১৬তম পর্ব
“Living amongst animals one becomes more like them.’
( Douglas Hamilton)
আমাদের সহপাঠী দেশবন্ধুনগর কলোনির ১২ নম্বর গলির সুকল্যান রায়, আমরা ডাকতাম সুকু বলে। ওর কাকা বিমল রায় আর আমার ছোট কাকা দুই ভাইয়ের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই সহপাঠী সুকু আর আমি দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। তখন আমরা ক্লাস ফোর পড়ি, একদিন সুকুকে সাপে কাটলো। ওর কাকা ছিলেন বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার। সাপ ও সাপের বিষ নিয়ে আধুনিক জ্ঞান থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল তাঁর। ওঝা গুণিনের খপ্পরে না পড়ে প্রথমেই কামড়ের চিহ্ন শনাক্ত করে পায়ের সেই ক্ষত চিহ্নের কিছুটা ওপরে দড়ি বেঁধে সুকুকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই যাত্রায় সুকু বিপদমুক্ত হয়ে বাসায় ফিরে আসে। আমরা সবাই এরপর ওকে বিষাক্ত সুকু বলে মজা করে ডাকতাম। আমি বড় স্কুলে ভর্তির পরেও আমাদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল।
বিমল কাকু ফরেস্টের বিট অফিসার থেকে রেঞ্জ অফিসার হয়ে জলদাপড়া রেঞ্জের দায়িত্বে, সেই সময় বাবা একদিন আমাকে নিয়ে জলদাপাড়া গিয়েছিলেন। জলদাপাড়ার হলং বন বাংলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে চর্চিত বনবাংলো। বাবার বন্ধু ডুয়ার্সের শ্রমিক নেতা, বিধায়ক ভবানী পাল ও তাঁর মেয়েসহ আমরা চারজন। মাদারিহাট থেকে সংরক্ষিত জঙ্গলে ঢুকতে হলে বিশেষ অনুমতি দরকার। দিনের আলো ততক্ষণে কমে এসেছে। চেকপোস্ট থেকে একজন বন্দুকধারী সিকিউরিটি গার্ড আমাদের গাড়িতে উঠলেন। অভয়ারণ্যের পথে আমাদের জিপগাড়িটি ঢুকতেই একটা ঠান্ডা গা ছমছম অনুভূতি। ঘন জঙ্গলের ভেতরের পাথুরে রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি চলছে, সঙ্গে থাকা বন বিভাগের সিকিউরিটি গার্ড আমাদের আওয়াজ করতে নিষেধ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর একটা ফুলের বুনো গন্ধ পেলাম। উগ্র মাতাল করা সেই গন্ধ। গার্ড জানালেন আমরা হলং বাংলোর কাছে চলে এসেছি, এই ফুলের গন্ধ বাংলোর বাগান থেকে আসছে , কাঁঠাল চাঁপা ফুলের গন্ধ। আধো অন্ধকারের জমাট অরণ্যের পথ, মাতাল করা চাঁপা ফুলের গন্ধ, মাঝে মাঝেই কোকিলের ডাকের স্মৃতি এখনো আমার ভেতর রয়ে গেছে। হলং বাংলার কাছাকাছি জঙ্গলের ভেতর একটা ছোট্ট ঢিবি, গার্ড জানালো ওগুলো লবণ মাটির ঢিবি। গণ্ডারের, হাতিদের খাওয়ার জন্য এই ঢিবিগুলোতে লবণ মাটি থাকে। বাংলোয় ঢুকবার আগেই আর এক রোমহর্ষক ঘটনা! একপাল বাইসন দিয়ে রাস্তা পাড় হচ্ছে, আমাদের গাড়ির সামনে দিয়ে প্রায়। গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল, হেডলাইট জ্বালিয়ে রাখা হল। আলোর জন্য দূর দিয়েই সেই বাইসনের দল চলে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতর থেকে আমরা নিঃশব্দে সেই অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য দেখছি। সেই প্রথম বনের ভেতর আমার বন্যপ্রাণের দেখা। লাল শাড়ি হাই-হিল ভবানী জেঠুর মেয়ে আমার পাশে বসে ছিল। উত্তেজনায় আমার হাত চেপে ধরলেন, কিশোর দেহমনে সেই বন্য দৃশ্য, চাঁপা ফুলের গন্ধ ও গরম স্পর্শ স্থায়ী দাগ রেখে গেলো!
একটা অসাধারণ সুন্দর বন বাংলো এটি। পাথর কুচি বিছানো রাস্তার দুদিকে যত্নে বানানো নানা ধরনের ফুলের গাছে সাজানো বাগান। মাঝে ১০/১২ ফুট খুঁটির উপর সবুজ রঙের কাঠের বাংলো। সেই সময় বাংলোটি কাঠের ছিল, এখন ইট সিমেন্টের নির্মাণে অনেক বড়সড় হয়েছে। ১৯৭৭ এর পর বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ডুয়ার্সের দিকে এলে এখানেই উঠতেন। ভি ভি আই পি অতিথিদের কল্যাণে আজ এটি অনেক ‘কর্পোরেট’ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার কৈশোরের সেই বনবাংলোটির স্মৃতি আজও অম্লান।
আমার স্কুলে সে সময় গরমের ছুটি চলছিল। বিমল কাকু বাবাকে বললেন, ‘বাবনকে এখানে রেখে যান। আমি আগামী সপ্তাহে বাসায় ফেরার সময় ওকে নিয়ে যাবো।’ বাবা এক কথায় রাজী, আমার কাছে এ হাতে স্বর্গ পাওয়া। হলং বাংলো থেকে কিছুটা ভিতরে ফরেস্ট কোয়ার্টার, পিলখানা ইত্যাদি। কাকুর কোয়ার্টের দেখভাল করেন একজন আদিবাসী যুবক। রামু লাকড়া, রান্না থেকে যাবতীয় কাজের দেখাশোনার দায়িত্ব তারই। বিমল কাকু বিয়ে করেননি। বড় পরিবারের দায়িত্ব ও বন জঙ্গলের স্থিতিহীন জীবনে আর কাউকে যুক্ত করতে চাননি তিনি। আমি এখানে সপ্তাহখানেক থাকবো শুনে রামুদা বেশ খুশি হলেন। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের জিপে করে বিমল কাকু রামুদার সঙ্গে আমাকে কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিলেন। এখানে জঙ্গল অনেকটা ঘন। কাঠের খুঁটির উপর অধিকাংশ ঘর, প্রায় এক মানুষ বা তার বেশি উঁচু খুঁটি, কাঠের বা কংক্রিটের। মূলত বন্য জন্তু, হাতির উৎপাতের কারণে অরণ্য ও সন্নিহিত এলাকার ঘরগুলো প্রাচীন কাল থেকেই এভাবে বানানো হয়। এখানে কিছু কংক্রিটের পিলারের ওপর সিমেন্টের ঘর রয়েছে। গোটা জায়গাটা সিমেন্টের খুঁটিতে তারের জালি দিয়ে ঘেরা। বন্য প্রাণের ক্ষতি হতে পারে বলে কাঁটাতার ব্যবহার করা হয়নি। একদিকে পিলখানা বা হাতিদের রাখার জায়গা অন্যদিকে মৌমাছি ও মাশরুমের পালন ইউনিট, মাহুতদের থাকার ব্যবস্থা। পিলখানায় গোটা দশেক হাতি রাখার ব্যবস্থা, মোটা খুঁটি ও ভারী শেকল, মাথার উপর উঁচু করে করা টিনের ছাউনি। এখানে পায়ে লোহার শেকলে বাঁধা থাকে হাতিরা। এদের মধ্যে থেকে চারটি হাতিকে পর্যটকদের জঙ্গল সাফারির জন্য ব্যবহার করা হয়। অন্যগুলো বন দপ্তরের কাজের, কুনকি বা কাঠ বহনের জন্য। আসার পথেই রামুদা বলছিলেন ফুলমণির কথা। ফুলমণি বনবিভাগের এক চর্চিত হাতির নাম। গত বছর সে জলাতঙ্ক রোগে মারা গেছে। মৃত্যুর আগে তার মাহুতকে পায়ের নিচে থেঁতলে হত্যা করেছে ফুলমণি। এই ঘটনায় বন বিভাগ তোলপাড়। খবরের কাগজে ফলাও করে করা হয় এই খবর। রেঞ্জ অফিসার সহ অনেক অফিসার বদলি বা সাসপেন্ড হয়েছেন। এই ঘটনার পরেই এখানে বিমল কাকুকে রেঞ্জ অফিসার করে আনা হয়। বিমল রায় বন বিভাগের একজন অভিজ্ঞ ও সিনিয়র অফিসার, সবাই শ্রদ্ধা করেন তাঁকে। বন কর্মচারীদের রাজ্য সংগঠনের সভাপতিও তিনি।
বিমল কাকুর কোয়ার্টারের সেই ‘টং-ঘরে’ আমার থাকার ব্যবস্থা হল, মধ্যখানের ঘরে। প্রথম রাতেই হই হই কাণ্ড। কোনোভাবে একটা বন্য হাতি সেই চত্বরে ঢুকে পড়েছে। রামুদা আমাকে ডেকে তুললেন। ওদিকে টিন বাজানো হচ্ছে, পটকা ফাটানো হচ্ছে। আমাকে বাইরে, বারান্দায় যেতে না করলেন। নাকে একটা তীব্র গন্ধ আসছিলো, কিন্তু ভয়ে ও উত্তেজনায় কাঠ হয়ে ঘরের মধ্যেই থাকলাম। এক সময় হন্তদন্ত হয়ে বিমল কাকু ঘরে এসে দেওয়াল আলমারি থেকে একটা লম্বা বন্ধুক নিয়ে গেলেন। হাতিকে দরকারে ঘুম পারানোর ট্রাংকুলাজার ইঞ্জেকশনের কার্টিজ ছুড়তে হতে পারে। কিন্তু তা আর করতে হয়নি। পটকার আওয়াজে হাতিটি ধীরে ধীরে যে পথ দিয়ে তারের জালি ভেঙ্গে ঢুকেছিলো সেই পথ দিয়েই বেড়িয়ে যায়। রামুদাকে সেই উৎকট গন্ধের কথাটা বললাম। সে বললো ওটা হাতির মস্তির গন্ধ। এই গন্ধে পুরুষ হাতি সঙ্গিনীর কাছে বার্তা পাঠায়, প্রজননক্ষম পুরুষ হাতির কানের পাশ থেকে একটা তরল বের হয়, সেটাই মস্তি। এই ‘মস্তি’-এর সময় হাতি অনেক বিপজ্জনক হয়ে থাকে। পিলখানায় হস্তিনির টানে এই দাঁতাল পুরুষটি এসেছিল। রামুদা বললেন যে অনেকদিন ধরেই এই হাতিটি কোয়ার্টারের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বছর পাঁচেক পরে ডুয়ার্সের চাপড়ামারি বনবাংলোয় একবার প্রকৃতীশচন্দ্র বড়ুয়া বা বিখ্যাত লাল জী-এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। গৌরীপুরের রাজপুত্রের সঙ্গে এক রাত এক সাথে! হাতি ধরা থেকে হাতি বিষয়ক যাবতীয় বিষয়ে তিনিই শেষ কথা। সে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার রাত। সেই সময় হাতির ‘মস্তি’ প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বিস্তারিত বলেছিলেন। ‘মস্তি’ হাতির এক বিচিত্র ও সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড। যৌন সঙ্গমের ইচ্ছা বা কামোত্তেজনার কারণেই হাতির ‘মস্তি’ হয়ে যায়। ‘মস্ত’ কথাটা হিন্দি; আমরা বলি ‘ভাট্টিখোলা’। কামোত্তজনার উৎপাত শুরু হয় তখনি, যখন একটা মদ্দা হাতি পুরোপুরি জোয়ান হয়ে ওঠে। অন্য সব জন্তুদের বেলায় মাদীরাই প্রথমে উত্তেজনার কবলে পড়ে। তাদের উত্তেজনার ঝলসানিতে পড়ে মদ্দারাও মত্ত না হয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু হাতির বেলায় উল্টোটা ঘটে। মদ্দা হাতি মস্তি না হলে মাদি হাতিদের গায়ে উত্তেজনার আঁচ লাগে না। মাদীরা গরম না হলে আদিম খেলায় মেতে উঠবে কি করে? প্রতি বছর মোটামুটি একই সময়ে হাতি মস্তি হয়। কারো যদি বৈশাখে হয় তো প্রতিবছর বৈশাখেই হবে, অন্য জীবজন্তুর মতো হাতিদের কোনো নির্দিষ্ট মিলন-ঋতু নেই। তবে সাধারণত বসন্তে বা বর্ষায় মস্তি হওয়ার প্রবণতা বেশি এদের। সাধারণত ২৫/২৬ বছরে হাতি মস্তি হওয়ার শুরু, চলে অনেক বছর। লালজী বলেছিলেন তাঁদের বিখ্যাত হাতি ‘জং বাহাদুর’ আশি বছর বয়েসেও মস্তি হয়েছিল। এই হাতি লালজীর দাদা বিখ্যাত অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়ার সিনেমা ‘মুক্তি’-তে দেখা গিয়েছিল। জং বাহাদুরকে ভারতের সর্বকালের সবচেয়ে বড় হাতি বলে মনে করা হয়। হাতির উচ্চতা মাপা হয় মাথার থেকে পা পর্যন্ত, জংবাহাদুরের উচ্চতা ছিল দশ ফুট সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি, পিঠ থেকে মাপলে আরো বেশি। ‘মস্ত’ হাতির চেহারায় লাবণ্য এনে দেয়। কান ও চোখের মধ্যে একটা রেখা টানলে তার মাঝ বরাবর একটা ফুটো দেখা যায়। সেই ফুটো থেকে এই সময় একটা তরল বের হয়, এটাই মস্তিরস। সাধারণত এক দেড় মাস এই মস্তি অবস্থা থাকে। এই ‘মদ’ বা ‘মস্তি’ মদস্রাবের গন্ধ এক ফার্লং দূর থেকেও পাওয়া যায়। এই সময় দেহের উত্তেজনায় তারা অধীর, অস্থির হয়ে পড়ে।
সেই বার লালজী আমাকে মস্তি ও হাতি নিয়ে কয়েকটি ঘটনার গল্প শুনিয়ে ছিলেন। তিনি একবার দরং জেলায় বাঘ শিকারে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে শোনেন যে এক ‘মহাজনের’ একটি ‘মস্ত’ হাতি ছুটে গেছে। মাহুত তাকে ধরতে গেল প্রথমে। হাতির তাড়া খেয়ে সে পালিয়ে এলো। এরপর মহাজন নিজেই গেলেন, খাইয়ে দাইয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে হাতিটিকে ফিরিয়ে আনলেন। মহাজনের পিছু পিছু হাতিটি বাধ্য ছেলের মতো ফিরে আসার পর মহাজন তাকে বকাবকি শুরু করল, ‘আর একবার এমন করলে তোকে মেরেই ফেলবো’। যেই এই কথা বলেছেন তিনি, অমনি হাতিটি রেগে গিয়ে মহাজনকে তার বিরাট দাঁতের আঘাতে ফালাফালা করে ফেললো। খবর পেয়ে মহাজনি ছুটে এসে হাতির পায়ে আছড়ে পরে বললেন— ‘আমার সর্বনাশ করলি, তুই মোক মারি ফেলা’। কিন্তু হাতিটি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার চোখে তখন জল। আর একটি গল্প এক আড়তদারের স্বপ্ন নিয়ে। সেই আড়তদার স্বপ্ন দেখলেন যে তার দোকানে যদি কোনো মস্তি হওয়া হাতির পা পড়ে তাহলে তার কারবার উথলে উঠবে। সে তখন জংবাহাদুরের মাহুতকে এসে ধরলো। মাহুত জংবাহাদুরকে নিয়ে চলল আড়তদারের দোকানে। প্রথমে তাকে ফুল বেলপাতা, পঞ্চপ্রদীপ দিয়ে বরণ করে নেওয়া হল। এরপর বালতি ভরা খাওয়ার দেওয়া হল। এরপর আরতি। হাতির গায়ে হাত বোলানোও হল। হাতি যখন খেয়েদেয়ে খোস-মেজাজে ফিরছে তখন মহাজন হাঁক দিলো— ‘কই হে মাহুত, হাতি তো আমাকে সেলাম করল না!’ ব্যাস, পলকে প্রলয় ঘটে গেল। হাতি বিদ্যুৎ বেগে ঘুরে দাঁড়াল। এরপর মহাজন আর আত্মরক্ষার সুযোগই পেল না। জংবাহাদুরের এই আচরণের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নাই। অতি দুর্বল ব্যাখ্যা হলেই বা মহাজন, মহারাজের পাট-হাতিকে সেলাম করতে বলা!
লালজী বা প্রকৃতেশ বড়ুয়ার সঙ্গে কাটানো সেই দিন ও রাতে আমি বন্যপ্রাণকে নতুন করে চিনলাম, অনেক কথা জানলাম।
চলবে








