আশিকা পি্যুষী পুরি পুলি।
চুটি রুটি রাম রোট মুগের শামুলি।।

আমাদের কলোনির বাসায় মধ্যেখানে ছিলো চৌকো উঠান, এর চারদিকে আমাদের ঘরগুলো। দক্ষিণে রান্নাঘর ও গরুর গোয়ালঘর। ঠাকুমা শীত বর্ষাসহ গোটা বছর সকালে উঠে নিজেই গরুর বাটে সরষের তেল মেখে দুধ দোয়াতেন, সন্ধ্যায় গোয়ালে ধোঁয়া দিতেন। সেই লালি, ধবলির দুধ কিছুটা বিক্রি হতো, অনেকটাই থাকত আমাদের জন্য। ‘নবান্ন উৎসব’-এর সময় ঠাকুমা দুধ বিক্রি বন্ধ রাখতেন। দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করা হতো। জমি থেকে চলে আসতো নতুন ধানের চাল। সেই চাল দিয়ে ও গরুর দুধ ও বাসার নারকেল গাছ থেকে নামানো নারিকেলের কুড়ে বানানো হতো নানা পিঠা পুলি, এবং পায়েস। পিঠা বানাতে বানাতে ঠাকুমা আমাদের চণ্ডীমঙ্গলের গল্প বলতেন। সেই যে খুল্লনা চণ্ডীদেবীর আশীর্বাদ নিয়ে সর্বমঙ্গলা স্মরণ করে যা যা রন্ধন করলেন তার গল্প। সেখানে পিঠা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ।

‘কলা বড়া মুগ সাউলি ক্ষীরমোন্না
ক্ষীরপুলি
নানা পিঠা রান্ধে অবশেষে।”

আমাদের সেই শীতের সন্ধ্যারাত কোনো ভৌতিক আখ্যানের গা ছমছম করা ভয় ছিলো না, ভূতের গল্পেও নির্বিবাদী ভূতের পিঠে প্রেম ঢুকে থাকতো। এই নির্বিবাদী ভূতরা মা ঠাকুরমাদের পায়ে পায়ে, যদিও ভূতের বলে পা দেখা যায় না, চলে এসেছে সীমান্ত টপকে। ভোজন রসিক বাঙালের পিঠে বানানো সারা বছর ধরেই চলে। কোচবিহারে মামা বাড়ি সাধারণত বছরে একবার যাওয়া হতো, সাধারণত মাঘ মাসে, পরীক্ষা শেষ হলে। মায়ের বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। ময়মনসিংহ থেকেই তাঁর সুচিকিৎসক হিসাবে পসরা। দেশভাগের পর এই বাঙলায় আসা দাদুদের পাঁচ ভাই খগরাবাড়িতে পরপর পাঁচটি প্লটে বাসা বাঁধেন, অনেকটা জমি– পেছনে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত। মামাবাড়িতে যদিও পিঠার থেকে বেশি আকর্ষণ ছিলো আমার পোড়া মিষ্টি আলুতে। বাড়ির বিরাট উঠানের একদিকে ধান সেদ্ধ করার মাটির বড় বড় উনুন। তাতে বিরাট বিরাট কড়াইতে ধান সেদ্ধ করা হতো। আর ধান সেদ্ধ করে যখন তা পাটির উপর নামানো হতো তখন সেই উন্মুক্ত উনুনের আগ্নিভ তুষ ও কাঠের মাঝে গুঁজে দেওয়া হতো মেরুন ও খয়েরি রঙয়ের মিষ্টি আলু । দ্রুত তা পুড়ে যেতো। চিমটা দিয়ে সেই পোড়া ও সেদ্ধ আলু বের করে বাইরের চোঁচাটা খুলে ফেলে থালার উপর রাখা হতো এবং একটু পড়ে খাওয়ার জন্য আমাদের হুটপুটি শুরু হতো। এই স্বাদ ছিলো অসাধারণ। মামা বাড়ির সেই চিতই পিঠে দুইরকমের বানানো হতো, নোনা ও আলুনি, লবণ থাকা ও না থাকা । দিদা খুব সকালেই উঠে নিজেদের পুকুর পাড়ে চলে যেতেন। শীত বা গ্রীষ্ম– কোনো ঋতুতেই এই অন্যথা হতো না । সাত সকালে স্নান করে তবে রান্না ঘরে ঢুকতেন। দাদু এই অবসরে গোয়ালঘরের থেকে গোরুদের বাইরে এনে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। খড় বা ঘাস আগে থেকেই তৈরি করা থাকতো। পুকুরপাড়ে যাওয়ার আগে আমাদের ডেকে দিয়ে যেতেন। মুখ ধুয়ে আমরা সকালের নরম রোদে বসে অপেক্ষা করতাম কখন দিদা রান্নাঘরে ঢুকবে। ওত পেতে থাকা আমরা গুটি গুটি রান্নাঘরে ঢুকে যেতাম। দিদার হাতে বানানো চিতই পিঠে, অনেকে একে আশকে পিঠে বলে। দিদার পাশে চলে আসতো আমার মা। মাটির উনুনে ধানের তুষে চিতই পিঠে রান্না হতো। উনুনের গনগনে আঁচে মায়ের মুখে লালাভ আভা। কী সুন্দর যে লাগতো মাকে! গোল করে খোপ করা পড়া মাটির ‘সরা’, সেই খপগুলোকে হালকা করে তেল মাখিয়ে দেওয়া হতো। এরপর চালের গোলা তাতে ঢালা হতো। সেই সরা আগুনের মিঠে তাপে ভাপানো হতো খুব দ্রুত সেই পিঠে তেতে শুকিয়ে যেতো। দিদা সেই তেতে থাকা সরা থেকে চামচে দিয়ে পিঠা বের করে কেটে রাখা কলাপাতায় রাখতেন। এভাবে ধীরে ধীরে সেই কলাপাতা ভরে যেতো। আমাদের তা থেকে থালায় তুলে দিতেন। ঝোলা গুড়, খেজুরের এবং নারকেল কোরা দিয়ে সেই গরম গরম চিতই পিঠের স্বাদই আলাদা। আসকে বা চিতই পিঠে নলেন গুড়ে গড়াগড়ি না দিলে স্বাদ খোলে না। এরপরের পর্বে ঘন করে জ্বাল দেওয়া হতো বাড়ির গরুর দুধ। সেই ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধে চিতই পিঠা দেওয়া হতো, এর সঙ্গে হাতে বানানো চুষি। এই পায়েসের স্বাদ ছিলো পাগল করা। ছোটো মামি এসে খুনসুটি করে দিদিমাকে শুনিয়ে গেলেন ঈশ্বর গুপ্তের ছড়া–

‘আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর
গড়িতেছে পিঠেপুলি অশেষ প্রকার।
বাড়ী বাড়ী নিমন্ত্রণ কুটুম্বের মেলা
হায়-হায় দেশাচার ধন্য তোর খেলা।।
কিংবা
‘শাশুড়ি আলাদা রেখে ছাই তিন হাঁড়ি
চুপু চুপি পাঠাইলেন কন্যাতীর বাড়ী।’

মামাবাড়ির পার্বণ ছিলো মজার আর খুনসুটির। মামাবাড়িতে মায়ের অনেকটা উদ্বৃত্ত সময় থাকতো, তিনি সেগুলো আমাদের জন্য রেখে দিতেন। সন্ধ্যায় মাকে ঘিরে আমরা, আমি ও আমার মামাতো ভাই বোনেরা। মা নানা বিষয় নিয়ে গল্প করতেন। পৌষের দিনের সেই গল্পের ছলে মা পিঠে প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এতে গৌরচন্দ্রের জন্য যে পঞ্চাশ ব্যঞ্জন রান্না হচ্ছে, সেখানে পিঠেপুলিও ছিলো ।

‘মুদ্গা বড়া, মাস বড়া, কলা বড়া মিষ্ট।
ক্ষীরপুলি নারিকেন পুলি আর পিষ্ট।।
কাঞ্চি বড়া দুগ্ধ চিড়া দুগ্ধ লকলকি।
আর যত পিঠা কোইল কহিতে না সকি।।’

পিঠে থেকে মা চৈতন্যের গল্পে চলে যেতেন। গৃহত্যাগ প্রসঙ্গ এলে চোখ তাঁর ছলছল করে উঠতো। প্রসঙ্গান্তরে চলে যেতেন তিনি– ‘আবার ‘চৈতন্যভাগবত’-এ শ্রীক্ষেত্রে অদ্বৈত প্রভুরা স্ত্রী-পুরুষে মিলে তাঁদের অন্তরের প্রভু গৌরচন্দ্রের তুষ্টির জন্য দশরকমের শাকভাজার পরে কী প্রস্তুত করলেন?

‘ঘৃত দধি দুগ্ধ সর নবনী পিষ্টক।
নানাবিধ সর্করা সন্দেশ কদালক।।’

মায়ের ওই কথায় একথা বুঝতে আমাদের অসুবিধে হয় না যে সংসারের মায়া ত্যাগ করলেও আমাদের নদের নিমাই এর পিঠে পরামান্নের প্রতি লোভ ত্যাগ করা সম্ভব হয়নি। কে-ই-বা পারে সেই ভাজা সোনা মুগের অপূর্ব সুবাস, নারকেলের কুড়ে চরা বা দুধ জমিয়ে ঘন ক্ষীরের পুর দেওয়া পাটিসাপ্টা বা ঘন দুধের ডুবে থাকা চুষির স্বাদকে এড়িয়ে যেতে!
সেবছর আর মামাবাড়ি যাওয়া হয়নি। আমাদের সাতঘরের বাসায় ঠাকুমার নেতৃত্বে পৌষ-পার্বণ। স্কুল ফেরতাম আমরা, বন্ধুরা আমাদের বাসায়। তাওয়া থেকে নামানো গরম গরম পাটিসাপ্টা হাতে হাতে। ওদিকে দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে, ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে সেই শ্বেত শুভ্র দুধ। থালায় আগে বানিয়ে রাখা হয়েছে পুলি। দুধ ঘন হতে হতে সেই পুলি যা চালের গুড়ো, নারকেলের কোরা বা ক্ষীরের পুর ভরা সেগুলো আস্তে আস্তে ছাড়া হতে থাকে। এরপর সেই দুধ আরো জ্বাল দেওয়া হতো, যতোটা ঘন করা যায়, এতে সেই পুলিগুলোও সেদ্ধ হতো। দুধ পুলি একটু ঠান্ডা হলে স্বাদ চমকায়, তাই ঠাকুমা বললেন– কাল সকালে এসো বা তোমাদের বন্ধু বাসায় দিয়ে আসবে।

পরদিন সাতসকালে উঠে মুখ ধুয়ে তৈরি হচ্ছি, এমন সময় সেই মারাত্মক খবর আনলো আমার ছোট কাকা। রঞ্জন আত্মঘাতী হয়েছে। আমার কাছে এ অবিশ্বাস্য, হতেই পারে না। কাল এই ঘরে ও পাটিসাপ্টা খেয়ে গেলো। ওই তো ঘরের মেঝেতে কাঠের পিড়িতে ঢাকা দেওয়া জামবাটিতে ঠান্ডা হচ্ছে পুলিপিঠা, দুধ পুলি। এখনই ওর বাসায় নিয়ে যাবো। এখনও সেই সকালের কথা মন থেকে মুছতে পারিনি, আমার আত্মা থেকে ঝরে গেছে একটা হাড়খণ্ড। আমি এক দৌড়ে স্কুলের সামনে, সেখানে অনেক জটলা। স্কুলের পেছনেই ওদের বাড়ি। পুলিশ এসেছে। সামনে যারা জটলা করে ছিলো তাদের একপ্রকার ধাক্কা দিয়েই ওদের সেই ভাঙাচোরা ঘরের সামনে। ঘরের চৌকাঠে রঞ্জনের মা, বাক্যহীন স্তব্ধ। আমাকে দেখে তাকালেন, চোখ স্থির। ঘরের ভেতর তখনো রঞ্জন ঝুলছে। ‘বডি’ নামানোর তোড়জোড় চলছে। আমার চোখের সামনে দুলছে দুটি নগ্ন পা। আমার গোটা জীবন সেই ঝুলন্ত, দোদুল্যমান পা, হলদে হয়ে যাওয়া পা পেন্ডুলামের মতো ঝুলতে ঝুলতে কিছু বলছে, এই শব্দের পাঠ উদ্ধার করতে পারিনি, আজো।

চলবে

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আন্ডারপাসে পিকনিকের বাস আটকে শিশু নিহত, আহত ২২
আন্ডারপাসে পিকনিকের বাস আটকে শিশু নিহত, আহত ২২
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আমিরাত ও যুক্তরাজ্য গেলেন রাষ্ট্রপতি
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আমিরাত ও যুক্তরাজ্য গেলেন রাষ্ট্রপতি
আবারও হাবের নেতৃত্বে শাহাদাত হোসাইন
আবারও হাবের নেতৃত্বে শাহাদাত হোসাইন
গাজীপুরে তুলার গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে
গাজীপুরে তুলার গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে
সর্বাধিক পঠিত
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ
মোবাইল অপারেটররা দিতে পারবে ওয়াই-ফাই সেবা, আপত্তি আইএসপি অপারেটরগুলোর
মোবাইল অপারেটররা দিতে পারবে ওয়াই-ফাই সেবা, আপত্তি আইএসপি অপারেটরগুলোর
স্কুলে গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে পারেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা: শিক্ষামন্ত্রী
স্কুলে গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে পারেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা: শিক্ষামন্ত্রী
বিদেশের সম্পদ দেশের টাকায় করিনি: সাবেক ভূমিমন্ত্রী
বিদেশের সম্পদ দেশের টাকায় করিনি: সাবেক ভূমিমন্ত্রী
ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ‘এএমপিএম’, পলাতক কর্মকর্তারা
বেইলি রোড ট্র্যাজেডিব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ‘এএমপিএম’, পলাতক কর্মকর্তারা